সাদা শাড়ি

সাদা শাড়ি

রিফাত আমার জানের দোস্ত। আমরা ছেলেবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি। একসাথে প্রাইমারী, হাই স্কুল এবং কলেজে পড়েছি, ইভেন আমাদের দুজনের রোল নাম্বার সিরিয়ালটা অবদি পাশাপাশি ছিলো। সারাদিন একসাথে ঘোরাফেরা একসাথে খাওয়া একরকম ড্রেস পরা সবকিছুই একসাথে ছিলো। কোনোদিন কোনো বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে বড় কোন ঝগড়া হয়নি। আমাদের বন্ধুত্বটা ছিলো ভাই ভাইয়ের মতো। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঠিক করলাম বিশ্ববিদ্যালয়টা’ও একসাথে পড়বো। তাই আর ঘটা করে পাবলিকে চেষ্টা না করেই ঢাকাতে ভালো প্রাইভেট একটা ইউনি’তে এডমিশন নিয়ে নিলাম।

আজকে আমাদের ওরিয়েন্টশন ক্লাস। দুজন একসাথেই বসছি। এক এক করে স্টুডেন্টস ক্লাসে ঢুকতেছে। হঠাৎ রিফাত আমাকে চিমটি কেটে বেগুনী রঙের আর হালকা কালো মিক্সড ড্রেস পরা একটা মেয়েকে দেখালো। আমি প্রথম দেখেই ক্রাশ খাইয়া ফিদা। রিফাত বলতেছে এটা তর ভাবী, দেখে রাখিস কেউ যেন না তাকায়। আমি বললাম হা সেটাই বলছিলাম, তুই তাকালে চোখ তুলে ফেলবো। তর ভাবীর দিকে একদম নজর দিবিনা। দুজনেই প্রচন্ড জোরে হেসে উঠলাম। তারপর ম্যাম ক্লাসে ঢুকলো। সবাই নীরবতা পালন করছে। ম্যাম পরিচয় জানতেছে এক এক করে। আমি আর রিফাত অপেক্ষা করতেছিলাম ওই মেয়েটির নাম পরিচয় জানতে।

অবশেষে জানতে পারলাম উনার নাম রাইশা। আমি বললাম ওয়াও! দেখছস হারামী, ওর নাম রাইশা। রবিন আর রাইশা দুটোই ‘র’ দিয়ে। তুই আশা ছেড়ে দে। তখন রিফাত বললো হারামজাদা আমার নাম তাহলে কি দিয়ে? আবারো উচ্চস্বরে হাসি। দুটোকেই ম্যাম দাড় করালো এবং বললো আমরাও হাসবো প্লিজ আপনারা কেনো হাসতেছিলেন বলেন। তখন রিফাত হারামীটা বলে উঠলো ম্যাম রবিন আপনার উপর ক্রাশ খাইছে। এবার পুরো তবলা হয়ে গেলাম আমি। যদিও ম্যাম ইউজড টু সম্ভবত, তাই কিছু আর বললেন না। তবে রিফাতের উপর মেজাজটা খুব খারাপ হয়েছিলো। কারন রাইশা আমার দিকে তাকিয়ে হাসতেছিলো। পুরু ক্লাসটাই হাসিতে হাহাময় হয়ে গেছিলো।

একদিন আমি ভার্সিটিতে যেতে পারি নাই। সেদিন রিফাত রাইশার সাথে পরিচিত হয়ে গেলো। আমার সেদিনের জন্য খুব খারাপ লাগছিলো ক্যান জানি। যদিও পরের দিন রিফাতই আমাকে রাইশার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। এক সুযোগে অনেক আড্ডা টাড্ডা দিয়ে আমরা অনেক ভালো ফ্রেন্ডস হয়ে গেলাম। তারপর থেকে আমাদের তিনজনের আড্ডা ঘোরাফেরা গ্রুপ স্টাডি খুব জমেছিলো। রিফাত ইদানিং অনেক কনচার্ন পড়াশোনায়। খুব ঘেষে ঘেষে থাকছে রাইশার সাথে। এই প্রথম রিফাতকে আমার অসহ্য লাগতে শুরু করে। অনেকদিন আমি যে যে প্লান করি প্রায় একই প্লান করে বসে থাকে আগে থেকেই রিফাত। রাইশাকে একা আর পাচ্ছি না। আস্তে আস্তে রিফাত আমার অপছন্দের একটা কারন হয়ে দাঁড়াচ্ছিলো। হেরে যাওয়াটা আমার খুব অসহ্য লাগে। জীবনে আমি হারটাকে এক্সেপ্ট করিনি। এক মার্ক হলেও রিফাত আমার চেয়ে কম পেয়েছে। আজ রিফাত রাইশাকে পেয়ে যাবে এটা মানতে পারছি না।

রাতে ঘুম আসেনা আমার। খুব অশান্তি লাগে। রিফাত অনেক প্রফুল্ল থাকে। আমার কিছুই ঠিক নাই। বারান্দায় এসে একটা সিগারেট ধরালাম। বসে বসে ভাবছি কি করবো। রিফাত আজকাল আমাকে রেখেই ভার্সিটিতে চলে যায়। অনেক প্ল্যান করে। ভার্সিটির একটিভ একটি ছেলে এখন রিফাত। কিছুদিন পর স্টাডি ট্যুর আমাদের। আর ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পরেছে রিফাত আর আমার উপর। সঙ্গত কারণেই আমি রিফাতের সাথে থাকায় এই দায়িত্বটা পাই। ভোরে সবাই গাড়িতে উঠার সময় ফুল দিয়ে সংবর্ধনা জানানোর একটা প্ল্যান করলাম। দুটো গোলাপ আগে থেকেই ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম রাইশাকে দেয়ার জন্যে। ঠিক একই প্ল্যান রিফাত’ও যে করে রেখেছিলো সেটা জানলাম যখন আমি আর রিফাত একসাথে রাইশাকে ফুলটা দিলাম। নাহ আর পারছি না রিফাতকে নিয়ে।

ট্যুরটা একদম বাজে কাটলো আমার। সারাক্ষণ রিফাত রাইশার সাথে সাথেই ছিলো। রাতে বাসায় আসলাম। রাগে গা পুড়তেছিলো। আরো রাগ উঠলো যখন রিফাত বললো কিরে ট্যুরটা কেমন হলো? আমার তো সেই হলো। তখন রাগে বলেই ফেললাম, রাইশার সাথে চিপকাই ছিলিতো সারাক্ষণ ভালো কাটারই কথা, তাইনা? এবার রিফাত বললো তুই কি সত্যি রাইশাকে ভালোবাসিস রবিন? আমি আর কিছু বললাম না। তখন রিফাত নিজ থেকেই বললো আমিও রাইশাকে পছন্দ করি দোস্ত। এক কাজ করতে পারি আমরা। সামনে ভালোবাসা দিবস, সেদিন তুইও প্রপোজ করবি আমিও করবো, দেখি কারটা রাইশা এক্সেপ্ট করে। জানি দুজনকেই এক্সেপ্ট করবেনা। কারো প্রতি অবশ্যই সে কিছুটা হলেও উইক। আর হা যদি কাউকেই এক্সেপ্ট না করে তাহলে আমরা সারাজীবন এমনটাই বন্ধু হয়ে থাকবো। আর যেকোন একজনকে এক্সেপ্ট করলে, নাহয় কেউ একজন সেক্রিফাইস করবো। এটা বলে ঘুমিয়ে পরলো রিফাত।

এবার মূখ্য সময় আমার। আমি একটা প্ল্যান করে ভালোবাসা দিবসের ঠিক দুদিন আগেই একটা সুযোগে রাইশাকে প্রপোজ করে ফেলি। রাইশা আমাকে ভালোবাসা দিবসের দিন তার উত্তর জানাবে বললো। কারনটা রাইশা ফিল করতো। এক্সেক বুঝতে পারতোনা আসলে রিফাত না’কি আমি তাকে ভালোবাসি। এবার সে নিশ্চিত হলো আমার প্রপোজাল পেয়ে। আমার অনেক ফ্রেশ লাগতেছে, অনেকদিন পর এই কাজটা করতে পেরে। আজকে ভালোবাসা দিবস। আমার আর রিফাতের চুক্তির ফলাফলের দিন। রিফাত আমাকে আগে প্রপোজ করতে পাঠাইছে। বোকাটা এটা জানেনা আমার কাজ শেষ দুদিন আগেই। তাও গেলাম, রাইশা আমার পাশেই বসা। ওকে দামি একটা হ্যান্ড ওয়াচ পরিয়ে গোলাপ ফুল দিয়ে আবার প্রপোজ করলাম। এক্সেপ্টেড।

আজকে আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সফল ব্যাক্তি মনে হচ্ছে। রিফাত আসলো। আশা মাত্রই রাইশা বললো রিফাত জানো এই রবিন পাগলটা আমাকে এতদিন ধরে ভালোবাসে অথচ বললো গত পরশু। আমিতো আরো ভাবতাম ইউ লাইক মি। এবার রিফাতের দিকে আমার তাকাতে লজ্জা হচ্ছে। রিফাত একটা অজুহাত দেখিয়ে চলে গেলো। তারপর থেকে রিফাত অন্যরকম হয়ে যায়। বাসাটা ছেড়ে দিয়ে চলে গেলো তারপরদিন’ই। আমার সাথে খুব কম কথা বলে। রাইশার সাথেও কথা বলেনা। রাইশাকে ওর নামে আজেবাজে বলে বুঝ দিয়ে রাখি আমি, বলি শালা বন্ধুত্ব চিনে নাকি। অনেকদিন আর খুঁজ নেয়া হয়’না। এক সেমিস্টার গ্যাপ হওয়ায় ক্লাস সিডিউল’ও চেঞ্জ।

আজকে সতেরো দিন রিফাতের নাম্বার বন্ধ। রিফাত ইতিমধ্যে দুই সেমিস্টার গ্যাপ দিয়ে দিছে। এতোদিন খেয়াল করি নাই। আজকে রাইশা আর আমার লাভ এনেভ্যারসারি। ভাবলাম আজকে রিফাত আমি আর রাইশা একসাথে ঘুরবো। কিন্তু রিফাতের কোন হদিস পাচ্ছি না। রিফাতের খুঁজে ওর বাবাকে কল দিলাম, তারপর আর নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলামনা। রিফাত হসপিটালে এডমিট অনেকদিন ধরে। অতিরিক্ত এলকোহল আর নেশায় আসক্ত হওয়ায় দুটো কিডনি’ই ডেম্যাজড। আমি এতদিন কোথায় ছিলাম? ভাবতেই পারছিনা, দৌড়ে হসপিটাল গেলাম। আঙ্কেল আমাকে দেখে কেঁদে কেঁদে বলতেছে তোমার ভরসায় ছেলেকে শহরে পাঠিয়েছিলাম আর তুমিই ওর ব্যাপারে কিচ্ছু জানোনা? আমার খুব কান্না পাচ্ছে। আমি আমাকেই চিন্তে পারছি না। রিফাত তো আমার জান ছিলো। আমি এমনটা কখন হলাম। খুব ভয়ে ভয়ে ক্যাবিনে ঢুকলাম। রিফাতকে চিনতে পারছিনা। ডায়ালাইসিস নিয়ে সুন্দর ছেলেটা আজ শুকিয়ে এটুকুনু।

কাছে এসে বসলাম। হাত দিয়ে ইশারা করলো মুখের কাছে কান নিতে। ফিসফিস করে বললো কেমন আছিস বন্ধু? তর রাইশা কেমন আছে? পৃথিবীর সব কান্না আজ আমাকে ডুকরে দিচ্ছে, আমি তাকাতে পারছিলাম না রিফাতের দিকে। আবার বললো লাস্ট একটা কমিটমেন্ট করবো দোস্ত বেইমানী করিস না প্লিজ। আমি কাঁদতেছি, বললাম আর কোনদিন করবো না এমনটা, তুই সুস্থ হয়ে যা ভাই। রিফাত বললো শোন, আমি মরে গেলে আমার কবরের পাশে একটা গোলাপ ফুলের গাছ লাগাবি কথা দে। গোলাপ রাইশার খুব পছন্দের। আমি হাউমাউ করে কাদঁতেছিলাম। রিফাত তর কিচ্ছু হবেনা, তুই এসব বলিস না।

রিফাত কিছুদিন পরেই চলে গেল। আজ অনেকদিন পর রিফাতের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাদঁতেছি। সাথে করে আকাশটাও। খুব বৃষ্টি হচ্ছে। রাইশাও আমাকে ভুলে অনেক আগেই চলে গেছে। বিয়ে করে নাকি কানাডায় স্যাটেল্ড। আমি কাউকে’ই পেলাম না। আমি আমার মোহে পড়ে সব হারালাম। আজকে এই বিশ্বাসঘাতক আমাকে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে। চিৎকার করে কাঁদতেছি। রিফাত তুই ক্ষমা করে দে ভাই আমার। খুব দূরে ঝাপসা অবয়ব দেখা যাচ্ছে রাইশার মতো কেউ একটা সাদা শাড়ী পরে আকাশের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাদঁতেছে।

গল্পের বিষয়:
দু:খদায়ক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত