তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তেরা

তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তেরা

সূর্যাস্তের আভায় গঙ্গার বুকে লালের জোয়ার লেগেছে। বিকেলের লঞ্চঘাটে ক্লান্ত, শ্রান্ত, প্রিয় মানুষের কাছে ফিরতে চাওয়া মানুষের ভিড়। দূরে হাওড়া স্টেশন অপেক্ষা করছে তাদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার। শব্দ করে লঞ্চটা এসে থামল গঙ্গার ঘাটে। মুহূর্তের মধ্যে পিলপিল করে মানুষজন ঢুকে যেতে লাগল সেটার পেটের মধ্যে। ওদেরই ভিড়ে, ওদের থেকে আলাদা হয়ে বিকেলের সূর্যের লাল মুখে চোখে মেখে দাঁড়িয়ে আছে দুটো ছেলে মেয়ে। একপাশে। ওদের কোথাও ফেরার তাড়া নেই। যদি নিয়ম হয় ওদের না যাওয়ার, তাহলেও ওরা বিন্দুমাত্র বিচলিত হবে না। কিন্তু এবার লঞ্চটা ছাড়বে। একে অন্যের চোখের দিকে তাকায় স্বপ্নিল ও বাসবী। আজ সকালেও প্রায় অচেনা দুটো মানুষ এখন অনেকখানি কাছে চলে এসেছে একে অন্যের।

“চলো, এবার উঠতে হবে তো আমাদের।” স্বপ্নিল বাসবীর দিকে ফিরে বলে ওঠে।
“হুম।” বলে ঘাড় হেলায় বাসবী।

“দাঁড়াও, আমি আগে উঠি।” বলে একলাফে লঞ্চের উপর উঠে পিছন ফিরে বাসবীর দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দেয় স্বপ্নিল। এক মুহূর্ত সেই হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে বাসবী। না, কোথাও কোনো স্লো মোশানে ক্যামেরা রোল হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু কি এক অজানা অনুভূতিতে বাসবীর মনের ভিতরটা মৃদু গতিতে আন্দোলিত হয়ে ওঠে। এই কি সেই হাত যে সারাজীবন তাকে আঁকড়ে ধরে রাখবে বলে এসেছে তার জীবনে ! নিজের কম্পিত হাতটা স্বপ্নিলের দিকে বাড়িয়ে দেয় বাসবী। কঠিন পুরুষালি অথচ উষ্ণতায় ভরা নমনীয় এক হাত ! ওর হাতের মুঠোর ভিতর নিজের হাতটাকে রেখে নিজেকে খুব নিশ্চিন্ত, সুরক্ষিত মনে হয় বাসবীর। মনে হাজারো দ্বিধা দ্বন্দ্ব যেন এই একটা ছোঁয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে ওর। অস্তগামী সূর্যটা তার মনের সব দোলাচল নিয়ে ডুবে যাচ্ছে পশ্চিমের আকাশে। লঞ্চে উঠে দুজনে একপাশে রেলিংয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পিছনে মানুষজনের কোলাহল, ব্যস্ততা, ইঞ্জিনের আওয়াজ সব নিশ্চুপ হয়ে গেছে যেন। অস্তিত্ব আছে শুধু দু’জন মানুষ আর একটা সূর্যের। স্বপ্নিল খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে বাসবীর। সূর্যের লাল ওর চোখে মুখে। বিহবল দৃষ্টিতে ওর দিকে মুহূর্তের জন্য তাকায় বাসবী। কি এক সুখের অনুভূতিতে ভরে ওঠে ওর বুক।

চোখের কোণে বাসবীর দিকে তাকায় স্বপ্নিল। দূরে সূর্যের দিকে তাকিয়ে আছে অবাক এক মানবী। সূর্য অকৃত্রিম ভাবে তার সিঁদুর কৌটোর লাল মাখিয়ে দিচ্ছে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানবীর মুখে। কি দ্রুত কাছে চলে আসছে ও বাসবীর ! এই তো কিছুদিন আগেও সে চিনত না এই মেয়েটাকে। কোথাও কোনো অস্তিত্ব ছিল না তার। দীর্ঘ ত্রিশ বছর কাটিয়ে দেওয়ার পরও কখনো তার মনে হয়নি তো এভাবে কাউকে কাছে পাওয়ার কথা ! সে তো ‘না’ বলে দেবে বলেই গেছিল মেয়েটার বাড়ি, বাড়ির চাপে। কিন্তু ওকে প্রথম দেখাতেই কি যে হয়ে গেল তার… তার কোনো ব্যাখ্যা পায়নি সে আজও। ওর সাথে মিশে বুঝেছে স্বপ্নিল, বাসবী একাধারে প্রাণোচ্ছল ও গভীর মনের এক মেয়ে। ওর অতলান্ত মনের সমুদ্রে বার বার ডুবছে ভাসছে স্বপ্নিল। তারও মনের কোণে সুপ্ত থাকা কোনো এক জলাধারের উৎসমুখ যেন খুলে গেছে। বুদ্বুদ কাটছে নানারকম অনুভূতিরা সেখানে। সারাদিন। সারারাত। আজ প্রথম ওরা একসাথে বাইরে এসেছিল। বাড়ির গুরুজনদের ভিড়ের বাইরে এসে একে অন্যকে চিনে নেওয়া বুঝে নেওয়ার জন্য। কিন্তু সারাটাদিন যেন এক নিমেষে পেরিয়ে গেল। এটা ওটা বকবক করে সকাল থেকে বিকেল হয়ে গেল। মহানগরীর আকাশে এখন লালের নরম আভা ছড়িয়ে আছে। দ্রুত গতিতে জল কেটে কেটে এগিয়ে যাচ্ছে লঞ্চটা ফেরিঘাটের দিকে। আর পশ্চিম আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা থালার মত একটা সূর্য। ক্ষণে ক্ষণে রং বদলাচ্ছে আর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগে যেন অধীর ভাবে সাক্ষী থাকতে চাইছে দুটো মনের নীরব মিলনের।

“সূর্যাস্তের সূর্য আমার খুব প্রিয়। বিশেষ করে সমুদ্রের উপর।” কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে বলে ওঠে বাসবী।
“হুম, আমারও তো ! কিন্তু এতবার সমুদ্রে গেছি, কখনো সমুদ্রের সূর্যাস্ত দেখা হয়নি তো !” বলে বাসবীর চোখে তাকায় স্বপ্নিল। তারপর গভীরভাবে বলে ওঠে, “হয়ত তোমার সাথে একসাথে দেখব বলেই তুলে রাখা আছে সেটা।” ওর মুখে একথা শুনে কি যেন হয় বাসবীর মনে ! ইচ্ছে হলেও স্বপ্নিলের চোখের তীব্র দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না সে। চোখ নামিয়ে নেয়। স্বপ্নিলও চুপ করে যায়। সূর্যটা দ্রুত নেমে যাচ্ছে দুটো বিশালাকায় বিল্ডিংয়ের মধ্যিখান দিয়ে। এদিকে লঞ্চের রেলিংয়ের উপর আলগোছে ফেলে রাখা দুটো হাত কখন যেন নিজেদের অজান্তে একে অন্যের স্পর্শে জড়িয়ে গেছে। এইসব মুহূর্তে আর কোনো কথার প্রয়োজন হয় না। সদ্য পরিচিত বাঙময় দুটো মন একে অন্যের ছোঁয়ায় ভরসা পেয়ে আগামী দিনের স্বপ্ন বুনে চলে…

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত