শান্তি কুঞ্জ

শান্তি কুঞ্জ

আমি যেই বাড়িতে থাকি সেই বাড়ির নাম “শান্তি কুঞ্জ”। নিজের বাড়ি না খালার বাড়ি। খালারা বড়লোক মানুষ। খালুজান বড় ব্যাবসায়ি। খালা ই আমাকে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। এ বাড়ির সদস্য সংখ্যা ছয় জন।খালার নাম আনোয়ারা বেগম, খুবই দরদী মহিলা, অবশ্যি সব সময় দরদী থাকেন না। খালুজানের সাথে যখন ঝগড়া লাগে তখন একেবারে শ্রীমতি ভয়ঙ্করীর মত লাগে।

আমার খালুজানের নাম আবু জাফর চৌধুরী। বাইরের মানুষ উনাকে খুব মান্য করলে ও বউ এর কাছে বেশি পাত্তা পান না। খালার সাথে ঝগড়ায় টিকে উঠতে পারেন না। ঝগড়া লাগলে খালা পুরো খালুজানের গোষ্ঠিকেই গালাগাল করে। খালার সাথে ঝগড়া করে খালুজান আমার রুমে আসেন এসে বলে, নয়ন সিগারেট আছে? আমি বলি, জ্বি আছে,, খালুজানের জন্য আমার রুমে সিগারেট রাখা থাকে। ঝগড়া লাগলেই এখানে এসে সিগারেট খান, এমনিতে অবশ্য খায় না। পর পর দুটো সিগারেট খেয়ে উনি মাতাল হয়ে যান। সিগারেট খেয়ে কেউ মাতাল হয় না, কিন্তু খালুজান হয়। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে উনি বলেন,, বুঝলে নয়ন বিবাহ ই সকল সমস্যার মূল। নেহাতই বাবা ধরে বিয়ে টা করিয়ে দিয়েছে নাহয় আমি বিয়েই করতাম না, আর এই মহিলাটা কে তো কখনোই না। বিয়ে হলো একটা পাবলিক টয়লেটের মত, যারা এর ভেতরে আছে তারা বের হওয়ার জন্য হাঁসফাঁশ করছে, আর যারা বাইরে আছে তারা ভেতরে ঢোকার জন্য মুখিয়ে আছে। তুমি কি আমার কথা বুঝেছ?

,, জ্বী, বুঝেছি।
এই মহিলার সাথে আর যাইহোক সংসার করা যায় না। তুমি কি আমার এই কথা সমর্থন কর?
,, জ্বী, করি।

এর পরেরদিন খালুজান সকাল সকাল বেরিয়ে যান, দুপুরবেলা আর আসেন না, ফোন দিলে ধরেন না, রাত বেশি হলে খালা আমাকে পাঠান, আমি গিয়ে অনুরোধ করলে খালু বলেন, নেহাত তুমি বলছো তাই যাচ্ছি, নাহয় আর কখনো যেতাম না ওই বাড়ি। খালু বাড়ি আসেন, খালার সাথে খুবই মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু দুইদিন পরই অবস্হা আবার আগের মত হয়।

এই বাড়ির আরেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলো রিয়া, পুরো নাম রিয়া চৌধুরী । খালার দ্বিতীয় কন্যা। এই মেয়ে হলো স্বঘোষিত পুরুষ বিদ্বেষী। সে নিজেকে পুরুষ বিদ্বেষী বলে পরিচয় দেয়। টিভিতে যখন ধর্ষন বা নির্যাতনের নিউজ দেয় তখন সে পুরো পুরুষ সমাজের গুষ্ঠি উদ্ধার করে। অথচ কিছুদিন আগেও তাকে একটা ছেলের সাথে ঘুরতে দেখা যেত, এখন অবশ্য ছ্যাঁকা খেয়েছে তাই দেখা যায় না। আমি যেদিন এই বাড়িতে এসেছিলাম এর পরেরদিনই এই মেয়ে আমার উপর ১৪৪ ধারা জারি করে। আমি যেন তার থেকে দুরত্ব বজায় রাখি। ও যখন ছাঁদে থাকবে তখন ছাঁদে যাওয়া যাবে না এই গুলো আর কি। আমিও মেনে চলি। বলা যায় না পুরুষ বিদ্বেষী বলে কথা।

জমিলার মা এই বাড়ির কাজের মহিলা। সবাই জমিলার মা বললেও জমিলা বলে ওনার কোনো কন্যা সন্তান নাই। ওনার নাম সুইটি। রিয়ার মতে কাজের মেয়ের নাম হওয়া উচিত রহিমার মা, জমিলার মা, কালুর মা, টাইপ। আর যাই হোক কাজের মেয়ের নাম সুইটি হওয়া যায় না, তাই সে এর নাম দিলো জমিলার মা, এই নাম সবাই সমর্থন ও করেছে। এইটা নিয়ে জমিলার মার মনে খুব কষ্ট। আমাকে বলে, দেখছেন ভাইজান.? গরিব বইলা আমার নামটা ও পাল্টাইয়া দিছে। জমিলার মার বয়স ৩০ হবে। স্বামী তালাক দিয়েছে। জমিলার মা লেখাপড়া জানা মেয়ে, ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছে। জমিলার মায়ের এক কথা, ওনার কোনো গতি নাই তাই এ বাড়িতে পড়ে আছে, যদি কোনো গতি হইতো তাহলে এ বাড়িতে থাকতো না। এ বাড়ির মানুষের উপর উনি খুবই অসন্তুষ্ট, তবে আমার উপর সন্তুষ্ট। কেন সন্তুষ্ট এইটা জানি না। সময়ে অসময়ে আমাকে চা টা করে দেয়।

দারোয়ান আব্দুর শুক্কুর। এই বাড়িতে আগে দারোয়ান ছিলো না, একদিন খালা খালুজানের কাছে দাবী করে বসলো এ বাড়িতে একজন দারোয়ান রাখতে হবে। এত বড় বাড়ি অথচ দারোয়ান থাকবে না! এটা কেমন কথা.? খালুজান অবশ্য প্রথমেই এই দাবী নাকচ করে দিয়েছেন। পরে এইটা নিয়ে একদিন তুমুল ঝগড়াঝাটি হলো, এর পরেই একটা দারোয়ান রাখা হলো। দারোয়ানের বয়স চল্লিশ হবে। বিবাহ করে নি। আমি শুক্কুর মিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম ভাই আগে কি করতেন..? শুক্কুর মিয়া বিরস মুখে বলেন, আর কইয়েন না ভাই, আগে ছিলাম হোটেলের বাবুর্চি। একদিন এক কাষ্টমার তুমুল হই চই শুরু করলো, ওর ডালে নাকি একটা চুল পাওয়া গেছে। আমি গিয়া বললাম চুল পড়বো কেমনে..? আমার মাথা তে তো চুলই নাই। এইডা বলার পর আরো ক্ষেইপ্যা গেল, বলে চুল নাকী আমার অন্য জায়গা থেকে পড়ছে। আপনি বলেন ভাইসাব, অন্য জায়গা থেকে চুল পড়নের উপায় আছে..? কি বেইজ্জতি! এবার দিছি বাবুর্চির কাম ছাইড়া। এখন দারোয়ানি করি। এই হলো শুক্কুর মিয়ার কাহিনী। শুক্কুর মিয়ার খুবই আক্ষেপ, এই বাড়িতে সুইটি ছাড়া কেউ ওনার সাথে সুখ দুঃখের আলাপ করে না। সবাই জমিলার মা ডাকলে ও শুক্কুর মিয়া ওনারে সুইটি ডাকে। দুজন কে মাঝে মাঝে সুখ দুঃখের আলাপ করতে দেখা যায়।

এ বাড়ির অস্হায়ী সদস্যদের দুজন হলো বড় আপা আর দুলাভাই। বড় আপা খালার প্রথম কন্যা। নাম “রিনা”, বড় আপা হয়েছে খালার মত প্রচন্ড ঝগড়াটে। আর খুবই সন্দেহ বাতিক মহিলা। কারনে অকারনে দুলাভাই কে সন্দেহ করে। মাসে পাঁছ ছয়বার ঝগড়া করে এখানে চলে আসে। পরে দুলাভাই কে এসে নিয়ে যেতে হয়। দুলাভাই ডাক্তার মানুষ। শ্বশুর বাড়িতে আসলে আমার সাস্হ্যের খোঁঝখবর নেন। আমাকে বলেন, বাজে নেশা টেশা একদম করবে না বুঝলে..?

,,জ্বী বুঝেছি,
,সিগারেট খাও..?
,,জ্বী না,
,,খুব ভালো,,সিগারেট সাস্হ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
,, জ্বি,,আপনি যদি খেতে চান তাহলে খেতে পারেন, ড্রয়ারে রাখা আছে।

দুলাভাই সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলেন, মাঝে মধ্যে সিগারেট খাওয়া একেবারে খারাপ না।
বড় আপার একটা ছেলে আছে, নাম শুদ্র, বয়স চার। এর কাজ হলো সারাক্ষন একটা খেলনা পিস্তল নিয়ে ঘোরা। আর ডিশুম ঢিশুম বলে সবাইকে গুলি করা।যাকে গুলি করবে তাকে মরার এক্টিং করতে হবে নাহয় প্রচন্ড জোরে চিৎকার করে।

এ বাড়ির চার পাশের প্রাচীর এর মধ্যে বড় বড় কয়েকটি কড়ই গাছ আছে। বিকেল হলে কয়েক শত কাক ওই গাছগুলোর উপর বসে চিৎকার করে।

এ বাড়িতে ভালোভাবেই দিন গুলো কেটে যাচ্ছে। এ বাড়িতে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গাটা হলো ছাঁদ। ওখানে রিয়া সুন্দর বাগান করেছে। নানা ফুল ফুঁটে থাকে। রিয়ার জন্য যাওয়া যায় না। মেয়েটা বেশিরভাগ সময়ই ওখানে থাকে। একবার বাগান থেকে একটা ফুল ছিঁড়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা হাজির পেছন পেছন এসেছে জমিলার মা। রিয়া ফুল ছেড়ার জন্য আমাকে বকাবকি করলো, সেই সাথে পুরো পুরুষ সমাজের ও এক হাত নিলো। ফুল ছেঁড়ার সাথে পুরো পুরুষ সমাজের কি সম্পর্ক সেটা আমার মাথায় আসে না,, অবশ্য রিয়ার ব্যাপার টা অন্য, পুরুষ বিদ্বেষি বলে কথা। রিয়া চলে যাওয়ার পর জমিলার মা আমাকে ফিস ফিস করে বলে গেল,, বুঝলেন ভাইজান, এ লাড়কি বহুত ডেন্জারেস। জমিলার মা হিন্দি সিরিয়ালের খুবই ভক্ত। ইদানিং হিন্দি বলা শুরু করেছে। সেদিন খালার চুলে তেল দিতে গিয়ে হিন্দিতে কিছু একটা বলেছিলো, সম্ভবত হিন্দিতে চুল বিষয়ক কিছু একটা বলেছিলো, এইটা নিয়ে খালা তুলকালাম কান্ড করেছিলো। পরে জমিলার মা আমাকে এসে বলেছিলো, দেখছেন ভাইজান গরীব বইল্যা একটু হিন্দিও বলতে পারি না।

একদিন সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গলো খালার চিৎকারে। না আজ খালুর সাথে লাগে নি। আজ শান্তি কুঞ্জে একটা বিশেষ ঘটনা ঘটেছে। জমিলার মা আর দারোয়ান ব্যাটা পালিয়েছে। পালানোর সময় খালার ড্রয়ার থেকে সাতাশ হাজার টাকা আর রিয়ার ঘর থেকে ওর মেকাপ বক্স নিয়ে গেছে। রিয়ার মেকাপ বক্সের উপর জমিলার মার বিশেষ নজর ছিলো। আমাকে অবশ্য একবার বলেও ছিলো,, ভাইজান আইজ গরীব বইল্যা একটু সাজুগুজু ও করতে পারি না, গরীবের কি একটু সাজার শখ হয় না?

জমিলার মায়ের ঘরে একটা চিঠি পাওয়া গেছে। খালার নির্দেশ মত চিঠিটা সকলকে জোরে জোরে পড়ে শুনিয়েছে রিয়া। চিঠিতে যা লিখা আছে তার সারমম হলো এই যে,

জমিলার মার কোনো গতি ছিলো না, তাই এতদিন এ বাড়িতে পড়ে ছিলো। এখন জমিলার মার গতি হয়েছে, দারোয়ান শুক্কুর মিয়া জমিলার মারে বিবাহ করবে বলেছে। জমিলার মা এই বাড়ির সকলের উপর অসন্তুষ্ট। খালার নামে বলেছে ওনার গলা নাকী কড়ই গাছের কাউয়ার চেয়েও খারাপ। খালুজান সমন্ধে বলেছে, খালুজান নাকী মানুষ ভালো তয় চরিত্রে দোষ আছে। জমিলার মায়ের দিকে কয়েকবার বদ নজর দিয়েছে। রিয়া সমন্ধে বলেছে এই মাইয়া মিচকা শয়তান যে এর স্বামী হবে তার কপালে দুঃখ আছে। দুলাভাইয়ের অনেক সুনাম করেছে।বলেছে দুলাভাইয়ের মত মানুষ হয় না। বলেছে বড় আপা নাকী দুলাভাই কে নির্যাতন করে। আমার সমন্ধে ভয়ানক কথা বলেছে। আমি নাকী রিয়াকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সারাক্ষন রিয়ার দিকে উঁকি ঝুঁকি মারি, কি সর্বনাশের কথা! এবং সব শেষে বলেছে ভূল ত্রুটি নিজ গুনে ক্ষমা করে দিবেন।

এই চিঠি শোনার পর সকলে পুরো দশ মিনিট নিশ্চুপ ছিলো। এরপরই শুরু হলো কুরুক্ষেত্র। খালা খালু দরজা আটকে ঝগড়া করছে। খালা বলছেন, তোমার মত চরিত্রহীনের সাথে আমি ঘর করেছি.? ছিহ,,আর খালু বলছেন চুপ করো অনোয়ারা তোমার গলা সত্যিই কাউয়ার মত। আপর দিকে বড় আপা দুলাভাই ও লেগে গেছে। বড় আপা বলছে,,তুমি কি ভেবেছ আমি কিছু জানি না? কিছু বুঝি না? বল জমিলার মায়ের সাথে তোমার কি চলতো? দুলাভাই বরাবরের মত নিশ্চুপ করে আছেন। ওদিকে রিয়া ও শুরু করেছে। কিছুক্ষন আমাকে গালি দেবে তারপর পুরো পুরুষ সমাজ কে গালাগাল করবে। আমি সিগারেট ধরিয়ে বাড়ির গেইটের কাছে বসে আছি। ইদানিং সিগারেট খাওয়া টা নেশায় পরিনত হয়েছে। বাড়ির সবার চিৎকারে পুরো বাড়ি ক্রমাগত কেঁপে কেঁপে উঠছে। ওইদিকে সবার চিৎকারের সাথে তাল মিলিয়ে কড়ই গাছের কাক গুলো ও সমানে চেঁচাচ্ছে। সকালের রোদ এসে গেইটের পাশের ওই নামফলকে এসে পড়েছে এতে বাড়ির নামটা ঝিক ঝিক করে উঠছে।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত