আমাকে ক্ষমা করো

আমাকে ক্ষমা করো

কলেজ থেকে ফেরার পর রিমি ঘরে ডুকতেই রিমির চাচি আর চাচাতো বোনেরা টেনে ওকে অন্য রুমে নিয়ে গেলো।আর বলতে লাগলো
-ওই রুমে যাইসনা।
-কিন্তু কেন??
-কথা বলিস না।আগে এই ওড়না টা দিয়ে মাথায় ঘোমটা দে।
-কি শুরু করেছো বলো তো। কি হয়েছে??
তখন রিমির ফুফু এসে বললো,

-এই কলেজ ড্রেসে যাবে নাকি?আগে চেঞ্জ করুক।ভালো একটা জামা পড়ে হাল্কা ইক্টু সাজুক।একদম হাল্কা।এইদিনে বেশি সাজ পছন্দ করে না।আলমারি থেকে ভালো জামা বের করতো পিয়াসি।
-কি আজব!!আমাকে বলবা তো সবাই এতো ব্যাস্ত হচ্ছো কেন আমাকে নিয়ে?
-তোকে দেখতে আসছে।এইটাও বুঝস না গাধি।
-আমার ভালো লাগে না।আমি যাব না ওদের সামনে।
-পাগল নাকি!!কেন যাবিনা??
-কত কথা বলবে কত প্রশ্ন করবে।আমি যাব না।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও রিমিকে নতুন জামা পড়িয়ে সাজিয়ে নিয়ে গেলো ওনাদের সামনে।
রিমি মাথাটা একটু উচু করে দেখলো কয় জন এসেছে।যদিও ওকে আগে থেকেই নিষেধ করে দিয়েছে উপরের দিকে তাকানো যাবে না।সারাক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
এখানে চার জন লোক বসে আছে।একজনের মাথায় টাক। উনি হয়তো ঘটক।এরেকজন দাড়িওয়ালা। মাওলানা মনে হচ্ছে।আরেক জন মুচকি হাসছে।নিসঃন্দেহে বলা যায় উনি ই বর।আর পাশের টা হয়তো বন্ধু। রিমির প্রশ্নপর্ব শুরু হলো।

নাম ধাম জিজ্ঞেস এর পরে মাওলানা সাহেব বললেন,
-সহি শুদ্ধ করে কোরান মাজিদ থেকে একটা আয়াত বলো তো মা।
রিমি গুন গুন করে বললো।
মাশাল্লাহ!! খুব ভালো।
ঘটক বললো ভালো হবে না।ছোট বেলায় মাদ্রাসায় পড়ছে তো।আর মেয়ে মাশাল্লাহ নম্র ভদ্র।লেখাপড়ায় ও মাশাল্লাহ।

মাওলানা সাহেব আবার বললেন,
আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে ১ লাখ ২৪ হাজার পয়গাম্বর পাঠিয়েছেন। তার মধ্যে কোরান মাজিদে মাত্র ২৬ জন নবী রাসুলের নাম আছে।তাদের নাম গুলো বলতে পারবা?
বর মাওলানা সাহেবের কানে কানে বললেন,
আহ!!মামা,,
আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।মেয়ে আমার পছন্দ হয়েছে।
রিমিকে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হলো।পরের দিনই বিয়ের তারিখ ঠিক হলো।
রাতে রিমির মা রিমির রুমে আসলো।রিমি বললো,
এসব কি মা??কালই নাকি বিয়ে??

-হ্যা।ওনারাই তাড়াহুড়ো করছে।আমাদের আর দেড়ি করার দরকার কি।কলেজে তোকে দেখেই পছন্দ করছে।তাছাড়া ছেলেও অনেক ভালো।
-সামনে আমার এইচএসসি পরীক্ষা মা।
-তাতে কি। বিয়ের পর পরীক্ষা দিবি।দেখ, বাপ ছাড়া মেয়ে তুই।কতো দিন তোর মামারা তোর খরচ দিবো।আর ওনাদেরও কোনো চাহিদা নাই।

রিমি আর কোনো কথা বলার সাহস পেলো না।বিয়েতে রাজি হয়ে গেলো।
বিয়ের দিন রাতে ভেবেছিলো তার স্বামীর সাথে অনেক কথা বলবে। কিন্তু সেরকম কিছু হলো না।রিমির স্বামী রিমির সাথে কতক্ষন কথা বলার একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করলো তার সাথে কোনো ছেলের সম্পর্ক ছিলো কিনা।রিমি মাথা নেড়ে না সূচক জবাব দিলো।তারপর রিমির প্রতি তার অতুলনীয় ভালোবাসা দেখাতে লাগলো।এরেঞ্জ ম্যারেজ আর লাভ ম্যারেজ এর মধ্যে হয়তো পার্থক্য একটাই।লাভম্যারেজে মন আগে পায় পরে দেহ,আর এরেঞ্জ ম্যারেজে দেহ আগে পায় পরে মন।

বিয়ের পর শশুড়বাড়ির সব দায়িত্ব রিমির উপর পড়লো।কারন রিমি ছিলো বড় বউ।তার একটা দেবর আর একটা ননদ।ননদের বিয়ে হয়ে গেছে।এদিকে শাশুড়িও অসুস্হ অনেক দিন ধরে।
রিমির এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলো।ওকে পরীক্ষাও দিতে হয়েছে অনেক ঝামেলার মধ্যে।সকালে রান্না করে দিয়ে,বাসার সব কাজ শেষ করে,শাশুড়িকে খাবার আর ঔষুধ খাইয়ে দিয়ে তারপর যেতো পরীক্ষা দিতে।খুব করে কষ্ট করে পরীক্ষা দিলেও রেজাল্ট ভালোই হলো।4.84 পেয়েছে।যদিও রিমির ইচ্ছে ছিলো আরো ভালো করার।পরিস্থিতি হয়তো অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করে দেয়।

রিমির স্বামীর নাম শাহিন।হয়তো বলা হয়নি। তো রিমির আর শাহীনের জিবন ভালোই কাটছে।রিমিরও টান বাড়ছে স্বামীর প্রতি।দুজন ছুটির দিনে ঘুরতে যায়।কেনাকাটা করতে যায়।দুজনের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং টাও বাড়ছে।রিমির কলেজের সব বান্ধুবিরা বিভিন্ন ভার্সিটিতে এডমিশন নিয়েছে।রিমি কতোদিন ধরে শাহিনকে বলবে বলবে ভাবছে কিন্তু বলতে পারছে না।শাহিন যখন খাচ্ছিলো রিমি তখন পাশের চেয়ারটায় গিয়ে বসে বললো,

-একটা কথা ছিলো,,
-হ্যা বলো কি বলবা।
-আমি পড়াশোনা করতে চাই।
-হুম। তারপর??
-অর্নাসে ভর্তি হবো।
-পড়াশোনা করে কি করবা?
-প্রতিষ্ঠিত হবো।একটা চাকরি করবো।
-বাড়ির বউ এর চাকরি করা আমার আব্বা আম্মা পছন্দ করে না।আর আমিও করি না।

তাছাড়া এতোদিন পরীক্ষা দিয়েছো রান্না বান্না খাওয়ায় ঝামেলা হয়েছে।আম্মাকে বাসায় একা রেখে তুমি পরীক্ষা দিতে গেছো।আম্মাকে বাসায় একা রেখে এখন তুমি ভার্সিটি যাবে প্রতিদিন??
বাদ দাও।যেটুকু পড়ার পড়ছো।এখন সংসারে মন দাও।

-সব মেয়েরাই তো পড়ে আবার চাকরিও করে।আমি সংসার ঠিক রেখেই পড়বো।তাছাড়া ভার্সিটিতে প্রতিদিন তো আর যেতে হয় না।
-খাওয়া শেষ হয়েছে।প্লেট টা নিয়ে রান্নাঘরে রাখো।আর এসব চিন্তা মাথা থেকে নামাও।
রিমির কিছু বলার আগেই শাহিন তার রুমে চলে গেলো।আর কোনো সুযোগ দিলো না কথা বলার।
এর পরের দিন রিমি আবার শাহিনকে বললো,

-একটু ভেবে দেখো প্লিজ।কোনো কিছুতেই কোনো সমস্যা হবে না।আম্মার সেবায়ও কোনো ত্রুটি থাকবে না।
-আবার শুরু করছো?
-আমি চাকরি করবো না যাও।শুধু পড়াশোনা টা শেষ করি।
-চার বছর লাগবে অনার্স শেষ করতে।এই চার বছরে তো আমাদের বাচ্চাও হবে।তখন বাচ্চা সামলাবা নাকি পড়বা?
-আমি সবটাই সামলাতে পারবো।
-উফফ!!ঘ্যান ঘ্যান করো না তো।

তাছাড়া তোমার বিয়ে দেয়ার সময় এমন কোনো কথা হয় নি যে তোমাকে পড়াতে হবে।আর এই টপিক নিয়ে আমার সাথে আর কথা বলবা না।

রিমি তার রুমে গিয়ে ফুপিয়ে কাদতে শুরু করলো।রিমি এটা কখনোই চাই নি।ওর একটা স্বপ্ন ছিলো।আজ যেন সেই সব স্বপ্ন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো।তাও রিমি হাল ছাড়েনি।প্রতিদিনই বলে গেছে শাহিনকে।প্রতিবারই শাহিন তার কথাকে অগ্রাহ্য করেছে।আর কতো বকাবকিও করেছে।

রিমি দিন দিন মনমরা হয়ে যাচ্ছে।সারাক্ষন আনমনে বসে থাকে।জানালার পাশে বসে তাকিয়ে থাকে বাহিরে।দেখতে থাকে আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাওয়া পাখি গুলোকে।জিবন টা যেন থমকে গেছে।মেয়েদের জিবন কি তাহলে এটাই।বিয়ের আগে বাবার উপর নির্ভর থাকতে হয় আর বিয়ের পরে স্বামীর উপর।
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রিমি তার শশুড়ের চেচামেচি শুনতে পেলো।
রিমি সেখানে গিয়ে দেখে ঘর টা পুরো অগুছানো। উনি কি যেন খুজছে আর জিনিসপত্র ছুরে ছুরে মারছেন।
রিমি বললো,

-কি হয়েছে আব্বা?কি খুজছেন আপনি??
– আর বলো না, সেই সকাল থেকে চশমা টা খুজছি।পাচ্ছিই না।আর মাথাটাও এত্ত ব্যাথা করছে। বলতে বলতে হাতে থাকা মগ টাও ছুরে মারলেন।
-আব্বা চশমা টাতো আপনার মাথায়ই। হাত দিয়ে দেখুন।

রিমির শশুড় মাথায় হাত দিয়ে দেখে চশমা।তখন উনি হো হো করে হেসে উঠলেন।
কি যেন হয়েছে আব্বার কিছু দিন ধরে।কেমন যেন অন্যরকম মনে হয়।আর সব ভুলে যায়।
রিমি কিছুদিন হলো ডাইরি লেখা শুরু করেছে।সারাদিন কাজ করে যতটুকু সময় পায় লিখতে থাকে।লিখতে লিখতে সেটা এক সময় নেশা হয়ে যায়।না লিখলে এমন মনে হয় যেন আজ ভাতই খায় নি।

রিমির আরেকটি সখ ছিলো। তা হলো ছবি আঁকা।সে তখন ছবি আকাও শুরু করে দিলো।সময় শুধু রাতে পেতো।তাই রাতে কখনো লিখতো আবার কখনো ছবি আকতো।
একদিন রাতে শাহিন এসে দেখে রিমি ছবি আকছে।তখন সে বললো,
কতোদিন ধরে দেখছি তুমি রাত জাগছো।ব্যাপারটা কি??
এতো রাতে বসে বসে তুমি কিসব আকিবুকি করো।ঘুম বাদ দিয়ে যত্তসব ফালতু জিনিস নিয়ে পরে থাকো।
রিমি তখন কিছুই বলে নি।খাতাটা পাশে রেখে চুপ করে শুয়ে পড়েছে।
এভাবেই চলতে থাকে রিমির দিন গুলো।দিনে সময় না পেলেও রাতেই ছবি আকে আর লিখালিখি করে।

একদিন রিমি তার শশুরকে খাবার খাওয়ার জন্য ডাকতে গিয়ে দেখে উনি মাটিতে পরে আছে।রিমি তখন বুঝতে পারছিলো না কি করবে না করবে।তাড়াতাড়ি করে সবাই কে ডেকে আনলো।আর ওনাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো।
ডাক্তার বললেন ওনার নাকি মাথায় অনেক সমস্যা।কতোগুলো ঔষুধ দিয়ে দিলেন।হাসপাতালে থাকা অবস্থায় ভালো থাকলেও বাসায় ফিরে অবস্থা আরো খারাপ হতে লাগলো।ধীরে ধীরে সব ভুলতে লাগলো।একসময় দেখা গেলো সে তার নিজের ছেলেকেই চিনতে পারছে না।শুধু তাই না, ব্যবসার সমস্ত হিসাব নিকাশ ছিলো ওনার কাছে, তাছাড়া কে কত টাকা ধার নিয়েছে সেসব কিছুই উনি বলতে পারছেন না। উল্টো যাদের কাছে ঋণি তারা এসে চাপ দিতে লাগলো টাকার জন্য। শাহিন ভেঙে পড়লো তখন।মানসিক একটা চাপ তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো।অসুস্থ মা বাবা, পাওনাদার আর ব্যবসা সবটা সামলানো যেন তার জন্য কঠিন হয়ে পড়লো।একদিন সকালে শাহিন রিমিকে ডেকে বললো,

-সবার জামা কাপড় গুছিয়ে নাও
-কেন? আমরা কোথায় যাচ্ছি?
-গ্রামের বাড়ি।
-সেখানে গিয়ে কি করবা তুমি?
-কৃষি কাজ করবো।
-কিন্তু আজই কেন যেতে চাইছো?আর এই বাড়ি??
-এই বাড়ি বিক্রি করে দিছি।
-বলো কি??কেন?
-পাওনাদাররা বলছে দুপুরের মধ্যে দুই লাখ টাকা না দিলে বাসা ওনারা নিয়ে নিবে।আর বাসা থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে।তার থেকে ভালো আমরা আগে আগেই চলে যাই। রিমি কিছু বললো না।জামা কাপড় গোছাতে রুমের ভেতর চলে গেলো।

কিন্তু দুপুরে যখন সবাই বাসা থেকে রওনা দেবে তখন আর রিমিকে পাওয়া গেলো না।শাহিন একের পর এক ফোন দিয়েই যাচ্ছে ওকে।কিন্তু ওর মোবাইল বন্ধ বলছে।শাহিন টেনশনে ছটফট করতে লাগলো।শাহিনের মা বললো,
বিপদের সময় কেউই কারো পাশে থাকে না।আমাদের এমন বিপদ দেখছে তাই হয়তো বাপের বাড়িতে চলে গেছে।
শাহিন বললো, এটা কি করে হয়?ও তো আমার কথা ছাড়া কোথাও বের হয় না।এদিকে ওই লোকদের আসার সময় হয়ে গেছে। কি করি বলোতো। বলতে বলতে পাওনাদাররা এসে পরেছে।এসে বলছে, আমাদের টাকা রেডি আছে তো? শাহিন বললো আমাদের আর কটা দিন সময় দেয়া যায় না?

-বহুত সময় দিছি।গাট্টি বস্তা নিয়া যান ভাগেন।

সবাই বাসা থেকে বের হবে ঠিক তখনি রিমি কে দেখা গেলো গেইট দিয়ে ভিতরে আসতে।আর ওর হাতে কতোগুলো টাকা।রিমি তার হাতের টাকা ওনাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,

-এই নিন আপনাদের টাকা।আমরা আমাদের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না।আর কোনো দিন যদি আমাদের সামনে দেখেছি তাহলে খবর আছে। টাকা পেয়ে সবাই চলে গেলো। শাহিন আর তার বাবা মা সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। শাহিন কাছে এসে বললো,

-তুমি এতোগুলো টাকা কোথায় পেলে??
-ভয় পেয়ো না।কোনো অপরাধ করে টাকা আনি নি।
-তাহলে?
-তুমি যেই পেইন্টিং কে যত্তসব আঁকিবুঁকি বলতে,সেই পেইন্টিং বিক্রি করে টাকা এনেছি।

তুমি যেই লেখাকে হাবিজাবি লেখালেখি বলতে সেই লেখা প্রকাশককে দেখিয়েছি।
ওনার খুব পছন্দ হয়েছে আমার লেখা।আর উনি বই প্রকাশের জন্য এডভান্স টাকা দিয়েছেন আমাকে।
শাহিনের চোখ ছলছল করছে।অনেক কথা হয়তো বলতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না।

-আমাকে ক্ষমা করো।তোমার মুল্য আমি বুঝতে পারেনি।তোমার প্রতিভাকে অবজ্ঞা করেছি।আর আজ এই কঠিন পরিস্থিতিতে তুমি ই আমাদের বাচিয়েছো।

-স্বামী হয়ে ক্ষমা চাইতে হয় না।শুধু এটা জেনে রাখো নারীদেরও অনেক কিছু করার ক্ষমতা আছে,,,,

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত