ভয়

ভয়

ছোট বোনটা প্রতিদিন মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ধপাস করে উঠে বসে কাঁদতে শুরু করে।প্রথম প্রথম ওর এই দৃশ্য দেখে খুব ভয় লাগতো কিন্তু এখন তেমন একটা লাগে না।কারন এখন জানা হয় গেছে যে এইটা ওর প্রতিদিনেরই কান্ড।সকালে উঠে একবার ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম-

-এই,রাত হলেই তোর কি হয়ে যায়?বল তো…
-কেন আপু?আমি কি করলাম?
-নাটক করবি না আমার সাথে।মাঝরাতে সজাগ হয়ে বসে বসে কাঁদিস কেন!
-ঘুমের মধ্যে আমি কি করি না করি সেটা আমি কিভাবে জানবো?

ইমিতার কথা শুনে মনে হলো সত্যিই ও ঘুমের মধ্যেই এসব উলটোপাল্টা কান্ড করে।ইমিতা মজা করার মতো ছটফট টাইপ মেয়ে তো মোটেও না।এর কিছুদিন পর ঘটলো আরেকটা হুলস্থূল কান্ড।সেটাও মাঝরাতেই।ইমিতা চোখ বন্ধ করেই রুমে হাটছে মাঝে মাঝে এমন ড্যান্স দিচ্ছে যা দেখলেও ভয় ভয় লাগবে।আমি ওকে কয়েকবার ডেকে ধরে ধরে বললাম-

-ইমিতা,তুই এসব কি করছিস?
ইমিতা আমার কথা শুনলো কি না বোঝা গেলো না।ইমতা তার মতো করেই নেচে যাচ্ছে।আমি এতো ভয় পেলাম যে সারারাত কম্বল মুখ বরাবর ঢেকে কুকড়ে শুয়ে রইলাম।সকালে উঠে যখন জিজ্ঞেস করলাম-
-ইমু,তোর কি কোনো অসুখ হয়েছে?
-আমার আবার কিসের অসুখ হবে?
-কাল রাতে এতো পাগলামো করছিলি কিসের জন্য?
-আমি পাগলামো করেছি?কি বলছো এসব?

-রাত হলেই তোর আবোল তাবোল কান্ডকারখানা শুরু হয়ে যায়।কাল তুই চোখ বুঝে এতো নাচানাচি করলি যে আমি তা দেখে খুব ভয় পেয়েছি।

-সেকি!আমি তো কাল চমৎকার একটা ঘুম দিয়েছি।আমি কখন উঠলাম আর কখনই বা নাচলাম আমার মনে পরছে না।

ইমিতার কথা শুনে আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেলো।আসলেই কি ও নিজের অসুস্থতা টের পাচ্ছে না!ইমিতা হঠাৎ করেই যেন বদলে গেলো।ব্যাপারটা আমি কেউকেই বললাম না।নিজের মধ্যেই রাখলাম।প্রতি রাতেই ইমিতার নতুন নতুন কান্ড দেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকতে হয়।একেক দিন একেকরকম কান্ডকারখানা।
আজ একেবারে ঠিক করে রাখলাম ইমিতা যখনি রাতে জেগে উঠে পাগলামো করা শুরু করবে তখন আমিও ওর সেই পাগলামোতে অংশ নিবো।অর্থাৎ সে যা করবে আমি ওর মতো করে সেটাই করবো।এইবার হবে পাগলীতে পাগলীতে মাস্তুত বোন।আজ রাত আড়াইটার সময় ইমিতা চোখ বন্ধ করেই বিছানায় উঠে দাঁড়িয়ে চুল ছড়িয়ে লাফাতে লাগলো।চোখ টিপ টিপ করে ব্যাপারটা লক্ষ করে আমিও বিছানার উপর উঠে খোলা চুলে ওর মতো করে লাফাতে লাগলাম।ইমিতা যেমনটা করছে আমিও ঠিক তেমনটাই করছি।কিছুক্ষণ পর ইমিতা নিজেই আঁতকে উঠে স্বাভাবিক হয়ে আমাকে ধরে বললো-

-পরী আপু,তোমার কি হলো?ও পরী আপু..

আমি ইমতার কথা শুনলাম না।আমি আমার মতো করেই চুল ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করে লাফানোর প্রক্রিয়া চলমান রাখলাম।ইমিতা এইবার কিছু না বলেই বোকার মতো কেঁদে দিলো।কাঁদতে কাঁদতে বললো-

-আমি এতোদিন মজা করে এসব করতাম।এখন তো দেখি সত্যি সত্যিই তোমাকে কানা ভূতে ধরে ফেললো।আমার খুব ভয় লাগছে।পরী আপু,তুমি শুনতে পাচ্ছো!

আমি এইবার স্বাভাবিক হলাম।বোকাটা আমাকে ভয় দেখানোর জন্য এসব করছে সেটা আমার অনেক আগেই সন্দেহ হয়েছিলো।আমি বললাম-

-কেন আমাকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলি?
ইমতা কান্না বন্ধ করে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো-

-আরাফ ভাইয়ার সাথে বাজি ধরেছিলাম।তার ধারণা তুমি কোনো কিছুকে ভয় পাও না।কিন্তু আমার ধারণা তুমি ভীতু মেয়ে।আর তাই আরাফ ভাইয়া বলেছে আমি এই বাজিতে জিতে গেলে আমাকে সে পুরস্কার দিবে।

আমি কিছু বললাম না।চুপ হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।এই মুহূর্তে একটা অতীত ঘটনা আমার মনে পরেছে।খুব ছোট থাকতে একবার পাবলিক বাসে করে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম।কিছুক্ষণ পর পুরো বাসটাই খালি হয়ে গেলো।বাসটা কিছুদূর যেতেই মনে হলো আমি ছাড়া বাসটিতে আর কেউ নেই।বাসের কন্ডাক্টর একটি কুৎসিত হাসি দিয়ে আমার দিকেই এগিয়ে আসছিলো।আমার পাশে বসে যখন অদ্ভুত কান্ড কারখানা করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলো ঠিক তখনি আমি আমার নখ আর ব্যাগে থাকা স্টীলের স্কেল দিয়ে লোকটির মাথায় মুখে ক্ষতবিক্ষত করে দৌড়ে বাস থেকে নেমে বাকিটা পথ হেটে বাসায় এসেছিলাম।আর এই ঘটনার পর থেকেই আরাফ ভাইয়া আমার নাম দিয়েছে ব্রেভ গার্ল।আমি মৃদু হেসে ইমিতাকে বললাম-

-মেয়েদের সাহসী হতে হয়।তোকেও হতে হবে।খুব সাহসী হতে হবে।প্রচন্ড সাহস নিয়ে চলতে হবে।মনে থাকবে?
ইমিতা হ্যা সূচক মাথা নাড়িয়ে বোঝালো তার মনে থাকবে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত