কবিতার ক্লাস

কবিতার ক্লাস

-“ভাইয়া প্লীজ,আমাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেন।”

মাইশা কথাটা বলল দুষ্টুমি ভরা চোখে।ক্লাস নাইনে পড়ে,পড়ালেখাতেও বেশ ভালো।আমাদের পাশের বাসাতেই থাকে।অংকে খানিক কাচা,তাই আন্টি আমাকে দায়িত্ব দিয়ে বলেছিল,”তুমি সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের স্টুডেন্ট,ম্যাথেও নাকি শুনেছি ভালো।আমার মেয়ে তো তোমার ছোটবোনের মত,ওকে কিছুটা সময় দিও।টাকার কথা চিন্তা করতে হবে না।”

আমি লাজুক হেসে বলেছিলাম,”আন্টি আমি তো প্রফেশনালি পড়াই না।টাকার চিন্তা করছি না,নিজের পড়া গুছিয়ে আমি অবশ্যই মাইশাকে অংক দেখিয়ে দেব।আপনি টেনশন না নিলেই ভালো।” তো মাইশাকে কয়েকদিন পড়াতেই বুঝলাম মেয়েটা দুর্দান্ত চালাক।আমার মত বোকা মানুষদের এক্ষেত্রে নাজেহাল হতে হয়।

যাই হোক,ওর এরূপ আব্দারে আমি প্রথমে ভীষন অবাক হলাম।তারপর ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলাম,

-“তুমি জানো ক্যামনে আমি কবিতা লিখি?”
-“আপনার ডায়রীটা সেদিন ভুলে রেখে গেছিলেন।আমি পড়ে ফেলেছি।সেখানে বড় আপুরে নিয়াও কবিতা আছে।”
মাইশার কথা শুনে তো আমার হার্টফেল করার মত অবস্হা।ওর বড় আপুকে তো আমি দু একবারের বেশি দেখিনি গত ছয়মাসে।দেখতে মোটামুটি সুন্দরী,রংপুর মেডিকেলে পড়ে।থাকে সেখানকার হোস্টেলে।কোনো রকমে মাইশাকে বললাম,

-“দেখো,আমি কিন্তু মোটেও তোমার আপুকে নিয়ে লিখিনি।কবিতায় একটা নারী চরিত্র লাগে,তাই একটা কাল্পনিক নাম বানিয়েছি।”

-“তাহলে নীলিমা কার নাম?আমার আপুর ভালো নাম নীলিমা।”

-“আচ্ছা তোমরা তো তাকে ডাক নামে ডাকো।আমি কেমনে ওর আসল নাম জানবো বলো তো?বিশ্বাস করো এটা কাকতালীয়।”

-“আচ্ছা,বিশ্বাস করলাম।এখন আমাকে এই মুহূর্তে একটা রোমান্টিক কবিতা লিখে দ্যান।”

-“কালকে লিখলে হয় না?আমি নাহয় বাসা থেকে লিখে আনবো?”
মেয়েটা মুখ ফুলিয়ে বলল,
-“না,এখনি লিখতে হবে।নয়তো আপিকে সব বলে দিবো।”
আমি মেয়েটার ধূর্ততা দেখে বিষম অবাক হলাম।

তো,পড়ানো বাদ দিয়ে মাইশার জন্য দ্রুত একটা কবিতা লিখতে হল।লেখার আগে ওকে একবার দেখেনিলাম।ওর নাকে একটা সুন্দর তিল আছে।ছোট্ট। লেখা শেষ হলে পর আমার কাছে বায়না ধরল সে-“এবার আবৃত্তি করে শুনান।” আমার তখন একটু বিরক্তি লাগল,নিজের বোন হলে পড়ার সময় এসব বায়নাক্কার জন্য কান মুলে দিতাম আচ্ছা করে।এখন পুলিশের মেয়ে,রাগ করতেও ভয় লাগে। মাইশাকে অবশেষে আবৃত্তি করে শুনাতে হল—

“তোমার নাকের ডগায় বাদামী এক তিল
দেখো,আমার প্রিয় আকাশটা ঝিলমিল
তোমার বর্ষাদুপুর কাটিয়ে আসা এই দিন
আমার বোতামভাঙা শার্টটাও ভীষন নীল।
আমার ভালোবাসার প্রহরগুলির রেশ
তোমার ঠোঁটভেজা ঐ চায়ের কাপে চুমুক
আমার পদ্য লেখার রাত্রিজাগা শেষ

তোমার বুকের কাছে চুমুর চিহ্ন বাড়ুক।” কবিতার কাহিনী শেষ হলে দেখি দরজার সামনে আন্টি দাড়িয়ে।মুচকি হেসে উনি বললেন,”তোমার গলার স্বরটা দারুন।ভালো হয়েছে আবৃত্তিটা।”

কখন যে উনি এলেন,টের পাইনি।আমি এমনিতেই লাজুক।এ কথা শুনে আমার দুই কান লাল হয়ে উঠল।তো,চালাক মেয়েটা করল কি,চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে আন্টির পাশে দাড়িয়ে বলল,

-“দেখো না আম্মু,১৯ তারিখে স্কুলের অনুষ্ঠানের জন্য ভাইয়াকে এতো করে ধরলাম একটা কবিতা লিখে আমাকে আবৃত্তি করে শুনান,আপনার থেকে শিখে অনুষ্ঠানে কাজে লাগাবো।বেশ হবে।অনেক বলার পর ভাইয়া ছোট্ট একটা পদ্য শুনালো।তুমি বলো না আম্মু ভাইয়া যেন আমাকে কবিতা লেখা শিখিয়ে দেয়।”

আন্টি আমার দিকে চেয়ে বললেন,”আচ্ছা বাবা তুমি একটু আবৃত্তিটা ওকে শিখিয়ে দিও,বাচ্চা মেয়ে।নাহলে আবার কী করে বসে!”

আমি মা আর মেয়ের অবস্থা দেখে থ হয়ে বসে থাকলাম।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত