গরীবের ঈদ

গরীবের ঈদ

–মা আমাদের জামা কিনে দিবে না সামনে তো ঈদ! ও মা এবার একটা জামা দুইটা প্যান্ট কিনে দিবা আমাদের। সবাই কত সুন্দর সুন্দর জামা পড়ে ঘুরতে যায় আমরাও যাবো মা। ও মা বলো না কিনে দিবা ?

–স্যার যাবেন না বাসায় অনেক রাত হয়ে গেছে চলেন বাসায় যাই।
–হুমমম যাবো চলেন।
–চলেন রিকশায় উঠি অনেক দূর হেটে যাওয়া যাবে না।
–তুমি চলে যাও রিকশায় আমার একটা জিনিস কিনার আছে আমি একটু পর যাবো।
–ওকে স্যার আসছি।

–আমার আসলে কিছু কেনার নাই পকেটে টাকা নাই তাই রিকশায় উঠলাম না। হাটতে হাটতে চলে যাবো অভ্যাস আছে! রাস্তায় নামলাম হাটছি পিচঢালা রাস্তায়! মাথায় অনেক চিন্তা সামনে ঈদ বউ ছেলে মেয়ের জন্য নিজের জন্য কিছু কিনতে হবে। কিন্তু হাতের অবস্থা অনেক খারাপ!

–আমি মাসুদ রানা বাবা মায়ের মেজো সন্তান। ভালোবেসে বিয়ে করেছি তার জন্য বাবার থেকে কিছু পায়নি।তারা আমার সাথে কথা বলেনা ফোনটা দিলে কেটে দেয়।

–ছোট খাটো একটা চাকরি করি তাতে সংসার চলে না। ধার দেনা করে চলি এখন কেউ ধার দিতে চায়না।গেলেই বলে নাই জানি আছে তবুও দেয় না মনে করে দিতে পারবো না!

–দোকানেও অনেক বাকি দোকানদারও আর বাকি দিতে চায়না। দেখা হলেই বলে ভাই আমার ছোট খাটো দোকান টাকাটা দিয়ে দিয়েন।

–ভাবতে ভাবতে বাসায় চলে আসলাম।  আসার সাথে সাথে ছেলে মেয়ে দুটো এসে আব্বু বলে জড়িয়ে ধরলো। আমার এক ছেলে এক মেয়ে ছেলে মেহেরাব মেয়ে মেহেরিমা। মেয়েটা ক্লাস সেভেনে পড়ে ছেলেটা ক্লাস থ্রিতে পড়ে।

–কেমন আছে আমার সোনারা। কারো মুখে কথা নেই দুজনেই চুপ! কি হয়েছে আম্মু বকা দিছে কেনো দিছে কি বলছে বলো।

–কি আর বলবো এটা কিনে দিবা ওটা কিনে দিবা। ওর বাপ কি জমিদার যা চাইবে তাই কিনে দিতে হবে।

–আরে চুপ করো তো ওরা ছোট মানুষ এসব তো বলবেই তুমি চিৎকার করো না! দেখছো তো ওরা ভয় পাচ্ছে।ঠান্ডা হও আমি সব বুঝাচ্ছি তুমি খাবার দাও।

–ইনি হলেন আমার স্ত্রী জুই অনেক রাগী তবে মনটা অনেক ভালো। বড় লোক বাবার ছোট মেয়ে ভালোবেসে হাত ধরে বাসা থেকে চলে আসছে।

–এতো টানা পোড়ন সংসার কোনদিন কিছু বলেনি কিছু আবদারও করে না। অনেক ভালোবাসে আমাকে আমার কিছু হলে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।

–মেহেরিমা হওয়ার আগে একদিন অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ি সে কি কান্না। সারা রাত ঘুমায়নি খাওয়া দাওয়া তো করেই নি। অনেক পাগল অনেক কেয়ার যত্ন নেয় এমন বউ পাওয়া ভাগ্যের বেপার। এমন অনেক পাগলামী আছে ওর।

–রাতে খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে আছি। জুই এসে পাশে বসলো শুনছো একটা কথা। হুমম বলো,বলছি আজ বাড়ির মালিক এসে অনেক কথা বলে গেছে। বাসা ছেড়ে দিতে বলছে না হলে বের করে দিবে। আমি দেখছি কি করা যায় এতো সমস্যা কি করবো বুঝতেছি না।

–সামনে ঈদ কিভাবে কি করবো বুঝে উঠতি পারছি না। তুমি চিন্তা করো না সব ঠিক হয়ে যাবে!চলো ঘুমাই পড়ি হুমমম চলো।

–পরেরদিন…….

–পরেরদিন ঘুম থেকে উঠে খাবার খেয়ে বের হলাম কাজের উদ্দ্যশে। বেতন এখনো পায়নি স্যার কে বললাম স্যার বেতনটা।

–এভাবে চাকরি করা বাসায় যাওয়া দোকানদারের কথা বাড়ির মালিকের কথা শুনতে শুনতে দিন যাচ্ছিলোলো।

–আজ ২৭ রোজা এখনো অফিস ছুটি হয়নি। অফিসে বসে কাজ করছি!জুই এর ফোন আসলো ধরলাম।
–হুমম বলো কি হয়েছে..??
–দুপুরে খাইছো..??
–হুমমম তোমরা..??
—হুমম,,আসার সময় বাজার করে এনো। ঘরে কোন বাজার নেই যা ছিলো সব শেষ।
–ঠিক আছে আনবো,রেখে দাও ভালো থেকো।
–হুমমম সাবধানে বাসায় ফিরো।
–ফোনটা রেখে ভাবছি পকেটে কোন টাকা নাই কিভাবে বাজার করবো।
–এই যে মাসুদ সাহেব কি ভাবছেন। কোন সমস্যা হয়েছে না কি হলে বলুন।

–না ভাই,তেমন কোন সমস্যা না। এই এখনো বেতন পায়নি হাতের অবস্থা অনেক খারাপ। বুঝেনি তো সামনে ঈদ ছেলে মেয়ে বউ এর জন্য কিছু কিনতে হবে!বাজারও করতে হবে ঈদের কি ভাবে কি করবো এটাই ভাবছি।

–ভাই কিছু মনে না করলে আমি কি সাহায্য করতে পারি!আপনি না হয় আমাকে আরেকদিন সাহায্য করলেন।

–না ভাই বেতনটা পেলেই হবে সব কিছু সমস্যা হবে!বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ কিছু মনে করবেন না সরি।

–না বলা সত্যে কিছু টাকা দিলো জোড় করে। বললো পরে দিয়েন এক সময় যখন হাতে থাকে।
–আচ্ছা ভাই আজ উঠি,, কিছু কাজ আছে ও গুলো শেষ করতে হবে।
–আচ্ছা ভালো থাকবেন।

–কথা হচ্ছিলো ফরিদ ভাইয়ের সাথে এখানেই বড় পোস্টে কাজ করেন। অনেক ভালো মানুষ সবাই ওনাকে পছন্দ করেন।

–অফিস শেষ করে বাসায় গেলাম। বাজারটাও করে নিছি বাসায় গিয়ে বাচ্চা দুটোকে বললাম কাল তোমাদের মার্কেটে নিয়ে যানো। কথাটা শুনা মাত্র দুজনেই এসে জড়িয়ে ধরলো কত যে আদর করলো।

–রাতে খেয়ে বসে আছি বিছানায়।

–শুনছো কাল যে ওদের নিয়ে যাবা টাকা পাবা কই। না দিতে পারলে কি অবস্থা হবে ভেবে দেখেছো কত কান্না করবে।

–তুমি ভেবোনা কাল নিয়ে যাবো ওদের কিছু কিনে দিবো। কাল রাতে আমরা সবাই যাবো। এখন ঘুমায় পড়ো আর হে কাল বেতন দিবে চিন্তা করো না!ওকে আর বললাম না ফরিদ ভাই জোড় করে টাকা দিছে।
–সকালে অফিসে গেলাম কাজ শেষ করে বেতনটা নিয়ে বাসায় গেলাম বিকেলে। অফিস ছুটি দিয়ে দিছে।

–রাতে রেডি হয়ে মার্কেটে যাবো।সবাই রেডি হচ্ছি রেডি হওয়া শেষ বের হবো।
–শুনছো আমার কাছে কিছু টাকা আছে। সেলাই মেশিনে কাজ করে জমা করছি।

–আপনাদের তো বলা হয়নি জুই একটা সেলাই মেশিন চালায় কেউ কোন কিছু বানাতে আসে না টুকটাক দু একজন আসে। সেখান থেকেই টাকা জমিয়েছে পাগলীটা।

–মার্কেটে অনেক ভীড় তার উপর কাপড় চোপড়ে অনেক দাম কি করবো ভেবে না পেয়ে বাসায় চলে আসলাম। বললাম কাল আবার যাবো আজ কিনবো না অনেক ভীড়।

–বাসায় এসে ইফতারী করে নামাজ শেষ করে!খাওয়া দাওয়া শেষ করে নামাজ পড়ে এসে শুয়ে আছি।
–শুনছো কিছু কিনতে হবে না ওই ঈদে কিনে দিও।

–কি বলছো ওরা তো মন খারাপ করবে। সবাই নতুন জামা পড়বে তা দেখে ওদের মনে কষ্ট হবে। আমি কাল সকালে নিয়ে যাবো দেখি কিছু পারি কি না।

–হুমমম,ওদেরকেই দিও আমার জন্য এনো না আমার তো শাড়ি আছে। আমার লাগবে না তুমি ওদের জন্য কিছু আর তোমার জন্য একটা পাঞ্জাবী এনো।

–পাগলী আমার তো আছে,সবার জন্যই কিছু কিনবো। সবাই ঈদে নতুন পোশাক পড়বো ভালো লাগবে।
–আচ্ছা এসব বাদ দাও,,রাত হয়েছে চলো ঘুমাই কাল সকালে যাবো।
–হুমমম,,শুয়ে পড়ো তোমার মাথায় একটু হাত বুলাই তুমি ঘুমাও।
–হুমমমম,,দাও হাত বুলাও হাত বুলালে শান্তি লাগে গো।

–ঘুমায়ছো শুনছো আমাদের বিয়ের কথা মনে আছে তোমার। কত কষ্টে বাসা থেকে তোমার কাছে চলে আসছিলাম।

–হুমমম,,আমাদের বিয়ের কথাটা মনে আছে। তুমি কতক্ষণ বসে ছিলা আমার জন্য কাজী অফিসে। আচ্ছা তোমার কি তখন ভয় করছিলো।

–হুমমম,অনেক ভয় করছিলো। আরেকটু দেরী করলে আমি কেদেই দিতাম!কত কষ্ট করে কান্না আটকায়ছি।
–বাসর রাতের কথা মনে আছে!রুমে ডুকলাম সালাম করে হায়রে কান্না। আমি তো ভেবে অস্থির কান্না কেনো করছো।

–সেদিন সুখের কান্না করছি তোমাকে যে কাছে পাবো তা ভাবিনি কোনদিন। সেদিন সালামটা করে অনেক খুশি লাগছিলো তাই কান্না করছিলাম।

–হুমমম,অনেক ভালোবাসি তোমায় অনেক।

–তোমার বুকে কতদিন মাথা রাখি না একটু রাখি বুকে মাথা দিলে অনেক শান্তি পাই। সব কষ্ট ব্যাথ্যা ভুলে যাই সব।

–কপালে একটা চুমো দিয়ে বুকে নিলাম। অনেক কথা বলতে বলতে ঘুমাই গেছি।

–সেহেরীর সময় জুই এসে ডাকছে। উঠে মেহেরিমা মেহেরাব কে উঠিয়ে এনে খেতে বসলাম। খাওয়ার সময় মেহেরাব বলছে,,

–আব্বু আমরা কবে নতুন জামা কিনবো। পড়শোদিন ঈদ কবে দিবা কিনে নতুন জামা।

–সকালে যাবো সবাইকে নিয়ে নতুন জামা কিনবো সবার জন্য এখন খাও।

–সেহেরী খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে গেলাম!নামাজ শেষ করে এসে শুয়ে পড়লাম।

–সকালে জুই এর ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো!ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে রেডি হয়ে গেলাম কিছু কিনতে!

–যে দোকানেই যাই অনেক দাম বলে। অনেক ঘুরাঘুরির পর রাস্তার পাশে দোকানগুলো থেকে মেয়ের জন্য ছেলের জন্য বউয়ের জন্য কম দামী কিছু কিনে বাসায় চলে আসলাম।

–বাসায় এসে গোসল করে নামাজে চলে গেলাম। এসে একটু ঘুমালাম!বিকেলে গেলাম সেমাই চিনি কিনতে।দোকানদার দিতেই চায়না তবুও অনেক বলে কিছু টাকা দিয়ে কিনে নিয়ে আসলাম।

–বাসায় এসে জুই বললো চাল তো নেই আনতে হবে টাকা কি কিছু আছে।
–হুমমম,,আছে ব্যাগ দাও গিয়ে নিয়ে আসি।

–ব্যাগ নিয়ে চালের দোকানে আসলাম চাল দিতে বললাম বললো টাকা দেন অনেক বাকি আপনার। আর কোন বাকী নাই ঈদের সামনে বাকী দিবো না।

–অনেক্ষন বসে থেকে অনেক বার বলে কিছু চাল নিয়ে আসলাম। বাসায় এসে জুইকে দিলাম জুই রান্না করতে গেলো।

–আছরের নামাজা ইফতারী এশার নামাজ খাওয়া দাওয়া সব শেষ করে কাটিয়ে দিলাম ঈদের আগের দিনটা।

গল্পের বিষয়:
ছোট গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত