ফিরে পাওয়ার আনন্দ

ফিরে পাওয়ার আনন্দ

ইশা তাবরিন রুহি, রুহি বলেই সবাই ডাকে। একটা প্রাইভেট স্কুলে টিচার। একদিন নার্সারির ক্লাস টিচার না আসায় রুহি নার্সারির ক্লাস নিতে এল। সবকিছু ঠিক মতই চলছে। হঠাৎ রুহির চোখ একটা ছেলের দিকে পড়ল। শার্টের বোতাম উল্টাপাল্টা লাগানো।

> আপনার বোতাম এমন কেন? ছেলেটা ঠিক করা শুরু করল। কিন্তু পারছে না। কারণ ছেলেটা জানেই না ভুলটা কোথায় হয়েছে। রুহি নিজেই ঠিক করিয়ে দিল।

~ থ্যান্কু ম্যাম।
> ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম।

রুহি ক্লাস নিতে লাগল। বারবার চোখ ছেলেটার দিকে যাচ্ছে। বাকি সবার থেকে ছেলেটা অনেক ধীরু। কিছু বললে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন বুঝেনি। উঠতে বললে কিছুক্ষণ ভাবে তারপর উঠে এই টাইপের। কোনো কিছু বললে কিছুক্ষণ চিন্তা করে তারপর করে। রুহি পুরো ক্লাস জুড়ে ছেলেটার হাবভাব দেখল।

> আপনার নাম? ছেলেটা কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বলল
– আদনান হোসেন আবির।

পরেরদিন রুহি নার্সারির ক্লাস টিচারকে আবিরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল ওর মা নেই। তাই অন্যরকম থাকে। ছুটির পর রুহি দেখল আবির দাড়িয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর একটা মহিলা এসে নিয়ে গেল। স্কুলের বুয়া থেকে জানতে পারল ওটা আবিরের কেয়ার টেকার। কিছুদিন পর আবার রুহি নার্সারির ক্লাস নিল। আবির অংক বুঝছিল না। রুহি খুব ভাল করেই বুঝিয়ে দিল। আবিরকে খুব আদর যত্ন করল। পরেরদিন আবিরের কেয়ার টেকার রুহির সাথে কথা বলতে এল।

— আপনি কি রুহি ম্যাম?
> জ্বি। বলুন।
— আবির সাহেবকে পড়াতে পারবেন?
> দেখুন আপাতত হাতে সময় নেই। তাই পারব না।
— দেখুন ওর মা নেই। গতকাল আপনি বুঝানোর অংক পর থেকেই বাসায় এসে জিদ ধরল আপনার কাছেই পড়বে। প্লিজ মানা করিয়েন না। যত চাইবেন বড় সাহেব ততই দিবেন।

রুহি আবিরের কথা চিন্তা করে হ্যা বলে দিল। প্রথম দিন আবির বাসায় যেয়েই বুঝল আবিরের বাবা বিশাল ধনী। তাই হয়তো আবিরের দিকে খেয়াল দিতে পারে না। কিছুদিনের মধ্যেই রুহির মনের মধ্যে আবিরের জন্য অদ্ভুত টান জেগে উঠল। রুহি যতক্ষণ থাকে আবিরের মুখে হাসি ফুটে থাকে। আবিরের সাথে সময় কাটিয়ে রুহির মনটাও তৃপ্তি পায়।

বিকালে আবিরকে পড়িয়ে রুহি আবিরের সাথে একটু খেলা করে। একদিন খেলার মধ্যে আবিরের আঙ্গুল কেটে যায়। বেশ রক্তও ঝরে। খবরটা আবিরের বাবাকে জানানো হল। আবিরের বাবা দ্রুত ছুটে আসেন। অন্যদিকে আবিরকে ঘুম পাড়িয়ে রুহি আবিরের রুম থেকে বের হতেই যাবে তখনই আবিরের বাবা এসে পড়ল। রুহি আবিরের বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। আবিরের বাবাও রুহির দিকে তাকিয়ে রইল। চারক বাকর সবাই বোকার মত তাকিয়ে রইল।

রুহি বাসায় এসে উদাস মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আবিরের মা আর কেউ নয় রুহি-ই। আবিরের বাবা আফনান হল রুহির স্বামী। আজ থেকে ৬ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। সেই মুহূর্তে রুহি বিয়ের জন্য রাজি ছিল না। তবুও বাবার অসুস্থতার জন্য বিয়ে করল। রুহির কাছে তার ক্যারিয়ারটা বড় ছিল। রুহি যখন জানতে পারল সে প্রেগন্যান্ট। তখন সে আফনানকে বাচ্চা নষ্ট করার কথা জানালো। আফনান কিছুতেই রাজি হল। পরিবারের সবাই রুহিকে বুঝাতে লাগল। কিন্তু রুহি বাচ্চা নিতে চাচ্ছিলো না। নিজের অস্তিত্বকেই যেন রুহির কাছে বিষ মনে হচ্ছিল। আবিরকে জন্ম দেয়ার পর রুহি আবিরকে বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত করে। রুহির এমন রুক্ষ ব্যবহারে আফনান খুব কষ্ট পায়। তবুও সংসার ভাঙ্গার ভয়ে কিছু বলত না। রুহি আবিরের প্রতি কোনো দায়িত্বই পালন করত না।

আফনান এক প্রকার মানসিক অত্যাচারের স্বীকার হচ্ছিল। তাই সে আর সহ্য করতে না পেরে আবিরকে নিয়ে অন্য শহরে চলে আসে। কিছু মাস যাওয়ার পর রুহি অনুভব করল সে কি মূল্যবান জিনিসের অবহেলা করেছিল। পরে অনেক খুজেও আর পেল না। তাই রুহি শিশুদের সাথেই জড়িয়ে পড়ার জন্য স্কুলে জব করছে। উচ্চ পর্যায়ে সুযোগ পেয়েও রুহি যায়নি। রুহির মায়ের ডাকে রুহির ধ্যান ভাংগে। রুহিকে কাদতে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করল

~~ নানুভাইয়ের কথা মনে পড়েছে বুঝি? রুহি প্রায়ই তার সন্তানের কথা চিন্তা করে কাদে। রুহি তার মাকে জড়িয়ে ধরে সব খুলে বলল।
~~ চিন্তা করিস না। আল্লাহ যেহেতু তোদেরকে আবার মিলেছে। তিনিই সব ঠিক করে দিবেন।

অন্যদিকে আফনানেরও পুরানো স্মৃতি গুলো মনে পড়ল। তবে সেই স্মৃতিতে রয়েছে রুহির রুক্ষতা। পরেরদিন রুহি স্কুলে এসেই আবিরকে দেখেই জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগল। চুমু দিয়ে আবিরের গাল ভরিয়ে দিল। আবিরের কেয়ার টেকার অবাক ভাবে তাকিয়ে আছে। এমন তো একজন মা-ই করে।

বিকালে ঘর থেকে নিজ হাতে খাবার বানিয়ে আবিরের জন্য নিয়ে এসেছে। সারা বিকাল কোলে বসিয়েই পড়িয়েছে, নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে। রুহির এসব আচরণের কথা কেয়ার টেকার আফনানকে জানিয়েছে। তবে আফনান বলল থাক অসুবিধা নেই। টিচার তো। রুহি আবিরকে নিয়ে দুএক দিন ঘুরতে বেরিয়েছে। যদিও কেয়ার টেকার সাথে ছিল। আজ শুক্রবার। আজও রুহি আবিরকে পড়াতে এসেছে। ঘরের ডাইনিং রুমের পরেই আবিরের রুম। ডাইনিং রুমে আফনান বসে আছে। রুহিকে দেখে তাকিয়ে আছে।

– আজ তো শুক্রবার।

রুহি কিছু না বলে ভেতরে চলে গেল। কেয়ার টেকার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কিছুক্ষণ পড়িয়ে রুহি আবিরকে নিয়ে আফনানের কাছে এসে বলল

> আমি আবিরকে নিয়ে একটু ঘুরতে যাচ্ছি।
– কোন অধিকারে? রুহি ছলছল চোখে আফনানের দিকে তাকিয়ে রইল।
– দেখুন, টিচারের একটা সীমাবদ্ধতা থাকে। রুহি চুপ করে রইল।
– এই নিন। আবিরকে পড়ানোর জন্য আপনার পারিশ্রমিক। এবার রুহির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
> তুমি আমাকে টাকা দিচ্ছ? আবিরকে পড়ানোর জন্য?
– টাকা পয়সা ক্যারিয়ার এসবই তো আপনার কাছে বড় তাই না?
> আমি নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছি।
– অহেতুক কথা বলার সময় নেই। টাকাটা নিন। আর আজ থেকে আবিরকে পড়াতে হবে না।
> প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। আমি তোমার কাছে কিছু চাই না। শুধু আবিরের কাছে থাকতে চাই। অন্তত এইটুকু কেড়ে নিও না।
– কোন অধিকারে? রুহি কাদতে কাদতে বলল
> আবিরকে আমি জন্ম দিয়েছি। মা হিসেবে এইটুকু তো পেতেই পারি। (করুণা)
– মা! (অট্টহাসি) যে মা ক্যারিয়ারের জন্য তার সন্তানকে গর্ভেই মেরে ফেলতে চায় সে কখনোই মা হতে পারে না। জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না।
> আমাকে মাফ করে দাও। আমি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছি।
– যাও এখান থেকে। তুমি আবিরের কেউ না।

আফনান রুহিকে বের করে দিল। রুহি ঘরে এসে মায়ের সাথে কাদতে লাগল। তিনি সান্ত্বনা দিলেন। কিন্তু রুহির বুকটা আবিরের জন্য ফেটে যাচ্ছে। এত বছর পর ফিরে পেয়েও আবিরের মুখে মা ডাক শুনতে পারল না। অন্যদিকে আবির খাওয়া দাওয়া পড়া বন্ধ করে দিয়েছে। সে রুহির হাতে খাবে, তুহির কাছে পড়বে বলে কেদেই যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকার কারণে দুদিন পর আবির অসুস্থ হয়ে যায়। হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর ডাক্তার আফনানকে জিজ্ঞেস করে রুহি কে? আবির রুহির সাথে দেখা করতে চায়। রুহি খবরটা পেয়ে হাসপাতালে দৌড়ে এলো। রুহি আফনানের পায়ে পড়ে গেল।

> প্লিজ তোমার দুটি পায়ে পড়ি। আমাকে আবিরের কাছে থাকতে দাও। কেয়ার টেকার হিসেবে হলেও থাকতে দাও। আফনান রুহিকে তুলল।
– কেয়ার টেকারের চাকরিটা খেতে চাচ্ছ কেন?
> তুমি যেভাবে বলবে আমি সেভাবে থাকতে রাজি। তবুও আবিরের কাছে থাকতে দাও।
– মা হিসেবে আবিরের পাশে থাকতে পারবে?

রুহি কান্নামাখা চোখে আফনানের দিকে তাকালো। তবে সেই চোখের পানিতে আশার আলো দেখা যাচ্ছে।

– না পারলে বলে দাও। আমি অন্য কাউকে খুঁজে নিব।
> না না অন্য কাউকে খুঁজতে হবে না। আমি পারব।
– সেই সাথে আরেকটি জিনিস লাগবে। রুহি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আফনানের দিকে তাকালো।
– তা হল আবিরের বাবার অর্থ্যাৎ আমার বউ হিসেবে পাশে থাকতে পারবে? রুহি মুখটা নিচে নামিয়ে নিল।
– বুঝেছি অন্যকাউকে খুঁজতে হবে।
> হুম পারব। (নিচু স্বরে)
– একটা কথা মনে রেখ বাবা মায়ের জন্য তাদের সন্তানই সব।
> হুম। আমি বুঝেছি। হীরা পেয়েও আমি তুচ্ছ করেছিলাম। যার শাস্তিস্বরূপ বিগত কিছু বছর শুধু অশ্রুই ঝরিয়েছি।

এদিকে ডাক্তার এসে আফনানকে বলল, দেখুন আপনি তাড়াতাড়ি রুহির ব্যবস্থা করুন। সবসময় ঔষুধ কাজে লাগে না। এই মুহূর্তে আবিরর মানসিক সাপোর্ট দরকার। কথাগুলো শুনে রুহি আবিরের কেবিনে গেলো। আবিরের পাশে বসলো। একটু পর চোখ খুলে আবির রুহিকে দেখে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল আপনি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আমি আপনার কাছে পড়ব।

> না না আমি কোথাও যাব না।

আফনান ভেতরে এলো। আবির রুহিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কেদে কেদে বলল, বাবা আমাকে আপনার কাছে থাকতে দিবে না।

– না আবির উনি আর কোথাও যাবে না। তোমার কাছেই থাকবে।
~ সত্যিই?
– হ্যাঁ সত্যি। তুমি জানো উনি কে?
~ আমার টিচার।
– তুমি না বলতে তোমার মা কোথায়? ইনিই হলেন তোমার মা।
~ সত্যি?
> হ্যা সত্যি। আমিই তোর মা।

রুহি আবিরকে জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগল। বহু বছর পর সন্তানকে কাছে পাওয়ার কান্না। আফনান মা ছেলের সেই দৃশ্য দেখছে। সন্তান থেকে মূল্যবান জিনিস আর কিছু হয় না।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত