অদ্ভুত ঘৃণা

অদ্ভুত ঘৃণা

_হ্যালো(কথা)
_বলো(আবির)
_কি করছ?
_ঘুমাচ্ছি।
_তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলছ কেন?
_তোমার সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে?
_একটু ভালো করে কথা বলতে পারোনা।
_ভণিতা না করে সরাসরি বলে ফেলো ফোন করেছ কেন?
_আসলে তোমাকে খুব মিস করছিলাম।
_এইটাই কারণ?(রেগে গিয়ে)
_না।আসলে একটা কিথা ছিল।
_তো আসল কথাটাই বলে ফেলো।এতো ঢং করছ কেনো!!!
_রাগ করবে নাতো?
_মেজাজ কিন্তু খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কি বলবে বলে ফেলো।আমার এখনো অনেক কাজ বাকী।
_মা ফোন করেছিল।
_ওই তোকে না কতবার বলেছি, মায়ের নামটা আমার সামনে উচ্চারণ করবি না।
_আমার মা ফোন করেছিল।আমিতো তোমার মায়ের কথা বলিনি।
_তুই বুঝিস না,এই মা শব্দটা শুনলে আমার মেজাজ বিগড়ে যায়। তারপরেও এই শব্দটাই আমার সামনে উচ্চারণ করতে হবে। অন্যকিছু বলবি।
_মাকে মা ছাড়া আর কি বলব?
_বলবি আমার শাশুড়ি।
_এটা আবার কি ধরনের কথা! আমার মাকে সরাসরি মা বলতেপারব না? তোমার শাশুড়ি বলতে হবে!!!
_হুম।যখন আমার কাছে তোমার? মানে আমার শাশুড়ি সম্বন্ধে কিছু বলববে।
_আমি পারব না।
_আচ্ছা ফোন রাখ।তোর এই ন্যাকামো আমার একদম ভালো লাগেনা। বলেই ফোনটা কেটে দিলো আবির।কথার মনটাই খারাপ হয়ে গেলো।ওর মা ফোন করেছিল ওকে আর আবিরকে কাল ওদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য,ওর ভাইয়া আর ভাবি আসবে ইতালি থেকে,এয়ারপোর্ট থেকে ওদের নিয়ে সরাসরি ওদের বাসায় যাবে।কিন্তু মায়ের কথা বলতেই আবির কেমন রেগে গেলো।

আবিরের মায়ের উপর ওর রাগ থাকার যথেষ্ট কারণ আছে,কিন্তু তাই বলে মা শব্দটার প্রতি ওর এতো রাগ দেখানোর কি আছে!!! কথা ভেবে পায়না।ওর মনটাই খারাপ হয়ে গেলো।এতোদিন পর ওর ভাই আর ভাবি আসছে, তারপরেও এয়ারপোর্ট যেতে পারবে না ওদের আনতে…কথা শুয়ে শুয়ে কান্না করতে লাগল। আবির ভাবছে যে, কথার সাথে এভাবে কথা বলাটা ঠিক হয়নি। ওকে রেখে ওর মা চলে গেছে, এতে কথার কি দোষ।দোষটা হয়ত আবিরের যে,ও ওর মায়ের সুখের পথের কাটা ছিলো।ওর বাবা-মায়ের বিয়েটা অন্যন্য বিয়ের মতই স্বাভাবিক একটা বিয়ে ছিল।আবিরের দাদার পছন্দ করা মেয়েকেই বিয়ে করেছিল আবিরের বাবা। ভালই চলছিল সবকিছু। আবির জন্ম নেওয়ার পরেও সব ঠিকঠাক চলছিল।কিন্তু আবিরের বয়স যখন আটমাস,তখন ওর বাবা একটা জঘন্যতম অপরাধ করে ফেলে!!!আর সেটা ছিল ওনার চাকরি ছেড়ে দেওয়া।যেটার কারনে আবিরের বাবা আর মায়ের মধ্যে অহরহ ঝগড়া চলতে থাকে।

আরিফ সাহেব হচ্ছে আবিরের বাবা আর রেণু বেগম ছিল আবিরের মা।আবিরের মত ছোট একটা শিশুর তখন কোনো ক্ষমতাই ছিলনা তার বাবা-মায়ের ঝগড়া বুঝার।তাই সে বিছানায় শুয়ে হাত-পা নেড়ে খেলছিল।আররেণু বলে উঠল,”দেখো আরিফ,আমাদের কেবল একটা সন্তান হয়েছে।আর এখন তুমি চাকরি ছেড়ে দিলে কেনো? আমার কথা বাদ দিলাম,সন্তানটার ভবিষ্যৎ চিন্তা করলে না?”কথাটা শুনে আরিফ খুব রেগে যায় আর বলতে থাকে,”আমার সন্তান, আমার চিন্তা আছে।তোমাকে এ নিয়ে ভাবতে হবেনা।আর ওই অফিসে চাকরি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।  সারাজীবন বেকার থাকব,তবুও ওইখানে কাজ করতে পারব না।” রেণু কথাটা শুনে আরো রেগে যায়, “তারমানে তুমি আজীবন বেকার থাকবে!!!এইটাই তোমার সিদ্ধান্ত?? ” আরিফের মাথায় তখন রাগ উঠে গেছে, আর ও রেগে গেলে হিতাহিত জ্ঞান থাকেনা।

রেগে গিয়ে বলতে লাগল,”হ্যা করব না আমি কোনো কাজ।তোর সমস্যা!! ” কথাটা শুনেই রেণু কান্না করতে থাকে,” থাকো তুমি বেকার হয়ে, আমার কি! আমি চলে যাচ্ছি “।চলে যাওয়ার কথা শুনেই আরিফও ওর সাথে তাল মিলিয়ে বলল,”হ্যা যা, যা। আর কখনো আমার বাড়িতে পা রাখবি না” বলেই একটা বিশ্রী ভাষায় গালি দেয় আরিফ।সেটা শুনে কান্না করতে করতে আবিরকে নিয়ে বেড়িয়ে যায় ওর মা।শশুর-শাশুড়িকে বলে যায় যে,তাদের ছেলে একটা অমানুষ,এর সাথে সে থাকতে পারবে না। আবিরের দাদা-দাদী সেদিন রেণুকে বাধা দিয়েছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।রেণু ভেবেছিল হয়ত আরিফ বাধা দিবে,কিন্তু নাহ! আরিফ ওর রাগ নিয়েই ছিল। একবারের জন্যও রেণুকে বাধা দিয়ে বলল না যে,রেণু তুমি যেওনা। সেই যে রেণু গেলো বাপের বাড়ি,একদিন,দুদি ন,এইভাবে দুইমাস কেটে গেলো,আরিফ একবারের জন্যও রেণু বা ছেলের খোজ নেয়নি।

আরিফের বাবা-মা অবশ্য প্রায়ই বউমা আর নাতিকে দেখতে গেছে।কিন্তু আরিফের প্রতি রেণুর অভিমানটা বেড়েই যায়। আরিফও কোনো চাকরি না করার কারনেরেণুর সামনে যাওয়ার সাহস পায়না।কিন্তু রেণু ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা।সে ডিভোর্স চায় আরিফের কাছে।আরিফ অবাক হয়ে যায় রেণুর কথা শুনে।ও ভাবে রাগের মাথায় রেণু এসব বলছে।ও বুঝায় রেণুকে যে,আজ না হোক কাল ও কিছু একটা করবে।এখন আরিফের বাবাইতো সব খরচ দিচ্ছে।তাহলে সমস্যা কি! আর এখন তাদের জীবন আর তাদের নেই,ছোট্ট আবিরের জীবনটাও যে এখন তাদের সাথে জড়িত।কিন্তু রেণু এসব শুনতে নারাজ। কোনো বেকার ছেলের সাথে সারাজীবন কাটানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।রেণুর পরিবার তার পক্ষে।আরিফ কিছুতেই রেণুকে বুঝাতে সক্ষম হলোনা।অনেক বিচার- শালিশের পর রেণুই জিতে গেলো। ভালভাবেই তাদের ডিভোর্স হয়ে গেল।

এইবার ঝামেলা বাধল আবিরকে নিয়ে।তার মা তাকে নিতে নারাজ।আরিফের কোনো স্মৃতি সে তার জীবনে রাখতে চায়না।১০ মাসের আবিরকে সে নিজের কাছে রাখতে অসীকৃতি জানায়।আরিফের বাবা অনেক অনুরোধ করে রেণুর কাছে যে,কচি আবিরের কি দোষ! অন্তত ও একটু বড় হলে না হয় উনি নিজের কাছে নিয়ে নিবে।এতো ছোট বাচ্চাকে মা ছাড়া কীভাবে বড় করবে,যেখানে ওর মা বেচে থাকবে।কিন্তু আবিরের কপালে ওর মায়ের আদরটা নেই।তাই ওর মা ওকে আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলে দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করে।কর্মজীবী ছেলেকে বিয়ে করে সুখে সংসার করতে থাকে। আবিরকে নিয়ে আসার পরেই আরিফ নতুন একটা চাকরি নেয় শুধুমাত্র ছেলের জন্য।আরিফের মা-বাবা আবিরকে নিজের সন্তানের মতই বড় করতে থাকে।আবির মাঝে মাঝে ওর দাদীকেই মা ডেকে তৃষিত হৃদয় শান্ত করত।

আজ ওর দাদা-দাদী নেই।ওর বাবা আর দ্বিতীয় বিয়ে করেন নি, আবিরের জন্যই হয়ত আল্লাহতালা আরিফকে বাচিয়ে রেখেছেন।আবিরের পছন্দ করা মেয়ে কথার সাথেই ছেলের বিয়ে দিয়েছেন।আর নিজে গ্রামে চলে গেছেন।বাকি জীবনটা গ্রামের প্রকৃতি দেখেই কাটিয়ে দিতে চান।আবির প্রতিমাসে টাকা পাঠায় ওর বাবার জন্য।ওর বাবা ওকে সবসময় বলে যে,” বাবারে কথা মামুণিকে কখনো কষ্ট দিস না।মেয়েমানুষ পানির মতই সহজ আর বরফের মতই কঠিন।পানিকে তুমি ইচ্ছেমত আকার দিতে পারবে,কিন্তু একবার যদি তাকে বরফের মতো কঠিন বানাও তবে তা গলানোর উপায় ভুলে গেলেই শেষ,যদিও অল্প ভালবাসার তাপেই তা গলে যায়। ” আবির এসব ভাবতে গিয়েই কথার কথা মনে পড়ে গেল।আসলেই মেয়েটাকে সরি বলা উচিৎ। আবির ফোন দেওয়ার সাথে সাথেই কথা রিসিভ করল…

_সরি(কথা)
_তুমি সরি বলছ কেনো?(আবির)
_ভুলভাল কথা বলে ফেলেছি, তাই।
_আমি বলেছি?
_বললেইতো।
_কি বললাম?
_কিছুনা।তুমি খুব পচা।
_আর তুমি খুব ভালো?
_নাহ!
_তবে?
_আমি পচার বউ।
_হাহাহাহাহা!!! কি বলার জন্য ফোন করেছিলে?
_কিছুনা।
_বলো(ধমক দিয়ে)
_ধমক দিলে কেনো? বলব না।
_ওকে।সোনা বউ আমার বলো।
_আপনার শাশুড়ি কাল আমাদের এয়ারপোর্ট যেতে বলেছেন ওনার ছেলে আর ছেলে বউকে আনতে যাওয়ার জন্য।আপনি কি রাজি!!!

_কবুলবেগমসাহেবা।জো হুকুম রাণীসাহেবা। কথাটা শুনেই কথা সব অভিমান ভুলে হাসতে থাকে।ভুলেই যায় যে,কিছুক্ষণ আগেও আবির তাকে বকা দিচ্ছিল। আবিরও বুঝতে পারে যে,তার কথা কি চায়।ছোট্টছোট্ট ভালবাসা,মিষ্টি একটু শাসন,হাসিমুখে কথা,এইতো।খুবতো বেশি কিছু নয়।সব মেয়েইতো আর তার মায়ের মত স্বার্থপর হয়না।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত