আসিতেছে নেতা

আসিতেছে নেতা

— ভাতিজা ভালা আছোনি?
— হ চাচা ভালা আছি। আপনার শরীল স্বাস্থের কি খবর?
— আল্লার রহমতে ভালাই আছি। তা চলো আইজকা আমার লগে।
দিলু চাচার কথা শুনে কিছুক্ষন ভাবলাম। উনি আসলে আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে চাচ্ছেন? আজকে শনিবার, নিশ্চয়ই কোন বিয়ের দাওয়াতে নিয়ে যাবেন না। তাহলে কোথায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন আমায়?

— চাচা শরীলডা ভালা নাই, আইজকা যাইতাম না।
— ভাতিজা এইডা হইবো না। তুমি প্রত্যেকবার শরীল খারাফের অজুহাত দিয়া বইয়া থাকো। আইজকা যাইতেই অইবো।

চাচার কথায় এবার আমি কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলাম। এর আগেও উনি আমাকে কোথায় যেতে বলেছিলেন? যতদূর মনে পড়ে এর আগে একবার তিনি আমায় তার এক আত্মিয়ের বিয়ের দাওয়াতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। দূর্ভাগ্যক্রমে সেদিন আমার লুজ মোশন হয়েছিল। তাই আমি না বলে দিয়েছিলাম। নিশ্চয়ই আজকেও চাচা আমাকে কোন দাওয়াতে নিয়ে যেতে চাইছেন।
— আইচ্ছা চাচা এত কইরা যহন কইতাছেন তহন না গেলে তো কইবেন পোলা বেদ্দপ। আমি যামু, কহন যাইতে হইবো হেইডা কন।
— আহো ভাতিজা বুকে আহো। তোমার লগে একটু কোলাকুলি করি।
এই কথা শুনে দিলু চাচার সামনে থেকে একটু সরে গেলাম। উনার এই বিশাল বপু দিয়ে যদি আমাকে জড়িয়ে ধরে হালকা চাপ দেন তাহলে আমার এই পাখির পালকের মত পাতলা শরীর নিমিষেই ছাতু হয়ে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

— নাহ চাচা লাগতো না। তয় আমি যাইয়া রেডি হই।
— যাও যাও, তার আগে একটু খাড়াও। তোমার লগে কিছু কথা আছে।
— কইয়া ফালান।

দিলু চাচা আমার কাছে ঘেষলেন। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। এই বুঝি কোলাকুলি শুরু করে দিলেন। ভয়ে আমার হৃদপিন্ড ইতিমধ্যে লুঙ্গি ড্যান্স দিতে শুরু করে দিয়েছে। দিলু চাচা আমার আরো কাছে চলে এলেন। তারপর আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন,

— ভাতিজা আর কেউ যদি তার সাথে তোমারে নিতে চায় তাইলে তুমি যাইবা না। তুমি শুধু আমার লগেই যাইবা।
— আইচ্ছা চাচা।
— আর এই লও, এইটা রাখো। পারলে আরো কয়ডা পোলাপাইন লইয়া লও। বোঝোই তো বিরাট কারবার।দিলু চাচা আমার হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে তার প্রমাণ সাইজের ভুঁড়িতে তবলা বাজাতে বাজাতে খালের উপর দেয়া সাঁকো বেয়ে ওপাড়ে চলে গেলেন। আর আমি মফিজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। টাকা দেয়ার কারন কি? দাওয়াত খেতে নেয়ার জন্য আবার টাকা দেয়া লাগে নাকি?

নোটটা পকেটে ভরে আমি হাঁটতে লাগলাম। চাচা বলেছে আরো কয়েকজনকে নিয়ে নিতে। নিশ্চয়ই বিরাট বড় কোন দাওয়াত আছে আজ। আমি চা দোকানে বসে ফোন করে আমার প্রায় সব বন্ধুকে নিয়ে আসলাম। সব মিলিয়ে বিশজন হবে।

— আবির ভাই, আপনেও আজকে দিলু চাচার লগে যাইবেন? আপনে তো কোনদিন যান নাই।
চা দোকানদার কালামের কথায় আমি মুচকি হাসলাম। সেদিন তো পেট খারাপ ছিল তাই যাইনি। আজকে তো আমি পুরো সুস্থ। আজকে একেবারে কব্জি ডুবিয়ে দাওয়াত খাবো।
বন্ধুদের বলে দিলাম দুপুর একটার মধ্যে ভাল কাপড়চোপড় পরে দিলু চাচার বাড়ির সামনের মাঠে থাকতে। আজ জমিয়ে পোলাও কোরমা খাওয়া হবে। বন্ধুরা সবাই খুশি হয়ে চলে গেল। আমিও খুশি হয়ে দিলু চাচার বাড়ির সামনে চলে আসলাম।
— চাচা পোলাপাইন তো হইয়া গেছে অনেক।
— কতজন হইবো?
— বিশজন তো হইবোই। বেশিও হইতে পারে।
— ও আইচ্ছা। এই লও এইটা রাখো। একটার মধ্যে সবগুলারে নিয়া এই মাঠে খাড়াইবা। বোঝনাই ব্যাপারটা? বড় কাজকারবার শুরু হইয়া যাইবো।
আমার হাতে দুইহাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে দিলু চাচা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। একটু পরেই ঘরের ভেতর থেকে শব্দ এলো,
— হ্যালো মোবারক ভাই। আমি তো পঞ্চাশজন লইয়া আইতাছি। আপনে কয়জন লইবেন?
এবার ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকলো। নিশ্চয়ই কোন বড়লোকের মেয়ে বা ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। অনেক খাবারের আয়োজন করা হয়েছে কিন্তু খাওয়ার লোক নেই। তাই হয়তো এভাবে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক জোগাড় করে নিয়ে যাচ্ছে। আমি তো মনে মনে বেজায় খুশি।
একটার আগেই আমার প্রায় সব বন্ধু এসে গেল। আমরা সবাই অপেক্ষায় আছি দিলু চাচার। কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরই দিলু চাচা আসলেন।
— মাশাল্লাহ! তোমাগোরে দেইখা আমার কইলজাডা ঠান্ডা হইয়া গেছে। এত পালোয়ান টাইপের পোলাপাইন থাকলে আমার আর চিন্তা কি? চলো ভাতিজা রওনা দেই।
সবার সামনে দিলু চাচা, তার পেছনে আমি আর আমার পেছনে বাকি সবাই। আমরা রওনা হয়ে গেলাম দাওয়াতের উদ্দেশ্যে।
মেইন রাস্তায় উঠেই আমার চক্ষু চড়কগাছ। আমাদের বয়সী অনেক ছেলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। লেগুনার পর লেগুনা বোঝাই ছেলেরা যাচ্ছে দ্বীনইসলাম চত্বরের দিকে। বুঝতে পারলাম সবাই খবর পেয়ে গেছে।
এখন আমার মাথায় একটাই চিন্তা, খাবার পাবো তো? নাকি শেষ হয়ে যাবে সব?
তো দিলু চাচার কথা অনুযায়ি দুইটা লেগুনা নিলাম। তারপর রওনা দিলাম দাওয়াতের কেন্দ্রস্থলের উদ্দেশ্যে। আমরা যেদিকে যাচ্ছি সেদিকে অনেক ছেলে ছোকরা যাচ্ছে। ব্যাপারটা আমার কাছে একটু সন্দেহজনক মনে হলো। সন্দেহকে উড়িয়ে দিয়ে চেপে বসে রইলাম।
বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পর কানে ভেসে এলো মাইকের মৃদু শব্দ,
— আসিতেছে আপনার আমার সকলের প্রান প্রিয় নেতা আবুল আলী।
মনে মনে কিছুটা রেগে গেলাম। এইসব নেতাদের কি দরকার দাওয়াত দেয়ার? এইসব নেতারা আসলে তাদের সাথে চ্যালাচামুন্ডাও চলে আসে। আমি সিউর আজ খাবারে টান পড়বে।
— চাচা আগে যাইতে পারমু তো?
— আরে ভাতিজা আগে যামু মানে? এক্কেবারে সামনে যাইয়া দাঁড়ামু।
— আইচ্ছা।
অবশেষে আমরা দ্বীনইসলাম চত্বরের সামনে এসে নেমে পড়লাম লেগুনা থেকে। অনেক মানুষের ভীড়। বেশিরভাগই আমার বয়সী। রাস্তায় পুরো জ্যাম লেগে গেছে। তবে মোটেও গাড়ীর জ্যাম নয়, মানুষের জ্যাম। আমরা সবাই ধীরে ধীরে এগুতে লাগলাম সামনের দিকে।
— চাচা খাওন দিবো কোনসময়? ক্ষিদা লাগছে খুব।
— খাওন দিবো কেন? এই জনসভায় তোমারে কেডায় খাওন দিবো ভাতিজা? টেকা দিছিনা তোমাগো? এই টেকা দিয়া বিরানি খাইবা। এইবার স্লোগান ধরো। ” আবুল ভাই জিন্দাবাদ”

সাথে সাথে আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে সবাই একসাথে স্লোগান দিয়ে উঠলো। আরেকটু এগিয়ে দেখলাম একটা বিশাল বড় মঞ্চে ভূড়ি ভাসিয়ে বসে আছেন একজন লোক। পান চিবুচ্ছেন, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে জাবর কাটছেন। বেঁটে একজন লোক মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

— ভাইসব এখন আপনার আমার প্রিয় নেতা যার জন্য আপনারা এত অধির অাগ্রহে বসে আছেন সেই আবুল আলী ভাই বক্তব্য পেশ করবেন।
আবার সমস্বরে ” আবুল ভাই জিন্দাবাদ” স্লোগান উঠলো। নেতা সাহেব জ্বালাময়ী ভাষন দিচ্ছেন আর আমি শুনছি। বুঝতে পারলাম এই জনসভায় আসার প্রস্তাবটাকে আমি দাওয়াতে যাওয়ার প্রস্তাব ভেবে ভুল করেছিলাম। কিন্তু এখানে যে লাখো লাখো লোক দাঁড়িয়ে আছে তারাও কি আমার মত ভুল করেছিল?
— চাচা এই সবাই কি এমনে এমনে আইছে?
— আরে নাহ। দেখোস না সবগুলান তোর বয়সী? এইগুলান রাজনীতির কি বোঝে? তুই যেমন টেকার লাইগা আইছোস এগুলারেও টেকা দিয়া আনছে।
— কে আনছে চাচা?
— নেতা নিজেই আনছে।
— কিন্তু কেন?
— যার সভায় যত বেশি লোক হইবো সে তত বেশি পপুলার। বোঝোস নাই ব্যাপারটা?

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত