সেই ছেলেটি

সেই ছেলেটি

‘অফিস যাওয়ার সময় পার্কের সামনের রাস্তার মোড়টাতে সুশ্রী মুখবয়বের বৃদ্ধ মানুষটাকে দেখি আমি৷ মুখে সবসময় মুচকি একটা হাসি থাকে৷

সাতসকালেও উনার ফুচকার দোকানটায় কাষ্টমার মুখরিত থাকে৷
কাষ্টমারদের সাথে হেসে হেসে কথা বলতে বলতে ফুচকা বানাতে থাকেন৷
সবাই উনাকে ফুচকা মামা বলে ডাকেন৷
আমারও বড্ড ইচ্ছে হয় ফুচকা মামার ফুচকা খেতে৷
কিন্তু সকালবেলা আর সময় হয়ে উঠে নি৷
সন্ধ্যে বেলায় যখন আবার সেই রাস্তা দিয়ে বাসায় ফিরি৷

তখন আর ফুচকা মামাকে দেখা হয় না৷ তার বদলে পাতলা করে একটা ছেলে ফুচকা বিক্রি করে৷
সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে সকাল বেলা ঢু মারি এদিকটায়৷

কিন্তু বরাবরের মতই হতাশ হতে হয়৷
সেই ফুচকা মামার আর দেখা পাই না৷
ছেলেটাকে ও জিজ্ঞেস করে জানা গেল, ছুটির দিকে ফুচকা মামা আসেন না৷
এর বেশি কিছু আর জিজ্ঞেস করা হয়নি কখনো৷

আমি একা মানুষ৷ শহরের নিঃস্বঙ্গটাকে ভালো লাগে আমার৷ সঙ্গহীনতাকে আরেকটু আপন করে পেতে চাই আমি৷ তাই বড় একটা ফ্লাটের ছোট্ট একটা ছিলেকোটাতে বাসা নিয়েছি৷

কারো সাথে তেমন একটা পরিচিতি নেই৷
সারাদিন অফিস, সন্ধ্যায় সোডিয়ামের আলোতে হালকা পাতলা হাঁটাহাঁটি আর ভোররাতে অল্প দু’টো ভাত গিলে ঘুমানো! আর ছুটির দিনে জম্পেশ করে একটা ঘুম দেয়া৷
এই পর্যন্তই আমার জীবনের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে৷
বাইরের জগৎটা অতোটা টানেনা আমাকে৷
সেই হিসেবে আশেপাশের কিছুই তেমন একটা চোখে পরেনা আমার৷

আজ অফিস ছুটি৷ রাস্তার মোড়টাতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরোলাম৷ জানি মামাকে পাবো না৷
তারপরও একবার ঢু মেরে আসা যাক ভাবলাম৷

গেইটের বাইরে বেরুতই সামনের ফ্ল্যাটের গেইট থেকে বের হওয়া গাড়িটার ভেতরে চোখ গেল৷
আমি প্রচন্ড রকমের অবাক হলাম৷

চোখ দু’টো ভালো করে কচলিয়ে নিলাম৷
হাতে আলতো করে চিমটি কেটে নিলাম৷
ব্যাথা অনুভব করছি৷
তাহলে ঠিকই দেখছি৷

বৃদ্ধ করে সুশ্রী মুখবয়বওয়ালা ফুচকা মামাকে দেখা যাচ্ছে গাড়ির ভেতরে৷
পাশে থাকা ছোট্ট নাতনীটার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে৷
কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরেচ্ছো সম্ভবত৷
মনে ভালোই কৌতূহল জন্মালো৷
লোকটা যদি এত বড়লোক হয়ে থাকে? তাহলে ফুচকা বিক্রি করতে যাবে কেন?
ততক্ষণে গাড়িটা চলা শুরু করেছে৷
আমি রাস্তার মোড়ের দিকে হাঁটা দিলাম৷
উদ্দেশ্য পাতলা শরীরের ছেলেটা৷
ফুচকা খেতে খেতে জানা যাবে হয়তো রহস্য৷

আজ তেমন কাষ্টমারের ভিড় নেই৷ ফুচকা মামা নেই বলে হয়তো৷
আমি ছেলেটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম৷
মামার মুখে সবসময় হাসি থাকলেও , ছেলেটা তেমন একটা হাসে না৷
-ফুচকা দাওতো একপ্লেট৷
ছেলেটা আমার দিকে তাকালো একবার৷ কখনো দেখেনি হয়তোবা৷
ছেলেটা ফুচকা বানাতে বানাতে বলল,
-ভাইজান কি নতুন এসেছেন এদিকটাই?
-নাতো ভাই৷ কেন?

-না এখানকার সব কাষ্টমারই আমার চেনা৷ আপনাকে কখনো দেখিনি তাই বললাম৷

মুখে হাসি ঝুলিয়ে বলল ছেলেটা৷
আমিও হাসলাম৷
ছেলেটা বড্ড গুছিয়ে কথা বলে দেখছি৷
ফুচকা মুখে দিয়ে বললাম,
-বাহ! ভালোইতো বানাও দেখছি৷
ছেলেটা আবার হাসলো৷
দু’পাটি দাঁত বের করে বলল,
-মামা শিখিয়েছে৷ মামা কিন্তু বেশি ভালো বানাই৷ খাবেন একদিন৷
মাথা নাড়িয়ে সায় দিলাম৷
কিছু বলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম৷
তার আগেই হুট করে কয়েকজন কাষ্টমার চলে আসলো৷
ছেলেটা ব্যস্ত হয়ে পরলো আবার৷
অপেক্ষায় রইলাম কিছূক্ষণ৷
না কাষ্টমার কমছে না৷
বরং বেড়েই চলেছে৷
আমার সব আশায় চলে ঢেলে হাঁটা দিলাম বাসার দিকে৷

আজ অফিস গেলাম না৷ ফোন করে অসুস্থ বলে দিয়েছি৷ স্যার ও আর তেমন আপত্মী করেননি৷ এমনিতে খুব একটা মিস দিইনা৷

হাঁটা দিলাম রাস্তার মোড়ের দিকে৷ উদ্দেশ্য ফুচকা মামার দোকানটা৷ আজ আর ছেলেটা নয়. সোজা মামার কাছেই জিজ্ঞেস করবো৷ যা হবার হবে৷

মোড়ের কাছে যেতেই মামাকে দেখা যাচ্ছে৷
প্রতিদিনের মতো মুখে হাসি ঝুলিয়ে ফুচকা বানিয়ে চলেছেন৷
আমি গিয়ে মামার পাশ ঘেষে দাঁড়ালাম৷
মামা মিষ্টি করে হাসি দিলো আমার দিকে তাকিয়ে৷
আমি অবাক হলাম৷ লোকটার হাসির মধ্যে কিছু একটা ছিল৷
আপাতত হাসির জবাবে আমিও হাসলাম একটু৷
মামা আমার দিকে ফুচকার প্লেট বাড়িয়ে দিলেন৷
আমি সম্মতিসূচক হাসি দিয়ে প্লেটটা নিলাম৷
আমাকে অবাক করে দিয়ে মামা বললেন,
-বাবা তুমি ওদিকটা বসো৷ তোমার সব কিছুর উত্তর পাবে!

মামা কিভাবে জানলো এসব? আমিতো কাউকে বলিনি৷ এমনকি ছেলেটাকেও জিজ্ঞেস করিনি৷
তাইলে মামা কি সব খেয়াল করেছেন এতদিন?

মামার কথা মত বসে রইলাম আমিও৷ এত সহজে সবকিছু জানতে পারবো! ভাবতেই ভালো লাগছে৷
কাষ্টমারের ভিড় একদম কমে যেতেই মামা তার গলায় ঝুলানো গামছা দিয়ে ঘামটুকু মুছলেন৷
তারপর মুচকি হেসে আমার পাশে বসলেন৷
তারপর বললেন,

-আমি জানি তুমি আমার ব্যাপারে কৌতূহলী৷ এই রাস্তা দিয়ে অফিস যাও প্রতিদিন৷ আমি দেখি তোমাকে৷
আমি কিন্তু অনেকদিন ধরেই তুমি যে ছিলেকোটায় থাকো তার সামনের বিল্ডিংয়েই থাকি৷
-হ্যা মামা জানি৷
জবাব দিলাম আমি৷

-আগে জানতেনা অবশ্য৷ সেদিন ফ্ল্যাটের সামনে গাড়ির ভেতরে দেখেছিলে আমাকে৷ আমি ও খেয়াল করেছিলাম৷ আমি জানতাম ঐ ব্যাপারটাই তোমাকে আমার ব্যাপারে কৌতূহলী করেছে৷
-হুম৷

মাথা নাড়িয়ে সায় দিলাম৷
আমার প্রশ্নের অপেক্ষা না করেই মামা বলা শুরু করলো,

-এই জায়গাটাতে আমি অনেকদিন ধরেই ফুচকা বিক্রি করি৷ সেই কিশের বয়স থেকেই৷ কত মানুষের সাথে পরিচয় আমার৷ ফুচকা বিক্রি করেই সংসার চালিয়েছি৷ ভাই-বোনকে লেখাপড়া করিয়েছি৷ কতো মানুষেরর ভালোবাসার স্বাক্ষী হয়ে আছি এই আমি৷ সাথে দুঃখ কষ্টেরও স্বাক্ষী আমি৷

তারপর বিয়ে করলাম৷ পরিবার হলো একটা৷
তারপর আস্তে আস্তে এতদূর আসা৷ সবই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে৷
-মামা ছেলেটা কে?

আমি প্রশ্ন করলাম৷ মামা স্মিত হাসলেন৷
তারপর বলতে শূরু করলেন আবার,

-ছেলেটার নাম রিয়াদ৷ নামটা অবশ্য আমার দেয়া৷ আমার বিয়ের কয়েকমাস পরেই ছেলেটাকে দেখেছিলাম৷ এই যে এখানটাতে বসে থাকতো৷ সবে ৯-১০বছর বয়স তখন ওর৷ পরনে ময়লা গেন্জি থাকতো একটা৷ আর দু’চার জায়গায় ছেড়া প্যান্ট৷

আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো সবসময়৷

ওর চেহারা দেখেই বুঝতাম, ও ক্ষুধার্ত৷ ভয়ে অথবা লজ্জায় কীছু চাইতে পারছেনা৷
একদিন আমি হুট করে কাছে ডাকলাম ছেলেটাকে৷ গুটি গুটি পায়ে আমার কাছে এসে দাঁড়াল৷ জিজ্ঞেস করলাম,

-ফুচকা খাবি?
ছেলেটা মা নাড়ালো৷
আমি ফুচকার প্লেট এগিয়ে দিলাম৷
ফুচকাটা শেষ করে ছেলেটাকে প্রাণবন্ত দেখেছিলাম আমি৷
এরপর থেকেই আমাকে টুকটাক সাহায্য করতো ছেলেটা৷
আমি মানা করলেও করতো৷
আর বলতো,
-আমি তোমার খাচ্ছি৷ বিনিময়ে কাজ করছি৷

জানো! ঐদিন অতটুকু বাচ্চার মুখে এই কথা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম৷ অতটুকু বাচ্চার কি আত্মসম্মানবোধ!”
মামা একটু থামলেন৷ তারপর আবার বলা শুরু করলেন,

-সবচাইতে বড় প্রতিদানটা দিলো বছরখানেক পরে৷ আমার স্ত্রীর সন্তান প্রসবের ব্যাথা উঠলো৷ আমি তখনও এইখানে৷ সাথে ছেলেটাও ছিল৷

যখন শুনলাম আমার স্ত্রীর অবস্থা খুব খারাপ৷ সবকিছু ফেলে ছুটে গিয়েছিলাম৷ আমার পিছু পিছু ছেলেটাও চলে গিয়েছিল৷ হাসপাতালে গিয়ে যখন শুনলাম এমারজেন্সী রক্ত লাগবে৷ আমি তখন পৃথিবীটা অন্ধকার দেখছিলাম৷
শেষমেষ রক্তটা জোগাড় হয়েছিল৷
কে দিয়েছিল জানো?

-কে?
আমি জিজ্ঞেস করলাম৷
-এই রিয়াদই সেদিন রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছিল আমার স্ত্রী কে৷
ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছিল আমার৷
সেদিন থেকেই ছেলেটাকে একদম আপন করে রেখেছি আমরা৷
হাতে রাখা গামছা দিয়ে মুখ মুছলেন মামা৷
-মামা! তাহলে আপনি বা রিয়াদ এখনো ফুচকা বিক্রি করেন কেন? ও কি লেখাপড়া করেনা৷
-বলেছিলাম না৷ ছেলেটার আত্মসম্মানবোধ প্রখর৷ ও নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়৷ নিজে কিছু একটা করে দেখাবে৷
হ্যা লেখাপড়া করে৷

সকালের সময়টাতে কলেজ যায়৷ গত দশ বছর ধরে এই রুটিন চলে আসছে৷ ছেলেটা এবার কলেজে উঠেছে৷
আমি নিজেই ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম৷”

“মামা ফুচকা দেন!”
কাষ্টমারের ডাকে ধ্যান ভাঙলো মামার৷ সাথে আমারও৷
অনুভব করলাম চোখ দু’টো ভিজে উঠেছে আমার৷
কেন জানি না? আমার নিজেরই গর্ব হচ্ছে এরকম একটা মানুষের সাথে কথা বলতে পেরে৷
কাষ্টমার সামলিয়ে মামা আমার দিকে ফিরে তাকালেন৷
-মামা জড়িয়ে ধরবো একটু?
কথার জবাবে মামা হেসে সম্মতি জানালেন৷
আমি শক্ত করে জড়িয়ে ধরি মানুষটাকে৷

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত