‘মণিহারা’-র তিন দর্শক

‘মণিহারা’-র তিন দর্শক

ভূতের গল্প শুনতে তো আমরা সব্বাই খুউউব ভালবাসি, তাই না? আর তারপর যদি বলি – এটা সত্যি ভূতের গল্প? যদি বলি, এ আমার নিজের জীবনের ঘটনা? তাহলে তো ব্যাপারটা দারুণ জমে যাবে! আমি বেশ বুঝতে পারছি আমার ছোট্ট বন্ধুরা গোলগোল চোখে গপ্পো শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। তাই আর দেরি না করে বলেই ফেলি…
সেদিন ছিল পঁচিশে বৈশাখ; আমাদের সবার প্রিয় কবিগুরুর জন্মদিন। সেই উপলক্ষে বিকেলবেলা দূরদর্শনের বাংলা চ্যানেলে দেখানো হচ্ছিল সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ছবি – “তিন কন্যা”। সেই সময় টিভিতে কেবল লাইন চালু হয়ে গেছিল বটে, কিন্তু তাই বলে দূরদর্শন চ্যানেলগুলো এমনভাবে বাতিল হয়ে যায়নি। তাই সেদিন অনেকের ঘরেই রবীন্দ্রনাথের তিনটি ছোটগল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটা চলছিল।

প্রথম গল্প ‘পোস্টমাস্টার’ শেষ হয়ে যখন ‘মণিহারা’ শুরু হল, তখন বাইরে হাল্কা ঝড়ের সঙ্গে বেশ ঝিরঝির করে বৃষ্টিও পড়ছিল; ভূতের ছবি দেখার এমন উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে আরোই বেশি করে এনজয় করছিলাম। কিন্তু এই ছবি শেষ হওয়ার ঠিক পরেই খেয়াল করলাম পৌনে সাতটা বেজে গেছে। আমাকে টিউশন পড়তে যেতে হবে স্যারের বাড়িতে। এবার আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছ বন্ধুরা? ওরকম গা-ছমছমে সিনেমা দেখার পর কি আর সঙ্গে সঙ্গে বাইরে যাওয়া যায়? কিন্তু কোনও উপায় নেই… ক্লাস টুয়েলভে পড়ি তখন… টিউশন কামাই করলে মা, বাবা এবং স্যার তিনজনে বকুনি দিয়ে আমাকেই ভূত করে দেবেন। অগত্যা, জামাকাপড় বদলে বইয়ের ব্যাগ কাঁধে বেড়িয়ে পড়লাম।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখা হয়ে গেল আমার আরও দুই বন্ধু প্রতিমা এবং জয়তীর সঙ্গে। ওরাও আমার ব্যাচেই পড়তে যাচ্ছে। তাই তিনবন্ধু মিলে বেশ গল্প করতে করতে চললাম। প্রায় মিনিট দশেক হাঁটলে আমরা স্যারের বাড়ি পৌঁছব।
যেতে যেতে প্রতিমা বেশ ভয় পাওয়া গলায় বলল -“জানিস, আমি এতক্ষণ ‘মণিহারা’ দেখছিলাম। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা কী দারুণ ছিল বল… ওই ঝুম ঝুম শব্দটা পুরো আমার কানে লেগে রয়েছে। এখনও মনে হচ্ছে দূর থেকে যেন ভেসে আসছে… আমি শুনতে পাচ্ছি…”

“ঠিক বলেছিস ভাই”, জয়তী বলে ওঠে, “শুধু কি মিউজিক? ওই কঙ্কালের হাত যখন ছিটকে এসে গয়নাটা কেড়ে নিল তখন? আর তার সঙ্গে সেই হিঁ হিঁ করে হাসি! উঃ! দেখ দেখ কথাটা বলতেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে’’, জয়তী একটা হাত বাড়িয়ে ধরল আমাদের চোখের সামনে।

আমি বললাম- “আজ একদম বেরোতে ইচ্ছে করছিল না রে। রাস্তাটা দেখ… কেমন অন্ধকার! লাইটপোস্টের সবকটা আলো কিন্তু জ্বলছে না। দুপাশে গাছগুলো কেমন দুলছে; মনে হচ্ছে ওরা আমাদের কথা শুনে হাসছে!”
জয়তী বলল- “গল্পটা যখন বইয়ে পড়েছিলাম, তখন কিন্তু ভয় লাগেনি। এখন সিনেমা দেখে ভয় লেগেছে।”
আমি বললাম- “একদম তাই। শুধু ভূতের সিন নয়… গোটা ছবিতেই যেন একটা ভয় ছড়িয়ে ছিল। সেই যে… মণি যখন গায়ের চাদর সরিয়ে বল্ল- ‘স-অ-অ-ব গয়না পরে নিয়েছি…’ তখনই তো ভয়ে আমার গা…”

আমি এতক্ষণ পাশে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলাম; হঠাৎ কী ভেবে সামনে তাকাতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে মুখের কথাটা আর শেষ করতে পারলাম না। অন্ধকার রাস্তায় আমাদের থেকে কিছুটা দূর থেকে এক শাড়িপরা মেয়ে বেশ দ্রুতপায়ে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে! ঠিক সেই সময় আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকে উঠল আর আমি স্পষ্ট দেখলাম- মেয়েটার হাতে, গলায়, মাথায়, কোমরে ঝকমক করছে গয়না! হ্যাঁ! গয়না! গা ভর্তি গয়না! কে ও? এখানে কী করতে এসেছে?

সময়টা হয়ত এক মিনিটের চেয়েও কম! কিন্তু তার মধ্যেই টের পেলাম – গলা শুকিয়ে এসেছে; হৃদপিণ্ডটা দপদপ করতে করতে বুঝি এক্ষুনি ফেটে যাবে! পাশে যে আমার দুই বন্ধু রয়েছে, তাও ভুলে গেছি। মনে হচ্ছে এক-সমুদ্র অন্ধকারের মধ্যে আমি একেবারে একা আর আমার সামনে ঐ এক গা গয়না পরা মেয়েটা! আর কোথাও কেউ নেই… কেউ নেই!

আর কিছুক্ষণ ঐ অবস্থায় থাকলে হয়ত চেঁচিয়েই ফেলতাম। কিন্তু আমার সব ভয় দূর করে একটা মিষ্টি গলার আওয়াজ যেন অনেকদূর থেকে ভেসে এল- “ও দিদি… আমাকে সুন্দর লাগছে?”

এবার পুরোপুরি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমাদেরই পাড়ার ছোট্ট মেয়ে পিউ! পরনে লাল শাড়ি; গাঁদা আর জুঁই -এর মালা দিয়ে কী সুন্দর গয়না পরেছে! একদম রাজকন্যার মতো লাগছে।

এবার ব্যাপারটা জলের মতো সোজা হয়ে এল আমার কাছে। আজ কবিগুরুর জন্মতিথি উপলক্ষে পাড়ার ক্লাবে বাচ্চাদের নাচ-গান-কবিতার একটা অনুষ্ঠান আছে। সেজেগুজে সেখানেই নাচ করতে যাচ্ছে পাঁচ বছরের পিউ। সঙ্গে ওর মাও রয়েছেন। আমাদের আসতে দেখে ও মায়ের হাত ছাড়িয়ে একাই দৌড়ে চলে এসেছিল আমাদেরকে ওর এই সুন্দর সাজ দেখাতে। ওর মাকে এবার দেখতে পেলাম এইদিকেই আসছেন।

নিজেকে তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে পিউকে আদর করলাম। অনেক শুভেচ্ছা জানালাম যাতে ওর নাচ ভালো হয়। আমার দুই বন্ধুও পিউকে খুব ভালো করেই চেনে। ওরাও অনেক আদর করল।

মায়ের হাত ধরে পিউ যখন একটু দূরে চলে গেল, তখন বেশ চাপা স্বরে প্রতিমা বলল- “খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম জানিস? মণির গায়ের সেই গয়নার কথাই তো তখন বলছিলাম আমরা! আর তখনি অন্ধকারে পিউ এর ওই শাড়ি আর ফুলের গয়না! বাবারে বাবা!” বলতে বলতেই হো হো করে হেসে ফেলে প্রতিমা।

“ভয় টয় পেয়ে যদি কিছু একটা করে বসতাম, প্রেস্টিজের পুরো বারটা বেজে যেত ভাই!” জয়তীও হেসে প্রায় গড়িয়ে পড়ল।

আমি তাড়া দিয়ে বললাম- “খুব হয়েছে; এবার চল দেখি… দেরি হয়ে যাচ্ছে। আর হ্যাঁ, ভয়টা আমিও কিছু কম পাইনি বাপু!”
তিনজনেই এবার একসাথে হেসে উঠলাম।

তোমরাও নিশ্চয়ই খুব হাসছ, তাই না বন্ধুরা? হাসির-ই তো কথা। আসলে ভূত বলে কিছু হয় না। অন্ধকার আর তার সঙ্গে মনের একটা বিশেষ অনুভূতি একসাথে মিশলে আমরা ভয় পাই, চোখে ভুলভাল দেখি। তাই ভূতের গপ্পো যখন পড়বে বা ভূতের সিনেমা দেখবে, তখন আনন্দ করে পড়বে বা দেখবে। মোটেই ভয় পাবে না, কেমন?

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত