একটি রঙীন প্রজাপতির ধূসর বর্ণ ধারণ

একটি রঙীন প্রজাপতির ধূসর বর্ণ ধারণ

**অনেক দিন পর গ্রামে এসেছি,
সারাটা বিকেল পুরনো বন্ধুদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিলাম।
মায়ের নির্দেশ, সন্ধ্যে নামার সাথে সাথে যেনো বাড়িতে ফিরি।
ঘড়ির কাটায় সন্ধ্যে প্রায় ৭ টা বাজে, বাজার থেকে টুকিটাকি কিছু কিনে বাড়িতে ফিরছি, হঠাৎ খুব পরিচিত কারো গলার শব্দে ঘুরে তাকালাম,
সিহাব এই সিহাব ..

তাকিয়ে দেখি আমাদের স্কুল শিক্ষক কালাম স্যার, উনি আমাদের ম্যাথের টিচার। স্যারের দিকে তাকাতেই ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।

কত বদলে গেছেন স্যার, মাথার চুল সব সাদা আর চোখের গ্লাসটার পাওয়ার বেশ খানিকটা বেড়ে গেছে তা স্পষ্ট।
আমি স্যারে পা ছুঁয়ে সালাম করলাম।স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ভালো আছিস?
– স্যার!!!!, জ্বী স্যার ভালো, আপনি?
— এইতো চলে যাচ্ছে
– বাসার সবাই কেমন স্যার?
— হুম ভালোই, চল আমার সাথে।
– কোথায় স্যার?
— বাসায়, আজ অনেক দিন পর তোকে দেখলাম, বেশ ভালো লাগছেরে।
– আমার ও স্যার।
আমি আর স্যার, হাটছি গ্রামের পথ ধরে স্যার কতো কিছু যে বলছেন। আমাদের ব্যাচের মধ্যে আমি ছিলাম স্যারের খুব প্রিয়, কিন্তু ছিলাম দুষ্টের শিরোমণি…

তবুও কেনো যে স্যার এতো যে ভালোবাসতেন ঠিক বুঝতাম না তবে ক্লাসের মধ্যে সব সময় গণিতে আমি সব চেয়ে বেশি নম্বর পেতাম, হয়তো এটাই একমাত্র কারণ ছিলো।
**
স্যারের বাড়িটা ছোট তবে বেশ ছিমছাম।
আমার অনেক স্মৃতি এই বাড়িটার এখানে সেখানে, কারন স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়তাম এক সময়।
বাড়িটা আগের মতোই আছে তবে উঠোনের বড় বড় গাছ গুলো দেখতে পেলাম না।

আমি সেই রুমেই গিয়ে বসলাম যেখানে আমি কাটিয়েছি স্কুল জীবনের বেশ কয়েকটি বছরের সকাল বেলা।
টেবিলটা ঠিক আগের মতোই আছে শুধু কাঠের চেয়ারের পরিবর্তে এখন প্লাষ্টিকের চেয়ার। কবি গুরু, নজরুল আর জীবনানন্দ দেয়ালের ঠিক আগের জায়গাটাতেই আছেন।
একটা সময় চা এলো, আমি আর স্যার চা খাচ্ছি। স্যার পুরনো স্মৃতিতে হারাচ্ছেন বার বার যে স্মৃতির প্রায় পুরোটা জুড়ে আমাদের ব্যাচের আনাগোনা।

কথায় কথায় আমি স্যারকে মিমের কথা জিজ্ঞেস করলাম। মিম স্যারের এক মাত্র মেয়ে, আমার সাথেই পড়তো।

বেশ সুন্দর ছিলো সে, কত যে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বেশ কয়েকবার চিঠিও লিখেছি তবে সব গুলো বেনামীচিঠি ছিলো।

শুধু যে চিঠিতে নাম লিখেছিলাম সেটাই গিয়ে পড়লো হেড স্যারের হাতে, তারপর আমাকে বেত্রাঘাত করে নিল-
ডাউন করিয়ে রাখা হলো অফিসে, আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ভয়ে।
অফিসে বসে আছেন আব্বু, হেড স্যার, কালাম স্যার সহ আরো কয়েকজন স্যার আর অফিসের জানালায় দাড়িয়ে ছিলো মিম সহ বেশ কয়েকটা মেয়ে।

অবাক বিষয় হচ্ছে মিম কাঁদছিলো অথছ সেই নালিশ দিয়েছিলো আমার নামে।

এর পর থেকে সে আমার সাথে নানা ভাবে কথা বলার চেষ্টা করতো, হয়তো সরি বলতে চাইতো কিন্তু আমি এড়িয়ে চলতাম সেটা আমার অভিমান থেকেই ছিলো।
আস্তে আস্তে পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, স্কুল কলেজ, ভার্সিটি শেষ করে এখন আমি জব করি, তবে সেই স্মৃতিগুলো আজো অক্ষত।
মিমের কথা জিজ্ঞেস করাতেই স্যার বিমর্ষ হয়ে গেলেন, উনার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।
আস্তে আস্তে কথা আড়ষ্ট হয়ে যেতে লাগলো স্যারের কিন্তু কেনো ঠিক বুঝলাম না । উনি বললেন,
— তুই বস আমি আসছি
– জ্বী স্যার
স্যার ভিতরের রুমে গেলেন, আমি বসে আছি।
মাথার উপর ফ্যানটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, হঠাৎ কারো পায়ের শব্দে দরজার দিকে তাকালাম, কেউ একজন দরজার পর্দাটার ওপাশে দাড়িয়ে।

এক ক্ষাণিক পর একটা খুব পরিচিত কন্ঠ ছুঁয়ে গেলো সত্ত্বাটাকে,
— ভালো আছো?
— মিম!!!!!
— যাক চিনতে পেরেছো তা হলে।
– আড়াল করে রেখেছো কেনো নিজেকে ?
— এমনেই
– ও, ভালো আছো?
— বেশ আছি, খাচ্ছি ঘুমাচ্ছি, চলে যাচ্ছে এক রকম।
– কবে আসছো?
— অনেক দিন হয়ে গেছে
– ও, শশুড়বাড়িতে সবাই ভালো?
— ঠিক জানি না।
আমি ঠিক ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না,
এমন সময় স্যার ঢুকলেন, তিনি মিমের ব্যাপারে বলতে লাগলেন।
” বনেদি ঘর দেখেই বিয়ে দিয়েছিলাম মেয়েটাকে, জামাই ব্যবসায়ী ছিলো। বেশ সচ্ছল পরিবার তাদের, শশুড়বাড়ির সবাইও বেশ ভালো।

সব কিছু ভালোই চলছিলো কিন্তু ”
স্যার ” কিন্তু ” বলেই থেমে গেলেন,
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
– কিন্তু কি স্যার?
স্যার নির্বাক, একটু পর তিনি মিমকে ডাকলেন।
মিম অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার সামনে এলো।
তাকে দেখে আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারলাম না যে এই
মেয়েটাই মিম, আসলে আমি প্রস্তুত ছিলাম না তাকে এই ভাবে দেখবো বলে।
স্যার বললেন,
— তারা সমস্ত দোষ আমার নিষ্পাপ মেয়েটার উপর চাপালো। অপয়া, পাপিষ্ঠা আখ্যায়িত করলো মেয়েটাকে। শুরু হলো অমানবিক নির্যাতন।

মেয়েটা ঠিকমতো খাবারও পেতো না ঐ বাড়িতে তার উপর সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম।

আমি বেশ কয়েকবার আনতে গেলাম কিন্তু তারা নানা অজুহাতে আটকে রাখলো, একটা পর্যায়ে মেয়েটা আমার ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়লো। হাসপাতালে ছিলো প্রায় দুই মাস।
তার পর আমি আর তাকে দেইনি তাদের বাড়িতে।
আমি মিমের দিকে এক বার তাকালাম,
সে নিথর হয়ে দাড়িয়ে আছে, যেনো সে সত্যি নিজেকে অপরাধী ভাবছে।
***
বাড়ি ফিরছি আমি….,
চারিদিকে বেশ অন্ধকার, তার চেয়েও অন্ধকার আমার স্মৃতিগুলোতে। কিছুতেই কিছু মেলাতে পারছিনা, আগের মিমের সাথে বর্তমান মিমকে।
নিজেকে সম্পূর্ণ অপ্রাকৃতিস্থ মনে হচ্ছে। কল্পনাও করিনি মিম নামক একটি চঞ্চল শুভ্রতা এভাবে মিলিয়ে যাবে।
মিম নিজই হয়তো কখনো কল্পনা করেনি তার জীবনে এরকম কিছু একটা ঘটে যাবে।
এক সময় যে রঙীন প্রজাপতিটা অজস্র স্বপ্ন নিয়ে উড়াউড়ি করতো, সেই রঙীন প্রজাপতিটা আজ সাদা কাপড়ে ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে।…..

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত