আমার ফিরে পাওয়া ভালবাসা

আমার ফিরে পাওয়া ভালবাসা

-এই শোন?
-হুম, বল।
-চাদরটা দাও তো?
-না দেব না!
-কেন?
-বারে, আমার বুঝি শীত করে না?
-তাহলে, তোমার চাদরের নিচে আসি?
-হুম আস!
-উহু,দুষ্টামি করলাম!
-তাহলে তোমার ঐ বোছা নাকটা আরও বোছা করে দেব।
-শোনো?
-হুম, বল!
-আমি দুষ্টামি করব না, শুধু তোমার উরুর উপর একটু মাথা রেখে দিব।আর তুমি আমার চুলে বিলি কেটে দিও!
-আচ্ছা দিব!
-যদি দুষ্টুমি করে তোমার ঠোঁটের লিপিস্টিক খেতে চাই।ভালবাসার সিক্ত উষ্ণতার ছোঁয়া দিতে চাই।তুমি কি রাগকরবে?

-হুম করব। (লজ্জায় রাঙ্গা হয়ে)
-কেন?
-কারন ফাজিলের পেটে লিপিস্টিক সহ্য হয় না।আর ফাজিলের কোন উষ্ণতার আমার প্রয়োজন নেই।
– কি আমি ফাজিল?
-হুম, অবশ্য ফাজিল একটা পোলা!
-ঠিক আছে আমি ফাজিল তোমার সাথে কোন কথা নেই।
-ঠিক আছে কথা বলতে হবে না, শুধু চাদরের নিচে আসলেই হবে।

স্যার,ক্যান্টনমেন্ট চলে এসেছি। সামনেই মনে হয় ম্যাডামের বাসা (ড্রাইভার বলে উঠল) কতক্ষণ যে এভাবে ঝিম মেরে বসে উপরের কথাগুলো ভাবছিলাম তা কে জানে। রাত দশটায় ইরাদের বাসা উদ্দেশ্য রওনা হয়েছিলাম।

ঘড়ির কাঁটাটা ভোর সাড়ে ছয়টা ছুই ছুই করছে। কুয়াশার চাদরে মোড়ানো চারপাশটা। মাঘ মাসের শীত হয় অনেক আজ কাল কুয়াশাও পড়ছে বড্ড বেশী। খুব শীত করছে গায়ে ইরার প্রিয় নেভী ব্লু কালার এর সার্ট ছাড়া আর কিছু নেই। এখান থেকে রাস্তার পাশের সারি সারি বাড়িগুলো আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে শীতে। সামনে কিছু দূর গেলেই হয়ত ইরা কে পাওয়া যাবে। বলছিলাম ইরার কথা। তখন ভার্সিটিতে ২য় বর্ষে পড়ি। শখের বসে একটু আধটু লেখালিখি করতাম। একটা পর্বের গল্প পড়ে ইরা আমাকে টেক্স করে। জানতে চায় আমি লেখক কি না? বাকি পর্ব কোথায় পাবে? খুব অল্প সময়েই আমাদের পরিচয়টা ভালবাসায় রূপ নেয়। আমরা কখনও কারও কোন ছবি বা কখনও দেখা করিনি।সারা রাত ভালবাসার কথা ঝগড়া মান-অভিমান করে কাটিয়ে দিতাম। একদিন আমি সারা দিন ফেসবুকে আসিনি।

একটা জরুরী কাজ ছিল, পরদিন ফেসবুকে এসে দেখি মেয়েটা আমাকে অনেকগুলো টেক্স করছে সবগুলো টেক্সে যেন মেয়েটার মন ভাঙ্গার কথা বলে যাচ্ছে। (আমরা কথা বলতাম ম্যাসেন্জার এ) যদিও ইরা আমার নাম্বার নিয়ে ছিল, কখনও ফোন দেয়নি। সেদিন আমার ফোনেও চার্জ ছিল না, এমন কি সেদিন বিদ্যুৎ ও ছিল না। অনেক কষ্টে মেয়েটার অভিমান ভাঙ্গাতে পেরেছিলাম। তারপর হাজারও কথার ফুল ঝুরিতে কেটে গেছে ঘুমহীন কত রাত তার কোন হিসাব নেই। যদি আমার জন্মস্থান কুড়িগ্রাম, লেখাপড়া করার জন্য ঢাকায় থাকতাম। আর ইরার জন্মস্থান লেখাপড়া সব কুমিল্লাতেই। ইরা বড় লোক বাবার একমাত্র মেয়ে। যদিও ওর বাবা অনেক আগেই ওদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছে, বড় দুই ভাই মা, আর পিচ্চি আর একটা ভাই কে নিয়ে ওদের সুখি পরিবার। অপর দিকে আমি বড্ড হতভাগা। বাবার সুদের টাকা কে ভালবাসতাম না তাই ঢাকায় পরে আছি ভালবাসার মা,ছোট ভাই বোন দুটো কে দূরে রেখে।আমার মনের সকল কষ্টগুলো ইরার ভালবাসার কথায় ভুলে যেতাম।

অনেক ভালবাসতাম ইরা কে, মেয়েটাও আমাকে অনেক ভালবাসত।সাথে অগাত বিশ্বাস, বলতে গেলে অন্ধ বিশ্বাস। ভালই যাচ্ছিল আমাদের ভালবাসার দিনগুলো। সামনেই ইরার পরীক্ষা এখন আমার থেকেও বেশী পড়ার দিকে মনস্থির হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু, পাগলী মেয়েটা সারাদিন যেন আমার সাথেই কথা বলতে চায়।এর জন্য অনেক বকাঝকা খেত ওর আম্মার কাছে তবুও মেয়েটা একটুও বদলায়নি। ভাল ভাবেই ইরার পরীক্ষা শেষ হয়। একদিন রাতে টিউশনি করে বাসায় ফিরছিলাম। গলির মুখে কয়জন বখাটে রাস্তা অবরোধ করে দাঁড়াল।কিছু বলার আগেই হাতের ছুড়ির কষাঘাতে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা পাথর এ লুটে পড়লাম। যখন সঙ্গবিত ফিরে পেলাম, নিজেকে হাসপাতালের বেড এ অবিষ্কার করলাম।পাশেই বসে থাকা মা আর ছোট বোনকে দেখে বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।মাকে জিজ্ঞেস করলাম..

-আমি এখানে কি ভাবে এলাম?
-তুই এক বছর তিন মাস থেকে এই বেডে পরে রয়েছিস।

কথাটা শুনেই আমার শরীরের রক্তকণিকাগুলোর গতি হাজারগুণ বেড়ে গেল।এটা কি ভাবে সম্ভব গতকালই তো আমি ভাল ছিলাম। আবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মা বলল ছুড়ির আঘাতের পর রাস্তার পাশের পরে থাকা পাথরে পড়ে মাথায় অনেক বড় ধাক্কা লাগে। আর আমি কমায় চলে যাই। ডাক্তাররা তো বলে দিয়ে ছিল আমি কোনদিন স্বাভাবিক হব না।সৃষ্টিকর্তা চেয়েছেন তাই আমি আবার স্বাভাবিক হলাম। কথাগুলো শুনে কখন দুচোখ বেয়ে অশ্রু পড়তে শুরু করেছে বুঝতে পারিনি। পাশেই থাকা ছোট বোন কে বললাম..

-তোর কাছে ফোন আছে?
-হুম,আছে।
-দে তো।
-কি করবি?
-কাজ আছে দে।

মা কে বললাম আমি বাড়িতে যেতে চাই, তোমরা কথা বল ডাক্তারের সাথে। মন মরা হয়ে শুয়ে আছি, জিবন থেকে হারিয়ে গেল হঠাৎ আসা ভালবাসাটা,এভাবে হারাতে পারে না। (ইরার আইডি খুজে পাইনি, হয়ত নষ্ট করেছেআইডি) ইরা তোমাকে ছাড়া যে আমার জিবন নিঃস্ব কি ভাবে বুঝাব তোমাকে। তুমি কি পারতা না একটু অপেক্ষা করতে আমার জন্য। আবার মায়ের কথা মনে পড়তে নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলাম। যদি ভাল না হতাম, সারা জিবন কমা নামের অর্ধ মৃত্যুবরণ করতাম। তুমি ভাল করেছ ইরা আমাকে ভুলে গেছো কি না জানি না তবে তোমাকে ভুলে থাকা দায় আমার। একদিন রাতে ফেসবুকে কিছু লিখছিলাম। তাসনিয়া তাসনিম নামের আইডি থেকে একটা ম্যাসেজ আসল..

-হাই, কাব্য (কিছুটা অবাক হয়ে রিপলে না করে ঘুরে আসলাম উনার টাইমলাইন থেকে, চেনা জানা কেউ নয় আর আমার ফ্রেন্ড লিষ্টেও নেই উনি, তবুও রিপলে করলাম।)
-জ্বি, বলুন..
-কেমন আচ্ছো?
-(কথাটা শুনে বুকের বাম পাশটাশটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল,ইরা নয় তো?) আলহামদুলিল্লাহ,ভাল। আপনি কি আমাকে চিনেন?

-হুম,আমি ইরার খালা হই।আর তোমার সাথে কিছু কথা আছে। অশ্রু ছলছল করছিল দুটি চোখেই।মনে হল আবার ক্ষনিকের জন্য কমায় চলে গেলামনিজেকে স্বাভাবিক করে বললাম..

-হুম বলুন,ইরা কেমন আছে?ইরার সাথে দেখা করতে চাই?
-আগে তো আমার কথাগুলো শুন তারপর তোমার সিদ্ধান্ত জানাবে?

-ঠিক আছে বলুন। উনার কথাগুলো শুনে কি করব কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম।মা কে ইরার সাথে আমার সব কথা বলে দিলাম।ইরার খালা যে কথাগুলো বলছেন সেগুলোও মা কে বললাম। চার মাস আগেই ইরার বিয়ে হয়, তার আগ পর্যন্তইরার আমার জন্য অপেক্ষা করেছিল। আমি যোগাযোগ না করায় অনেক কান্নাকাটিকরে ইরা, এটা দেখে ওর ভাইয়ারা ওর বিয়ে ঠিক করে।বিয়েটাও হয়ে ছিল ধুমধাম করে।বিয়ের একমাস পরই ইরার স্বামীর গাড়ি এক্সিডেন্ট করে আর মারা যায়।(বিয়ের পরই ইরা আইডি ডিলেট করে দেয়) ইরা কে আমি অনেক ভালবাসি।আমার ভালবাসাটা ইরার দেহের জন্য নয়।ইরার সুন্দরমনটার জন্য।

“যাকে ভালবাসি নিজের থেকেও বেশী, দেহের ভালবাসার কাছে আমার ভালবাসাটাকে এভাবে হেরে যেতে দিতে পারি না” মা কথাগুলো শুনে অবাক নয়নে তাঁকিয়ে আছে আমার দিকে।প্রথম বাবা, মা কেউই রাজি হতে চায়নি।আমি পরে বলেছিলাম। আমি যদি অর্ধ মৃত্যু কমায় থাকতাম সারা জিবন তাহলে কি করতেন? আমার মুখে এমন কথা শুনে মা অবাক হয়ে ছিল কি না জানি না? তবে বাবা অনেক বেশী অবাক হয়ে ছিল হয়ত।তাই তো বলেছিলেন। তোর যুক্তি আর ভালবাসার কাছে আমরাপরাজিত। আসলে ভালবাসা কে ভালবাসা দিয়ে হিসাব করতে হয়।আবার, সব কিছুর হিসাব করাও চলে না। সব থেকে বড় কথা হল, “যাকে ভালবাসেন তার অতীতকে নয়, বর্তমানকে ভালবাসুন” আর ভবিষ্যৎ টাকে আপনার ভালবাসার ছোঁয়ায় বদলে দিন।তাহলে দেখবেন, পৃথিবীতে সব থেকে দামী আর সুখি মানুষটাই আপনি।

ড্রাইভারের ডাকে আবার বাস্তবে ফিরে এলাম (ইরার খালার থেকে অনেক বলে ঠিকানা নিয়েছিলাম) ধূলময় রাস্তাটা আজ বড্ড বড় মনে হচ্ছে,যদিও আগে কখনও আসিনি তবুও স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশীই।ইরার ভাইয়েরা বিয়ে করে বউ সহ বিদেশ চলে গেছে।ইরার লেখাপড়া আছে।তাই টিউশনি করায় বাড়িতে। আনমনা ভাবে কখন যে বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি জানি না।এক তলা বাসাটার দেয়ালগুলো কেমন মলিন লাগছিলো আমার কাছে।কোথাও ছোট খাটো ফাটলও ধরেছে। বাসা থেকে আট দশ বছরের কেউ একজন বাহির হচ্ছিল, তাঁকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম এটা কি ইরাদের বাসা? পিচ্চিটা কিছু না বলে মুখের দিকে কেমনভ্যালভ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আবার বললাম, কি হল কিছু বলছো না যে?

-আপনি কি কাব্য ভাই? কথাটা শুনেই পুর শরীলটা শিহরণ দিয়ে উঠল। ওই পিচ্চি কি ভাবে জানে আমি কাব্য? আচ্ছা, ও সাফওয়ান নয় তো? (সাফওয়ান ইরার ছোট ভাই)

-হুম, আমি তোমার কাব্য ভাই।তোমার আপু বাসায় আছে? ও আমাকে একটা রুমের দিকে হাত ইশারা করে দেখিয়ে দ্রোড়ে চলে গেল।

ওর দেখানও রুমটার থেকে পড়ানোর শব্দ শুনতে পেলাম।দরজায় দাঁড়াতেই কল্পনার সেই ইরার মুখটা দেখতে পেলাম।আমার কল্পনার থেকেও সুন্দর ইরা, কিন্তু চিন্তায় চিন্তায় মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেছে। ইরা মনযোগ্য দিয়ে ক্লাস নিচ্ছিল ছোট ছোট নিষ্পাপ বাচ্ছাদের।মনে হচ্ছিল, সুন্দর একটা গোলাপ কে চারপাশে ছোট ছোট কলি ঘিরে ধরে রেখেছে। দরজার সামনে থেকেই জিজ্ঞাসা করলাম. কে..ম.. মন..আ..আ..চ..ছো..ইরা…? ইরার চারপাশে ঘিরে ধরে বসে থাকা সব ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলো আমাকে তোতলাতে দেখে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।কিন্তু তারা আরও বেশি বিস্মিত হল সামনে দাড়ানো তাদের ম্যাডামটির চোখে পানি দেখে।অঝোর ধারায় শিশুদের মত কেঁদে যাচ্ছে মেয়েটা।

একটু বাহিরে আসবে?রুম থেকে বাহির হয়ে
একটু দূরে গেলাম আমরা।
-এখানে কেন এসেছো?তখনও কাঁদছিল মেয়েটা।
-তোমাকে দেখতে,কেমন আচ্ছো তুমি?
-এই তো অনেক ভাল আছি।
-ভাল থাকতে চাইলেই কি ভাল থাকা যায়? কিছুটা অসস্তি বোধ করল কথাটায়।
-হয়ত বা যায়।তুমি কেমন আছো..?
-তোমার মতই ভাল আছি?
-এত শীতের মাঝে শুধু শার্ট পরে এসেছো কেন?
-তোমার চাদরটার ভাগ নেব বলে!
-সেটা যে আর হবার নয়?
-কেন হবার নয়?
-আমার চাদরটা যে আজ মলিন হয়ে গেছে!
– কিন্তু আমার ভালবাসার চাদরটা যে আজও তার স্বপ্নে রঙ্গিন হয়ে আছে।
-তুমি চলে যাও কাব্য!
– যাব,তবে তোমাকে সাথে নিয়ে,তোমার উরুতে মাথা রেখে দুষ্টুমির ছলে ছলে তোমার আলতো ঠোঁটের লিপিস্টিক খাওয়ার ধান্দায় বা অন্য রকম অনুভূতির ছোঁয়া দাওয়ার ইচ্ছায় নয়।তুমি শুধু সারাটি জীবন আমার পাশে থেক।তোমার ঐ চাদরের কোন ভাগ ও আমি চাইব না।তুমি শুধু আমাকে সারাটি জীবন ভালবেসে যেও।

-পারব না!
– কেন?
-কারন আমি চাই আমার ফাজিল বরটা সারাটা জিবন আমার পাশেই থাকুক।
-কি,আমি ফাজিল?
-তা নয় তো কি?
-যাও তোমার সাথে কোন কথা নেই।
-তুমি কথা না বললেও আমি তোমাকে আর ছাড়ছি না।

বলেই আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়ল মেয়েটা। ভালবাসার বাহু ডোরে আবদ্ধ করে নিলাম ইরা কে। পাশেই বিনা টিকিটে দাঁড়িয়ে থাকা ইরা ছাত্র-ছাত্রীগুলো হাত তালি দিতে লাগল। (কলিযুগের ছেলে মেয়ে বলে কথা) হ্যাঁ, আমি অবশেষে আবার খুজে পেলাম আমার ফিরে পাওয়া ভালবাসাকে। (যাকে ভালবাসবেন তার রুপ বা দেহ দেখে নয়। মন দেখে ভালবাসিয়েন। রুপ বা দেহের ভালবাসা আজ আছে কাল নেই থাকবেও না। মনের ভালবাসা চিরকাল থাকবে)

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত