ময়ূরকণ্ঠী

ময়ূরকণ্ঠী

তুমি আজ অফিস থেকে আসার সময় আমার জন্য ময়ূরকণ্ঠী রঙের লিপিস্টিক আনবা?
.
কোনো পরিস্থিতিতে কোনো কিছু আবদার না করা মেয়েটা যে কিছু নিজ থেকে চাইতে পারে আমার জানা ছিল না। আমি চুপচাপ ইরার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে আবার শান্ত গলায় বলল,

-আনবেনা?

-ময়ূরকণ্ঠী রঙ কেমন ইরা? আমি চিনিনা

-তুমি আমার জন্য একটা লিপিস্টিক ও আনতে পারবা না মুগ্ধ??

-লিপিস্টিক আনতে পারবনা তা বলিনি। কিন্তু ময়ূরকণ্ঠী রঙ কেমন তা তো আমি জানিনা

-আচ্ছা ময়ূরকণ্ঠী লিপিস্টক পড়ে তোমার সাথে বের হলে তোমার কি আমার হাত ধরে হাঁটতে অস্বস্তি ফিল হবে?

-তোমার প্রতি আমার কখনও অস্বস্তি আসেনা ইরা। খেয়ে নাও

হুটহাট এমন অদ্ভুতরকম কথা বলা মেয়েটার নাম ইরা। আমার ইরা। অসম্ভব গুণবতী মেয়ে, রূপবতীও। তবে সেটা শুধু আমার কাছে। প্রথম যেদিন ইরাকে আমার মায়ের সামনে নিয়ে গেলাম মা খুব রেগে গিয়েছিল। চোখমুখ লাল করে বলেছিল,

-তোর কিসের অভাব আছে যে এরকম পাতিলের তলার মত কালো মেয়েকে বিয়ে করতে হবে?

মা’কে বুঝানো অসম্ভব ছিল। আলাদা হয়ে গেলাম ইরাকে নিয়ে। ছোট্ট ছিমছাম বাসায় আমি আর আমার ইরা থাকি। খুব বেশি কষ্টতে ইরাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেই ইরা বুঝে যায় আমার কষ্ট হচ্ছে, এটা ওর একটা গুণ। অসম্ভব ভালো গুণ।
.
ইরার মন খারাপের ধরণ গুলো অন্যরকম। খুব বেশি মন খারাপ হলে ইরা চুপ করে থাকে। রেডি হয়ে বসে থাকে আমার অফিস থেকে ফেরার জন্য। ফিরলেই হাত ধরে বাইরে নিয়ে আসে। বাসার সামনে থাকা ছোটখাটো রেস্টুরেন্টের এক কোণায় বসে হোটেলবয় কে বলবে, দুই প্লেট সেদ্ধ চালের ভাত নিয়ে আসো তো!

প্রেগ্ন্যাসির চার মাসের মাথায় হুটহাট সেন্সল্যাস হয়ে যেত। জ্ঞান ফেরার পর আমার বুকে মাথা রেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করত,

-আচ্ছা মুগ্ধ আমাদের যদি একটা মেয়ে হয় তুমি কাকে বেশি ভালবাসবে?

-দুজনকেই

-তুমি আমার সমান আর কাউকে ভালবাসতে পারবে??

-ইরা তুমি দিন দিন অদ্ভুত কথা শিখে যাচ্ছ খুব

-আমি অদ্ভুত হয়েই যাচ্ছি মুগ্ধ।
.
কিছু কিছু মানুষকে হারানোর কথা চিন্তায় কেনো দুশ্চিন্তায় ও আনতে নেই। মনে হয় যেন এটা ভাবলেই হারিয়ে যাবে। আমি বোধহয় ইরাকে খুব বেশি হারিয়ে ফেলার ভয় পেতাম, যখনই ইরার আহ্লাদীর মাত্রা বেড়ে যেত তখনই ভয় পেতাম এই মেয়েটাকে ছাড়া থাকা কি সম্ভব??!

এরকম অসম্ভব অনেক কিছুই সম্ভব করে দিয়ে ইরা চলে গেল। আমাদের মেয়ে জন্মানোর সময়ই আমি ইরাকে হারালাম। আচ্ছা ইরা অভিমান করে চলে গেল? দুজনকেই সমান ভালোবাসব বলেছিলাম বলে?

ইরা মারা যাওয়ার পর মেয়েকে নিয়ে আব্বা-আম্মার কাছে চলে আসলাম। মানুষ কি অদ্ভুত প্রকৃতির। আমার ইরা কালো ছিল বলে এ ঘরে জায়গা পায়নি, কিন্তু ঠিক মায়ের মতই হওয়া আমার কালো মেয়েটা কাঁদলেই আমার মা তাকে বুকে ধরে রাখে। এমন ভাবে ধরে রাখে যেন আমার মেয়ে কাঁদলে আমার মায়ের বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড নড়বড়ে হয়ে যায়।
.
আমার আর ইরার মেয়েটা যখন কথা বলা শিখলো তখন বুঝলাম শুধু গায়ের রঙ না কথাবার্তা, রাগ,অভ্যাসেও মেয়েটা তার মায়ের মতই হয়েছে। তার মন খারাপ হলে সে সারাদিন কারো সাথে কথা বলেনা। আমার অফিস থেকে ফেরার অপেক্ষায় সারাদিন না খেয়ে বসে থাকে। আমি ফিরলেই দরজা খুলেই শান্ত গলায় বলে,

দাদুমণি দুই প্লেট সেদ্ধ চালের ভাত নিয়ে আসো তো!
.
মায়ের স্বভাবের মেয়েটা আমাকে ভুলিয়েই দিয়েছে আমি ইরাকে বলেছিলাম দুজনকেই সমান ভালোবাসব। ইরা হয়ত সব দেখছে, আর খুব অভিমান করে ভাবছে, এই যে বলেছিলে দুজনকেই সমান ভালবাসবে? তুমিতো মেয়েকেই বেশি ভালবাসছো মুগ্ধ!

-দেখোতো আব্বু আমাকে কেমন লাগছে

মেয়ের দিকে তাকিয়েই দেখি খুব অন্যরকম ধরনের লিপিস্টক দেওয়া। এতটাই অন্যরকম যে মনে হচ্ছে এই রঙ লিপিস্টক যে তৈরি করেছে তারও একটা এরকম মেয়ে আছে, যার রূপ বিশ্লেষণ করেই সে এই রঙের লিপিস্টিক বানিয়েছে।

-কি হল আব্বু বলো না

-এটা কি রঙ মা?

-তুমি রঙ ও চিনোনা? এটা ময়ূরকণ্ঠী রঙ

আমি অবাক হয়েই তাকিয়ে রইলাম। ময়ূরকণ্ঠী রঙের লিপিস্টিক আর ইরাকে এনে দেওয়া হয়নি। আমি কি করে জানব ময়ূরকণ্ঠী রঙের লিপিস্টিকে ইরাকে এত্ত বেশি সুন্দর লাগবে।
.
ইরার ঝাপসা হয়ে যাওয়া ছবির দিকে তাকিয়ে খুব শান্তভাবে বললাম, আমি তোমার মেয়েকে ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছি ইরা। বিশ্বাস করো ঠোঁটে ময়ূরকণ্ঠী রঙের লিপিস্টিক দেওয়া মেয়ের হাত ধরে হাঁটতে আমার অস্বস্তি ফিল হচ্ছেনা, একটুও না।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত