তির্যক

তির্যক

তোমাকে এখন আর দিদি বলে ডাকতে ইচ্ছে করে না। মাত্র আট বছরের বড় তুমি। দেখতে দেখতেই তো আট বছর পার হয়ে যায়। এইযে দেখোই না, তুমি দেশ ছেড়ে চলে গেছো বছর বারো হয়ে গেলো। এক যুগ তোমায় দেখি না। অথচ তুমি সেই আগের মতোই আমার বুকে রয়ে গেছো কুমু’দি। না দিদি না। শুধু কুমু। তুমি আমার সেই কুমু; যার জন্য প্রতিটা সকালে আমার একটা প্রার্থনা থাকতো- আজ যেন আমাদের বাসার সামনে দিয়ে ভার্সিটি যাও। কিন্তু তোমার ক্লাসের হিসাব আমি বুঝতাম না ঠিক মতোন। আমার স্কুলের সময়ের সাথে মিলতোও না।
.
কুমু, তোমার কি মনে আছে? একদিন খুব বৃষ্টি। তুমি ভার্সিটি থেকে যেই বাসে করে বাড়ি ফিরছিলে সেই বাসে আমিও কাক ভেজা হয়ে উঠলাম। আমায় হাত নাড়িয়ে ডাক দিলে। তুমি মহিলা সীটে সীট না পেয়ে মাঝখানের দিকে বসেছিলে। তোমার পাশে এক ষণ্ডামার্কা লোক বসা ছিল। আজীবন তোমার পাশে সব পুরুষকেই আমার ষণ্ডা লাগে। লোকটাকে বললে, ‘ভাইয়া কিছু মনে করবেন না। ও আমার ছোট ভাই। দেখছেনই তো কেমন ভিজে গেছে। ছোট মানুষ কি আর এতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে সারাদিন স্কুল করে। একটু যদি ওকে সীটটা দিতেন…’

লোকটার ছিল দয়ার শরীর। কিছু না বলেই উঠে গেলো। নিমিষে লোকটাকে আমার কাছে দেবতার মতো মনে হলো। কি সুন্দর চেহারা। কি সুন্দর চোখ। একটু আগেও যাকে আমার ষণ্ডা মনে হচ্ছিলো। আমি তোমার পাশে বসতেই তুমি একটা রুমাল দিয়ে বললে, ‘মাথাটা মুছে নে।’ আমি মাথা মুছে তোমায় রুমালটা দিতেই তুমি রুমালটা নাকের কাছে শুঁকে বললে, ‘ইয়াক! গোবরের গন্ধ। তোর মাথায় এখনো গোবর গিজগিজ করছে। স্কুলে কিছু শিখিস নাই। মাথায় তো গোবর ছাড়া কিছু নাই।’
.
তোমার এই কথা শুনে আশেপাশের অনেকেই তোমার সাথে হাসতে লাগলো। আমার ইচ্ছে করছিলো লজ্জায় মাথাটা ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে ফেলি। কিন্তু জানো সেই সময়ে আমার খুব করে তোমার ঠোঁটে হাত রাখতে ইচ্ছে করছিলো। কি সুন্দর করেই না তুমি হাসো। আমার ভাড়াটাও তুমি দিয়ে দিলে। বাস থেকে নামার সময়ও ছিল বৃষ্টি। তুমি ছাতা ফুটিয়ে আমার কাঁধে হাত রেখে আমায় নিয়ে হাঁটা দিলে।

সন্ধ্যার মতো অন্ধকার হয়ে আছে চারপাশ। মানুষ জন কম। কেমন শীতল চারদিকটা। মাথার উপরে ছাতিতে টপটপ বৃষ্টি পড়ছে। আমার কাঁধে তোমার হাত। আরেক হাতে তুমি ছাতা ধরে আছো। তোমার সাথে পায়ে পায়ে হাঁটছিলাম। আমার ইচ্ছে করছিলো আর যেন আজ বাসায় ফিরতে না হয়। আর যেন কখনো আমরা না ফিরি কোথাও। আমি আর তুমি শুধু এমন বৃষ্টিতে হাঁটবো। শুধু হাঁটবো। জানো কুমু’দি, তোমাকে সেদিনই প্রথম আমি ভালবেসেছিলাম। সেটা আজ বুঝতে পারি। এর আগে তোমার প্রতি আমার ভালো লাগা ছিল। কিন্তু ভালবাসাটা সেদিন থেকেই শুরু। তোমার সেই আলতো স্পর্শ হয়তো ছিল স্নেহ। আমি খুঁজে পেয়েছিলাম ভালবাসার প্রথম স্পর্শ। অথচ তুমি আজো জানো না কুমু’দি। সেই কবে থেকে একটা ছেলে তোমার জন্য কতটা ভালবাসা বুকে জমিয়ে রেখেছে। ছোট্টবেলার সেই ভালবাসার পুকুর এখন মস্ত দীঘি হয়ে গেছে। তোমার জন্য ভালবাসা আরো যেন বাড়ছে। কেন এতো ভালবাসি তোমায় বলতে পারো?

তুমি আমাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ঘুর পথে এদিকে এলে। আমার বলতে ইচ্ছে করছিলো, ‘চল দিদি আরো কিছুক্ষণ হাঁটি।’ কিন্তু তখন এতো সাহস আমার ছিল না। নাকের নিচে সবে দূর্বাঘাসের মতো গোঁফ গজাচ্ছিল। গলার কাছে সব অনুভূতি কেমন যেন দলা পাকাতো। হঠাৎ দাঁড়িয়ে তুমি আমায় ছাতাটা ধরতে বলে ব্যাগে খুলে কি যেন খুঁজলে। আমি অপলক তাকিয়ে ছিলাম তোমার দিকে। তুমি ভ্রু কুঁচকে খুঁজেই যাচ্ছো। কানের পাশে চুল গুলো গুঁজে দিচ্ছো। ওড়নাটা ঠিক করছো। যেটা খুঁজছিলে সেটাই পাচ্ছিলে না। আমি প্রার্থনা করছিলাম যেন না পাও। আমি যেন এভাবেই তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি। বৃষ্টি বাড়ছিল। বৃষ্টির ফোঁটা গুলো যেন টপটপ করে ছাতিতে নয় আমার বুকে এসে পড়ছিলো।
.
যেই মুহূর্তে প্রার্থনা করলাম যেন খুঁজে না পাও। সেই মুহূর্তে তুমি পেয়ে গেলে। একটা মিমি চকলেট। হাতে নিয়ে একটা আলতো হাসি দিয়ে আমার শার্টের পকেটে চকলেটটা ঢুকিয়ে দিয়ে আমার চুল গুলো এলোমেলো করে বললে, ‘বাসায় গিয়ে খাবি ঠিক আছে?’ বলেই আমার হাত থেকে ছাতিটা নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলে। তখনো কি জানতাম কুমু’দি সেটাই ছিল আমাকে করা তোমার শেষ স্পর্শ।

বাসার কাছে আসতেই দেখলাম মা দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। ছাতা বন্ধ করে মাকে তুমি বললে, ‘আন্টি তোমার এই গরুটাকে আমার কাছে বিয়ে দিয়ে দাও। মানুষ বানিয়ে দিবো। ওর সারা গায়ে গোবরের গন্ধ।’ মা হাসতে হাসতে বলল, ‘তো বাসায় নিয়ে আসছিস কেন। তোর কাছে নিয়ে যা না কুমু!’ তুমি ছাতা দিয়ে আমার পেটে গুঁতো দিয়ে মাকে বললে, ‘আরেকটু বড় করে দাও আন্টি। এরপরে বিয়ে করে নিয়ে যাবো।’ আমার দিকে ফিরে বললে, ‘কিরে গরু যাবি তো আমার সাথে?’ বিশ্বাস করো আমার খুব করে হ্যাঁ বলতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছিল না। মা তোমায় বাসায় বসে যেতে বলল। তুমি বসলে না। চলে গেলে।

ঠিক তার এক সপ্তাহ পরে তোমার বিয়ে হয়ে গেলো। তোমার বর তোমায় আমেরিকা নিয়ে যাওয়ার কাগজপত্র ঠিক করলো। যেদিন তোমার বিয়ে হলো সেদিন থেকে আমার কেমন করে যে দিন গুলো গেছে সে শুধু আমিই জানি কুমু’দি। তোমাকে যে আমি ভালবেসে ফেলেছিলাম। ছোট বয়সের কোন ভুলভাল ভালবাসা সেটা ছিল না দিদি। সত্যিকারের ভালবাসা ছিল। নয়তো আজো কেন তোমায় প্রার্থনা করি।
.
তুমি জানো কুমু, তোমার দেওয়া সেই মিমি চকলেট এখনো আমার কাছে আছে। আমি খাইনি। গলে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে। তাও আমি ফেলিনি। তুমি আমেরিকা যাওয়ার আগে আমাকে একটা ডায়েরি দিয়েছিলে। আর খুব সুন্দর একটা কলম। আমার বলেছিলে, তোমায় যেন প্রতি মাসে একটা প্রেম পত্র লিখি। আমি বড় হলে আমায় বিয়ে করে তোমার কাছে নিয়ে যাবে। তোমার এই কথা শুনে বাসার সবাই কত হাসাহাসি করলো। তোমার বরও হাসলো। তোমার সেই ষণ্ডামার্কা বরের হাসি দেখে ইচ্ছে করছিলো গুলি করে মারি। আমার বুকের কষ্টটা সেদিন কেউ বুঝেনি।

সেই ডায়েরিতে তোমায় কোন চিঠি লিখা হয়নি। শুধু একটা শব্দই লিখা- কুমু। ডায়েরির একটা ইঞ্চিও এখন খালি নেই। শুধু তোমার নামটা লিখা। নিজের সংসারে এখন হয়তো ভুলেই গেছো আমার কথা। সেই বৃষ্টি ভেজা দিনের কথা। অথচ সেই দিন গুলো ছাড়া আমার কাছে আর কিছুই নেই। তুমি ছাতা হাতে হাঁটার সময় তোমার গায়ের গন্ধ আমি পাচ্ছিলাম জানো। চুল কিছুটা ভিজে গিয়েছিল তোমার। চুলের গন্ধ পাচ্ছিলাম। এসব ছাড়া তোমার আর কিছুই আমার কাছে নাই কুমু’দি। তোমার হাতটাও কখনো ধরা হয়নি আমার।

যেদিন আমেরিকা চলে যাবে তার আগের দিন সন্ধ্যায় বাসায় এসেছিলে। আমি ইচ্ছে করেই তোমার সামনে যাইনি। হুট করে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলাম। তোমায় বিদায় জানাবার কোন শক্তি আমার ছিল না। এখন মনে হয় ভুল করেছিলাম। আমি থাকলে হয়তো আমায় একবার জড়িয়ে ধরতে। মা বলেছিলো তুমি বিদায় নেওয়ার সময় কেঁদেছিলে। আমি কেমন করে তোমার সেই কান্না সহ্য করতাম কুমু’দি।
.
আজ তুমি কত কত দূরে। সূর্যও এক সাথে তোমাকে আমাকে ছুঁতে পারে না। তোমার মনের কোথাও হয়তো আজ আর আমি নেই। তোমার গল্প তাও শুনি মাঝেমাঝে। তোমার ফেসবুকের তোমার ছবি দেখি। চুপিচুপি দেখে চলে আসি। তোমার সাথে কথা বলার সাহস পাই না।

আমার খুব করে আজ তোমায় পেতে ইচ্ছে করে কুমু’দি। তোমার চারপাশটা জুড়ে থাকতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে তোমার হাসির কারণ হতে। তোমার চারপাশে যেখানে তুমি ঘুরে বেড়াও। সবকিছু আমার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে। সেদিন ব্রুকলিন বাউনের ছবি দিলে। ‘এন’ ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছো। স্টেশনে একদল বাজনা বাজাচ্ছিলো। আমার খুব ইচ্ছে করছিল কুমু’দি, তোমার হাত ধরে ‘এন’ ট্রেনে উঠতে। আমার কাঁধে তুমি মাথা রাখবে। বৃষ্টি ভেজা সেই দিনের মতো তোমার গায়ের গন্ধে, চুলের গন্ধ ভরে যাবে আমার বুক।

যদি কখনো আমার কথা তোমার মনে পরে। তবে তোমার সব গল্প আমায় শোনাবে তো দিদি। তোমার কোন এক স্বপ্নের কথা আমায় জানাবে। যা আজো কেউ পূরণ করেনি। আমি তোমার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। আমার জন্য একটা স্বপ্ন তুমি তুলে রেখো দিদি। আর কাউকে বলো না সেই স্বপ্নের কথা। সেই স্বপ্ন কেবল আমিই পূরণ করতে চাই। শুধু আমি।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত