সেই ছেলেটা

সেই ছেলেটা

ছেলেটা কে প্রতিদিন দেখি ঠিক একি সময়ে পাড়ার দোকানটাতে আসতে। এসেই যে পথে আসলো সেই পথের দিকে তাকিয়ে দোকানদারের থেকে একটা সিগারেট নিয়ে আবার আশে পাশে তাকিয়ে ঝুলত্ব দেশালয় থেকে সিগারেট টা ধরিয়ে দোকানের পিছনে গিয়ে মোবাইলটা বের করে টিপে আর একটু পর পর সিগারেটে টান দেয়।

ছেলেটা মনে হয় পাড়ায় নতুন এসেছে। এই দোকানে অনেক ছেলেই আসে। কিন্তু সবারই একটা করে গুন লক্ষ করি যা ছেলেটার মধ্যে নেই। আর সেটা হলো আশেপাশের ছাদে উকি দেওয়া। কয়েকদিন থেকে বেশ একটা জিনিস লক্ষ করি তা হলো তার কাধের গিটারটার দিকে। সিগারেট অর্ধেক খেয়ে ফেলে দিলে খোলা মাঠের দিকে যায়। গিয়ে একটা কলম আর ডাইরি বের করে গিটার টা কাধ থেকে নামিয়ে বাজায় আর খাতায় কি যেন লেখে। সূর্য ডোবার একটু আগেই আবার একটা সিগারেট নিয়ে টানতে টানতে চলে যায়।

আমি নীলু। এই পাড়াই অনেক আগে থেকেই বাবার চাকরির সুবাধে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। আর বিকালে বাসার ছাদে গিয়ে চারিপাশের মানুষগুলোকে দেখাই একমাএ কাজ। কিন্তু ছেলেটিকে যেইদিন থেকে দেখেছি অন্য মানুষগুলোর কর্মকান্ড খুব একটা দেখা হয় না দেখি ছেলেটাকে। বেশ ভালোই লাগে। ছেলেটা চলে গেলেই আবার বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ হই। এই আমার জীবন।

একদিন কলেজে গিয়ে দেখলাম সেই ছেলেটা। কাধে গিটার খোচা খোচা দাড়ি চুলগুলো উস্কখুস্ক। বাব্বাহ্ গিটার থাকে সব সময়? নাহ্ এটা একটা ভালো দিক। আরে ছেলেটা আবার কই গেলো এখানেই তো বসে ছিলো। আশেপাশে দেখতেই নজর পড়লো মাঠের দিকে সেই একি কাজ করছে। ছেলেটাকে দেখেই কাছে গেলাম। কাছে যেতেই উঠে দাড়ালো বসা থেকে।

– আরে আরে উঠছেন কেন?
– নাহ্ মনে হলো আপনি বসবেন তাই।
– তাই বলে উঠে যাবেন?
ছেলেটা কোন কথা না বলে বসে রইলো।
– কি একা থাকতে ভালো লাগে?
– জ্বি অনেকটাই।
– আমি এসে কি বিরক্ত করলাম?
– নাহ্ নাহ্।
– হুমমমম পাড়ার দোকানটাই প্রতিদিন কেন যান?
কোন কথা না বলে চুপ করে আছে।
– পাড়ায় কি নতুন নাকি?
– হুমমম এই মাসেই এসেছি।
– বেশি সিগারেট খাওয়া ভালো না বুঝলেন!
ওকে দেখে মনে হলো এই কথাটা হয়তো আশা করে নি।
– না না আমি তো বেশি খাই না বিকালে একটু খাই।
– হুমমম ক্লাশ নেই?
– আছে তবে এখন না পড়ে।
– কোন ডিপার্টমেন্ট?
– বাংলা।
– কোন বর্ষ?
– ২য়।
– ও আমি নীলু আপনি?
– জ্বি?
– নাম কি?
– নীল।
– বাহ্ আমি নীলু আর ওমনি আপনি নীল হয়ে গেলেন?
– না আসলে এটাই তো আমার নাম।
– আজকে যাবেন?
– কোথায়? (আমার দিকে তাকিয়ে বললো)
– প্রতিদিন যেখানে যান সেখানে।
– হুমমম যাবো তো শহরের মাঝে ওমন জায়গা খুজে পাই না তো তাই আরকি।
– ওকে তখন দেখা হবে।

বলেই চলে আসলাম। কি ছেলেরে বাবা কথা বলতেও জানে না ভাব নাকি অাসলেই কম কথা বলে কোনটা? নাহ্ ভাব না হয় তো ২য় টাই হবে।এতোদিনে তো তেমন কিছু লক্ষ করলাম না। বিকালে ছাদে বসে আছি। মোবাইলের স্কিনে সময়টা দেখলাম। কি ব্যাপার আজকে আসছে না কেন এতোক্ষনে? তাইলে কি আসবে না? কলেজে কথা বলে আবার ভুল করলাম না তো? সৃর্য ডুবতে চলেছে গিটারিস্টের কোন খবর নেই বাধ্য হয়ে নিচে চলে গেলাম।

কলেজেও দেখলাম না। ক্লাশ চলছে।
“স্যার আসবো? ”
কথাটা শুনে সবাই দড়জার দিকে তাকালো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৩০ মিনিট দেরি। স্যার একটু বিরক্তই হলো মনে হয়। স্যারের মুখে বিরক্তির ছাপ।
“হুমমম আসো ”
মাথা নিচু করে ক্লাশে ডুকতেই স্যার ডাক দিলো।
– এই ছেলে শোন?
– জ্বি স্যার।
– এত্র দেরি কেন?
– আসলে গিটারটার একটা তার কালকে ছোট ভাই ছিড়ে ফেলেছিলো তাই ঠিক করতে দেরি হয়ে গেলো।
ও তাইলে এই জন্যই কালকে যায় নি? আরে আজব ছেলে তো গিটার ছাড়া কি যাওয়া যায় না নাকি হু?
– গিটার?
– জ্বি।
– কই দেখি
ছেলেটা গিটার এগিয়ে দিলো।
– বাজাতে পারো?
স্যারের বোকামো দেখে সবাই হেসে উঠলো আর স্যারও বুঝতে পারলো তার বোকামি টা।
– আচ্ছা বাজাও তো দেখি।
– স্যার দেখতে পারবেন না তো শুনতে পারবেন
– ওই হলোই শুনাও।

ছেলেটা আমতা আমতা করে কাধ থেকে গিটার নামিয়ে তারে একটা ডুঙ্গকার দিলো। সাথে সাথে গায়ে একটা ঝাকি দিলো আমার। ছেলেটা বাজাচ্ছে সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে। সবার চোখ ছেলেটার দিকে। মনে হয় সবাই থ মেরে গেছে। দেখো দেখো ফাজিল মেয়ে গুলো কেমন করেতাকিয়ে আছে মনে হয় গিলে ফেলবে। মনে হচ্ছে মাথাটা ফাটাই সবার হু।

এই রে ওর দিকে তাকালে আমার কি? আমার বর লাগে নাকি হু? হি হি মনে মনে হেসে দিলাম। বাজানো শেষ সবাই চুপ করে আছে।
– নাম কি?
ছেলেটার দিকে তাকিয়ে স্যার বললো,
– নীল।
উহ্ আমাকে কে চিমটি কাটলো? পিছনে তাকিয়ে দেখি তাহসিন।
“তোর নীল ”
“আমার? ”
” নাহ্ নামের বেশ মিল তো হি হি হি।”

শয়তান একটা। খালি ফাজলামি।

– তো আগে পিছে কিছু আছে নাকি শুধুই নীল?
– সজীব মাহমুদ নীল।
– হুমমমম যাও আর শোন শোন
পিছনে তাকিয়ে বললো,
– জ্বি!
– নতুন?
– জ্বি স্যার কালকে ভর্তি হয়েছি।
– হুমমমম ক্লাশ করো আর দেরি করো না যেন।

মাথা নাড়িয়ে চলে আসলো। পিছনের ফাকা সিটে বসে পড়লো। আরে আমার পাশে একটা ফাকা সিট থাকতে পিছনে কেন বসতে হবে? গায়ে কি গন্ধ নাকি হু? এই দেখো দেখো ফাজিল মেয়ে গুলো পিছনে তাকিয়ে কেমন করে দেখছে ইচ্ছা করছে চুল কেটে দিই। ক্লাশ শেষে বাইরে যেতেই শুনলাম কয়েকটা মেয়ে ওকে নিয়ে কথা বলছে। কেমন যেন একটা রাগ হলো। একটা মেয়ে বলছে, ইশ যদি ওর সাথে প্রেম করতে পারতাম গিটার টা সারাদিন শুনতাম। নানান জনে নানান কথা বলছে মাথা তো পুরাই হিট।
রাগে ওদের কাছে গেলাম।

– এই কি হচ্ছো শুনি?
– কেন রে নীল কে নিয়ে কথা বলছি।
– কথা বল তবে চোখ দিবি না হু।
– চোখ কি মন দিয়েছে ( পাশ থেকে আরেকটা মেয়ে বললো)
– এই যে সে আমার বর বুঝলি সাবধান।
– তোর বর? কই আমরা তো জানি না।
– তো তোমাদের জানাতে কি করতে হবে? ঢোল দিবো নাকি? যত্তসব!

হুড়হুড় করে চলে আসলাম। এই রে কি বললাম কি লজ্জা কি লজ্জা।
মৃখটে মনে হয় লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। হি হি হি। বাসায় এসে সময় দেখছি বার বার বিকালের অপেক্ষায়। আরে আজকে বিকাল এতো পর কেন হচ্ছে? ভাল্লাগে না হু। ছাদে গিয়ে দেখলাম ছেলেটা আসছে তো? কই নি তো আসে নি আরে এখন আসে নাকি আসে তো সেই বিকালে। আচ্ছা একটু আগে পথ ভুল করে আসলে কি হয়? বিছানায় এইপাশ ঐ পাশ করতে করতে ঘুম চলে আসলো। ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠলাম। এই রে মেনে হয় ছেলেটা চলেই গেলো। দৌড়ে গেলাম ছাদে।

ওর আশার পথের দিকে তাকাতেই দেখলাম আসছে। দোকানে আসলো প্রতিদিনের মত। একি আজকে পিছনে ছেলেগুলো কে? কে ডেকে নিলো, কি কথা বলছে? ওকে আবার কিছু বলছে না তো? একটা ছেলে ওর কলার ধরলো। বুঝলাম প্রতিদিন আসার কারনে হয় তো। দৌড়ে নিচে গেলাম। আমাকে দেখেই ছেলেটা ওর কলার ছেড়ে দিলো। নীল মাটির দিকে তাকিয়ে আছে।

– কি হইছে ওকে এমন করছো কেন সাগর?
– দেখো না প্রতিদিন আসে এখানে!
– তাতে কি হইছে তোদের কোন কিছু করছে?
– না তা নয় তবে প্রতিদিন আসে তাই…..
– আমিই আসতে বলছি।
কথাটা শুনে নীল আমার দিকে তাকালো।
– তুমি কেন? (সাগর)
– আমার বর লাগে তাই।
– কি বলো আগে তো জানি না।
– আগে জানো নে এখন জানলে তো। তোমাদের কোন কাজ আছে?
– নাহ্
– তো যাও।

চলে গেলো। পিছনে তাকিয়ে দেখি নীলও যাচ্ছে।

– একি তুমি কই যাও?
– না আর আসবো না।
– কেন?
– ওই তো ছেলেগুলো।
– ওদের কি বললাম শুনো নি?
– হুমমমম কিন্তু সেটা তো আমাকে বাঁচানোর জন্য।
– হলে হবে। তুমি আসবা আর যদি না আসো তো ওই ঝোড়টা দেখছো?
ওকে দেখিয়ে বললাম।
– হুমম
– ওই খানে নিয়ে গিয়ে রেপ করে দিবো হি হি।
ধুর কি বলি এই সব আমার মুখে কি কিছুই আটকায় না নাকি?
-চলো বসি।
– কোথায়?
– প্রতিদিন যেখানে বসো সেইখানে।
– কিন্ত…
– আবার কথা বলে ঝোড় টা দেখো নি?

চুপ হয়ে গেলো। ওর হাত ধরবো নাকি? নাহ্ নাহ্ আমার বুঝি লজ্জা নেই হু?
নাহ্ ধরিই। বলেই হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলাম। আরে হাতটা এতো গরম কেন? বসেই বললাম বাজাও।

– হাতটা।

এই রে এখানো ধরে আছি? কি লজ্জা কি লজ্জা! হাতটা ছেড়ে দিলাম।
বাজাচ্ছে। মুগ্ধ হয়ে শুনছি। আজান? এতো তারাতারি? ইশ রে কত তারাতারি হয়ে গেলো সন্ধ্যা ধুর ভাল্লাগে না। বাসায় চলে আসলাম।

একি ছেলেটা আমার ক্লাশে নেই কেন? বাহ্ বেশ কয়দিনই আসলো না আর আমাদের বাসার সামনেও আসে না তাইলে কি রেপ হওয়া ভয়ে নাকি?সে কি জানে না তারে না দেখলে ভালো লাগে না। ক্লাশে বসে আছি কয়েকদিন ওর দেখা নেই। হঠাৎ দেখলাম ক্লাশে ডুকছে। দৌড়ে গেলাম।

– একি এতো দিন কই ছিলো হু? আমার কথা মনে পড়ে না? তুমি জানো না তোমারে খুব মিস করি? কানের নিচে একটা দিবো।
– আসলে সিলেট গেছিলাম।
– কেন?
– প্রোগ্রাম ছিলো তো তাই।
– তাইলে আমারে বললে না কেন?

দেখো কেমন করে ডেপডেপ তাকিয়ে আছে! আমার বুঝি লজ্জা করে না?
আজকেই ভালোবাসি বলে দিবো নাকি? নাহ্ নাহ্ আমি তো মেয়ে আমার তো লজ্জা আছে।

– ওই ভালোবাসি বলো।
– কেন?
– যা বলতে বলছি বলো নাহলে ওই ঝোপে কি করবো মনে আছে?
– কি?
– রেপ করবো রেপ তারপর ৭দিন হাসপাতালে হু। কি হলো বলো “ভালোবাসি ”
– ওকে, ভালোবাস্‌ এবার।
– এবার মানে জড়িয়ে ধরো। বুঝলাম লজ্জা করছে। ইশ কি লজ্জা বতী রে। ওকে আমিই ধরছি।

– কি হলো শক্ত করে ধরো।

শক্ত করে ধরলো। আর এই যে আপনারা হ্যা এই দিক ওইদিক না তাকিয়ে শুনুন, আমাদের দিকে কেন তাকিয়ে আছেন হুু? আমার বুঝি লজ্জা করে না হু?

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত