প্রবিত্র ভালবাসা

প্রবিত্র ভালবাসা

প্রায় দুই মাস বিয়ে হয়েছে নুরের সাথে রিয়ার কিন্তু নুর তাকে একটুও ভালবাসে না,এই ভেবে অনেক কষ্ট পায় রিয়া। পারিবারিক ভাবে বিয়েটা হয় তাদের কিন্তু নুর যে এত নিষ্ঠুর সেটা আগে বুঝেনি রিয়া। প্রতিদিন রিয়াকে কাঁদতে হয়, সে যা রান্না করে না কেন নুরের কাছে তা কখনো ভাল হয় না! ছোট থেকে রিয়া অনেক ভাল চা বানাতে পারে কিন্তু সেটাও নাকি নুরের কাছে খুব বাজে লাগে।

এইতো সেদিন অনেক শখ করে পুলি পিঠা বানাছিল রিয়া, সে নুরের মায়ের কাছে শুনেছে পুলি পিঠা নাকি নুরের অনেক পছন্দের। কিন্তু নুরের কাছে নাকি এইটা পিঠাই মনে হয়নি আজব কি জিনিস, খুব খারাপ একটা স্বাদ হয়ছে নাকি পিঠাতে! অনেকক্ষণ কেঁদেছিল রিয়া কারন সবার কাছে তার রান্না অনেক ভাল লাগে কিন্তু যার জন্য কষ্ট করে সরচে ভাল রান্নার চেস্টা করে সেই শুধু দুই মাস ধরে খারাপ বলে গেল। সেদিন অনেক শখ করে রিয়া বলেছিল “চলেন না আজ দু’জন বাইরে ডিনার করি? কিন্তু নুর রাজি না! রিয়ার অনেক রাগ হল সে বললে উঠলো “তাইলে বিয়ে করেছেন কেন? নুর চুপ হয় যায়। রিয়া দ্রুত রুমে চলে যায়, অভিমানি মেয়েটি এখন কাঁন্না করবে। হুম ভালই লাগে তার কাঁন্না দেখতে আর সেটা মিস করে না নুর। কিন্তু রিয়া সেটা জানে না,যে সারাক্ষণ তাকে কেও লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে! নিজের বউকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার মধ্যে নাকি অনেক ভাল লাগা কাজ করে নুরের। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই নুর অবাক হল রিয়ার ব্যাগ গোছানো দেখে। রিয়া আর এইভাবে থাকতে পারবে না! যে তাকে ভালইবাসে না,তার সাথে থেকে অবহেলা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না।

নুর রিয়ার কাছে এসে বলল, ব্যাগ গোছানো কি দরকার এখন? দরকার আছে,আমি বাবার বাড়ি চলে যাচ্ছি এই ভাবে থাকার আর আমার পক্ষে সম্ভব না! আচ্ছা। আচ্ছা মানে? হুম যাও তাইলে। যাবো ই তো,যান আপনি। আপনার খাবার রেডি আছে,খেয়ে অফিস যান। অফিস থেকে এসে আমাকে আর দেখতে পাবেন না! নুর কিছু না বলে চলে গেল রুমের দিকে,রিয়ার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে কারন নুর তাকে যেতে বাধাও দিল না! রিয়া ফাইনাল ডিসিশন নিল আর নুরের সাথে সে থাকবে না,আজই চলে যাবে বাবার বাড়ি। নুর রুমে এসে একটা কাগজে কি জানি লিখলো! তারপর সেটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে দিল। নুর গোসল সেরে সকালের নাস্তা করে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হবে। রিয়া নুরের কাছে গিয়ে বলল, “মানুষ এতটা নিষ্টুর কি করে হয়?” নুর একটা হাসি দিয়ে বলল, “ড্রেসিং টেবিলের উপর একটা জিনিস আছে সেটা একটু দেখ আমি এখন যাই?

তাই বলে নুর অফিস চলে গেল। আর রিয়া রুমে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলো এই রিয়া, না তোমাকে টিয়া নামে ই ভাল মানাই। হে হে হে আচ্ছা এত রাগ কই পাও তুমি? আমি কিন্তু জানি টিয়াপাখিরা পাকা মরিচ খায়,তুমিও অনেক মরিচ খাও তাই এত রাগ তোমার! শোন টিয়া আমার কিন্তু এমন রাগী বউ ই ভাল লাগে। তোমার কি মনে আছে,আব্বুর সাথে একদিন তোমাদের বাসায় ঘুরতে গেছিলাম? ওই দিন তুমি গোলাপী কালারের একটা ড্রেস পরেছিলা। ওইদিন ই তোমাকে আমার ভাল লেগেছিল,তারপর “আম্মু” কে বললাম আর আব্বু-আম্মু মিলে তোমার বাসায় প্রস্তাব নিয়ে গেল। আমি ভাবতেই পারিনি তখন যে তুমি আমার সাথে বিয়ে করতে রাজি হবে! বিয়ের দিন থেকে আজও তোমার দিকে ঠিকভাবে তাকাতে পারিনা, কেমন জানি লাগে! তোমাকে স্পর্শ করতেই ইচ্ছা করে না। কারন আমার মনে হয় আমার বউকে স্পর্শ করলে যদি সে পুরাতন হয়ে যায়? আমি চাই আমার বউ সারাজীবন নতুন থাকবে।

আচ্ছা টিয়া পাগলী তুমি কি একটু ক্ষেয়াল কর না? যে তোমার হাতের রান্না আমি তৃপ্তি সহকারে খাই। খাইতে খারাপ লাগলে কি কেও তৃপ্তি সহকারে খায় পাগলী? তুমি সত্যি অসাধারন চা বানাতে পারো কিন্তু আমি ইচ্ছা করে বলি ভাল হয়নি। কারন তোমাকে রাগাতে আমার ভাল লাগে,রাগলে তোমাকে এত সুন্দর  লাগে যা বলে বোঝাতে পারবো না। তুমি রাতে রাগ করে আমার বিপরিত দিকে মুখ করে ঘুমিয়ে পড় তাই কষ্ট করে আমাকে উঠে বসে থাকতে হয় তোমার মায়াবী মুখটি দেখার জন্য। জানালার পর্দা সরালে চাঁদের আলো এসো তোমার মুখে পড়ে আর ডিম লাইটের আলো তো থাকেই। কি করবো বল আমি যে রাতে ঘুমাইতে পারি না! তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে রাত কাটিয়ে দি কিন্ত তুমি জানো না। শেষ রাতের দিকে একটু ঠান্ডা লাগে তাই তুমি গুটি-শুটি হয়ে সুয়ে থাকো । টিয়া তুমি ক্ষেয়াল করেছো কি কোনদিন! সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমার গায়ে চাদর টা কে দিয়ে দিল? জানি তুমি কোনদিন ই ক্ষেয়াল করনি।

কিছু দিন আগে তোমার অনেক জ্বর আসে তুমি তখন কিচ্ছু খাইতে পারছিলে না, বেড থেকে ৩ দিন উঠতেই পারোনি। মাঝেরাতে স্বপ্ন দেখে চিৎকার দিসো। আমি অফিসে ছুটি চাইছিলাম কিন্তু প্রথমে আমাকে ৫ দিন ছুটি দিতে রাজি হয়নি,পরে আমি চাকরি ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম তাই ছুটি দিয়েছিল। টিয়া তুমি না থাকতে আমি চাকরি দিয়ে কি করবো বল? থাক আর কিছু লিখবো না! তুমি তো আজ চলে যাবে। যাওয়ার আগে বেডের কোনায় হাত দিও দেখ নীল একটা ব্যাগ আছে। কাল বেতন পেয়েছিলাম তাই অর্ডার দেওয়া ৫ জোড়া নুপুর দোকান থেকে কাল রাতে এনেছি। কিন্তু তোমাকে দিতে ভুলে গেছিলাম রাতে। গ্রামের বাড়ি পুকুরে গোসল করতে গিয়ে তোমার নুপুর হারিয়ে গিয়েছিল,তাই তুমি অনেক কাঁন্না করেছিল তাই আমার অনেক খারাপ লেগেছিল। আজ সেই রকম সেইম ৫ জোড়া নুপুর আনলাম। কারন এইবার হারালে যেন কষ্ট না পাও। তুমি ৫ জোড়া ই হারিয়ে ফেল দরকার হলে আরও ১০ জোড়া হারাবে কিন্তু তুমি কিছু হারিয়ে ফেলে কষ্ট পেলে আমি সহ্য করতে পারবো না।

আর টিয়া পাগলী বউ আমার সাবধানে যেও,আর পৌঁছে আমাকে জানিও না হলে টেনশনে থাকতে হবে। চিঠি পড়তে পড়তে রিয়ার চোখে যে কখন বৃষ্টি নেমেছে তা সে নিজেও বুঝতে পারিনি। আজ চিৎকার দিয়ে কাঁন্না করতে খুব ইচ্ছা করছে তার,এইটা হবে রিয়ার সুখের কাঁন্না । যে এক চিমটি ভালবাসা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল সেটার পূর্ণতা পাওয়ার কাঁন্না। চোখ মুছে রিয়া তার মায়ের কাছে ফোন দিয়ে কাওকে দিয়ে ওই গোলাপী ড্রেসটা পাঠায় দিতে বলল। আজ সে অনেক সাজবে তার পাগলাটার জন্য। নুরের মন খারাপ লাগছিল তাই দুপুরে বাসায় চলে আসলো। বাসায় এসে ভুলে কলিং-বেল এ চাপ দিল,নুরের মনে ছিল না আজ রিয়া চলে গেছে সেটা! তাই সে পকেট থেকে চাবি বের করে লক খুলতে যাবে এমন সময় দরজাটা খুলে গেল। নুর কিছু বুঝে উঠার আগে রিয়া তার হাত ধরে রুমে নিয়ে আসলো।

কেন জানি চোখ ফেরাতে ইচ্ছা করছে না রিয়ার মুখ থেকে নুরের। সেই প্রথম যেমন দেখছিল আজও রিয়াকে তেমন লাগছে। সেই গোলাপী ড্রেসটা পরা,হালকা গোলাপী লিপস্টিক দেওয়া পাতলা ঠোটে, চোখে কাজল,চুল গুলা ছেড়ে দেওয়া, আর সেই লাজুক চাহুনি সব ই ঠিক আছে কিছু বদলাইনি রিয়ার। কিছুক্ষন পর রিয়ার নুরের মাথায় টোকা দিলে বলল ওই কি হইছে আপনার,আমাকে মনে হচ্ছে প্রথম দেখছেন? হুম..সেই রকম ই লাগছে। মানে? প্রথম যেমন দেখছিলাম ঠিক তেমন ই দেখছি আজ তোমাকে। তাই চোখ ফেরাতে ইচ্ছা করছিল না! আহারে। আচ্ছা একটা কথা বলি? হুম.. বল! আমি কি তুমি করে কথা বলতে পারি এখন আপনার সাথে? না পারার কি আছে! আচ্ছা রাগীনি তুমি যাবা না? না! কেন? তুমি আমাকে কষ্ট দিসো তো! এর সাজা তোমাকে দিবো তাই যাবো না। আচ্ছা এই সাজার মেয়াদ কত দিন? দিন,মাস,বছর কিছু না! এই সাজার মেয়াদ সারাজনম ।

আচ্ছা এই সাজা পেতে আমি রাজি আছি। এখন বল কি রান্না করেছো? খুব খুদা পেয়েছে কিছুই রান্না করিনাই তো। হুম..আচ্ছা তাইল চল বাইরে লাঞ্চ করবো আজ? হুম চল নুর আর রিয়া বেরিয়ে পড়লো বাইরে লাঞ্চ করার জন্য,হয়ত এমন দিনের জন্য অপেক্ষা করছিল তারা। এমন হাজারও প্রবিত্র ভালবাসা বেঁচে থাকুক । সুখে থাকুক ভালবাসার এই মানুষগুলো।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত