বদল

বদল

“ওই যে তোমার লাটসাহেব রাজ্য জয় করে ফিরলেন বাড়ি।”
সোহমকে দরজা দিয়ে ঢুকতে দেখে রাগে গজগজ করতে করতে বললেন অবিনাশ বাবু। যার উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলা, অর্থাৎ সোহমের কোনো হেলদোল হল না কথাগুলো শুনে। আর ‘লাটসাহেবের’ মা তো রান্নাঘর থেকে বেরোলেনও না। যেমন কাজ করছিলেন তেমনই একমনে রুটি বেলে যেতে লাগলেন। কোলের উপর রাখা কাগজটা সপাৎ করে টি টেবিলের উপর ফেলে ইজিচেয়ার থেকে শরীরটা তুলে রান্নাঘরে এলেন অবিনাশ বাবু।

“কিগো, কিছু বলবে না তোমার গুণধর ছেলেকে ?”
“কি বলব ?” নিরুত্তাপ ভাবে উত্তর দিলেন নীলিমা দেবী।
“ঘড়িটা দেখেছ ? রাত দশটা ! একটা ক্লাস ইলেভেনে পড়া ছেলে এই সময় আড্ডা দিয়ে বাড়ি ঢোকে! সপ্তায় দু’দিন তিন দিন হচ্ছে এটা। বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি আমি।”
“কি করব বলো ! ছেলে বড় হয়েছে। বেশি কিছু বলতে গেলে যদি ওর ক্লাসের রাজার মত কিছু একটা”
“আরে রাখো তো ! ওই ভয়ে ভয়ে থাকলে তো কিছুই বলা যাবে না ! আজ রাত দশটা হচ্ছে ফিরতে, এরপর বারোটা হবে, তারপর তো আর ফিরবেই না রাতে মনে হচ্ছে”

ড্রইং রুমে অবিনাশ বাবুর ফোনটা বেজে ওঠায় স্বামী স্ত্রীর কথোপকথন সেখানেই ছেদ পড়ে যায়। রাতে নিঃশব্দে তিনটে প্রাণী রুটি আর তরকারি খেয়ে শুতে চলে যায়।

“কই গো… আমার দাড়ি কামানোর বাক্সটা দেখেছ ? কিগো… শুনছ…” আজ রবিবার। ঘড়িতে সকাল দশটা। বাজারের ব্যাগটা এনে রান্নাঘরে নামিয়ে দিয়েই স্নান করতে যাবেন বলে দাড়ি কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন অবিনাশবাবু। তো সেই বস্তুটিই গায়েব। বহু পুরোন টিনের একটা বাক্স। তাতে প্রায় ক্ষয়ে যাওয়া একটা ব্রাশ। একটা নতুন আর গুটিকয় ব্যবহৃত ব্লেড। কমদামি একটা শেভিং ক্রিম। এই তো সম্পদ। তা সেই নিতান্ত বেচারা বাক্সটা কিভাবে খাটের তলা থেকে উবে যেতে পারে ! আজ অফিসে কলম পেষা নেই। কোথায় একটু সকাল সকাল স্নান সেরে আরাম করবে ভাবলেন তিনি…

“বাবা… এই নাও।” নিজের পড়ার ঘর থেকে কি একটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে সোহম।
“কি ! কি এটা !” অবিনাশবাবুর চোখে বিস্ময়। ছেলের হাতে ধরা একটা নীল প্যাকেটে মোড়া বস্তু। চৌকো মত।
“নাও না। নিজেই দেখ।” হাত বাড়িয়ে সোহম প্যাকেটটা দেয় অবিনাশবাবুকে।

ধীরে ধীরে নীল রঙের রাংতা খুলছেন তিনি। সেলোটেপগুলো খুলে খুলে ভিতর থেকে বার করে আনেন একটা নীল বাক্স। খুব দামি দেখতে। অবিশ্বাসের চোখে হাতে ধরা জিনিসটার দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। বাক্সটার উপরে সোনালী হরফে লেখা , “রয়্যাল গ্রূমিং কিট”। নীচে কোম্পানির নাম। বাক্সটা খোলার সাহস হয় না আর অবিনাশ বাবুর।

“কোত্থেকে পয়সা পেলি ! এটার তো অনেক দাম। ” প্রশ্নটা নিজের অজান্তেই মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে উনার। নীলিমা দেবী ততক্ষনে বেরিয়ে এসেছেন রান্নাঘর থেকে।
“চুপ করে আছিস কেন ? বল ? কোথা থেকে টাকা এলো তোর কাছে ?” আবার প্রশ্ন করেন তিনি।
সোহম চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।

“ও নিজের টিউশন শেষে সপ্তায় দু’দিন মল্লিকদের বাড়ি পড়াতে যায় ওদের ছোট ছেলেটাকে।” নীলিমা দেবী উত্তরটা দেন।
“মানে ! কবে থেকে ? আমি তো কিছুই জানি না !”
“তুমি বকবে বলে ও তোমায় কিছু জানাতে পারেনি। তিন মাস হল।” উত্তর শেষে আর দাঁড়ান না সেখানে নীলিমা দেবী।

ভেবেছিলেন সঙ্গদোষে ছেলেটা বুঝি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক বাবার মত তাঁরও কপাল খারাপ ভেবে আগাম ধরেই নিয়েছিলেন কিছু করতে পারবেন না বুঝি আর। কিন্তু ছেলেটা তার বকাঝকার উত্তরে এতদিন নীরব থাকার অর্থটা আজও নীরবেই যে বুঝিয়ে দিয়ে গেল !

সোহম বাবার সামনে থেকে চলে গেছে নিজের ঘরে। অবিনাশ বাবু হাতে ধরে থাকা বাক্সটার চেনটা খুলতেই মৃদু মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে এসে লাগল উনার নাকে। আর উনি দেখলেন ভিতরে ছোট্ট একটা কার্ডে লেখা , “হ্যাপি ফাদার্স ডে… বাবা।”

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত