ত্রিরত্ন ও তিন মাস্তান এর কাহিনী

ত্রিরত্ন ও তিন মাস্তান এর কাহিনী

কানার নাম পদ্মলোচন ,বোবা টার নাম কথক , বয়রার নাম শ্রুতিধর। তারা তিন ভিক্ষুক। এই ত্রিরত্ন গুলিস্থানের বাস স্ট্যান্ডের পাশে ভিক্ষা করে। তাদের এই নাম কেন পরে তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যাবে এই গল্পে।

আমার আল্লাহ র নবীজির নাম বল মমীন ভাইচিকন সুরে গজল গাইতে থাকে তাদের মধ্যে পদ্মলোচন। এই তিনজনের মধ্যে তার গানের গলা বেশ সুরেলা। এই তিনজনের তিন টি গুন আছে তাদের দৃষ্টিতে। বয়রা শ্রুতিধর বই পড়তে পারে। সে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া লেখা করেছে। সে পড়তে পারে লিখতে পারে শুধু কানে শোনেনা। তাদের নাম শ্রুতিধরের নাকি দেওয়া। এর মধ্যে শ্রুতিধর পড়ে শেষ করে ফেলেছে দেবদাস বইটি। প্রথমে দেবদাস নাম নিজের জন্য পছন্দ করেছিল , দুইবন্ধুদের জন্য চুনিলাল, হরলাল। পরে মনে হল নাহ দেবদাস এর বোতল খেয়ে জীবন শেষ। তাছাড়া পার্বতীর বিয়ে হয়ে গিয়েছে আরেক জায়গায়। যদিও সবসময় পার্বতীর জন্য বুকের ভিতর হুহু করতে থাকে তার।

অনেক ভেবে চিনতে এই নাম টি তার পছন্দ হল শ্রুতিধর। তার শ্রবনে কিঞ্চিত অসুবিধা হয়ে ঘাটতি দূর করার জন্য এই নাম টি বেছে নেওয়া।

পদ্মলোচন বেড়ে উঠেছিল নর্দমাক্ত বস্তি ডাস্টবিনের উপরে। তার মা বাবা কে বা কোথায় সে জানেনা। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে নিজেকে সে দেখেছে এই বস্তিতে। বর্তমানে তার বয়স বিশ। তারা তিনজনে সবসময় একসঙ্গে থাকে ,খাওয়া পরা ভিক্ষা একসাথে।

বোবা কথক এর একবোন আছে। দুরে বিয়ে হয়ে স্বামী সংসারে আছে। ভাইয়ের দিকে খেয়াল রাখার সামর্থ্য তার নাই।

এই হল তিন দুঃখী, আত্মীয় পরিজন ভালবাসা হীন ,সহায়সম্বল হীন ত্রিরত্ন আজ গুলিস্থানের বাস স্ট্যান্ডে বসে ভিক্ষা করছে। আমাদের গল্প শুরু এখান থেকে।

এই ত্রিরত্নের গ্রুপের পাশে আজ দাড়িয়ে আছে হারু মাস্তানের গ্রুপ। যাদের দাপটে দৌরাত্ব্যে এই এলাকার সবার নাভিশ্বাস হওয়ার উপক্রম। যখন তখন রাস্তার ভিক্ষুকদের হামলা করা ,তাদের ভিক্ষার টাকা কেড়ে নেওয়া মাস্তান টার এ প্রতিদিনের কাজ।

চোখের কোন দিয়ে চোরা টা দেখল পদ্মলোচন দের থালায় একজন একশ টাকা দিয়ে গিয়েছে। তখন ই এসে সে হামলা করল।

দেখ তো রে এইকানা টার গলায় কি লেখা ? শিষ্য রা দুজন অল্প বিস্তর পড়ালেখা জানে। হারু একেবারে বকলম। সেই ঘাটতি ঢাকতে সে শিষ্যদের উপর চোটপাট করে সারাদিন।

ঊঊ কাছে এসে তুতলিয়ে পড়তে থাকে শিষ্য

পদ্মলোচন , কথক শ্রুতিধর প্রতিভাধর গায়ক
গান গেয়ে ধন্য করব শিষ্যের জবাব।

গান গাই ধন্য কর বেটা এখন গলা ধর তাইলে খবর আছে ধমকে উঠে হারু মাস্তান টা। ঠিকমত চড়া গলায় না গাইলে খবর আছে তগোর ভেংচি কেটে বলে সে।

গান ঠিকমত না গাইলে চাদা দিবি। আজকের সারাদিন এর ইনকাম ,তার লগে পুরা মাসে থাকার ভাড়া দিবি বুঝছস।

দেখ তো কানা ডা সত্যি কানা নি? হারু চুপিসারে শিষ্যকে বলে।

কিভাবে দেখুম ওস্তাদ।

তগরে আর কত শিখামু পাখিপড়া, আস্তে কইরা থালা থন একশ টাকা সরা।

কিযে কন পাশের দুইটা চোখে দেহে।

এই গন্ডগোলের মধ্যে এরা গান ধরল। আসলে পদ্মলোচন ভাল গায়।

হারুর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল গান শুনে।

নারে ভাই তুই তো কাদায় দিলি। ভাল গাছ রে তুই। পিঠ চাপড়ে দিল পদ্মলোচনের।

ভাইগো আমারে মাপ করি দিয়েন সহসা ই পদ্মলোচন বলে উঠে। আমি অন্ধ না। ক্লাস এইট পাশ। কাজ না পাইয়া ক্ষুধার জালায় ভিক্ষা করি। আমি শুনছি গো আপনার কথা।

এই একশ টাকা আপনি নিতে পারেন গো ভাই। চাইলে আপনি এ দিয়া খাওয়ার কিনা আনেন সবের লাগি। একলগে খাই। আইজ রোজার দিন। শ্রুতিধর বলে উঠে। কথক তাতে সম্মতি জানায়।

যাও মিয়া তোমাগো কষ্টের টাকা। কি যে কও। বলে সে অনুতাপের সাথে ভাবে এযাবত কাল সবার টাকা জবরদস্তি করে ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে। এখন এক বৃদ্ধ পঙ্গু ভিক্ষুকের টাকা তার কাছে।

চোখ মুছতে মুছতে পদ্মলোচন হাত বাড়িয়ে দেওয়া টাকা টা নিল। তার কাছে ছিল মোট বারশ টাকা। তার থেকে হাজার টাকা ওই বৃদ্ধ লোকটিকে দিয়ে আর দুইশ টাকা দিয়ে খাওয়ার কিনলো ছয়জনের জন্য পকেট শুন্য করে।

তবু আজকে গর্বে আনন্দে ,পরিতৃপ্তিতে তার বুক ভরে উঠল। সে এক ছিচকা বাজে মাস্তান। কিন্তু আজকে এই কাজের জন্য নিজেকে বড় ভাবতে ইচ্ছে করল।

নিজেকে নিজে স্যালুট দিয়ে দাড়াল একই সঙ্গে তিন ভিক্ষুক এর উদ্দেশ্যে সালাম জানাল।

পরিশিষ্ট : এরপর থেকে ছয়জন তাদের ভিক্ষাবৃত্তি ,মাস্তানি করা ছেড়ে দিল। তারা কিছুদিন ঠেলা চালাল ,চায়ের দোকানে কাজ করে টাকা জমিয়ে ছোট চায়ের দোকান দিল। বছর ঘুরতে ছোট চায়ের দোকান বড় রেস্টুরেন্ট এর রূপ নিল। আর ও চার বছর পরে তাদের আর ও দুই টি রেস্টুরেন্ট হল। এখন মোটামুটি ভদ্র পরিবারের মেয়ের বাবা তাদের সাথে আত্মীয়তা ও করতে চায়। শ্রুতিধর এখন বিয়ের কল্পনা করে পার্বতীকে ভুলে গিয়ে।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত