লেখনীর শেষ প্রান্তে

লেখনীর শেষ প্রান্তে

“আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়”
তন্ময়ের আত্মহত্যার পর তার ঘরে চিরকুটে এই লিখাটি পাওয়া যায়। পুলিশ এসে তন্ময়ের ঝুলন্ত লাশ নিচে নামিয়ে রাখল। তারপর টেবিলে রাখা বই খাতা বের করল। খাতার হাতের লেখার সাথে চিরকুটের লেখা মিলিয়ে পুলিশ প্রমান পেল চিরকুটটি তন্ময়েরই লেখা।

আত্মহত্যাটাই তন্ময়ের জন্য ভালো হয়েছে। প্রতিনিয়ত তিলে তিলে ভয়, আতংক, আর কষ্ট পাবার চেয়ে একেবারে চলে যাওয়াই ভালো। গত একমাসে পুরো পাগলের মত হয়ে গিয়েছিল তন্ময়। গত মাসে তিথীর আত্মহত্যার পর থেকে একটি রাতের জন্য ঘুমাতে পারেনি সে। গত কাল রাতেও তিথী তার মেয়েকে নিয়ে অাবার এসেছিল অন্ধকার ঘরে।
তন্ময়’কে ডাকছিল…

-এই তন্ময় দেখো, তোমার মেয়ে এসেছে। তোমাকে বাবা বলে ডাকবে। উঠো তন্ময়।
তন্ময় ভয়ে বালিশ বুকে চেপে ধরে রাখল। পাশের ঘরে বাবা মা আছে, তাদের ডাকা উচিত। কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছেনা। একটা মৃত মানুষ এক মাস ধরে কেন আসে? তাহলে কী তাকেও মেরে ফেলবে তিথী?
মেয়েকে কোলে নিয়ে তিথী এগিয়ে যাচ্ছে তন্ময়ের দিকে।

-এই নাও, তোমার মেয়েকে কোলে নাও। দেখোনা কত শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। তোমাকে একটুও জ্বালাতন করবেনা।

তন্ময় ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। সকালে তার ঘুম ভাঙ্গে। তারপরই সিদ্ধান্ত নেয়। আর না, অনেক হয়েছে। প্রতিদিনের কষ্টের চেয়ে একেবারে চলে যাওয়া ভালো।

তিথীর বাড়ি পাশের এলাকায়। প্রায় ঘুরতে যেত তন্ময় বন্ধুদের সাথে সে এলাকায়। পুরো গ্রাম্য পরিবেশ পাওয়া যায় শিলমান্দি এলাকায়।

তিথী চাচাত বোনটার সাথে প্রাইভেট পড়া থেকে আসত বিকেলবেলা। তিথী আহামরি কোন সুন্দর মেয়ে নয়। তবুও তন্ময়ের ভালো লাগত। কেন ভালো লাগে তার ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি। হয়তো প্রতিদিন একই রাস্তায় মেয়েটিকে দেখার কারণে ভালো লাগে। আবার ভেবে দেখে, এমন অনেক মেয়েকেই তো সে কলেজে প্রতিদিন দেখে, কখনো তো কারো মায়ায় পড়েনি। তবে এই মেয়ের প্রতি এত মায়া জন্মালো কেন? এটাই কী প্রেম? এরই নাম ভালোবাসা?

কোনোদিন যদি তিথীকে না দেখে, সে দিনটির মত তিক্ততা আর নেই তন্ময়ের কাছে। আর দেখার পর কত ভালো লাগে। পেছন পেছন বাড়ি অবধি যায় তন্ময়। একটু দূরে দাড়িয়ে দেখে তিথীর বাড়ির ভিতর চলে যাওয়া। এতটা পথ তিথীও দুয়েকবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখত। এই বিষয়ে মেয়েরা একটু এগিয়ে। কোনো ছেলে একটি মেয়েকে পছন্দ করলে মেয়েটি সহজেই বুঝতে পারে। কিন্তু ছেলেরা মেয়েদের ভিতরের কথা জানেনা। মেয়েরা গোপনে ভালোবাসে আর সেটা ছেলেদের অনেক কষ্টে বুঝতে হয়।

তন্ময় সাহস করে একদিন পেছন থেকে ডাক দিল…
-এই শুনো।
-কান খোলা আছে।
-তোমার নাম কী?
-নাম দিয়া কাজ কী?
-প্রেম করলে দোষ কী?
-হইছে, হইছে। পুরোনো ডায়ালগ বাদ দিন। কিছু বলার থাকলে বলুন।
-এতদিন ধরে পেছন পেছন ঘুরি, বুঝোনা কিছু?
-বুঝে কাজ নেই। আমি তেমন মেয়ে না। আমার এখন লেখাপড়ার বয়স।
-লেখাপড়ারতো ক্ষতি হবেনা।
-হবে নাকি হবেনা সেটা আমি বুঝি। আমার পেছন পেছন না ঘুরলে খুশি হব।

তন্ময় মন খারাপ করে ফিরে আসল। খুব কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। পেছনে যেতে না করেছে। অথচ একদিন না দেখলে কত খারাপ লাগে।

আজ চারদিন পর নানির বাড়ি থেেক ফিরল তন্ময়। বিকেলবেলা ছুটে গেল তিথীকে একনজর দেখার জন্য। মাটির রাস্তার মোড়টিতে দাড়িয়ে আছে তন্ময়। তিথী তাকে দেখে হাটার গতি কমিয়ে দিল। তার চাচাত বোন চলে যাচ্ছে। তিথী হাটছে ধীর গতিতে। তন্ময়ের সামনে এসে দাড়াল। তিথীর চোখে উছলে পড়া ঢেউ। মনে হচ্ছে এখনি কেঁদে দিবে। তিথী চোখ নিচে নামিয়ে বলল….
-চারটা দিন কোথায় ছিলেন?
-নানির বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম।

-আপনারা পুরুষ মানুষ অনেক পাষান। নারীর মনে প্রেম জাগিয়ে তুলেন, স্বপ্ন দেখান। তারপর হুট করে চলে যান।
-কী বলছ এসব? আমি চারদিন না আসাতে তোমারতো খুশি হবার কথা। চারদিনতো আমার জ্বালাতন থেকে বেঁচে গেলে। তুমিতো আর আমাকে ভালোবাসোনা।

-যুগের পর যুগ চলে যাচ্ছে। আপনারা পুরুষ মানুষ কোনদিন নারীর মন বুঝবেন না। চারটা দিন কতটা কষ্টে কেটেছে জানেন? বাড়ি যাবার পথে কতবার পিছন ফিরে তাকাইতাম জানেন আপনি? আপনার তা জানার দরকার নেই। অাপনিতো বেড়ানো নিয়ে ব্যস্ত।
কথাগুলো বলার পরই তিথীর গাল বেয়ে

নামতেছে চোখের পানি। তন্ময় তিথীর চিবুক ধরে মুছে দিচ্ছে পানি। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে তন্ময় বলতেছে, “আর কখনো এমন হবেনা। অভিমানীকে আর কাঁদাবনা। বড্ড ভালোবাসি অভিমানীকে।”

মাস পেরিয়ে বছর ঘুরে। তন্ময় তিথীর প্রেম হয় গভীর থেকে গভীরতর। প্রতিদিন দেখা করার শুরুতে আর ফিরে আসার সময় চুমো বিনিময় হয়। একদিন তন্ময় বেশি কিছু চাইল। জগতের নিয়ম বুঝি এমনই। আগুনের কাছে মোম গেলে গলবেই।

তিথী না করল। এটা অন্যায় এটা পাপ। অন্যদিকে তন্ময় বুঝায়, এটা ভালোবাসা এটা বিশ্বাস।
দিন যায় সপ্তাহ ঘুরে। রাগ আর চাপা অভিমানে কাটে দিনগুলো।

খালের পাশে ঘন গাছপালা। ছোট একটি জঙ্গলের মত। দিনের বেলায় মানুষ যেতে ভয় পায়। অথচ একদিন সন্ধা রাতে সব বাঁধা দূরে রেখে, ভালোবাসার টানে তারা মিলিত হয়। জগতের সব সুখ যেন এই মিলনে নিহিত।
মানুষ পশ্রয় পেলে মাথায় উঠে। উঠতি বয়সটা নিয়ন্ত্রনে রাখতে না পারলে জীবনে অনেক দুঃখ থাকে। তন্ময় পশ্রয় পায় তিথীর কাছে। একবার দুবার নয়, বারবার তারা ভুল পথে পা বাড়ায়। কখনো সাবধানে কখনো সব ভুলে। কয়েক মাস পর সে ভুলেই তিথী তার মধ্যে আরেকটি প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পায়।
একটা অজানা ভয় তিথীকে ঘিরে রাখে সবসময়।

পরেরবার যখন তন্ময় তিথীর চিবুক ধরে চুমো খেতে যাবে, দেখে তার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ। তিথী কেঁদে দিয়ে তার ভয়ের কথা জানালো। তন্ময়ও পিছনে সরে আসল তিথীকে ছেড়ে দিয়ে। এত সাবধানতা অবলম্বন করার পরও কীভাবে কী হল?

তন্ময় আবার তিথীকে বুকে টানে। মাথায় হাত বুলিয়ে সব ঠিক হয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দেয়।
কিন্তু তিথীর ভয় কাটেনা। তন্ময়ের পিঠ খামচে ধরে বলে, প্লিজ চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি। তন্ময় অপারগতা জানায়। ইন্টারে পড়া ছেলেটির দ্বায়িত্ব তার বাবা মায়ের। সে ছেলেটি কীকরে একটি নতুন সংসারের দ্বায়িত্ব নিবে?

তন্ময়ের মুখে রাজ্য জয়ের হাসি। সে পরদিন তিথীর পাশে বসে বলতেছে, “অনেক কষ্টে এক মহিলাকে জোগাড় করেছি। তুমি শুধু ঘন্টা তিনেকের জন্য সেখানে যাবে। তিনিই তোমার সব ব্যবস্থা করবেন।”

-তুমি বাচ্চা নষ্ট করতে বলতেছো?
-এটা করা ছাড়া আরতো কোন উপায় নেই।
-উপায় নেই মানে? তোমার পরিবারকে জানাও। আমরা একটি ভুল করেছি, অবশ্যই তারা আমাদের ক্ষমা করবেন। কিন্তু আমাদের ভালোবাসার ফসলকে আমি এভাবে নষ্ট করতে পারিনা। কিছুতেই পারিনা।
তন্ময় দাঁত খিঁচিয়ে চোখ রাঙ্গিয়ে বলতেছে, “বুঝার চেষ্টা করো তিথী।”
-আমাকে চোখ রাঙ্গাও তুমি? তুমি আজকেই তোমার বাড়িতে সব বলবে। উনারা নিশ্চয় কিছু একটা করবেন।
-আমি কিছুতেই বাড়িতে এমন কথা বলতে পারবনা।
-না বললে আমি আত্মহত্যা করব তন্ময়।
-ইমোশনাল ব্লাকমেইল করোনা। আমি কিছুতেই বলতে পারবনা।
-আমি তোমাকে ব্লাকমেইল করেছি? ঠিক আছে আমি চললাম। ভুল যেহেতু করছি, মাশুলতো দিতে হবে। তবে একটা কথা জেনে রেখো। তোমার এই বুকে অন্য কোনো মেয়ের জায়গা হতে দেবনা আমি।

বিধ্বস্ত মন নিয়ে সেদিন বাসায় ফিরে আসে তন্ময়। আর সেই রাতে তিথী একবুক কষ্ট নিয়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে গাছে ঝুলে পড়ে। সেখানে, যেখানে তারা দুজন ভুল পথে পা বাড়িয়েছিল। সেখানে আত্মহত্যার মত আরেকটি ভুল করে গর্ভের ছোট্ট মানুষটিকে নিয়ে মায়ার এই পৃথিবী ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেল।

পরদিন তন্ময় শিলমান্দি পৌঁছার আগেই মধ্য পথ থেকে শুনতে পায়, পশ্চিম পাড়ার তিথী নামের মেয়েটি গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

তন্ময়ের পা আর সামনে বাড়েনি। ভয় আর কষ্ট তাকে সামনে পা বাড়াতে দেয়নি। তিথীর মায়াভরা মুখটিও শেষবারের মত দেখতে পারেনি। পনেরো মিনিটের পথ তন্ময়ের বাড়ি আসতে দেড় ঘন্টা লাগল। এক নিদারুণ কষ্ট তার গলা চেপে আছে।

এই যে তন্ময়ের অস্বাভাবিকতা শুরু, ফাঁসি নেবার আগ পর্যন্ত আর স্বাভাবিক হতে পারেনি।

তন্ময় এতকাল জানত, আত্মহত্যা করলে সে আত্মা ঘুরে বেড়ায়। সে আত্মার মুক্তি হয়না। তন্ময় ফাঁসিতে ঝুলার আগে ভাবল, “তিথী আমাকে নেবার জন্যই ঘুরঘুর করছে। আমাকে পেলে নিশ্চয় তিথীর আত্মার মুক্তি হবে। নয়তো তিনটি আত্মা একসাথে ঘুরে বেড়াব। আমি, তিথী আর আমাদের মেয়েটি।”

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত