চেনা বন্ধুটির অচেনা রূপ

চেনা বন্ধুটির অচেনা রূপ

নাইমঃ আজ ভোরেই রাজশাহী থেকে এসেছি। প্ল্যান, বন্ধুদের সঙ্গে করে একসাথে এশিয়া কাপের ফাইনাল ম্যাচ দেখবো। সারাদিনের ব্যস্ততায় মা’র সাথে দেখা হয়নি। দেখা হয়নি বলছি এই কারণে, আমি থাকি আমার নানাবাড়িতে। নানাবাড়ি থেকে দাদাবাড়ির দূরত্ব খুব বেশি না। আধা কি.মি. মতো হবে আর কী। তবে, এসেই ব্যস্ততা সারাদিন। এই ব্যস্ততার মধ্যে মা’র সাথে আর দেখা করা হয়নি। কাল খুব ভোরেই আবার চলে যেতে হবে। সুতরাং, আজ রাতেই দেখা করতে হবে। অর্থাৎ? বন্ধুদের সাথে সম্পূর্ণ ম্যাচটা আর দেখা হবে না।

শাকিমঃ সবে রাত নয়টা বেজেছে। ফার্স্ট ইনিংস শেষ। প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাহিরে বেরুলাম। নাইম আমার সাথ নিলো। আমাকে এসে বললো,

– কোথায় যাচ্ছিস?
– ওয়াশরুমে।
– একা যেতে পারবি?
– একা যেতে না পারলে বের হলাম কেন?
– বেশি বকতে হবে না তোকে। বেশতো উশখুশ করছিলি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। ভীতু কোথাকার। দে, আমাকে টর্চটা দে।

নাইমের দিকে টর্চটা বাড়িয়ে দিলাম আমি। শালা ফাজিল, নিজে বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছে, আর ও কিনা আমাকে ভীতু বলছে!

আমি এক নাম্বারটা সেরে নিয়ে বাইরে বেরুলাম। টর্চ হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ঢুঁকলো ও। আমি টিউবওয়েলে হাতমুখ ধূতে লাগলাম। হাতমুখ ধোয়া শেষ হলে বললাম,

– নাইম!
– কী রে? ভয় পাচ্ছিস নাকি?
– হুমঃ আমি চলে গেলাম।
– সে কি! থাম! একা একা যেতে পারবি না।
– যেতে পারবো।

আমি ‘যেতে পারবো’ বলার সাথে সাথেই ওয়াশরুম থেকে ধরফড় করতে করতে বেরিয়ে এলো নাইম। বললো,

– আরে, যেতে পারবি না বললামতো। চল, আমার সাথে যাবি এখন।

আব্দুল্লাহর বাড়ি গিয়ে ঢুঁকলাম আবার। খেয়েদেয়ে উঠে তাজকির ওর বাড়ি চলে গেলো। বাড়ি গিয়ে ওকে আবার খেতে হবে। না খেলে কাল মাইর খেতে হবে। অথচ, আব্দুল্লাহর বাড়ির পোলাও-মাংসও ছাড়তে পারছে না বেচারা।

পোলাও-মাংস খেয়ে বাড়ি চলে গেলো ও। এবার নাইম বললো সেও বাড়ি যাবে। বাড়ি যাওয়ার কারণটাও ব্যাখ্যা করলো ও। তারপর আব্দুল্লাহ বললো, ‘‘খাবারদাবার সব উঠিয়ে, গুছিয়ে নিই। তারপর রেখে আসছি তোকে।’’ আমি বললাম, ‘‘আমি রেখে আসছি। তুই সবকিছু গুছিয়ে নে, আমি ওকে রেখে আসি, ওদিক থেকে তাজকিরও আসবে আবার। তুই আমার সাথে গেলে বেচারাকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।’’

আব্দুল্লাহ আমার কথাকে অধিক যৌক্তিক বলে ধরে নিলো এবং আমার কথায় সায় দিয়ে বললো, ‘‘যা তাহলে। দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস।’’

০২.

শাকিমঃ আমি আর নাইম বেরিয়ে পড়লাম। বড় বাগান পেরিয়ে পিচঢালা রাস্তায় উঠতে হয়। তারপর আর কিছুদুর হাঁটতে হয়। নাইমের ভয় পাওয়ার মতো জায়গা এই বাগানটুকু। আশেপাশে বাড়িটাড়ি নাই। লম্বা লম্বা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। সব থেকে লম্বা গাছটা মরা। ডালপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মিথ আছে, এ গাছে নাকি ভূত থাকে। অনেকেই নাকি রাতের বেলা এই গাছের দিকে তাকিয়ে নিজের প্রতিরূপ দেখতে পেয়েছে। তারপর যা হয়, বেহুঁশ।

বড় বাগান পেরিয়ে রাস্তায় উঠলাম আমরা। হাঁটছি। হঠাৎ একটা কুকুর ঘেউ করে চেঁচিয়ে উঠলো। নাইমও কুকুরটার সাথে সাথে ওরে বাবারে বলে চেঁচিয়ে উঠলো। তারপর আমার হাতকে শক্ত করে ধরে রইল। নাইমকে ওর বাড়ি পর্যন্ত রেখে আমি ফেরার পথ ধরলাম।

পিচঢালা রাস্তা থেকে বড় বাগানে প্রবেশ করলাম।

আব্দুল্লাহঃ নাইম-শাকিমের যাওয়া অনেকক্ষণ হয়ে যাওয়ার পরেও শাকিম ফিরে না আসায় আমি আর তাজকির ক্রমাগতভাবে শাকিমকে ফোন করতে থাকলাম। কিন্তু কী হয়ে গেলো, শাকিম ফোন রিসিভ করলো না। নাইমকে ফোন দিলাম। নাইম বললো শাকিম নাকি ওকে রেখে চলে এসেছে। কিন্তু কী হয়ে গেলো, শাকিম এখানে এসে পৌঁছলো না।

ব্যাপারটা আমার কাছে ঠিকঠাক লাগছিলো না। তাই, আমি আর তাজকির শাকিমের খোঁজে বেরিয়ে পড়লাম। হাঁটতে হাঁটতে নাইমের বাড়ির ওখানকার মোড় পর্যন্ত গেলাম। গ্রাম এলাকা সব। অধিকাংশ দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে। একটামাত্র চায়ের দোকান খোলা আছে। বয়স্ক মানুষেরা সব চা-সিগারেট খাচ্ছে আর টিভি দেখছে। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলাম। কিন্তু কী হয়ে গেলো, শাকিমের দেখা পেলাম না।

হতাশ হয়ে ফিরে আসছি আর আকাশপাতাল ভাবছি। কোথায় যেতে পারে ও? তাজকির বললো,

– রাফাকে ফোন করে জানবি? ওর সাথে দেখা করতে যেতে পারে।
– এতো রাতে রাফার সাথে দেখা করতে যাবে কেন?
– কেন বললেতো হবে না। যেতেওতো পারে।

রাফাকে ফোন করলাম। কিন্তু কী হয়ে গেলো, শাকিম ওর ওখানে যায় নি। ভালোমন্দ ভাবতে ভাবতে বড় বাগানে এসে প্রবেশ করলাম। আকাশে মোটামুটি আকৃতির চাঁদ দেখা যাচ্ছে। টর্চটা আর জ্বাললাম না।

বড় বাগানে পায়ে হাঁটা পথটা লম্বাটে মরা গাছটার নিচ দিয়ে। মানুষ পায়ে হাঁটার সময় সব থেকে ছোট পথ খোঁজে এবং সেখান দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। বড় গাছটার নিচ দিয়ে যে রাস্তা, সেটাও সেভাবেই সৃষ্টি হয়েছে।

বড় গাছটার কাছে আসতেই ওপর থেকে টপ করে কী যেন তাজকিরের মাথায় পড়লো। মাথায় হাত দিয়ে ও ভেজা(টর্চ জ্বালার পরে বুঝেছি) কিছু অনুভব করলো। সন্দেহজনক কিছু ভেবে আমাকে টর্চ জ্বালতে বললো ও। সন্দেহজনক ভাববার কারণটা হচ্ছে, এই গাছে কখনোই কোনো পাখি বসে না। এলাকাবাসীর ভাষায় এই গাছটা নাকি অভিশপ্ত। সুতরাং, তাজকিরের মাথায় পাখির বিষ্ঠা পড়া অসম্ভব।

টর্চ জ্বেলে তাজকিরের হাতে আলো ফেললাম। যা দেখলাম তা অতি অপ্রত্যাশিত। রক্ত। অন্ধকারেই আমরা চোখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। হৃদস্পন্দন থেমে যাবার জোগাড়। ভয়ে ভয়ে উপরের দিকে তাকালাম। তাকিয়েই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। এতোখানি প্রত্যাশা করিনি। আকাশপাতাল ভাববার সময়ও এই পর্যায়ে যাই নি।

বড় গাছটার উঁচু একটা ডালে শাকিম বসে আছে। খালি গা। ওর গেঞ্জিটা একটা ডালে ঝুলছে। মাথার চুল উশকোখুশকো। চোখদুটো টকটকে লাল। এ মানুষ নয়। পিশাচ। পিশাচটার হাতে একটা পাখি। পাখিটার গায়ে কামড় বসিয়েছে। পিশাচ যে পাখির লোমটোম উপড়িয়ে, জবাই করে খাবে, এমনটা ভাবা ভুল। গলায় কামড় বসিয়েছে এবং সম্ভবত রক্তটুকু চুষে খাচ্ছে। সম্ভবনাটুকু সত্যি হলো যখন দেখলাম প্রথম পাখিটার রক্তশুন্য কাঠশক্ত দেহটাকে নিচে ফেলে দিয়ে আরেকটা পাখির গলায় কামড় বসালো।

এতোক্ষণ লক্ষ করিনি। মৃদু হুংকার শুনে এবারে চোখ পড়লো তাজকিরের দিকে। তাজকিরের মধ্যে শুনেছি ভূতপ্রেত বাস করে। প্রমাণ পেলাম। ওর চোখদুটোও লাল টকটকে হয়ে গেছে। গায়ের পাঞ্জাবী খুলে ফেলেছে। আমি ওর হাতখানা ধরলাম। ও ছাড়িয়ে নিলো। ওর দেহে এখন অসুরের শক্তি। গর্জে উঠলো ও। তাজকিরের গর্জনে শাকিমও গর্জে উঠলো এবং বিড়ালের মতো করে চার হাত-পা বেয়ে নিচে নেমে আসলো। দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি চললো। তারপর দুজনেই মাটিতে পড়ে গেলো। আমি গিয়ে তাজকিরের শরীরে হাত দিলাম। সাথে সাথে জেগে উঠলো ও। তারপর দুজনে গিয়ে শাকিমকে জাগালাম। পৈশাচিক রূপটা আর ওর মধ্যে নেই। ও এখন আমাদের বহুদিনের চেনা বন্ধুটি…

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত