মোঁচা ঘন্ট

মোঁচা ঘন্ট

সেদিন আমার হাসবেন্ড আমাকে অবাক করে দিয়ে একটা কলার মোঁচা কিনে আনলো। অবাক হলাম তার যথেষ্ট কারন আছে। সাধারণ অনেক কিছুই আছে যেগুলো ও চেনেনা। ঠিক চেনেনা বললে ভুল হবে।ওগুলো যে খেতে হয় সেটা জানেনা।বেশ কিছুদিন আগে ওর সাথে বাজারে গিয়েছি।আমি কাঁচাবাজার করতে খুব একটা পছন্দ করিনা।তারপরও সেদিন কেন জানি গেলাম।বাজারে যেয়ে আমার ভিষন পছন্দের পুঁইশাকের মিচলি দেখলাম।ওটা দেখে আমি চিৎকার করে উঠলাম।আহ কতদিন খাইনা।এটা যে এখানে কিনতে পাওয়া যায় তুমি তো কখনো বলনি?
ও আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিল।
পুঁইশাকের বিঁচি তুমি খাবে।
বিঁচি আবার খাওয়া যায়?
আমার মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।

আমার বলতে ইচ্ছা করছিল, না এটা আসলে খাইনা।এই বিচি বেটে চুলে লাগালে চুল ঘন,কালো হয়।টাক মাথায় চুল গজায়।কিন্তু বলতে পারলামনা।আমার আশেপাশে অনেক লোকজন।তারা যদি আমার মত এমন নির্ভরযোগ্য কারো কাছ থেকে এই ধরনের কথা শোনে,তাহলে তো সবাই এটা এপ্লাই করা শুরু করবে।তারপর আমার যে কি হবে,,,,,

রাগ করে ভেবেছিলাম না কিনে চলে আসব।পরে আবার আফসোস হবে ভেবে কিনলাম।
বাসায় ফিরেই মাকে কল করলাম।কিভাবে রান্না করব জেনে তাড়াতাড়ি রান্না করলাম।যদিও ওকে একটুও খেতে দেইনি।বিঁচি খেয়ে যদি আবার বদহজম হয়?
এর কিছুদিন পর একদিন দেখি বাজারের ব্যাগে আমার প্রিয় পুঁইশাকের মিচলি।আমি তো খুশিতে দিলাম এক লাফ।পরে একটু চিন্তায় পড়লাম।ও যে জিনিস খায়না সেটা তো আনার কথা না।
বাজার এনেই দেখি উনি কাহিল হয়ে বিছানায় শুয়ে টিভি দেখছে।আমি পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
দেখি টিভি দেখায় মসগুল তাই কোনদিকে খেয়াল নেই।
কি ব্যাপারে আজ হঠাত পুঁইশাকের বিঁচি কিনে আনলে কি মনে করে?
ও আমার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিল।
আহ কি নিষ্পাপ হাসি।যে কেউ সেই হাসিতে ভুলে যাবে।তবে আমি ওই মুহুর্তে ভুললাম না।
বললেনা কেন আনলে?

খেতে তো ভালই লাগে তাই আনলাম।বলেই আবার টিভি দেখায় মনযোগ দিল।ভাবখানা এমন যেন টিভিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু দেখাচ্ছে।

কিন্তু আমি তো তোমাকে সেদিন খেতে দেইনি।
ও দাওনি বুঝি?
ও একটু অবাক হলো।
তুমি পছন্দ করনা তাই দেইনি।
তাহলে আমি বোধহয় একাই খেয়েছিলাম।কথাটা বলেই বুঝল মস্ত ধরা খেয়ে গেছে।এবার টিভির দিকে এমনভাবে তাকালো যেন এই মুহুর্তে সে টিভি না দেখলে মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে।আমি হাসতে হাসতে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলাম।কারন তখন টিভিতে চার সতিনের ঘর সিনেমা দেখাচ্ছিল।

যাই হোক ওর কলার মোঁচা আনাতে আমি খুব অবাক হলাম।সেই সাথে খুব বিরক্তও হলাম।কারন এটা কিভাবে রান্না করতে হয় আমি জানিনা।চাকরির কারনে আমি সব সময় ঝামেলা কম হয় এরকম কিছুই রান্না করি।তাই কলার মোচা কখনো রান্না করিনি।আর কিভাবে রান্না করতে হয় তাও জানিনা।কিন্তু সেটা ওকে বুঝতে দিলেই সমস্যা।আমি তক্ষুনি মাকে কল করে সব জেনে নিলাম।আমার মা থাকতে আমার কোনই চিন্তা নেই।এমন কিছু নেই যা মা জানেনা।মা আমার মুশকিল আসান।

কলার মোঁচা কাটা যে এত কষ্টের তা আমার আগে জানা ছিলনা।মায়ের হাতের মজার মজার রান্না খেয়ে সব সময় হাত চেটেছি।কিন্তু মা যে এতো কষ্ট করে রান্না করে তা তো বুঝিনি।আমি আমার পছন্দের সব খাবার মায়ের জন্যে জমিয়ে রাখি। বাবার বাড়িতে যে কয়দিন থাকি পছন্দের সব খেয়ে আসি।অবশ্য আমাকে কিছু বলতে হয়না।মা-ই সব করে।আমি মাছের মাথা খেতে পছন্দ করি।তাই বাড়িতে যে কয়দিন থাকি মা আমাকেই মাছের মাথা দেয়।আহা বাবার বাড়ি থাকলে কত শান্তিতেই না থাকা যায়!সাতসকালে উঠে রান্নার ঝামেলা নেই।সারাদিন নিশ্চিন্তে ঘুরা যায়।তারপর বাসায় আসলে আর রান্না করতে ইচ্ছা করেনা।আর তাতে আমার হাসবেন্ডের রাগ হয়।ওর ধারনা মেয়েরা বাবার বাড়িতে ঘনঘন গেলে অলস হয়ে যায়।

একা একা মোঁচা কাটতে না পারাই ছেলেকে ডাকলাম সাহায্যের জন্যে।পড়ার সময় আমার ছেলেটাকে কাজ করতে ডাকলে সে বেজায় খুশি হয়।না ডাকলেও সে কারনে অকারনে ছুটে আসে।এই সময় ওর মাতৃভক্তি দেখার মত।
ছেলের সাহায্যে মোঁচা কেটে রান্না করলাম।খেয়ে দেখি অসাধারণ হয়েছে। একদম আমার মায়ের মত।নিজের রান্নার প্রশংসায় যখন আত্বতৃপ্তি লাভ করছি ঠিক তখনি একটা কথা ভেবে আমার সব আনন্দ ফিকে হয়ে গেল।

আমার হাসবেন্ডের একটা বৈশিষ্ট্য আছে।আমার রান্না যেমনই হোক সে কোন মন্তব্য করেনা।তার পছন্দের কোনকিছু খেতে দিয়ে আমি হয়ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি প্রশংসাবাক্য শুনব বলে।সে তখন গুড়ে এক মুঠো বালি ঢেলে উঠে যাবে।তবে এতদিনের সংসারে আমি বুঝেছি যেদিন সে অন্যদিনের চাইতে একটু বেশি খাবে বুঝতে হবে সেদিনের রান্না করা খাবার তার ভাললেগেছে।তার কয়েকদিন পর সে সেই জিনিসটা আবার কিনে আনবে।
এই কথাটা যখনি ভাবলাম ঠিক তখনি মাথায় মোঁচার চিন্তা এলো। আজ মোঁচা খেয়ে ভাললাগলে নির্ঘাত ২/৩ দিন পর আবার আনবে।আর আমার তখন ১২টা বাজবে।কিন্তু কিভাবে এই মোঁচার ঘন্টকে বিশ্বাদ করব সেটা ভেবে কোন দিশা পেলামনা।শেষমেশ আমার একমাত্র পুত্রকে ডাকলাম সাহায্যের জন্যে।যদিও জানি এই সাহায্যের বিনিময়ে আমাকে বড় কোন ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।কিন্তু এই মুহুর্তে এতো কিছু ভেবে লাভ ও নেই।

ছেলের পরামর্শে এত মজার মোঁচা ঘন্টকে খাওয়ার আশা ত্যাগ করে তার মধ্যে অনেকটা উচ্ছের রস আর লবণ দিলাম।মুখে দিয়ে বমি আসার উপক্রম হল।তাড়াহুড়াই নিজের জন্যে ভাল কিছুটা উঠিয়ে রাখা হলনা।সে যাই হোক যেভাবেই হোক এই মোঁচার চিন্তা ওর মাথা থেকে তাড়াতে পারলে আমি বাঁচি।

ছেলেকে নিয়ে যখন এই আনন্দ উদযাপন করছি, ঠিক তখনি ও এলো।আমরা রাতের খাবার সাধারণত সবাই একসাথেই খাই।তাই ও এলে আমি খুশিমনে খাবার পরিবেশন করতে গেলাম।কিন্তু শোবার ঘরে যেয়ে দেখি সে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাতেই সে যা বলল তা শুনে আমি এই শীতের মধ্যেই ঘেমে গেলাম।

আজ ফেরার পথে তার পরিচিত এক বড় ভাই নাকি জোর করে বাসায় নিয়ে গিয়ে রাতের খাবার খাইয়েছে। আমি অপেক্ষা করব বলে আমাকে কয়েকবার কল ও করেছে।কিন্তু আমি শুনব কি করে আমি তো তখন মোঁচা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।

আমার মন খারাপ দেখে সে বলল,তোমার মোঁচা রান্না খেতে পারলাম না।২/১ দিন পর আবার মোঁচা কিনে আনব।সেদিন তিনজন একসাথে খাব।

আমি একবার আমার মোঁচা ঘন্টর দিকে তাকালাম আরেকবার তাকালাম আমার মোবাইলটার দিকে।আজ নিজ হাতে দুটোরই সর্বনাশ করলাম।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত