পরাজিত লেখক

পরাজিত লেখক

বিকেল থেকেই বাইরে ঝুম বৃষ্টি। একটা ঠাণ্ডা আবহাওয়া বিরাজ করছে। দোতলা বাড়ির ব্যালকনিতে লাল রং এর কাঠ পেন্সিল আর সোনালী কাভারে বাঁধাই করা আমার লেখালেখির খাতাটা নিয়ে বসে আছি।প্রচন্ড ইচ্ছে করছে কিছু লেখার। কিন্তু কোন লেখাই মাথায় আসছে না। খাতাটা বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে নিশ্চুপ বসে বৃষ্টি দেখছি। সন্ধ্যা নেমে আসছে।আমার লেখার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।এখন প্রকৃতির কান্না দেখায় বিভোর। এমন সময় মা মোমবাতি হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে বললেন, বাবা, তোর সাথে একটা ছেলে দেখা করতে এসেছে।

আমি তাঁর কথায় কিছুটা অবাক হলাম। অবাক হওয়ার মতই ব্যাপার। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে এই অসময়ে কে আসতে পারে ভেবে আমি ভেবে পেলাম না। কারও সাথে এ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল এমন মনে করতে পারছি না। মাকে বললাম ছেলেটাকে উপরে পাঠিয়ে দিতে ।

মা সোনালী কাভারের খাতার পাশে মোমবাতিটা রেখে চলে গেলেন। বৃষ্টির সাথে হালকা বাতাসও হচ্ছে। বাতাসের তালে মোমবাতিটাও নিভু নিভু করছে।বাইরে ঝুম বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ।একটা ভৌতিক পরিবেশ।এই ভৌতিক পরিবেশের মধ্যে আমি একটা অচেনা অজানা ছেলের জন্য অপেক্ষা করছি।

ঠিক দুই মিনিটের মাথায় ছেলেটা উপরে এল। ওর পিছু পিছু আমার স্ত্রী পরীকে ও চা -বিস্কুট হাতে আসতে দেখলাম। পরী চা -বিস্কুট রেখে চলে গেল। ছেলেটার বয়স তেইশের কাছাকাছি। চেহারায় কবিত্ব ভাব।চোখে চশমা। তবে খুব স্মার্ট না।অভিযোজন ক্ষমতা বেশ কম বলেই মনে হল। ছেলেটা হাত উঁচিয়ে বলল- স্যার, আসসালামুআলাইকুম।পাইকারী সালাম না। বিশুদ্ধ সালাম। আমি ওকে বসার ইঙ্গিত করলাম।ও আমার সামনের চেয়ারে জড়সড় হয়ে বসল কিন্তু কোন কথা বলছে না দেখে আমিই কথা শুরু করলাম।বললাম তোমাকে ঠিক চিনতে পারলাম না তো?
ও খানিক চুপ থেকে রোবটের মত একটানা কিছুক্ষণ কথা বলে চলল।ওর কথার বিষয়বস্তুটা এমন –

“ছেলেটার নাম সজল। আমাদের পাশের গলিতে থাকে। কিছুদিন হল ও লাবণ্য নামের একটা মেয়ের সাথে প্রেম করছে।প্রেম শুরুর আগে ও জানতে পারে যে লাবণ্য আমার লেখালেখির অনেক বড় একজন ফ্যান। তাই প্রেম করার পথ সহজ করতে সজল নিজেকে আমার দুঃসম্পর্কের ছোট ভাই হিসেবে পরিচয় দেয়।এতে অতি সহজে লাবণ্য তার প্রেমে পড়ে। এখন প্রেম করার পর লাবণ্য সজলকে বলছে – “তোমার ভাইকে (আমাকে) বল যেন আমার নামের একজন নায়িকা তার লেখায় থাকে।””

সজল কিছুক্ষণ থেমে বলল – স্যার, আমি লাবণ্যকে খুব ভালবাসি স্যার।আমি স্যার লাবণ্যকে হারাতে চাইনা।আপনি স্যার আমার জন্য এইটুকু করেন স্যার।স্যার আপনি যত টাকা চান আমি…..।

আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, তুমি টাকা দিয়ে আমার চরিত্রকে কিনতে চাইছ।গেট আউট। বেয়াদপ। শার্টের কোণে চোখ মুছতে মুছতে সজল বিদায় হল।রাতে খাবার টেবিলে ব্যাপারটা নিয়ে বেশ হাসাহাসি ও হল।পরী বলল,তুমি দিতে একটা কিছু লিখে! তারপর আবারও হাসি।
মা বলল, ছেলেটার সাথে খারাপ ব্যবহার না করে বুঝিয়ে বলতে পারতিস। বয়স কম।এজন্য একটু আবেগী।

এরপর প্রায় দুই বছর কেটে গেছে। সজলের কথা আমরা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি।

সেদিন একুশে বই মেলায় আমার একটা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান শেষে আমি ও পরী ট্রেনে খুলনা ফিরছি।হঠাৎ কেউ একজন আমাকে বলল, স্যার আসসালামুআলাইকুম। বিশুদ্ধ সালাম।

আমি খবরের কাগজ থেকে চোখ তুলে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়েই চিনতে পারলাম। সেই চশমা ওয়ালা কবি কবি চেহারার সজল। ও তখনও কথা বলে যাচ্ছে – স্যার, সেদিন আপনার বাড়ি থেকে আসার পর লাবণ্যকে সবকিছু খুলে বললাম। লাবণ্য বলল, “আমি তোমাকে লেখকের ভাই ভেবে ভালবাসিনি।আমি তোমাকে ভালবাসি।লেখকের ভাইকে না।আমি স্যার অনেক সুখে আছি।আমাদের জন্য দোয়া করবেন।”
আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম – তুমি কোথায় গিয়েছিলে?

– স্যার, আপনার কাছে শেখা সততার পুরস্কার হিসেবে আমি লাবণ্যকে পেয়েছি। আর সেই একই সততার বোঝা মাথায় নিয়ে দেশের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ঘুরছি একটা চাকুরীর আশায়। ওর কন্ঠে স্পষ্টতঃই ক্ষোভ।

– এত সুন্দর করে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিতে যাই। পরীক্ষা দিয়ে কখনও শুনি পরীক্ষা বাতিল আবার কখনও শুনি যাদের চাকরি হয়েছে তাদের সর্বোচ্চ মার্ক শতকরা প্রায় ৯৫ এর ও উপরে। যা ইচ্ছা করলে আমি অনেক আগেই করতে পারতাম।কিন্তু করি না। আপনি গল্পের চরিত্র বিক্রি করিন নি আর আমি নিজের চরিত্র কিভাবে বিক্রি করব?

আমাদের কথা বলতে দেখে পরী খুব খুশি।রাতে ট্রেনে খাওয়ার জন্য আমাদের দু ‘জনের খাবার তিনজনকে খাওয়াল পরী।সকালে ট্রেন থেকে নামার সময় আমি সজলকে বললাম, সজল তুমি কি আমাকে পাঁচটা টাকা দেবে?

সজল হাসি হাসি মুখ করে আমাকে পাঁচ টাকার একটা নোট দিল।

আমি পরীর হাতে টাকাটা দিয়ে বললাম রেখে দাও এটা লাবণ্যকে নিয়ে লেখা গল্পের অগ্রিম পারিশ্রমিক।বাংলাদেশে টাকায় সব হয়।আমি না হয় একটা ভাড়াটে লেখক হলাম।

বাসায় ফিরে সন্ধ্যায় সোনালী কাভারে বাঁধাই করা লেখালেখির খাতাটা নিয়ে মনের আনন্দে লাবণ্যের গল্প লেখা শুরু করলাম।পরী চেয়ারের পিছনে ভর করে লাবণ্যকে নিয়ে আমার লেখা গল্প পড়ছে।আমি লিখতে গিয়ে মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলছি।পরীর কাজ পরী করছে। গল্প পড়ে চোখের পানি ফেলছে আমার ঘাড়েরর উপর। অথবা চোখের পানি পড়ছে না। হয়ত এটা আমার মনের ভুল।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত