চিহ্ন হারাতে নেই

চিহ্ন হারাতে নেই

” আরে ও যা দুষ্টু হয়েছে না! কি বলব আর। সারাদিন গোটা বাড়িতে ছুটে বেড়াচ্ছে। আর সারাদিন এটা চাই, সেটা চাই করে আমার মাথা খারাপ করছে।” গলায় একটা হাসি হাসি টান এনে বলল সুস্মিতা।

পায়েল মোবাইলের এপারে চুপ করে শুনছিল ওর কথা। সুস্মিতা ওর কলেজের বান্ধবী। কলেজ শেষ হওয়ার পর কলেজের বন্ধুগুলো সরে সরে গেছে । গান হাসি আড্ডার কলেজ জীবন হাতা খুন্তি আর রান্নাঘরে নিজের ভবিতব্য লিখে নিয়েছে। সময় বদলেছে এবং তার সাথে সাথে বদলেছে মানুষের মুখ। আগেকার রঙচঙে উদ্দাম জীবন এখন চারদেওয়ালে নিষিদ্ধ রূপকথা হয়ে হাঁপাচ্ছে।

পায়েল বলল,” বাচ্চারা একটু দুষ্টু না হলে মানায় না রে। তোর ছেলেকে কিন্তু ভারী মিষ্টি দেখতে।”
মোবাইলের ওপারে হাসল সুস্মিতা। যে পায়েল আর সুস্মিতাকে কয়েক বছর আগে পর্যন্ত কলেজে আলাদা করা যেত না, কলেজ শেষ হওয়ার পর তাদের মাঝের দূরত্বটা একটা গোটা মহাসাগরের সমান। জোহানেসবার্গে থাকে এখন সুস্মিতা। স্বামী নামি কোম্পানিতে কাজ করে। ছেলে স্বামী নিয়ে সুখেই আছে সুস্মিতা। বন্ধুত্বটা কেবল মোবাইলেই বেঁচে আছে ওদের।

সুস্মিতা বলল, ” এই পায়েল, তোর আজকে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ডেট ছিল না ? কখন যাবি ?”
” এই যাব। সুদীপ সবে ফিরল অফিস থেকে। ও একটু ফ্রেস হয়ে নিক। তারপর যাব। সন্ধ্যে সাতটায় অ্যপয়েন্টমেন্ট।” জবাব দিল পায়েল।
” ডক্টর চ্যাটার্জিকেই দেখাচ্ছিস তো ?” জিজ্ঞেস করল সুস্মিতা।

” হ্যাঁ। ওনাকেই দেখাচ্ছি। গত বারে অনেক টেস্ট করতে দিয়েছিলেন। সুদীপ এবং আমাকে , দুজনকেই। দেখি আজ রিপোর্ট দেখে কি বলেন।” শান্ত গলায় উত্তর দিল পায়েল।

” আচ্ছা বেশ। ডাক্তার কি বলল জানাস কিন্তু আমাকে । এখন রাখছি রে। ছেলে চিৎকার করছে। এই ছেলেকে নিয়ে আর পারি না বাপু আমি!” হাসতে হাসতে ফোন রাখল সুস্মিতা।

ফোন রাখল পায়েলও। তফাৎ শুধু একটাই। সুস্মিতার মত হাসিটা ওর মুখে নেই। তার জায়গায় আছে একটা গভীর আশঙ্কা, একটা অজানা ভয়। ফোন রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল পায়েল।

সুদীপ আর পায়েলের দুবছর হল বিয়ে হয়েছে। এই কিছুদিন আগেই বিবাহ বার্ষিকীর গন্ধ এখনও গা থেকে যায়নি ওদের। সুদীপকে পায়েল কলেজ থেকেই চেনে। মাত্র কয়েকদিনের আলাপেই উস্ক খুস্ক চুলের বেখেয়ালি ছেলেটাকে ভালোবেসে ফেলেছিল পায়েল। সুরেন্দ্রনাথে পড়ার সময় সপ্তাহে একদিন অন্ততঃ কলেজ স্কয়ারের বেঞ্চে পাশাপাশি বসাটা অভ্যেস হয়ে গেছিল ওদের। শেষ বিকেলের রোদ্দুরে প্রেমটা ভালোই জমাটি ছিল ।

সুদীপের নিজের বলতে মা ছাড়া কেউ নেই। বাবা মারা গেছে বেশ কিছুদিন হল। আগে টিউশনি পড়িয়েই কোনরকমে মা ছেলের ভাত জুটে যেত। দুবছর আগে সল্ট লেকের নামি কোম্পানির সেলস ডিপার্টমেন্টে চাকরি পাওয়ার পরই নিজের মানুষের তালিকায় পায়েলকে জুড়ে নিয়েছে সুদীপ। পায়েলের মা অনেক ছোটবেলাতেই মারা যান। বাবা ধর্মতলায় একটা বেসরকারি অফিসের ক্লার্ক ছিলেন। গত বছর রিটায়ার করার পর কোলকাতা ছেড়ে পাঁশকুড়ায় পুরোন বাড়িতে চলে গেছেন। বাকি জীবনটা ওখানেই কাটাতে চান। সুদীপ ভালো ছেলে, তাই নিশ্চিন্তে একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিতে কোন দ্বিধা বোধ করেননি তিনি।

যাদবপুরের দু কামরার ভাড়া বাড়িতে সব আছে। সুখ, শান্তি, ভালোবাসা, আদর, মান অভিমান, সব। নেই শুধু একটা সন্তান। অনেক দিন ধরেই ট্রাই করছে ওরা দুজন। নিজের কোলটা ভারী খালি খালি লাগে পায়েলের। সুস্মিতার ছেলের কথা শুনে মন ভালো হলেও ভয় হয় অনেক বেশি, কারণ সে নিজেও চায় মা হতে। কিছুদিন চেষ্টা করার পর ভালোবাসার সুঁতোয় যখন হতাশার টান পড়ল তখন বাধ্য হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিল ওরা। গত সপ্তাহেই ডক্টর চ্যাটার্জিকে দেখিয়ে আসা হয়েছে। তিনি পরীক্ষা করে ওদের দুজনকেই কিছু টেস্ট করতে দিয়েছেন। আজ আবার যাওয়ার কথা আছে ওনার কাছে।

সুস্মিতার ফোন রাখার পর চুপ করে বিছানায় বসেছিল পায়েল। ওদের শোওয়ার ঘরের সাথে একটা ছোট্ট বারান্দা জোড়া আছে। জোৎস্না রাতে বারান্দায় গেলে মন ভালো হয়ে যায়। বারান্দার দুটো পাশাপাশি চেয়ারে অনেকে রাত অব্দি সুদীপের সাথে গল্প করে কাটায় পায়েল। ঘুম আসে না চোখে।

সুদীপ ফ্রেস হয়ে ঘরে ঢুকে বলল, ” আরে চল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছ’টা বাজতে চলল, এর পর বেরোলে আর সাতটার মধ্যে পৌঁছতে পারব না। রাস্তায় যা ভিড় দেখলাম তাতে কেষ্টপুর যেতে ভালোই টাইম লাগবে।”
কোন কথা না বলে রেডি হতে চলে গেল পায়েল। নিঃশ্বাস ঘন ঘন পড়ছে ওর, ডাক্তার কি বলবে কে জানে!

কেষ্টপুরে চ্যাটার্জি ইনফার্টিলিটি ক্লিনিকে ওরা টাইমেই পৌঁছে গেল। রাস্তায় যথেষ্ট ভিড় ছিল। বাসে আসলে কোনদিনই টাইমে পৌঁছতে পারত না ওরা। সুদীপের বাইক আছে বলে রক্ষে।

শেষ কবে বাসে চড়েছে হাতে গুনে বলে দিতে পারে পায়েল। নিজেদের একলা ঘুরে বেড়ানোর সময়গুলো সুদীপের বাইকের পেছনে বসেই কেটে যায়। এই বাইকে করেই মাঝে মাঝে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায় ওরা। ডানা মেলে পাখির মত নিজেকে উদ্দাম হওয়ায় মেলে ধরে পায়েল। বাইকের পিছনে বসে সুদীপকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে অনেক বিকেল নিমেষে কেটে গেছে ওর। বাইকটা ভীষণ প্রিয় সুদীপের। মা আর পায়েলের পরে যদি প্রেম বলে কিছু থেকে থাকে তা হল ওর বাইক। অনেক কষ্টে টাকা পয়সা জমিয়ে নিজের পছন্দ মত বাইকটা কিনেছে সে। পায়েলের সাথে সাথে বাইকের যত্নেও কোনরকম কার্পণ্য করে না সুদীপ।

ওয়েটিং রুমে সুদীপের হাত ধরে বসে আছে পায়েল। বুকটা অনবরত উঠছে নামছে। একটা চাপা উত্তেজনা খামচে ধরে আছে গলার কাছে। যেটাকে সহজে ঝেড়ে বের করে দেওয়া যাচ্ছে না। কিছুক্ষন পরে ওদের ডাক আসতে দুজনে ডক্টর চ্যাটার্জির ঘরে ঢুকল। ডক্টর চ্যাটার্জি কোলকাতা শহরের নামকরা গাইনিকলজিস্ট। একডাকে চেনে সবাই। অনেক মায়ের শুন্য কোল মিটি মিটি হাঁসি দিয়ে ভরে দিয়েছেন তিনি। নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে এক অবিরাম ভরসার জায়গা।

ডক্টর চ্যাটার্জি বয়স্ক মানুষ। অনেক বছর ধরে প্র্যাকটিস করছেন। ওদের দেখে মুখে একটা হালকা হাসি টেনে বলিষ্ঠ গলায় বললেন, ” আরে আসুন আসুন। বসুন। সব রিপোর্ট এনেছেন তো ?”

” হ্যাঁ ডাক্তারবাবু। যা যা করাতে বলেছিলেন, সবই করিয়েছি। এই নিন।” চেয়ারে বসে রিপোর্ট ফাইলটা ডক্টর চ্যাটার্জির দিকে এগিয়ে দিল সুদীপ। পাশের চেয়ারে পায়েল বসেছে। স্বাভাবিক ভাবেই খুব চিন্তিত সে।
সমস্ত রিপোর্ট খুঁটিয়ে দেখার পর ডক্টর চ্যাটার্জি বললেন, ” সুদীপ বাবু, একটা ভালো খবর আছে আর একটা একটু খারাপ খবর আছে। তবে চিন্তার কিছু নেই।”

” কি ডাক্তারবাবু ?” ভুরু কুঁচকে ডাক্তারের দিকে তাকাল সুদীপ। পায়েলও তাই।
” দেখুন, আপনার রিপোর্ট সবই নরমাল। কোন অসুবিধা নেই আপাতত। কিন্তু রিপোর্ট অনুযায়ী আপনার স্ত্রীর টিউবাল ব্লকেজ আছে।”
” মানে ?” আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল সুদীপ।

ডক্টর চ্যাটার্জি বললেন,” আসলে ডিম্বাশয় থেকে জরায়ু পর্যন্ত যে নালিটা যায় সেটাতে কোনভাবে ব্লক আছে। এই কারণেই কনসিভ করতে প্রবলেম হচ্ছে ওনার। মুশকিল হল একদিকের টিউবে ব্লক থাকলে অসুবিধা হত না,ওনার দুদিকের টিউবেই ব্লক আছে। যেজন্য সমস্যা হচ্ছে।”

একটা ফ্যাকাসে দৃষ্টি নিয়ে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে সুদীপ। বিষয়টা বুঝতে কিছুটা পেরেছে কিন্তু মানতে পারছে না সহজে। পায়েল মুখ নিচু করে বসে আছে। কেমন একটা অভিমানী সংকীর্ণতা চেপে ধরেছে ওকে। সুদীপ বলল, ” এর কি ট্রিটমেন্ট নেই ডাক্তারবাবু ?”

” দেখ ট্রিটমেন্ট তো আছে। সার্জারি করা যায়। কিন্তু রিপোর্টে বলছে টিউব অনেকটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সার্জারি করেও সেরকম ফল পাওয়া না যেতে পারে। আমি এই পরিস্থিতিতে আই ভি এফ অর্থাৎ ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের কথাই সাজেস্ট করব আপনাদের।” বললেন ডক্টর চ্যাটার্জি।

কিছুক্ষন চুপ করে থাকল সুদীপ। পায়েল একবারও মুখ তুলে তাকালো না। সুদীপ একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, ” আই ভি এফের কিরকম খরচা ডাক্তারবাবু ?”

ডক্টর চ্যাটার্জি বললেন, ” দেখুন, খরচা তো অনেক। কিন্তু সাফল্য যে আসবেই তা কিন্তু নয়। আমরা ভগবান নই, আপনাকে কথা দিতে পারব না আমি, শুধু চেষ্টা করতে পারি মাত্র। তবে অনেকেই এখন আই ভি এফ প্রেগনেন্সি নিচ্ছে, সাকসেস রেট খারাপ নয়।”

মাথা নাড়ল সুদীপ। এরপর আই ভি এফের খরচ সম্পর্কে অনেক কিছুই বললেন ডক্টর চ্যাটার্জি। সুদীপ কথা বললেও পায়েল পুরো সময়টা চুপ করেই কাটাল। কথা বলার মত পরিস্থিতি কিংবা মনের জোর কোনোটাই নেই ওর।
ডাক্তারের চেম্বার থেকে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল ওদের। পুরো রাস্তাটা পায়েল কোন কথা বলেনি। একটা অপরাধবোধ কাজ করছে ওর মনে। কেমন যেন একটা মুষড়ে গেছে সে।

রাতে খাওয়ার পর বারান্দায় এসে বসেছিল সুদীপ। ঘরের কাজ সেরে পায়েল ওর পাশে এসে বসল। পরিষ্কার কালো আকাশে তারাগুলো চিক্ চিক্ করছে। অর্ধেক চাঁদটা অসম্ভব রকম উজ্জ্বল। কিন্তু সে উজ্জ্বলতা পায়েলের মনের ভেতরকার অন্ধকারটাকে মুছতে পারল না কিছুতেই। কিছুক্ষন বসে থাকার পর ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল পায়েল। বুকের ভেতরকার শুকনো নদীতে বন্যা এসে চোখ দিয়ে ঝরে পড়ছে অবিরত। সুদীপ দূরে আকাশের দিকেই তাকিয়ে ছিল, পায়েলের কাঁপা কাঁপা গলার আওয়াযে মুখ ঘুরিয়ে পায়েলের হাত ধরে বলল, ” এই বোকা মেয়ে, কাঁদছ কেন ?”
কোন কথা বলল না পায়েল। হাত পা কাঁপছে ওর। সুদীপ বলল, ” আরে কি ছেলে মানুষী করছ বল তো ?”

” আই অ্যম সরি সুদীপ। প্লিজ পারলে ক্ষমা কর আমায়।” কাঁদতে কাঁদতে বলল পায়েল।
সুদীপ চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়েলের সামনে মেঝেতে বসল বাবু হয়ে। পায়েলের দুহাত নিজের দুহাতের মধ্যে নিয়ে বলল, ” ধুর পাগলী! এসব কি বলছ বল তো!”

” প্রবলেম তো আমারই! আমার জন্যেই….” কথা আটকে যাচ্ছে পায়েলের।
” ধ্যাৎ! যা হয়েছে তার জন্য তুমি তো আর দায়ী নও রে বাবা! ডাক্তারবাবু তো বললেন ভ্রূণ প্রতিস্থাপন করিয়ে নিলেই হল। নাহলে অ্যডপ্ট করে নেব। চিন্তা কিসের!” গভীর কথাকে সহজ ভাবে বলার চেষ্টা করল সুদীপ।
” যে জিনিস তোমার নয়, যে জিনিস আমার নয়, সে জিনিস আমাদের হওয়াটা খুব কঠিন সুদীপ। আর ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের অনেক খরচ। অত টাকা কোথায় পাব আমরা !” ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল পায়েল।
” আরে বাবা! তুমি ওসব নিয়ে চিন্তা করো না তো! সব ম্যানেজ হয়ে যাবে।” পায়েলকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল সুদীপ।

” কিচ্ছু ঠিক হবে না।” নিজের মনেই কথাটা বলল পায়েল।
কথাটা কিছুটা হলেও সত্যি বোধহয়। অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও সংসারটা এখনও নড়বড়ে। পায়েল বাড়িতে টিউশন পড়ায়। সঞ্চয় বলতে কিচ্ছু নেই। সুদীপের মাইনে বিশাল কিছু না। তারপর মায়ের অসুখের খরচাও কম নয়। সংসার চলে খুব সামান্য কিছুই হাতে বাঁচে ওদের।

পায়েল নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, ” সুদীপ, বাবার দেওয়া সোনার হারটা যদি বিক্রি করি তাহলে হয়ত টাকা জোগাড় হয়ে যাবে। কি বল!”

সুদীপ পায়েলের দিকে তাকাল। অন্ধকারে চাঁদের আলো পায়েলের মুখ আবছা করে রেখেছে। সে বলল,” তুমি কি পাগল হলে পায়েল। ও হার তোমার বাবা তোমাকে দিয়েছে।”

” প্লিজ সুদীপ, আমাকে আর কোণঠাসা কোরো না। এটুকু তো করতেই হবে আমাকে।” গলা কাঁপছে পায়েলের।
চুপ করে গেল সুদীপ। সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে পায়েলকে রেসিস্ট করা মানে তাকে আরো বেশি করে কোণঠাসা করে দেওয়া। এখন চুপ করে থাকলেই পায়েলের বুকের শব্দ গুলো শোনা যাবে। কথা বোঝা যাবে। সেটা না হলে পায়েলকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে ধীরে ধীরে। চুপ করে পায়েলের কোলে মাথা রাখল সুদীপ। পায়েলও আর কথা বলল না এরপর।

একমাস কেটে গেছে । সমস্ত পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আজকে ভ্রূণ প্রতিস্থাপন হয়েছে পায়েলের। অনেক না বলার পরেও পায়েলের জোরাজুরিতে ওর বাবার হারটা নিতে বাধ্য হয়েছে সুদীপ। হয়ত এতে নিজের প্রতি অপরাধবোধটা একটু কমবে পায়েলের।

হাসপাতাল থেকে কিছুক্ষন আগেই বাড়ি ফিরেছে ওরা। আজ আর সুদীপ বাইক নিয়ে যায়নি। গাড়ি ভাড়া করে বাড়ি নিয়ে এসেছে নিজের স্ত্রীকে। রাত হয়ে গেছে। বিছানায় শুয়ে আছে পায়েল। ঘরের আলো নেভানো। পায়েলের পাশে বসে আছে সুদীপ। দুজনের মুখেই হাসি। পায়েল সুদীপের একটা হাত নিজের বুকের কাছে নিয়ে বলল, ” আমি খুব এক্সাইটেড বুঝলে!”

” আমিও। ও হ্যাঁ তোমাকে একটা জিনিস দেওয়ার ছিল পায়েল।” বলল সুদীপ।
” কি বল তো ?” জিজ্ঞেস করল পায়েল।
” তার আগে চোখ বন্ধ কর।”
” আচ্ছা বেশ।” চোখ বন্ধ করল পায়েল।

সুদীপ পায়েলের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে পকেট থেকে একটা হার বের করল। তারপর পায়েলের গলায় পরিয়ে দিল। পায়েল অবাক হয়ে উঠে বসল বিছানায়। বাম হাত দিয়ে পাশের সুইচ বোর্ড থেকে ঘরের আলো জ্বালিয়ে চমকে উঠল সে। এটা তো ওর বাবার দেওয়া হার। সে বলল, ” একি! এটা তুমি বিক্রি করোনি ?”
সুদীপ ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, ” না।”

” তাহলে এতগুলো টাকা কোথাথেকে পেলে ?” অকপট প্রশ্ন পায়েলের।
” ও জোগাড় হয়ে গেছে।”
” না, বল কোথাথেকে পেলে এত টাকা !?”
সুদীপ বলল, ” থাক না, ওসব কথা। পরে হবে। এখন তুমি রেস্ট নাও।”
” না, তুমি বল আগে।” গলায় জোর দিয়ে বলল পায়েল।
সুদীপ কিছুক্ষন চুপ করে থাকল, তারপর বলল, ” বাইক টা বিক্রি করে দিয়েছি আজকে।”
” মানে ?” জিজ্ঞেস করল পায়েল।
” মানে, বাইকটা আজকে বিক্রি করে দিয়েছি।”

মুখ থেকে কথা হারিয়ে গেছে পায়েলের। সে কোনরকমে বলল, ” তোমার এত সাধের বাইক বেচে দিলে তুমি ?”
সুদীপ পায়েলের চোখের দিকে তাকাল। তারপর ওর হাত ধরে বলল, ” পায়েল, এই হারটা তোমার বাবার চিহ্ন। উনি যখন থাকবেন না তখন এটাই হয়তো ওনার চিহ্ন হয়ে তোমার গায়ে লেগে থাকবে। আমি আমার বাবার সব চিহ্ন হারিয়েছি পায়েল। এখনও খুঁজে বেড়াই সেগুলোকে। তুমি হারিও না এটা। ” একটু থামল সুদীপ। গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে বলল, ” বাইক না থাকলেও আমি অফিস যেতে পারব। আমরা ঘুরতে যেতে পারব। কিন্তু এই হারটা হারালে তোমার বাবার চিহ্নটাও হারাবে তুমি। এটা আমি অন্ততঃ হতে দিতে পারলাম না।”

চুপ করে গেল সুদীপ। পায়েল চোখ দিয়ে জল উপচে পড়ছে। সুদীপের বুকে মাথা রাখল সে। সুদীপের বুকের ধুকপুকুনিটা সে খুব স্পষ্ট বুঝতে পারছে এখন।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত