পরিণাম

পরিণাম

সকাল তখন আটটা, অনুভব সেকেন্ড ট্রিপে মেট্রো টা দমদম থেকে ছেড়ে রওনা হলো কবি সুভাষের উদ্দেশ্যে। আজ ছয় বছর সে কলকাতা মেট্রো রেলের চালক হিসেবে কর্মরত। আগে একটু দেরি হওয়ায় এম জি রোড স্টেশন ছেড়েই অনুভব মেট্রো টা বেশ দ্রুত গতিতে টানেলের মধ্যে দিয়ে সেন্ট্রাল স্টেশনের দিকে এগোচ্ছিল , সেন্ট্রাল স্টেশনে মেট্রো প্রথম কম্পার্টমেন্ট ঢুকতেই, ঘটাং করে ট্রেনের এমারজেন্সি ব্রেক কষলো অনুভব । অনুভব এর চোখের পলকেই চলন্ত মেট্রোর সামনে ঝাঁপিয়ে পরলো এক যুবক, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, মেট্রোর গতিবেগ বেশি থাকায়, এমারজেন্সি ব্রেক চেপেও বাঁচাতে পারলো না ছেলে টাকে অনুভব। এটাই তার ছয় বছরের কর্মজীবনের প্রথম অ্যাক্সিডেন্ট। সব যাত্রী দের ট্রেন থেকে বের করে , মন খারাপ করে কেবিনে বসেছিল অনুভব। এখোনো বডি সরাতে প্রায় ঘন্টা খানেক সময় লাগবে। সে ট্রেনের সামনের কাচ থেকে দেখতে পাচ্ছে ক্ষতবিক্ষত দেহ টা লাইনের ওপর উপুর হয়ে পড়ে আছে। অনুভব মনে মনে ভবতে লাগলো “কার কোল খালি হলো কে জানে , কে স্বামী হারালো কে জানে, ইত্যাদি “” অনুভব খেয়াল করলো ততক্ষণে দুজন লোক লাইনে নেমেছে দেহ টাকে লাইন থেকে তোলার জন্য। সেই দুজন লোক সোজা করে বডি টাকে স্ট্রেচারে শুয়িয়েছে।

অনুভব কোনো কালেই মৃত দেহ দেখতে পারতো না, কোনো কালেই সে রক্ত কাটা ছেড়া সহ্য করতে পারে না। তাও সেদিন একরকম জোর করেই নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই ছেলেটির মৃত দেহর দিকে তার চোখ টা চলেই গেল, হয়তো এটা দেখার জন্যেই যে তার হাতে কার জীবনের ইতি ঘটলো। কিন্তু লাশের মুখের দিকে তাকিয়েই অনুভব চমকে উঠল। নিজের অজান্তেই সে অতীতের কালো অন্ধকারাচ্ছন্ন পথ ধরে পৌছে গেল তার অতীতে তার স্কুল জীবনে। পৌছে গেলো সে তার কল্পনার ডানায় ভর করে তার শৈশবের স্মৃতিতে মোরা শহর কল্যানী তে। মৃত দেহের মুখটা তার চিন্তে সময় লাগেনি কারন সেই ছেলেটি ছিল তারই বিদ্যালয়ের ক্লাসমেট সুদীপ্ত। উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর কারো সাথে যোগাযোগ রাখেনি অনুভব, কল্যানী শহর ছেড়েই চলে এসেছিল সে কলকাতা শহরে। তার কাছে তার বিদ্যালয়, তার কল্যানী শহর ছিল একটি জেলখানা, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সহপাঠীদের অত্যাচারে তার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়ে ছিল কটা বছর সে, তার পরেই স্কুল থেকে বেড়িয়ে তার জীবনের সবথেকে কলঙ্কিতময় ইতিহাস টিকে ভুলে গিয়েছিল আনন্দের মহানগরী কলকাতা তে এসে, নিজের জীবনের অধ্যায় গুলো কে নতুন করে সাজিয়ে নিয়েছিল অনুভব।

কিন্তু এতোগুলো বছর পর আবার সে আজ সেই ইতিহাসের মুখোমুখি, আজ অনুভবের ভীষণ অবাক লাগলো সুদীপ্তর কথা ভেবে, যে সে আত্মহত্যা কেন করলো, সে তো স্কুল জীবনেই সুদীপ্তর খুশির জন্য নিজের প্রিয় বন্ধু টিকেও তার হাতে সম্প্রদাণ করেছিল, সুদীপ্তর মিথ্যা সন্দহের কারনে সে নিজের হাতে শেষ করেছিল তার প্রিয় বন্ধু স্নেহার সাথে তার বন্ধুত্ব টা, তাঁকে বিনা কারনে মারধোর ও করেছিল সুদীপ্ত, সুদীপ্ত দিনের পর দিন মিথ্যা বলে খারাপ করেছিল স্নেহার কাছে তাকে, কিন্তু অনুভব কখোনোই এসব কিছুর প্রতিবাদ করেনি , সে বরাবরই ছিল খুব শান্ত প্রকৃতির ছেলে, সে শুধু সেদিন ভগবানের কাছে বিচারের দাবি জানিয়েছিল। তারপর অনুভব ও সম্পূর্ণ সরে আসে স্নেহা এবং সুদীপ্তর জীবন থেকে , সব ভালোই চলছিল হঠাৎ করে কি এমন হলো যে সুদীপ্ত কে এতোদিন পর আত্মহত্যা করতে হলো? তাকে এর কারন জানতেই হবে। এই সমস্ত নানান চিন্তা ভাবনা অনুভব কে পাগল করে দিচ্ছিল। কোনো রকমে অনুভব সেদিন কার ডিউটি শেষ করে বাড়িতে ফিরেই ফোন নিয়ে বসে পড়লো, তাকে এই রহস্যের সমাধান করতেই হবে সে যে কোনো মূল্যেই হোক । স্কুল পাশ করার পর কারো সাথেই আর যোগাযোগ রাখেনি অনুভব, সবাই কে ব্লক করে দিয়ে ছিল সারা জীবনের মতন। কিন্তু তাকে আবার আজ পুনরায় প্রবেশ করতে হলো তার ফেসবুকের ব্লক লিস্টে, এবং সে এক এক করে আনব্লক করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট করতে শুরু করলো তার অতীতের বন্ধু দের। বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হলো তার কিন্তু কেউই কোনো খবর দিতে পারছিল না।

শেষ পর্যন্ত তার এক বন্ধু, অয়ন এর মাধ্যমে জানতে পারলো তার প্রশ্নের অজানা উত্তর, সামনে আসলো তার রহস্যের অমীমাংসিত সমাধান । অয়নের কাছে ঘটনা গুলো শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল অনুভব। সমস্ত ঘটনা গুলো যেন তার চোখের সামনে সিনেমার ফ্লাশ ব্যাক এর মতন ভেসে উঠছিল। অনুভব কলকাতায় চলে আসার পরে ভালোই চলতে থাকে স্নেহা এবং সুদীপ্তর সম্পর্ক। কলেজের পড়া কালীন তারা পরিবারের অমতে বিবাহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়, সুদীপ্ত রোজগার এর কারনে মাঝপথে পড়াশোনা বন্ধ করে দিলেও সুদীপ্তর সাহায্যে স্নেহা নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছিল। মাস্টার্স ডিগ্রি কমপ্লিট করে একটি প্রাইভেট জব শুরু করে স্নেহা, সুদীপ্তও ছিল বেশ আনন্দিত, ভেবেছিল সে এবার হয়তো তাদের সংসারে আসবে সুখের আলো। কিন্তু অদৃষ্ট তাদের ভাগ্য টা লিখেছিল একটু অন্য ভাবে। চাকরিতে জয়েন করার পর স্নেহার মনে জেগে উঠেছিল প্রমোশন এর খিদে, এগিয়ে যাওয়ার খিদে, জেগে উঠেছিল অল্প সময়ের মধ্যেই উচ্চতার শিখরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তার এই খিদে মেটানোর জন্য অফিসের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিছানার শয্যাসঙ্গী হতেও তার মনে দ্বিধাবোধ হয়নি, তার উদ্দেশ্য ছিল খালি এগিয়ে যাওয়া, সে যে কোনো মূল্যেই হোক, সুদীপ্ত কে তার জীবনের একটি অভিশাপ ব্যতীত আর কিছু মনে হতো না সেই সময়। প্রতি রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে সুদীপ্ত কে সে একটাই অজুহাত দেখিয়ে দিতো যে তার অফিসের কাজের চাপ, কিন্তু তার প্রতি অন্ধবিশ্বাসী সুদীপ্ত কখোনো ধারণাও করতে পারেনি স্নেহা তার অজান্তেই অফিসের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা দের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে চলেছে নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে।

কিন্তু কথায় আছে সত্যি কখোনো চাপা থাকেনা, একদিন অফিসের বসের সাথে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় স্নেহা কে দেখে ফেলে সুদীপ্ত, এরূপ বিশ্বাসঘাতকতার কারন স্নেহার কাছে জানতে চাইলে তাকে স্নেহা পরিস্কার জানিয়ে দেয় তাকে আর তার প্রয়োজন নেই, সে এখন তার ক্যারিয়ারে মনসংযোগ করতে চায়। তাই নিজেকে শেষ পর্যন্ত সামলাতে না পেরে কলকাতা শহরের, অনুভবের মেট্রোর সামনে সুদীপ্ত সেদিন মরণ ঘুমের উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পরে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছিল চির অন্ধকারের দেশে। আজ এতো দুর্ব্যবহার এর পরেও সুদীপ্তর জন্য অনুভবের চোখ টা জলে ভরে উঠেছিল। কিন্তু আজ যেন সবার অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে অদৃষ্ট হো হো করে কটাক্ষের হাসি হেসে উঠেছিল আর ব্যাঙ্গের সুরে বলেছিল “”আজ আত্মহত্যা করলি কেন? সেদিন তো স্নেহার ওপর মিথ্যা অধিকার দেখিয়ে গায়ে হাত তুলেছিলি অনুভবের , অন্যায় ভাবে হত্যা করেছিলি এক পবিত্র বন্ধুত্বের, পারলি ধরে রাখতে তোর স্নেহা কে? পারলি না, তুই হেরে গেছিস, তুই আজ পরাজিত “। আজ কেটে গেছে দুটো বছর সুদীপ্তর মৃত্যুর, আজ ও অনুভব সেই দিনটায় সুদীপ্তর উদ্দেশ্যে বাড়ির ছাদে একটা মোমবাতি জ্বালায়, প্রতিবারই নিজের অজান্তেই তার চোখ টা ঝাপসা হয়ে আসে তার, যদি আর একটু আগে সে মেট্রো টা থামাতে পারতো, তাহলে হয়তো আজ সুদীপ্ত কে এইভাবে অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হতো না। কিন্তু এটাই হয়তো ভাগ্যের পরিহাস, সময় যে কাউকে ক্ষমা করেনা, কাউকে না, প্রতিটা মুহূর্ত কে হিসাব করে ফিরিয়ে দেয় সময়।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত