অসহায় বাবা

অসহায় বাবা

“আচ্ছা ধরুন চারপাশে শতশত ক্যামেরা আর মোবাইল, ফ্লাস অন করে সবাই আপনাকে ভিডিও করছে। আর আপনি আপত্তিকর একটা সিসুয়েশন এ আছেন। তখন আপনার কেমন লাগবে?
আরেকটু সহজ করে বলি, ধরুন আপনার গলায় জুতার মালা পরিয়ে দাড় করিয়ে রেখেছে, আর শতশত মানুষ আপনার ভিডিও করছে তখন আপনার কেমন লাগবে?”
চারজন বন্ধু মিলে একটা ভিডিও দেখছিলাম, আর চা খাচ্ছিলাম।
ভিডিও টা কিছুক্ষণ আগে রেকর্ড করে নিয়ে এসেছি। বেশ বিনোদন মূলক ভিডিও হবে এ বছর। ইতোমধ্যে ফেসবুকে আর ইউটিউবে আপলোডও করে ফেলেছি।

ভিডিওটা ছিলো একটা মেয়ের মাথা থেকে চুল চেঁছে ফেলে দিয়ে ন্যাড়া বানানোর ভিডিও।
কিন্তু একটা অচেনা মানুষের মুখে এমন কথা শুনে চা খাওয়া থামিয়ে তার দিকে তাকালাম।
লোকটাকে আমি চিনি বলে মনে হচ্ছে না, বা কখনো দেখেছি কি না তাও মনে নেই। শরীরের সাথে একটা ময়লাযুক্ত কোর্ট জড়িয়ে আছে। প্যান্টটাও ছেড়া ফাটা।
পোষাক-আশাক দেখে মনে হচ্ছে লোকটা পাগল। কিন্তু পাগলেরা এমন প্রশ্ন করে না।
তাহলে লোকটা কে? হয়তো পথচারী হবে।
কিন্তু আমাকে এমন অদ্ভুৎ প্রশ্ন করার কারণ জানতে চাওয়ার জন্য বললাম “অবশ্যই খারাপ লাগবে। কারণ তখন যতটা সম্ভব নিজেকে আঁড়াল করে রাখার চেষ্টা করবো। আর আমি ওমন কিছু করবো না যাতে করে আমাকে খারাপ অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়।”

লোকটি আমার উত্তর শুনে কোন কথা না বলে শুধু একবার মুচকি দিয়ে হাসলো।
কিন্তু অচেনা লোকটার মুখের হাসিতে একধরনের রহস্য লুকিয়ে আছে যা এইমুহূর্তে আমি খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারছি। আবারো নিজ থেকে জানতে চাইলাম “আপনি কি আমাকে চিনেন?
বা কখনো কি আপনার সাথে দেখা হইছে আমার?”
“নাহ্, বাবা। তোমার সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি।”
“তোমরা মোবাইলে যেন কি দেখছিলে মনোযোগ দিয়ে?”
তারমানে অপরিচিত আংকেলটা ভিডিও প্রসঙ্গে কথা বলছিল এতক্ষণ ধরে।

লোকটা আমার বাবার বয়সি হবে, তাই আংকেল বলে সম্বোধন করছিলাম। “আসলে আংকেল কলেজ থেকে ফেরার পথে অনেক গুলো মানুষ জমায়েত দেখে ভিড় ঠেলে সামনে যেতেই দেখলাম, একটা বিশ থেকে বাইশ বছরের একটা মেয়েকে কয়েকজন মিলে মাথার চুল চেচে ন্যাড়া করে দিচ্ছে। লোকমুখে জানতে পারলাম, মেয়েটা নাকি একটা ছেলের সাথে খারাপ কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। বিষয়টা কত ফানি তাই না।”
লোকটা আমার কথা শুনে মুখের দিকে গম্ভীরভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জবাব দিলো।
“হ্ বাজান, অনেক ফানি। এখনকার যামানাতে তো সবকিছুই ফানি হয়ে গেছে।”
“আচ্ছা তোমার হাতে কয়েকমিনিট সময় হবে, যদি হতো ঐ গাছের নিচে বসে দুটো কথা বলতাম।”
লোকটার সম্পর্কে প্রথম থেকেই জানার ইচ্ছা ক্রমশ বাড়ছিলো তাই জানার সুযোগ হাত ছাড়া না করে হ্যাসূচক মাথা নাড়লাম। আবারো দু কাপ চা বানাতে বলে অচেনা আংকেলের সাথে দোকানের পাশে একটা গাছের নিচে গিয়ে বসলাম।

“আচ্ছা তোমাকে তুমি করেই বলি, কেমন?”
“জ্বী বলুন।”
“তোমার নাম কি বাবা?”
“জ্বী আমার নাম, রাতুল।”
“ভার্সিটিতে পড়ো?”
“জ্বী আংকেল। অনার্স থার্ড ইয়ার।”
“খুবই ভালো

। আমার নাম সালাম খন্দকার। আমি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলাম।”
“এখন আর করেন না?” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “করি না বললে ভুল হবে, স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।” এরই মধ্যে চায়ের দোকান থেকে টগর এসে দু কাপ চা দিয়ে গেলো। চা খাওয়া ছাড়া গল্প জমে না। তাই আমি এক কাপ নিয়ে আংকেলকে অন্যটা নিতে বললাম।  “বাবা আমার কাছে টাকা নেই।” “সমস্যা নেই, আপনি খান। আমি বিল দিয়ে দিবো।” আংকেলটি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করলো।

“সারপিং গ্রামে আমার বাড়ি। পারিবারিক ভাবে আমার পাশের গ্রামের একটা মেয়েকে বিয়ে করি আমি। বিয়ের যখন তিনবছর তখন আমাদের ঘর আলো করে একটা ফুটফুটে মেয়ে জন্ম নেয়। কিন্তু মেয়েটির দুর্ভাগ্য সে তার মায়ের আদর পাই নি। জন্মের কিছুদিন পরই জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে আমার স্ত্রী পরলোক গমন করেন। খুব কষ্ট করে আমার মা মরা মেয়েটিকে মানুষ করেছিলাম। সৎ মা কষ্ট দিবে ভেবে ২য় বারের মত আর বিয়েতে জড়ায় নি। বাবা-মেয়ের ছোট সংসার বেশ ভালোই যাচ্ছিলো। লেখাপড়াতে বেশ মেধাবী ছিলো মেয়েটা আমার।”

কিছুক্ষণ দম নিয়ে আবারো বলতে শুরু করলেন “আমি একজন শিক্ষক ছিলাম, তাই নিজের মেয়েকে যথেষ্ট শিক্ষা দিয়েই বড় করেছিলাম। সময়ের বিবর্তনে মা মরা মেয়েটা আমার প্রাইমারি শেষ করে মাধ্যমিকে ভর্তি হলো। সবাই এক নামে চিনতো আমার মেয়েটাকে। নিজের মেয়ে বলে বলছি না লেখাপড়ায় ভালো, গুণবতী, রূপবতী, সাংসারিক সবদিক দিয়েই আমার মেয়েটা ছিলো এগিয়ে। যার কারণে ছোট বয়সেই এলাকার সবার কাছে ভদ্র মেয়ের লিষ্টে সবার উপরে ঠাই পেয়েছিলো। আর আমিও আমার মেয়ের জন্য গর্ব করতাম।
কিন্তু…”
“কিন্তু কি? আংকেল!”

“আমার মেয়েটাকে সমাজের মানুষগুলো বেশিদিন আমার কাছে থাকতে দেয় নি। স্কুলে যাবার পথে রোজ কিছু ছেলে আমার মেয়েকে বিরক্ত করতো। বেশকিছুদিন আমি নিজেও গিয়ে শাসিয়ে এসেছি। কিন্তু ক্ষমতার দিক দিয়ে তাদের কাছে আমি অতি সামান্য ছিলাম। গ্রামের মাতবর, আর গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ছেলে ছিলো সবগুলো।
আমার চৌদ্দ বছরের মেয়েটি যখন স্কুল ড্রেস পরে রোজ স্কুলে যেতো তখন ভদ্রঘরের সন্তান গুলো বিভিন্ন ভাবে বিরক্ত করতো। আর আমার মেয়েটা বাড়ি এসে রোজ রাতে কেঁদে কেঁদে বলতো।
কিন্তু আমি ছিলাম, মধ্যবিত্ত ঘরের সাধারণ একটা স্কুল টিচার। যার সাধ্য বড়জোর স্কুলে গিয়ে বাচ্চা শাসন করা। ভদ্রমানুষগুলোর কাছে গিয়েও কয়েকবার বলেছি। তারা আমার মেয়েকে বিরক্ত করার অভিযোগ শুনে হেসে বলেছিলো।

“এই বয়সে ছেলেরা একটু আধটু এমন করেই থাকে।”
“কি করবো কার কাছে যাবো। তাই নিজেদেরকেই আঁড়াল করে ফেলেছিলাম। নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে অন্যত্র বাড়িভাড়া করে মেয়েকে নিয়ে থাকতাম। কিন্তু কিছুদিনের ভিতরে নতুন ঠিকানাতে গিয়েও শান্তি পাই নি। ধৈর্যের মাত্রা অতিক্রম হয়ে গেলে আমার ছোট্ট মেয়েটি একদিন ছেলেগুলোকে একটা চড় মেরেছিলো।

আর তারপর…” “তারপর কি হলো আংকেল?” “আমার মেয়েটিকে সবাই মিলে ধর্ষণ করলো। আমার ছোট্ট মেয়েটা সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলো। এক সপ্তাহ ধরে পাশ্ববর্তী একটা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ছিলো আমার মেয়েটা। গ্রামের ভদ্রমানুষ গুলোর কাছে তাদের ছেলেদের কুকর্মের কথা বলতেই তারা আমাকে উল্টো দোষারোপ দিয়ে বলেছিলো। “নিজের মা মরা মেয়েটাকে আমাদের মত সম্মানিত মানুষের ঘরের বউ বানানোর ফন্দি আটা তাই না।” বলে তারা আমাকে তাড়িয়ে দিলো। আচ্ছা তুমিই বলো তো বাবা, কোন বাবা তার মেয়ের সম্পর্কে এতটা খারাপ কথা বলে বেড়াবে? সবাই আমার মেয়েটার দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলতে শুরু করলো। তবুও আমি হাল ছাড়ি নি। মেয়ের সর্বনাশ করলো যারা তাদের বিরুদ্ধে সমাজের কাছে বিচার দিলাম। কিন্তু সমাজ আমার ফুলের মত ছোট্ট মেয়েটাকে কুলটা বানিয়ে দিলো।

ভরা মজলিশে সবার সামনে আমার মেয়ের মাথার চুল চেঁছে ন্যাড়া বানানো হলো। দাঁড়িয়ে থাকা সবাই বেশ মজা করে তাদের ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলো। আর আমার মেয়েটা মাথা নিচু করে অসহায়ের মত বাঁচতে চেয়েছিলো। মেয়েটা আমার তখনো পুরোপুরি সুস্থ হয় নি। মাতবরের পা জড়িয়ে ধরে সেদিন আমার মেয়ের জন্য একটু সম্মান ভিক্ষা চেয়েছিলাম। তারা এতটায় নির্দয়, যে মেয়েটাকে এলাকার সবাই ভদ্র মেয়ে বলে জানতো তার মুখে এত বড় খারাপ অপবাদ দিতে একটুও কুণ্ঠাবোধ করলো না। থানাতে গিয়েও ন্যায় বিচার পাই নি আমি। সেখানকার বড় স্যারকেও তারা টাকা দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে।  মেয়েটা আমার রোজ রাতে তার ন্যায় বিচারের জন্য আমার কাছে হাত জোড় করে মিনতি করতো। রোজ রাতে মৃত্যু যন্ত্রনাতে ছটফট করতো। কিন্তু আমি এমনি অধম বাবা, তাকে তার ন্যায় বিচার দিতে পারি নি।

কিন্তু তাকে মুক্তি দিয়েছি। যে হাত দিয়ে তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতাম, রাতে ঘুমানোর সময় মাথাতে হাত বুলায়ে দিতাম। সেই হাত দিয়ে তাকে মুক্তি দিয়েছি। যে মেয়েটা সামান্য হাত কেটে গেলে আমাকে চেপে ধরে কান্না করতো। রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে ভয় পেয়ে আমার কাছে এসে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো। তাকে নিজের হাতে অন্ধকার ছোট্ট একটা আলোহীন চার দেওয়ালের মাঝে মাটি চাপা দিয়েছি। কি ঠিক করেছি না। আমাকে এখন সবাই পাগল বলে। নিজের মেয়েকে মেরে ফেলার অপরাধে আমাকে থানাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। কিন্তু প্রাণে মারে নি। তারা ভেবেছে আমি পাগল। আর পাগলকে মৃত্যুদন্ড দেওয়ার আইন নাকি এখনো অবধি পাশ হয় নি। আমার চিকিৎসার জন্য পাগলাগারদে পাঠানো হয়েছিলো।

সেখান থেকে পালিয়ে এসেছি। আচ্ছা তুমিই বলো আমার মেয়ের খুন আমি কিভাবে করতে পারি? আমি তো শুধু তাকে মুক্তি দিয়েছি। বাবা হয়ে কি মেয়েকে খুন করতে পারি।” ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিওর কারণে তাকে কোথায় নিয়ে লুকিয়ে রাখতাম। মেয়েটা আমার সারাজীবন কষ্ট পেতো। আমি বাবা হয়ে কি করে মেনে নিবো, তাই তাকে মুক্তি দিয়েছি। কিন্তু খুন তো করেছে সমাজের ঐ মুখোশধারী বিত্তবান মানুষগুলো। আমার ফুলের মত নিষ্পাপ মেয়েটাকে জগতের সামনে নষ্টা বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তারা তো ঠিকই কলার খাড়া করে সমাজের বুকে রাজ করছে। আমার মেয়েটা এখনো রোজ রাতে এসে তার ন্যায় বিচারের জন্য আর্তনাদ করে। কিন্তু কোথায় পাবো ন্যায় বিচার।

সবাই যে শক্তের ভক্ত। বাবা তোমরা যেটাকে বিনোদনের জন্য মোবাইলে ধারণ করেছো একটিবারের জন্য নিজেকে ঠিক ঐ স্থানে দাঁড় করিয়ে দেখো কেমন পরিস্থিতির ভিতরে ঐ মানুষটা আছে। আচ্ছা বাবা আমাকে এখন যেতে হবে। তোমার অনেকটা সময় নষ্ট করে দিলাম। আমার মেয়েটা যে একা আছে। তার কাছে আমাকে যেতে হবে। লোকটি চায়ের কাপটা ফেলে দিয়ে দ্রুত গতিতে হাটা শুরু করে দিলো। পিছন থেকে অনেক বার ডাক দিলাম, কিন্তু হয়তো আমার কথা শোনার সময় তার নেই। সাথে সাথে ফেসবুক আর ইউটিউবে আপলোড দেওয়া ভিডিওটা ডিলেট করে দিলাম। জানি না লোকটার কথা গুলো সত্যি কি না তবে একটা মানুষ কতটা কষ্ট আর আঘাত পেলে এমন বর্বর আর পাগলপ্রায় হয়ে যায় তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এই মানুষটা।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত