আমার কাজলদি

আমার কাজলদি

আমাদের বাসায় দুটি দরজা আছে , একটি সদর দরজা আরেকটি পেছনের । পেছনের দরজাটা ইমার্জেন্সি ছাড়া খোলা নিষেধ । ইমার্জেন্সি দরজা অবশ্য খোলা হয়েছে কয়েকবার এবং বাবাই এটা নিজ হাতে খুলতেন এবং আমার হাত ধরে আলতো করে দরজার বাহিরে বসিয়ে রেখে আসতেন ।আমাদের পরিবার বেশ সাদামাঠা , বাবা সরকারি চাকুরিজিবী । মা একজন নিষ্ঠাবান গৃহিণী বলতে যা বোঝায় তাই । আমরা দু’বোন , কোনো ভাই নেই । এ নিয়ে অবশ্য বাবা মায়ের কোন আফসোস ছিলোনা । তবে ইদানীং তিনারা কাজলদি কে নিয়ে বেশ চিন্তিত । আমরা একই মায়ের পেটের দু’বোন অথচ গায়ের রং আকাশ পাতাল তফাত । কাজলদি কালো বলে মা আদর করে তার নাম রেখেছিলো কাজল । কাজলদির গায়ের রঙের সাথে নামের মিলটা বেশ সুন্দর অথচ আমার রঙের সাথে নামের কোনো মিল নেই। আমি বেশ ধবধবে ফর্সা , অথচ আমার নাম রাত্রী । এটা কোনো কথা হলো !

সবাই আমাকে শিখিয়েছিলো কাজল আপু ডাকতে কিন্তু ,
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ
মাগো আমার শোলক বলার কাজলা দিদি কই ,

এই কবিতাটি পড়ার পর থেকেই কাজল আপুকে কাজলদি বলেই ডাকি , ডাকটা আমার বেশ পছন্দ ।
কাজলদিও পছন্দ করে !!

আজ ইমার্জেন্সি দরজাটা খোলা হয়েছে , বাবা নিজ হাতে খুলে আমার হাত ধরে দরজার সামনে বসিয়ে বললেন , বেশিক্ষন লাগবেনা হয়তো , ওদের নাস্তা করতে যতটুকু সময় লাগবে ততটুকু সময় তুই এখানেই চুপটি করে বসে থাকবি । তবে মনে হচ্ছে এবারের নাস্তার টাকাটাও জলে যাবে , কাজলকে হয়তো ওরা পছন্দ করবেনা । এ নিয়ে পনেরোবার হবে , আমার কাজল মাকে যে আর কত পরীক্ষা দিতে হবে তা কে জানে !!

বাবার শেষের কথাগুলির সাথে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো । আমি একটু হেসে বাবাকে বললাম , ধৈর্য ধরো বাবা ধৈর্যের ফল মিঠা হয় । দেখো একদিন এক রাজকুমার আসবে আমার কাজলদির জন্য ।

আমার কথা শুনে বাবা কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বললো , তাই যেনো হয় মা , আর যেদিন সেই রাজকুমার আসবে আমার কাজলকে নিতে সেদিন যেনো তোকে এভাবে লুকিয়ে থাকতে নাহয় । কথাগুলি বলেই বাবা দ্রুত ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দিলেন । বাবার চোখের কোনে একফোঁটা জল দেখতে পেয়েছিলাম যা আমার চোখেও আক্রমন করলো । আপনজনদের চোখের জল হলো ছোঁয়াচে , একজনের চোখ থেকে অন্যজনের চোখে ছড়িয়ে পরে ।

আজ আমার কাজলদি কে দেখতে এসেছে , প্রথম প্রথম আমি কাজলদির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম কিন্তু ছেলে পক্ষ ফিরে গিয়ে যখন খবর পাঠাতো যে আপনার বড় কন্যাকে নয় ছোট কন্যাকে পছন্দ হয়েছে তখন খুব কষ্ট হতো । কাজলদি মুচকি হেসে আলতো করে চোখের কোন মুছে ফেলতো । বাবা মার চেহারাতেও কালো মেঘেরা এসে ভীর করতো ।

এরপর থেকেই আমাকে বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হতো অথবা পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দেওয়া হতো ।
আমাদের পেছনের দরজা একটি গলির ঠিক মাঝ বরাবর । তবে গলিটায় লোকজনের যাতায়াত অনেকটা কম ।
মাথা নিচু করে যখন চোখ মুছছিলাম হঠাৎ কারো কন্ঠস্বরে চমকে উঠলাম , মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখি শাহিন ভাই দাঁড়িয়ে আছে ।

শাহিন ভাই মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলেন , আজও কি কাজলকে দেখতে এসেছে ?
আমি মাথা উপরনিচ করে সাঁয় দিতেই তিনি আবারো মুচকি হেসে চলে গেলেন । আমি একদৃষ্টে তার চলে যাওয়া দেখছি । এই মানুষটি বড়ই অদ্ভুত !! কখনোই আগ বাড়িয়ে কথা বলেনা । কিছু জিজ্ঞাসা করলেই মুচকি হেসে জবাব দিয়ে সরে পরে । মাঝে মাঝে ভীষন রাগ লাগে আবার মাঝে মাঝে তার লাজুক হাসি দেখলেই মন ভালো হয়ে যায় । মনে হয় ঐ হাসিতে মায়া যেনো থৈ থৈ করছে ।

আমি মানুষটিকে ভীষণ পছন্দ করি , আমার স্বপ্নের রাজকুমার সে ।

শাহীন ভাইদের পরিবারের সাথে আমাদের পরিবারের বেশ সখ্যতা । তাদের বাসায় কিছু রান্না হলে আন্টি নিজে এসে দিয়ে যান আর আমাদের বাসায় কিছু রান্না হলে মা সবসময় কাজলদির হাতে পাঠান । আমি নিয়ে যেতে চাইলেও দেননা । মাঝে মাঝে মায়ের ওপর ভীষণ রাগ হয় । বলতে ইচ্ছে হয় , যতই ষড়যন্ত্র করোনা কেনো শাহীন ভাই তোমার কালো মেয়েকে পছন্দ করবেনা । কথাটি মনে আসতেই নিজেকেই ভীষণ বকি আমি । কাজলদিকে অনেক ভালোবাসি আমি ,এধরনের কথা মনে আসতেই নিজেকে বড্ড ছোটমনের মানুষ মনে হয় ।

একদিন কথার ছলে জিজ্ঞাসা করেছিলাম , আচ্ছা কাজলদি শাহীন ভাইকে তোমার কেমন লাগে , মানে তুমি কি শাহীন ভাইকে পছন্দ করো ?

কাজলদি তার ডাগর ডাগর চোখকে আরো বড় বানিয়ে রসগোল্লার মতো আমার দিকে তাকিয়ে বললো , তোর মাথা ঠিক আছে তো , নাকি গেছে ! কোথায় রাজ পুত্রের মতো দেখতে শাহীন ভাই আর কোথায় আমি !! কল্পনাতেও তাকে আমি আনিনা কারন আনলেই কষ্ট অনিবার্য !!

সেদিন বুক থেকে একটি বোঝা যেনো নেমে গিয়েছিলো । এবার আমি শাহীন ভাইকে নিয়ে নির্দ্বিধায় স্বপ্ন বুনতে পারবো ।

সেদিনও ছেলেপক্ষ জানিয়ে দিলো মেয়ে তাদের পছন্দ হয়নি । কাজলদি আর আগের মতো কষ্ট পায়না । বাবার কাছে অনুমতি চেয়েছে চাকরি করবে বলে । বাবাও মত দিলেন , হয়তো মেয়ের বিয়ে হবেনা ভেবে হাল ছেড়ে দিয়েছেন ।

সপ্তাহখানেক পর শাহীনভাই তার মাকে নিয়ে হাজির , দু’হাত ভর্তি মিষ্টি । শাহীন ভাই ঢাকায় চাকরি পেয়েছেন , সামনের মাসেই চলে যাবেন । যাবার আগে কাজলদিকে চাইতে এসেছেন।

আন্টি যখন মায়ের হাত ধরে বললেন , সই তোমার বড় মেয়েটিকে কি আমায় দেবে , আমার শাহীনের বউ করে নিতে চাই । তখন মায়ের চোখ খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠলো , বাবা বিস্ময়ে হা হয়ে রইলেন যেনো বিশ্বাস করতে পারছেননা । কাজলদি বসা থেকে উঠে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো । মুখ বেশ থমথমে হয়তো ভাবছে বিচ্ছিরি মজা চলছে এখানে । আর আমি ! আমার স্বপ্ন দিয়ে তৈরি রাজমহলটি যেনো এক নিমিষেই কাঁচের ঘরের মতো ভেঙে টুকরোটুকরো হয়ে গেলো । প্রচন্ড যন্ত্রণা হতে লাগলো যা কাউকে বলাও সম্ভব না । একটি মাত্র কথায় আমাদের চারজনের অনুভুতি চার রকম ভাবে অনুভুত হলো ।

আন্টি সবার চেহারার দিকে তাকিয়ে আবার বলে উঠলেন , কাজলকে আমার আর শাহীনের অনেক আগের থেকেই পছন্দ কিন্তু এমন গুনবতী সোনারটুকরো মেয়েকে যে চেয়ে নেবো সে সাহস হয়নি কারন সে যোগ্যতা আমার ছেলের ছিলোনা , আজ শাহীন চাকরি পেয়েছে তাই আজ সাহস করে এলাম , তোমার মেয়েটিকে দেবেনা সই ?
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন , রাত্রি মা, তুই বলেছিলিনা যে একদিন এক রাজপুত্র আসবে আমার কাজল মাকে নিতে , দেখ সে এসেছে আর তোকেও আজ আর বাহিরে দাড়াতে হলোনা !!
বাবাকে কি করে বলি , হ্যাঁ বাবা রাজপুত্র এসেছে নিতে যে কিনা আমার স্বপ্নের রাজপুত্র !!
কাজলদি লজ্জামিশ্রিত হাসি নিয়ে ছুটে রুমে চলে গেলো , বাবা মা হাসি মুখে মিষ্টি মুখ করতে ব্যস্ত ।

সবার আনন্দ দেখে , বিশেষ করে কাজলদির মুখে হাসি দেখে সকল কষ্ট ভুলে যেতে চাইলাম , এখন তো কষ্ট পাবার সময় নেই এখন আনন্দের সময় ,আমার কাজলদির বিয়ে এত্ত এত্ত কাজ করতে হবে আর আমি তো যথেষ্ট সুন্দরী আমার জন্য যে রাজকুমারের অভাব হবেনা

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত