বন্ধুত্বের স্বাদ

বন্ধুত্বের স্বাদ

অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে সৌম্য। জয়ন্ত এখনো এলো না। ছেলেটার স্বভাব এখনো গেল না। কলেজ থেকেই ওর সবসময় লেট করা স্বভাব। ভাবতে ভাবতে স্মৃতি গুলো ভাসতে থাকে সৌম্যর চোখের সামনে। যেন সেদিনের কথা। সেই কলেজের পাশে হরি কাকার কাছে চা আর সিঙারা খেতে খেতে আড্ডা। কোন ডিপার্টমেন্টে নতুন মেয়ে ভর্তি হয়েছে, সে সব খবর থাকতো জয়ন্তের কাছে। চায়ে চুমুক দিয়ে চলত আড্ডা। সৌম্যর পরিবারের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিলো না। মানে খারাপই বলা চলে। জয়ন্ত তাকে সেইসময় প্রচুর সাহায্য করেছে। জয়ন্ত ছিল নদীর স্রোতের মতো। সবসময় চলমান। খুব ইমোশনাল ও। এত ভালো বন্ধু কিন্তু সেদিনের ওই ঘটনার পর সব যেন ভেঙ্গে গেল। আজ দু’বছরের বেশি হয়ে গেল। জয়ন্তের সাথে কোন যোগাযোগ ছিল না সৌম্যর। ওই একটা ভুল বোঝাবুঝি, আর বন্ধুত্ব শেষ। এখনো সৌম্যর মনে হয় যে সে আটকাতে পারত হয়তো। ভাবতে ভাবতে বিকেলের মরে আসা আলোয়‌ সৌম্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আকাশে পাখিগুলো সব কোলাহল শুরু করেছে। ঘরে ফেরার তাড়া নাকি কোন ব্যাপারে ঝগড়া করছে কে জানে। জয়ন্ত এইরকমই ভাবতে ভালোবাসতো। কাঁধে কারো হাতের ছোঁয়া পেল সৌম্য। ” তুই সেই এক‌ই‌রকম থেকে গেলি জয়ন্ত। সেই..”

– বলতে বলতে ঘুরে তাকিয়ে দেখে একটা বাচ্চা মতো মেয়ে। করুণ ভাবে তাকিয়ে বললো” দাদা কিছু টাকা দেবে? আমার ভাই খুব অসুস্থ। ডাক্তার বলছে টাকা লাগবে, না হলে ভাইকে দেখবে না।”- বলতে বলতে মেয়েটি কেঁদে ফেললো। ” কোথায় তোমার ভাই?”- জিজ্ঞেস করল সৌম্য। মেয়েটি চোখ মুছে বললো ” আনিসুর ডাক্তারের কাছে রেখে এসেছি। দিন না পঞ্চাশ টাকা।”

– পঞ্চাশ টাকা নিয়ে চলে গেল মেয়েটি। আনমনে একটু হাসলো সৌম্য। আনিসুর ডাক্তারকে সবাই চেনে। রবিবার ওনার চেম্বার বন্ধ থাকে। আজ রবিবার। আর ওনার চেম্বারের পাশ দিয়েই এসেছে সৌম্য। দেখেছে চেম্বার বন্ধ। মেয়েটি মিথ্যা কথাও ঠিক করে বলতে শেখেনি। জয়ন্ত বলতো জানিস তো মানুষ দুটো কারণে মিথ্যা বলে, অভাবে আর স্বভাবে। এই মেয়ে মনে হয় অভাবেই বললো। জয়ন্তের সব ভালো ছিল, শুধু সেদিন যে কি হয়েছিল। পাগলের মত হয়ে গেছিল সে। মাথা ফেটে গেছিল সৌম্যর। সেলাই পড়েছিল বেশ কয়েকটা। হাসপাতালে পুলিশ এসেছিল। কারণ ওদের মারামারির সময় একজন পুলিশ পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। ওনার ধমক শুনে জয়ন্ত পালিয়ে যায়। হাসপাতালে পুলিশ কে হাতজোড় করে সৌম্য বলেছিল জয়ন্ত কে কিছু না করতে। ওই শেষ, তারপর জয়ন্তের আর খোঁজ পায়নি। এই সেদিন জয়ন্তের ফোন আসে। ফোনে হরি কাকার চায়ের দোকানে আসতে বলে। “সৌম্য ভাই কেমন আছিস?”- চিৎকার শুনে ঘুরে তাকালো সৌম্য। ওই যে জয়ন্ত। কাছে এসে জড়িয়ে ধরলো তাকে।

“কিরে ভুঁড়ি বানিয়ে ফেলেছিস তো! “- বলেই সেই প্রানবন্ত হাসিটা হাসলো। এক‌ইরকম আছে, সেই আগের জয়ন্ত, সেই প্রানবন্ত হাসিটা। সৌম্যর মনে আছে অনেকেই তাদের এই বন্ধুত্ব নিয়ে খোঁটা দিত। সৌম্যকে একটা জোর ঝাঁকুনি দিয়ে জয়ন্ত বললো ” কিরে কি ভাবছিস, এখনো সেই দিনটার কথা ভাবছিস? ওই জন্য তোকে আজ ডেকেছি। আমি খুব ভুল করে ফেলেছি রে। মাফ করে দিস ভাই। আসলে সেদিন যে কি হয়েছিল আমার।”- সৌম্য চুপ করে আছে। ওর তখন সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। ওর সামনে তখন সেই পুরনো জয়ন্ত। সেই কলেজের আড্ডা, তর্ক, সচিন না ব্র্যাডম্যান, পেলে না মারাদোনা এই বিষয়ে তর্ক গুলো ভাসছে। আর সেই দিনটা। দিনটা মনে আছে সৌম্যর। ৮ই অক্টোবর। জয়ন্তের জন্মদিন ছিল সেদিন। রিনি কে খুব ভালোবাসতো জয়ন্ত। একদিন সৌম্যকে ধরে বললো জন্মদিনের দিন রিনি কে প্রোপোজ করবে। সৌম্য জানত জয়ন্ত একবার যখন ঠিক করেছে তখন করবেই। সৌম্যর উপর দায়িত্ব ছিল প্রেম নিবেদনের ভাষা লেখার। মানে সোজা বাংলায় লাভ লেটার লেখার। সব কিছু লিখে লাস্টে নামটা ফাঁকা রেখেছিল।

জয়ন্ত বলেছিল বস আমি নিরক্ষর ন‌ই। তাই নিজের নাম নিজেই লিখবো। আবার কাঁধে আলতো চাপ দিয়ে জয়ন্ত বললো” কলেজের কথা ভাবছিস না? সত্যি কত মজা করেছি একসাথে আমরা! জানিস সেদিন অনিমেষের সাথে দেখা। ওর মুখেই শুনলাম তোর ব্যাগে নোটসের খাতা নিতে গিয়ে খাতার মধ্যে চিঠিটা পায় ও। নিজেই লাস্টে ইতি সৌম্য লিখে আমার কাছে নিয়ে এসে বলে দেখ তোকে ফাঁকি দিয়ে রিনি কে প্রোপোজ করবে সৌম্য। জানিস আগের দিন রাতে বাবার শরীর খুব খারাপ হয়ে পড়েছিল। তাই এমনিতেই মাথার ঠিক ছিল না। তারপর তোর নাম দেখে… আমি এতটাই পাগল হয়ে গেছিলাম হাতের লেখা মিলিয়ে দেখার বুদ্ধি টাও মাথায় আসেনি। শুধু মনে হয়েছিল তুই ও আমার সাথে বেইমানি করলি!”- পাগলের মত মাথা নাড়তে লাগলো জয়ন্ত ।” শান্ত হ ভাই, শান্ত হ , তারপর অনিমেষকে কি বললি তুই?”- দূরে প্রায় অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে জয়ন্ত বললো” আমি বললাম যে কত মুহূর্ত কে তুই অজান্তেই মেরে ফেলেছিস অনিমেষ। অথচ এই সম্পর্ক মারার জন্য তোর বিচার করার কেউ নেই।”- সৌম্য হেসে বললো”যাক বাদ দে ওসব কথা। হরি কাকা দুটো চা দাও। একটাতে চিনি একটু বেশি দিও।”

– শুনে জয়ন্ত হেসে বললো” শালা তোর মনে আছে এখনো।”- চায়ের কেটলি থেকে বাস্প গুলো কেমন বেরিয়ে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে সৌম্য বলে উঠলো ” সম্পর্কের মৃত্যু হয়, কিন্তু স্মৃতির হয় না ভাই। তুই আমার মনে সারাজীবন থাকবি রে। তোর হাতের দুটো ঘুসি, আর একটু রক্ত তাতে ফাটল ধরাতে পারবে না।”- তার কপালে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে জয়ন্ত বললো” খুব লেগেছিল না রে?”- উত্তর দেওয়ার আগেই চা চলে এলো। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে জয়ন্ত বলে উঠলো ” বাহ্, চায়ের স্বাদ তো এক‌ইরকম আছে হরি কাকা। “- মনে মনে হেসে সৌম্য বললো, কিছু কিছু স্বাদ কোনদিন পাল্টায় না, সেটা হরি কাকার এলাচ দেওয়া চা হোক, বা বন্ধুত্বের স্বাদ। আকাশটা কেমন ফিকে হলুদ আর কালো রঙে মিশে যাচ্ছে। পাখিগুলোর ঝগড়া থেমে গেছে। হরি কাকার রেডিও তে তখন চলছে ” ইয়ে দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে…”- এলাচের সুগন্ধ, বন্ধুত্ব, কিশোর কুমার আর মান্না দে সব এক হয়ে গেল সৌম্যর কাছে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত