বিষ

বিষ

আমি রাজ। পড়াশোনা শেষ করে আমার পারিবারিক ব্যাবসা টা দেখাশোনা করছি। আমি অনাথ। আমার আপন বলতে আল্লাহ্‌ পাক ছাড়া আর কেউ নেই। বাবা মা কে চার বছর বয়সে হারিয়েছি। আমার বেড়ে ওঠা আমার চাচার কাছে থেকে। তিনি আমার বাবার একমাত্র ছোট ভাই।

তার কাছে থেকেই বড় হয়েছি। কিন্তু আমার চাচি আমাকে প্রথম থেকেই সহ্য করতে পারতেন না। কোনো রকমে গ্র‍্যাজুয়েশন টা কমপ্লিট করে তাদের থেকে আলাদা হয়ে একা বেরিয়ে পড়লাম। আমি Established হবার পর পর এই আমার চাচা বাবার ব্যাবসা টা আমার হাতে বুঝিয়ে দেন। তখন কোনো কিছু বুঝতাম না একা একা থেকে। অভিভাবক এর শূন্যতায়। কিন্তু এখন নিজেকে সামলে নিয়েছি।প্রতিদিন নিজেকে এভাবে সামলে রাখতে হয়। বাবা মা এর জন্যে কষ্ট হয়। কিন্তু এখন আর কষ্ট পেলেও লাভ নেই কারন তারা আর নেই। প্রতিদিন নিজেকে নিজের অভিভাবক হিসেবে মেনে নিয়েই চলতে হয়। যাক, আমার জীবন সম্বন্ধে কিছুটা হলেও জানলেন। এবার গল্পে আসি। পরিচয় দিতে দিতে অফিসের জন্যে লেট হয়ে যাচ্ছে। আমি গেলাম। সকাল বেলা ব্রেকফাস্ট করেই অফিসের জন্যে বের হলাম। সাধারন দিন গুলোর মতোই আজ অফিস টা কাটলো। রাতে এসে না খেয়েই ডুবে গেলাম ঘুমের রাজ্যে। যেহেতু কেউ নেই বাসায় আমি একা ছাড়া তাই রান্না নিজে করা ছাড়া উপায় নেই। খুব অলস লাগছিলো। তাই আর রান্না করিনি। না খেয়েই ঘুমিয়ে গেছি।

পরদিন, পরদিন সকাল বেলা খেয়ে বের হলাম আবার অফিসের উদ্দেশ্যে। সারাদিন অনেক ব্যাস্ততার মাঝে দিয়ে কাটলো। বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হলো। গাড়ি টা চালাতে চালাতে ঘড়ি টা দেখলাম। দেখি ১০:৫৫ বাজে।  কিন্তু বাসায় যেতে একদম ইচ্ছে করছিলো না।ইচ্ছে হচ্ছিলো আরও লেট করে বাসায় যাই। এসব ভাবতে ভাবতে গাড়ি চালাচ্ছিলাম, হটাৎ দেখলাম ৩ জন ছেলে একটা মেয়েকে নিয়ে যেন কোথায় যাচ্ছে। মেয়েটা অনেক চেষ্টা করছে নিজেকে ছাড়ানোর। কিন্তু পারছে না। ছেলেগুলো অনেক খারাপ ভাষায় গালাগাল দিচ্ছে। আমি আর দেরি না করে কী হচ্ছে তা দেখার জন্যে গাড়িটা থামিয়ে গাড়ির হেডলাইট অফ করে দিলাম। তারপর স্টিয়ারিং এর উপর কিছুটা ঝুকে সামনে দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম মেয়েটা কে নিয়ে তারা রাস্তার পাশে একটা ঝোপে ঢুকতে যাচ্ছে। আমি আর দেরি করলাম না। বুঝে নিলাম আসলে কি হতে যাচ্ছে। আমি তৎক্ষণাৎ গাড়ি থেকে নেমে ছুটে গেলাম তাদের দিকে। আমাকে আসতে দেখেই ছেলে ৩টির মধ্যে থেকে একজন ছুরি নিয়ে আমার দিকে তাক করে বললো,

ছেলেটিঃ এই!!! আরেক পা এগুলে একদম জানে শেষ করে দেবো শালা। ভাগ,ভাগ এখান থেকে।

রাজঃ আপনারা কারা?  আর এই মেয়েটিকে এভাবে ধরে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিলেন?

ছেলেটিঃ সেটা তোর দেখার বিষয় না।

রাজঃ দেখুন, ওকে ছেড়ে দিন।

ছেলেটিঃ নাহলে? নাহলে কী? এই এই দেখ তোরা।

হিরো আসছে আমাদের থেকে ওই টারে বাচাইতে। এই বলে হেসে উঠলো।আমার পকেটে একটা ছুরি সবসময়েই থাকে। পকেটে নয়তো গাড়ির ড্যাশবোর্ড এ রাখি সেটা সবসময়।আত্নরক্ষার জন্যে। আমি অবস্থা বেগতিক  দেখে পকেট থেকে আমার ছুরি টা বের করে ওই ছেলে টা কে হুট করে পেছন দিক দিয়ে ধরলাম। আর ওর হাত থেকে ছুরি টা ফেলে দিলাম। তারপর আমার ছুরিটা দিয়ে ওর গলায় তাক করে বললাম,

রাজঃ এইবার!!!? এইবার কোথায় পালাবি?

মেয়েদের সাথে এরকম অসভ্যতামো করতে বাধে না? আজ তোর গলা কেটে ফেলে দেবো।আমার এরকম মুভমেন্ট বাকি ছেলেগুলো হয়তো আশা করেনি। তারা মেয়েটিকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেলো। আর সেই ছেলেটি আমায় বললো,

ছেলেটিঃ ছেড়ে দিন আমায় ভাই প্লিজ। আমি আর জীবনে কোনো দিন আপনার সামনে পড়বো না।

রাজঃ মেয়েটার পায়ে ধর। ক্ষমা চা। আর বল এসব আর কোনোদিন করবি না।

ছেলেটিঃআপু, আমাকে ক্ষমা করে দিন। এরকম আমি আর কোনো দিন করবো না। তারপর ছেলেটা কে আমি সজোরে একটা লাথি দিলাম। সে পালিয়ে গেল। তারপর মেয়েটার কাছে গেলাম। অনেক যায়গায় কেটে গেছে। আর রক্ত পড়ছে। টানা হ্যাচড়ার জন্যেই হয়তো ব্যাথা পেয়েছে ও আমি তাকে বললাম,

রাজঃ আপনি এখানে এতো রাতে কী করছিলেন আর ওরাই বা কারা?

মেয়েটিঃ ওরা খুব খারাপ। খুব বাজে। আমাকে আজ ওরা মেরেই ফেলতো। মেয়েটা কে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ও অনেক দূর্বল হয়ে পড়েছে।কথা বলার সময় কেমন যেন হাপিয়ে হাপিয়ে কথা বলছে। আর সমানে কেদেই চলেছে। তার এ অবস্থা দেখে তাকে আর সেখানে একা ফেলে যেতে ইচ্ছে হলো না। আর বখাটে দের স্বভাব খুব খারাপ। এরা একবার সফল না হলে বারবার এসব করে। আমি বললাম,

রাজঃ চলো।

মেয়েটিঃকিন্তু কোথায়? (অবাক হয়ে)।

রাজঃআমার বাসায়। আসো।

মেয়েটিঃকিন্তু….

রাজঃ আরে চলো তো। এই বলে আমি তার হাত ধরে নিয়ে গাড়িতে উঠালাম। তারপর আমি তাকে আমার বাসায় নিয়ে এলাম। মেয়েটার চোখে,মুখে বিস্ময়ের চিহ্ন। আর ভয় দেখতে পেলাম। আমি তাকে বাসার ভেতরে নিয়ে এসে শান্ত করার জন্যে বললাম,

রাজঃ ভয় পেয়ো না।তুমি এখানে নিরাপদ। শান্ত হও

মেয়েটিঃ(…… নিশ্চুপ….) আমি তাকে একটা পানির বোতল দিলাম খাবার জন্য। সে পানি খেতে লাগলো। আমি তাকে আবার ও বললাম,

রাজঃ আচ্ছা তোমার নাম কী? বললে না তো?

মেয়েটিঃ আমার নাম মোনা। মিরা জান্নাত মোনা।

রাজঃ আমার নাম রাজ।

আচ্ছা এতো রাতে তুমি ওইদিকে কী করছিলে আর একা একা কেনই বা গিয়েছিলে? তুমি কী জানতে না যে ওই রাস্তা টা ভালো না? বাসায় কে কে আছে তোমার?ওনাদের ফোন নাম্বার টা দাও। আমার এরকম প্রশ্ন করা দেখে মোনা মৃদু হেসে বলা শুরু করলো,

মোনাঃ আমার পরিবারে কেউ নেই। আমি অনাথ।

আমার বাবা মা নেই।আর আমার আত্নীয় স্বজন থেকেও নেই। আমার এক খালার কাছে আমি বড়ো হয়েছি। খুব কষ্ট করে বড় হয়েছি তার কাছে থেকে জানেন? সেটাকে ঠিক বড় হওয়া বলে না, সেটাকে বলে নির্যাতন।  দিনের পর দিন খালা আমাকে টর্চার করতো। আর সবাই বলতো কী জানেন? আমার বাবা মা মরার সাথে সাথে নাকি আমিও মরে গেছি। আমার খালু অনেক ভালো মানুষ। তিনি কোনো সময় খালার কথা প্রশ্রয় দিতেন না। তিনি আমায় খুব আদর করতেন। কিন্তু সেই শান্তি টাও কপালে জূটলো না। খালা আমাকে বাসা থেকে গয়না চুরির মিথ্যা অভিযোগে বের করে দেয়। আর খালু ও আমায় ভুল বুঝে। তারপর খালা আমাকে বাসা থেকে বের করে দেয়। তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো। আমি অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়তাম। কিন্তু পেট চালানোর জন্যে পড়াশোনা ছাড়তে হয়। আমি একটা রেস্টুরেন্ট এ ওয়েটার এর জব করতাম। সেখানে খুব একটা ভালোভাবে চলতো না আমার। তবুও কাজ টা ধরে রেখেছিলাম। ১ মাস করার পর থেকে একটু সমস্যা হতে লাগলো। এই কয়েকটা ছেলে আমাকে রোজ বিরক্ত করতো।  তারপর আজ এই ভাবে আমাকে এই বলে কাঁদতে লাগলো মোনা। আমি তখন তার এই ঘটনা গুলো শুনে অবাক হলাম। মেয়েটা কে দেখে বোঝা যাচ্ছে না যে তার সাথে এমন টা হয়েছে। সত্যিই বাবা মা না থাকলে দুনিয়াতে নিজেকে খুব অসহায় লাগে। আমার মতন কাউকে খুজে পেলাম যে কি না আমার মতনই অনাথ। আমি তারপর বললাম,

রাজঃ আমিও তো অনাথ। আমার বাবা মা কেউ নেই। ছোট বেলা তেই তাদের হারিয়েছি। আমিও তোমার মতই।

মোনাঃ আপনার ও মা বাবা নেই?

রাজঃ নাহ। আমার কেউ নেই। নিজের কাছে নিজেকে ছাড়া আর কেউ নেই আমার।

মোনাঃ থাকেন কী করে একা একা?

রাজঃসয়ে গেছে সব। আচ্ছা শোনো । তুমি আর ওই দিকে যাবে না।

মোনাঃ মানে?

রাজঃ হ্যা, যা বলছি তাই।তুমি আর সেখানে যাবে না ঘুরে। তুমি আমার এখানে থাকবে। আর এটাই হলো আজ থেকে তোমার নতুন বাড়ি। আর তুমি আমার অফিসে কাল থেকে জয়েন করবে। সেখানে চাকরী করবে। আর এখানে থাকবে। মোনার চোখে মুখে অনেকটা স্বস্তি দেখলাম।

আর কিছুটা ভয় ও দেখতে পেলাম। হয়তো আমি অচেনা একজন তাই ভয় পাচ্ছে। আজ যদি তাকে না বাঁচাতাম তাহলে কী সর্বনাশ টাই না হতো। যাক, আল্লাহ্‌ পাক যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। আমার বাসায় মোট পাঁচটা রুম ছিলো একটা ড্রয়িং রুম, দুটো বেডরুম, একটা কিচেন আর একটা ডাইনিং রুম। আমি পুরো বাসা টা তাকে দেখালাম। তারপর আমার পাশের রুম টা গুছিয়ে দিলাম তার জন্যে। তারপর রাতে রান্না করে নিলাম। তাকে খেতে দিলাম। আমিও খেয়ে নিলাম। মেয়েটার হাতের অনেক যায়গায় কেটে গেছে। সেগুলো তে স্যাভলন লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলাম। তারপর তাকে ঘরে পাঠিয়ে দিলাম। রাতে শুয়ে শুয়ে আজকে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা গুলো ভাবতে লাগলাম। আস্তে আস্তে দু চোখের পাতা লেগে আসছিলো। ধিয়ে ধিরে ঘুমিয়ে গেলাম। সকাল বেলা, সকাল বেলা ঘুম ভাঙলো একটা মেয়েলী কণ্ঠে, কণ্ঠটা খুব মিষ্টি। চোখ খুলতেই দেখি মোনা চা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি উঠে তার হাত থেকে চা এর কাপ টা নিলাম, আর বললাম,

রাজঃ আরে, তুমি চা করতে গেলে যে? আর তোমার হাতে তো ব্যাথা। এগুলো নিয়ে কিচেনে গেলা কেন?

মোনাঃ কেন? আপনিই তো কাল রাতে বললেন যে এটা নাকি আমার নতুন বাড়ি। তাহলে আমি তো এটুকু করতেই পারি।

রাজঃহুম।

তা ঠিক। আমি যতটুকু বুঝলাম মেয়েটা খুব মিশুক। খুব সহজেই মিশে যায়। হয়তো তার ভেতর এখন আর সেই ভয়টা নেই যেটা কাল রাতে ছিলো। আমি তারপর ফ্রেশ হলাম। ব্রেকফাস্ট করে মোনা কে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। প্রথমেই গেলাম শপিং মল এ। কারণ মেয়েটার পরনে একটাই জামা। তার কিছু কেনাকাটা দরকার। প্রথমে নিতে রাজী হচ্ছিলো না। আমার ধমকে সে বাধ্য হয়েই নিলো। তারপর সেখান থেকে রওয়ানা হলাম অফিসের উদ্দ্যেশ্যে। মোনা খুব অবাক হলো আমার কান্ড দেখে। তাকে নিয়ে গেলাম আমার অফিসে। তারপর তাকে জব ও দিয়ে দিলাম। ও এখন থেকে আমার সহকারী হিসেবে নিয়োজিত। আমি অফিসে না থাকলে ও আমার কাজটা করে নিতে পারবে। সবাইকে বলে দিলাম ওর কথা। ও আজ থেকে অফিসে কী কী করবে, ওর কাজ গুলো ওকে বুঝিয়ে দিলাম। তাকে জয়েন করিয়ে নিলাম অফিসে। তারপর রাতে একসাথে অফিস থেকে বের হলাম।

বাসায় চলে আসার পর মোনা চেঞ্জ করে কিচেনে চলে গেলো রান্না করতে। আমি বারন করা সত্ত্বেও মানলো না। তার একটাই কথা,” আপনি বলেছেন এটা আমার নতুন বাড়ি, তাহলে আমি এখন যা খুশি তাই ই করবো”। হাহা সত্যিই মেয়েটা অনেক অদ্ভুত।  সব জায়গা তেই মানিয়ে নিতে পারে। জানিনা এই এক দিন এ কতটুকু জানতে বা চিনতে পেরেছি মোনা কে কিন্তু এটুকু আমি জানি যে মেয়েটা অনেক ভালো।  এভাবেই কাটছিলো আমাদের দুই অনাথের দিনগুলি। আস্তে আস্তে মোনা আর আমি অনেক ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। সে আস্তে আস্তে আমার সাথে অনেক ফ্রি হয়ে গিয়েছিলো। একজন আরেকজন এর খেয়াল রাখা,কেয়ারিং, খুশি, দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়া, একে অপরের মুখে হাসি ফোটানো এভাবেই চলছিলো প্রতিটা দিন। হ্যা শুরুতে আমি তাকে এখানে নিয়ে এলেও, আমার একটু মানিয়ে নিতে সংকোচ হতো বটে, কিন্তু মোনা তা দূর করে দিয়েছে। এখন আর আগের মতো ফিল হয় না। এখন মনে হয় খুব ভালো একটা বন্ধুর সাথে আছি। আমার সুখ -দুঃখের ছায়া এখন মোনা, আর মোনার ছায়া হলাম আমি। অনাথের কেউ নেই। আর আমরাও তো অনাথ। আমাদেরও কেউ নেই একজন আরেকজন কে ছাড়া। এভাবে সময়ের মতো সময় আপন গতিতে কেটে গেলো। কেটে গেলো ৮ টা মাস।

এই ৮ মাসে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে মোনার মধ্যে।মোনা এখন আর সেই আগের মোনা নেই। সে অনেক বদলে গেছে। সে আমার প্রতি আরও বেশি কেয়ারিং হয়ে পড়েছে। আমি কখন কী করছি, খেয়েছি কী না, আমার অফিসের সব দরকারী ডকুমেন্ট কোথায় কী আছে, সব কিছুর প্রতি সে অনেক কেয়ারফুল। অনেক খেয়াল রাখে ও আমার। আর এখন ও আর আগের মতো সংকোচ বোধ করে না। অধিকার টা খাটানো সে শিখে গেছে। আর এ দিক টায় আমিও খুব খুশি। কিন্তু তার কেয়ারিং টা যেন একটু বেশিই। আমাকে ছাড়া একটু ক্ষণ ও থাকতে পারে না। আর ও এখন আমায় আপনি করে বলেনা, তুমি করে বলা শুরু করে দিয়েছে। আমরা দুজন একসাথে থাকলে ফাজলামি,বাঁদরামি, দুষ্টুমি,খুনসুটি লেগেই থাকে। একদিন রাতের বেলা, সকাল বেলা আমি আর মোনা অফিস এর জন্যে বের হলাম। সারাদিন অনেক কাজের ঝড় গেলো আমাদের ওপর দিয়ে। একটা প্রেজেন্টেশন মিটিং ছিলো। সেটা পুরোটা সামলে নিয়ে ডিল টা কনফার্ম করলাম।।

অনেক টায়ার্ড ছিলাম আজ। মোনাও ভীষন ক্লান্ত। রাতে বাইরে থেকে খেয়ে বাসায় এলাম। বাসায় এসে কিছুক্ষন বসে তারপর ফ্রেশ হয়ে নিলাম যে যার রুম এ গিয়ে। তারপর শুয়ে পড়লাম। গভীর রাত।  আশেপাশে সব কিছু নিরব। বাইরে বৃষ্টির শব্দ গুলো পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে অনেক গড়াচ্ছি।কিন্তু ঘুম আর আসছে না। শুয়ে থেকে কিছু ভালো লাগছে না। তাই অগত্যা উঠেই পড়লাম। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি টার রুপ কি সুন্দর। পুরোটা আকাশ জুড়ে কালো মেঘের গভীর আচ্ছাদন এ বিস্তৃত হয়ে আছে। সিংহের গর্জন এর চেয়েও মারাত্নক কালো মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। আমি আকাশ দেখা তে মগ্ন ছিলাম। সেই মুহূর্তে মোনা আমার রুমে এলো। আমিও তার দিকে তাকালাম। দেখে মনে হচ্ছিলো কোনো পরী আকাশ থেকে নেমে আমার রুমে নেমেছে। সাদা রঙ এর একটা জামা পড়ে, চোখে কাজল দিয়ে,আর কপালে ছোট্ট একটা টিপ দিয়ে এসেছে। অনেক সুন্দর লাগছিলো তাকে।।

আমি তার দিকে তাকিয়েই রইলাম। সে ধিরে ধিরে আমার দিকে এগিয়ে এলো। এসে আমার দিকে কিছুক্ষণ নিরব হয়ে তাকিয়ে রইলো। তার চোখের ভাষা গুলো কেন জানিনা আজ আমি সঠিক ভাবে পড়তে পারলাম না। তার চোখ গুলো আজ অন্যকিছু বলছিলো। এই ভাষাটা পড়ার সাধ্য আমার ছিলো না। সে আমার হাত দুটো কে তার হাতের মধ্যে আবদ্ধ করে নিলো। আর তারপর আমার দিকে আরও কাছে আসতে চাইছিলো। আমি পেছনে যাবার চেষ্টা করতেই কিছু একটার প্রবল ধাক্কা অনুভব করলাম বুকের মধ্যে। সোজা গিয়ে বিছানায় পড়লাম। তারপর ওঠার চেষ্টা করতে গিয়েও পারলাম না। মোনা আমার বুকের ওপর শুয়ে পড়লো। মাথা টা তুলতেই কোনো এক অজানা শিহরণ এ সারা শরীর যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো আমার। মোনা তার ঠোট জোড়া আমার ঠোট জোড়া তে মিশিয়ে নিলো। অনেক্ষণ পর সে আমায় ছেড়ে দিয়ে আকড়ে ধরে বললো,

মোনাঃ রাজ? কিছুই কী বোঝো না তুমি?

রাজঃকী বুঝবো?

মোনাঃ ভালোবাসি। তোমাকে ভালোবাসি।  নিজের থেকেও বেশি।

রাজঃ আমি বুঝতে পেরেছিলাম সেটা।

মোনাঃ তাহলে বলো নি কেন? আজ লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে নিজেই চলে এলাম তোমাকে বলতে। আমি আর থাকতে পারছিলাম না এভাবে। তাই আজ এভাবে এলাম তোমার কাছে। রাজ? একটি বার বলো? ভালোবাসি। প্লিজ।

রাজঃ জানিনা কেন মোনা। আমি তোমায় ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না। তোমাকে ছাড়া আমি থাকতে পারি না।। তুমি আমার জীবনে আসার পর আমি টের পেয়েছি যে বন্ধুত্ব কী, ভালোবাসা কী, একসঙ্গে থাকার মানে কী। হ্যা আমিও ভালোবাসি তোমাকে। কিন্তু বলতে পারিনি। শত হোক, তুমি যদি চলে যেতে তাহলে আমি একা একা থাকতে পারতাম না। তুমি ভুল বুঝলে আমি কী করতাম তুমিই বলো?

মোনাঃ এতো কিছু বুঝে নেয়া টা ঠিক নয়।

রাজঃ I’m sorry….

মোনাঃ রাজ?

রাজঃ হুম?

মোনাঃ তুমি কী জানো? আমার ভেতর টা পুড়ে গেছে? ভালোবেসেও না বলতে পারার দহন টা বোধহয় সহ্য করার মতো নয়। আমি তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত। শুধু তোমার জন্য। এই তৃষ্ণা শুধু পানি খেলে মিটবে না, এই ক্ষুদা শত খাবার খেলেও মিটবে না।। কি করে মিটবে জানো? ভালোবাসা পেলে মিটবে। বুকের বাম পাশে যে আগুন টা জ্বলেছে তা ঠান্ডা করতে পারো একমাত্র তুমি। খুব ভালোবাসি তোমাকে আমি। আমায় ছেড়ে যাবা না তো কোনো দিন? বলো?

রাজঃ না। কোনো দিন ও যাবো না পাগলী আমার। তোমায় ছেড়ে গেলে আমি বাচবো কি করে?? তোমার আমি আছি,  আমার তুমি আছো। চলো, একে অপরের ভরসা হয়ে সামনের দিন গুলোকে একসাথে কাটাই।

মোনাঃ তোমার মতো মানুষ পাওয়া খুব দুষ্কর। একা একটা মেয়েকে নিয়ে নিজের কাছে রাখলে। সব দিক দিয়ে খেয়াল রাখলে। তাকে আগলে রাখলে। ভরসা করলে। তুমি আমাকে তোমার প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছো।

রাজঃহা হা হা।

মোনাঃ এই হাসলে দাত গুলো ভেঙে ফেলবো। শয়তান একটা। আমাকে জ্বালিয়ে এখন হাসা হচ্ছে তাই না?

রাজঃ ওকে সরি সরি।

মোনাঃ আচ্ছা রাজ?

রাজঃহুম?

মোনাঃ আমার রুপ এ কী বিষ আছে?

রাজঃ না। কোনো বিষ নেই। আর যদি থাকেও, সেটা হলো পবিত্র বিষ। যা সেবন করলে মৃত্যু নয়, নতুন জীবন পাওয়া যায়।

মোনাঃ সত্যিই তুমি অনেক ভালো।খুব ভালোবাসি তোমায়। আমি নিজে মরে হলেও তোমার খেয়াল রাখবো কথা দিলাম।

রাজঃচুপ। একদম চুপ। এসব বলো না। যা হয়েছে সব বাদ দাও। নতুন করে পথচলা শুরু করো আবার। ৩ বছর পর..

অদ্রিতাঃ আ.. ম্মু…আ…ম্মু দে..খেছো? বা..বা উ..ঠতে না. উহুউহুহুহু। বা..বা তা খু..ব পতা। বা….বা পতা…পতা পতা.. (কেদে কেদে)।

মোনাঃ না মা কাদে না লক্ষী সোনা। তোমার বাবা উঠছে না তাই না? দাড়াও পানি ঢেলে দিচ্ছি এক্ষুনি ওর মাথায়। মোনা যেই জগ টা নিতে যাবে তখনই আমি তাকে টেনে আমার কাছে নিয়ে এলাম। সে বললো,

মোনাঃউফফ!!! এই ছাড়ো। ছাড়ো বলছি। সুযোগ পেলেই খালি দুষ্টুমি? ছাড়ো।

রাজঃ তোমাদের দুই মা মেয়ের কান্ড দেখে তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম গো। যদি পানি ঢেলে দিতা তাহলে তো আমি যেতাম ডুবে।

মোনাঃ হিহিহিহ তুমিও না। সত্যিই।

রাজঃএই মোনা(জড়িয়ে ধরে)

মোনাঃ ওই? কী?

রাজঃএকটা ইয়ে দাও না?

মোনাঃ এইই। একদম না। তারপর আমার পাগলীটা কে একটা ইয়ে দিলাম। তখন দেখি অদ্রিতা লাফাচ্ছে। আর জোরে জোরে হাত তালি দিচ্ছে। আর বলছে,

অদ্রিতাঃ বা..বা.. মা.আ কে হামি খে.য়ে..তে।

কি..মতা। কি দা..রুন মতা। হিহিহিহিহিহি। আর এদিকে তাকিয়ে দেখি মোনা লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে ও চলে গেল। তারপর অদ্রিতা কে আদর করলাম।  ও হলো আমাদের, আমার আর মোনার মেয়ে। অদ্রিতা। আমাদের আদরের মেয়ে। খুব পাকা পাকা কথা বলে এই বয়সেই। ওর মিষ্টি মিষ্টি কথা গুলো শুনলে মন টাই ভালো হয়ে যায়।  আগলে রেখেছি আমি আমার পরিবার কে। এতো দিনে নিজেকে একজন সফল মানুষ হিসেবে নিজের কাছে মনে হচ্ছে। মোনা আর অদ্রিতা আমার সব।

আমি এমন একটা বিষের উদাহরণ পেয়েছি যেই বিষ সেবন করলে মৃত্যু হয় না। পেয়েছি একটা নতুন জীবন। আসলে কী জানেন? বিষ কোনো অসহায়ের ভেতর থাকে না। থাকে সমাজের বিষধর সাপের থেকেও ভয়ংকর মানুষ গুলোর কাছে। যারা নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে অন্যের ক্ষতি করতেও বাদ রাখে না।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত