বখাটের প্রেম

বখাটের প্রেম

চোখ খুলেই অনু নিজেকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় আবিষ্কার করলো। ঘরটা ভীষণ অন্ধকার। কাচের জানালা ভেদ করে আসা অল্প আলোতে অনু যা দেখছে তা হলো, ঘরটা বেশ বড় তবে ফাঁকা কোন ফ্যাক্টরী হবে হয়তো। অনু ভাবে, কিন্তু আমি এখানে এলাম কি করে!  মাথা টা কাজ করছে না অনুর। সকালে নাস্তা করে প্রতিদিনের মতোই ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছিল অনু। তারপর একটা অটোতে উঠেছিল। অটোতে আরো দুজন ছিলো। আমি মোবাইলটা বের করে ফেসবুকিং করতেছিলাম। এরপর আর কিছুই মনে পড়ছে না আমার।  কিন্তু এ কোথায় আমি? ভাবে অনু।

হাত-পা নড়াতে চেষ্টা করছে তবে পারছে না। কারণ রশি দিয়ে খুব শক্ত করে বাঁধা। চিৎকার করছে জোর গলায়, তবে মুখটা কাপড় দিয়ে বাঁধা থাকায় শব্দটা খুবই ক্ষীণ শুনাচ্ছে। অনেকক্ষণ পর দরজা খোলার শব্দ পায় অনু।  সামনে তাকাতেই দেখে গেটটা খুলে তিনজন প্রবেশ করলো । তারপর আবার গেট টা আবার বন্ধ করে দিল। মুখ দেখা যাচ্ছে না কারোই। বুকটা ধক ধক করে ওঠে অনুর। ভাবে, আমাকে কেন এখানে এনেছে? আমার কোন ক্ষতি করবে না তো” ভাবতেই ভয়টা আরো গাঢ়ো লাগে অনুর কাছে। একজন এসে মুখের কাপড়টা খুলে দেয় আর সাথে সাথেই অনু চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, প্লিইইইজ আমার কোন ক্ষতি করবেন না ছেড়ে দিন আমাকে। আমাকে কেন এখানে এনেছেন? ছেড়ে দিন প্লিজ। চিন্তা করো না। তোমার কোন ক্ষতি করবো না। শান্ত হও প্লিজ।

গলার সুর চেনা চেনা লাগে অনুর। তবে ধরতে পারছে না কার। কে আপনি? আমাকে কেন ধরে এনেছেন?  আরে বাবা শান্ত হও সব বলবো। এই আয়ান জ্বী ভাই বলেন। ঘরের লাইট টা জ্বালিয়ে দে। আয়ান ঘরের লাইট টা জ্বালিয়ে দেয়। মুহূর্তেই অন্ধকার ঘরটা আলোতে ভরে ওঠে। অনেকক্ষণ অন্ধকারে থাকার জন্য অনু ভালো করে তাকাতে পারছে না। তারপর আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকাতেই বড়-সড় একটা শক খায় ও। অভ্র তুই ! হ্যাঁ আমি। তোর সাহস কি করে হয় আমাকে এখানে ধরে আনার?  আরে বাবা সব বলবো একটু চুপ তো করবে না কি? এই আয়ান খাবার নিয়ে আয় তো যা। জ্বী ভাই যাচ্ছি। আয়ান খাবার আনতে চলে যায়। তুই আমাকে এখানে কেন এনেছিস আমি বুঝি না ভাবছিস? অনুর কথা শুনে অভ্র শুধু মুচকি হাসে। দেখ অভ্র ভালো হবেনা কিন্তু [অনুর চোখে মুখে ভয় স্পষ্ট] ভাই, এই যে খাবার। খাবার নিয়ে আয়ান আসে। হ্যাঁ দে।

আয়ানের হাত থেকে খাবারটা তুলে তারপর প্লেটে নিয়ে এক লোকমা অনুর মুখের কাছে নিয়ে বলল অভ্র,  সেই সকালে বাসা থেকে খেয়ে এসেছো। তারপর থেকে অজ্ঞান ছিলে এখন একটু খেয়ে নাও । খাবো না। বলেই প্রচন্ড রাগে মুখটা ঘুড়িয়ে নেয় অনু। আমার উপর যত খুশি রাগ করো কিন্তু আগে একটু খেয়ে তো নাও। তোর মতো বেহায়া, বখাটের হাতে আমি কিচ্ছু খাবো না। আচ্ছা খেতে হবে না পাগলি একটা। এই রাজু ওর হাতের বাঁধন টা খুলে দে। জ্বী ভাই। রাজু হাতের বাঁধন খুলে দিতেই ঠাস করে প্রচণ্ড জোড়ে অনু অভ্রর গালে চড় বসিয়ে দেয়। অভ্র শুধু মুচকি মুচকি হাসে। রাগে কটমট কটমট করছে অনু। খেয়ে নাও প্লিজ। বলেই অভ্র অনুর দিকে প্লেট টা বাড়িয়ে দেয়। খুব খুদা লাগায় কিছু না ভেবেই অনু অভ্রর হাত থেকে প্লেট টা নিয়ে খেতে শুরু করে আর অভ্র অনুর দিকে অপলক ভাবে চেয়ে আছে। অনেকটা বিরক্তও লাগছে অনুর কাছে। তুই একটা বেহায়া, ইতর, নির্লজ্জ কারো খাবারের দিকে এভাবে চেয়ে থাকে? [অভ্রকে বলে অনু] অভ্র মুচকি একটা হাসি দিয়ে উঠে অন্যদিকে চলে যায়। খাওয়া শেষ হতেই অনুর পাশে এসে বসে অভ্র। ছেলেটা কে? অভ্র অনুকে বলে।  কোন ছেলেটা? যার সাথে সেদিন পার্কে বসে ছিলে। চুপ থাক। ছেলেটা যেই হোক তাতে তোর কি? আর ও ইমন।

আমি ওকে ভালোবাসি শুনেছিস? আমি ওকে ভালোবাসি। দেখো অনু তুমি খুব ভালো করেই জানো যে আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসতেই পারো তবে ইমন ছেলেটা ভালো না। ইমন তোমাকে ভালোবাসে না। আর তুমি খুব ভালো করেই এটাও জানো যে, তোমার কিছু হলে আমি কি করতে পারি। কিহ ! ইমন খারাপ হ্যাঁ! ইমন খারাপ? তুই খারাপ।  তুই একটা বেহায়া, কুত্তা, বখাটে ছেলে আর করবিরে তুই হ্যাঁ, কি করবি? আমার বাবাকে গিয়ে যদি বলি তো তোকে কি করবে একবার ভেবেছিস? এসব নিয়ে আমি ভাবি না। তাহলে একটা বার ছেড়ে দে দেখ কি করি তোর। আরে পাগলি ছেড়েই তো দেবো। শুধু এটা বলতেই নিয়ে এসেছি যে ইমন তোমার ভালো চায় না। ওকে ছেড়ে দাও। আমরা একে অপরকে ভালোবাসি। তবু তুই কেন আমার পিছে পরে আছিস ? আমি তো আগেই বলে দিয়েছি তোর মতো ছেলে আমার পছন্দ না। দেখো অনু আমি রেগে গেলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে বলে দিলাম। কি করবি তুই?আমাকে জোর করে ভোগ করবি তাইতো? এজন্যই তো ধরে এনেছিস না? আর তোর মতো কুত্তার কাছে এমন টাই আশা করা যায়।

অনু! আমি বখাটে হতে পারি, তবে ভালোবাসাকে কখনোই অসম্মান করতে শিখিনি। তোমার গায়ে আমি স্পর্শও করবো না। তাহলে কেন ধরে এনেছিস? আমাকে ইমনকে আলাদা করতে?  নাহ, শুধু বুঝাতে। দেখো, আমি চাই না তোমার কিছু হোক। ইমন তোমার অনেক ক্ষতি করবে প্লিজ একটু বুঝো।  আমার কিসে ভালো আমি খুব ভালো করেই তা বুঝি। তাই দয়া করে আমাকে নিয়ে তোর এতো ভাবা লাগবে না। আমাকে যেতে দে।  অনু আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আমি চাই সব সময় তুমি হাসিখুশি থাকো। ইমন ছেলেটা ভালো না অনু। ইমনকে নিয়ে আর একটাও বাজে কথা বলবি না। আর তোকে আমি মর রে গেলেও ভালোবাসবো না। অনুর কথায় খুব কষ্ট পায় অভ্র। তবুও মুচকি হেসে নিজেকে অনেকটা শক্ত করে নেয়। অভ্র মনে মনে ভাবে, আমি কতটা ভালোবাসি তা কি অনু কখনোই বুঝবে না? না কি আমিই ব্যর্থ যে ওকে বুঝাতে পারবো না। আমাকে যেতে দে এখন।  অনুর কথায় ভাবনার ছেদ পরে অভ্রর। হ্যাঁ হ্যাঁ যাবে তো। এই রাজু যা গাড়ি নিয়ে আয়। জ্বী ভাই যাচ্ছি। আমি একাই যেতে পারবো আমাকে যেতে দে।  এই এমন রাগ করে না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে আর এই এলাকাটাও তেমন ভালো না আমি তোমাকে একা ছাড়তে পারবো না।

রাগে বিরক্তিতে অনু আর কিছু বলতে পারে না। একটু পর রাজু গাড়ি নিয়ে এসে অভ্রকে খবর দেয় তারপর অভ্র অনুকে নিয়ে গাড়িতে ওঠে। সারাটা পথ অভ্র অপলক ভাবে অনুর দিকে তাকিয়ে ছিলো আর অবাধ্য খোলা চুলের খেলা দেখতেছিল তবে এটা খুবই বিরক্তি লাগে অনুর। গাড়িটা এসে অনুর বাসার সামনে থামতেই অনু নেমে তাড়াতাড়ি চলে যেতে থাকে। তবুও অভ্র ডাক দেয়। অনু একটু দাড়াও। অভ্রর কথাতে একটু সামনে গিয়ে দাড়ায় অনু। অভ্র ভাড়াটা দিয়ে অনুর কাছে গিয়ে বলে ইমন অনেকভাবে তোমাকে ইমপ্রেস করবে তোমাকে আরো কাছে পাওয়ার জন্য। তুমি একটু সাবধানে থেকো কেমন?  তাড়াতাড়ি করেই অনু গেট দিয়ে বাসায় ঢুকে যায় আর অভ্রও কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে নিজের ক্লাবে চলে যায়। দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই অনু দেখে সবাই একসাথে বসে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সবাই খুব চিন্তিত।

সেই সকালে ভার্সিটি যাবে বলে বেড়িয়েছিলে সারাটা দিন কোথায় ছিলে? [অনুর বাবা কর্কশ কণ্ঠে জানতে চায়] বাবা তুমি অভ্রকে চিনো? কোন অভ্র? আরে ঐ যে এলাকায় যে মাস্তানি করে সবাই ভাই ভাই করে ঐ ছেলেটা? [অনুর ভাই অয়ন বলে] হ্যাঁ ঐ বখাটে টা। কেন কি হয়েছে? কি হয়েছে রে মা? আবার কি ও তোকে ডিস্টার্ব করেছে? না বাবা। আজ ও আমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছিলো। তুমি তো জানো ঐ বেহায়াটা অনেকদিন ধরে আমার পিছে পড়ে আছে আর আজ নিয়ে গিয়ে আমাকে বেঁধে রেখেছিলো। বলেই অনু কান্না শুরু করে দেয়। কিহ্!  এই মা তোর কোন ক্ষতি করেনি তো ছেলেটা? জানতে চায় অনুর মা। না আম্মু কিছু করে নি। আমার মেয়েকে কিডন্যাপ করা! ঐ ছেলেটাকে আমি আজ উচিত শিক্ষা দেবো। বলেই অনুর বাবা হনহন করতে করতে বাসা থেকে বেড়িয়ে যান। রাত প্রায় ১০টা বাজে। অভ্র ক্লাবে বসে আছে আর অনুকে নিয়ে কল্পনাতে উড়াল দিচ্ছে ঠিক তখনই, ভাই, পুলিশ এসেছে। আপনাকে ডাকছে ক্লাবে ঢুকে অভ্রকে বলে আয়ান।  আচ্ছা চল। আয়ানের সাথে অভ্র বাইরে আসতেই, তুমিই কি অভ্র? একজন পুলিশ জানতে চায়। জ্বী আমিই অভ্র। আমাদের সাথে চলো। জ্বী চলেন।

পুলিশ গাড়িতে করে অভ্রকে থানায় নিয়ে আসে।  এরপর কোন কথা বলার আগেই জেলে পুরে দেয়। আমাকে এখানে কেন আনলেন? জানতে চায় অভ্র। কেন এনেছি সেটা আমিই বলছি। অনুর বাবা বলে। অভ্র তাকিয়ে দেখে অনুর বাবা রাগি চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আমার অপরাধ টা কি? বাব্বাহ! অপরাধ টা কি? তুই আমার মেয়েকে ডিস্টার্ব করিস! তুই এসআই আমিনের মেয়েকে কিডন্যাপ করছিস। তাও বলছিস কি তোর অপরাধ!  অভ্র আর কিছু বলতে পারে না। কারণ কথাটা তো সত্যিই।  জেলের ভিতর ঢুকে অনুর বাবা অভ্রকে এলোপাথাড়ি ভাবে লাঠি দিয়ে মারা শুরু করে।  তারপর যখন অভ্র ব্যাথায় মাটিতে শুয়ে পড়ে ঠিক তখন তিনি বেড়িয়ে আসেন।

রাত প্রায় ১টা বাজে । প্রচণ্ড ব্যাথায় কাতরাচ্ছে অভ্র। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে আর বন্ধ হয়ে আসা চোখের সামনে ভাসছে ছয় মাস আগের সেই স্মৃতিগুলো। এই যে ভাইয়া আপনার কাছে ১০০ টাকা খুচরা হবে কি? ভার্সিটির ক্যাম্পাসের গেটে দাড়িয়ে ছিল অভ্র ঠিক তখনি মেয়েলি কণ্ঠে ঘুড়ে তাকালো তার দিকে। জ্বী আমাকে বলছেন? বললো অভ্র। জ্বী আপনাকেই। টাকা টা খুচরা হবে কি? দেখেন তো রিকসাওয়ালার কাছেও নাই  এদিকে ক্লাসের টাইমও হয়ে যাচ্ছে।  আমার কাছেও তো ভাঙতি নেই তবে ভাড়াটা কত?  ত্রিশ টাকা।

অভ্র রিকসাওয়ালাকে টাকাটা দিয়ে দেয়।  ধন্যবাদ আপনাকে। অভ্র শুধু মুচকি হাসে।  আপনাকে পরে টাকাটা দিয়ে দেবো কেমন? এখন লেট হয়ে যাচ্ছে বাই। বলেই অপরিচিতা চলে যায়। আর অভ্র মন্ত্রমুগ্ধের মতো অপরিচিতার চলে যাওয়ার পথ পাণে চেয়ে থাকে। কেন জানি অভ্রর মনের ভিতর শীতল একটা হাওয়া বয়ে যায়। হয়তো মেয়েটার চাঞ্চল্যতার জন্যই। কি ব্যাপার অভ্র ভাই? কি হয়েছে? একা একাই মুচকি মুচকি হাসছেন যে? হুট করেই আয়ান বলে। আয়ানের কথায় ঘোর কাটে অভ্রর। নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, কক কই? কিছু না তো চল ক্লাসে যাই। চলেন। তারপর দুজনে মিলে ক্লাসে চলে যায়। বলে নেই যে অভ্র অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্র। তবে এলাকায় নাম ডাক থাকায় সবাই ভাই বলেই ডাকে। সেম ইয়ার হলেও।

অভ্র আর আয়ান গল্প করতে করতে ক্লাসে ঢুকে যখন সিটে বসতে যাবে ঠিক তখনই বড় সড় একটা টাসকি খায়। আরে আপনি এই ক্লাসে! সেই অপরিচিতা বলে। একই প্রশ্ন তো আমারও। আপনি এখানে? আমি আফসানা আহমেদ অনু। বাসা বগুড়াতে। বাবা পুলিশের এসআই বদলি হয়ে এখানে এসেছি। অবশ্য পরিবার আগেই এসেছে আমি কয়েকটা দিন আগে এসেছি আর আপনি কে? আমি অভ্র। আমার পরিচয় বলতে এতটুকুই।  এটা কেমন পরিচয়?  আমি যেমন ঠিক তেমন হাহাহা। আচ্ছা পরে কথা হবে। বলেই অনু নিজের সিটে চলে গেল। আর অভ্রও গিয়ে আয়ানের পাশে বসে। ভাই, নতুন মুখ আবার আপনার সাথে সেধে কথা বললো ব্যাপার কি?  ব্যাপার কিছু না। এতো বেশি কথা বলিস কেন তুই? অভ্র রাগি সূরে বললো। স্যরি ভাই। হুম।

একটু পরই ক্লাস শুরু হয়। প্রতিদিনের মতো আজও অভ্রর পড়াতে মন নেই আজ আবার মনটা অন্যদিকে। হ্যাঁ অন্যদিকে। কিসের টানে যেন অভ্র বারবার আড় চোখে অনু নামের মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটাকে দেখতে কেন যেন অভ্রর খুব ভালো লাগছে । দুটো ক্লাস কি করে যে শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারেনি অভ্র। আর অন্যদিন সময় যায়ই না। অভ্র ভাই একটা প্রোগ্রাম আছে যে আজকে যাবেন না? অভ্র তখন অন্যদিকে বিভোর। অভ্র ভাই। হ্যা কিক কি হয়েছে বল?  একটা প্রোগ্রাম আছে যে সেটাতে যাবেন না? আজ কেন যানি অভ্রর উঠতেই ইচ্ছা করছে না তবুও যেতে হলো। কারণ এটাই যে ওর জীবন। প্রোগ্রাম থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়।  তারপর ক্লাবের রুমে গিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে পরে ও। আজকের দিনটা কেন জানি বড্ড বেশিই ভালো গেলো অভ্রর।

মেয়েটার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেই অভ্রর ভিতরটা কেমন করে যেন উলোট পালট হয়ে গেছে। বারবার মেয়েটার সেই মায়াবি চাহনি আর মুচকি হাসিটাই চোখের সামনে ভাসছে। আচ্ছা মেয়েটার নাম কি যেন? কি যেন নাম! ধ্যাত ভুলেই গেছি। অভ্রর নিজের উপর নিজেরই রাগ লাগে। অভ্র বুঝে উঠতে পারে না আজ কেন এমন হচ্ছে। কত মেয়েই তো আশেপাশে থাকে কাউকেই তো এতো ভালো লাগে নি। তবে কি আমি মেয়েটার মায়ায় আটকে গেছি? ভাবতেই অভ্র নিজেই লজ্জা পায়। সারাটা রাত আর ঘুমাতেই পারেনা অভ্র। চোখ বুজলেই শুধু মেয়েটার মায়াবি চেহারা ভাসছে। শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে যায় অভ্র। ফোনের শব্দে ঘুমটা ভেঙে যায় অভ্রর। ঘুম ঘুম চোখে ফোনটা রিসিব করে।তারপর,উমমমম, হ্যালো। ভাই কই আপনি? ভার্সিটি আসবেন না আজ?  কয়টা বাজে?  ৯ টা পার হয়ে গেছে।  কিইইইইহ্ !

একলাফে উঠে বসে অভ্র। শালা এখন বলতেছিস নয়টা বাজে। তোর খবর আছে ফোন রাখ বলেই ফোনটা রেখে কোন রকমে ফ্রেশ হতে চলে যায় অভ্র। তারপর নাস্তা না করেই ভার্সিটিতে চলে যায়। তাড়াতাড়ি করেও দরজার কাছে এসে দেখে স্যার চলে এসেছেন। আসবো স্যার? বলে অভ্র। বাহ্, অভ্র যে! এমনিতেই পড়াশোনা করো না আবার লেট! ঢুকে কি হবে চলেই যাও।  স্যরি স্যার ঘুম থেকে উঠতে লেট হয়ে গেছে।  উঠলে কেন ঘুমিয়েই থাকতে। এসো ধমক দিয়ে স্যার আসতে বলেন। অভ্র চুপচাপ ক্লাসে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই পিছের একটা সিটে গিয়ে বসে যেখান থেকে মেয়েটা (অনুকে) দেখা যাবে। অভ্র অপলক ভাবে (মেয়েটার) অনুর দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন যেন মাদকতা কাজ করছে ওর। ক্লাস শেষ আয়ান আর রাজু সাথে অভ্র বসে আছে ঠিক তখনই,এইযে মিঃ অভ্র, আপনার টাকাটা নিন।  কিসের টাকা? অভ্র অবাক চোখে বললো। সাথে রাজু আয়ান ও অবাক।

কেন! ঐ যে সেদিন আমার কাছে খুচরা টাকা না থাকায় আপনি ভাড়াটা দিলেন।  ওহহ হ্যাঁ দিন। তা কেমন আছেন? ভালো। আচ্ছা একটা কথা জিঙ্গেস করি?  করেন। আপনার নামটা কি যেন? সে কি! সেদিন না বললাম আজই ভুলে গেলেন। স্যরি আসলে,,,, থাক থাক। আমি অনু এবার ভুলে গেলে খবর আছে।  ঠিক আছে ভুলবো না। আর অভ্র যাই হোক আমরা তো সেম ব্যাচ তো তুই করে বলি? অভ্র তো অনুর কথাতে খুশিতে আটখানা। কি বলবে ভেবেই পাচ্ছে না। আচ্ছা ঠিক আছে  এভাবেই শুরু হয় ওদের বন্ধুত্বের। অল্পদিনের মধ্যেই অনুর সাথে খুব ভালো ফ্রেন্ডশীপও হয়ে যায় অভ্রর। আর অনু একটু চঞ্চল থাকায় অল্পদিনেই অনেক ফ্রেন্ড হয়ে যায় ওর। তবে অভ্রর সাথেই বেশি কথা আর ঘোরাঘুরি হয়। এদিকে অভ্র এখন নিয়মিত ক্লাস করে অনুর কাছে কাছে থাকতে চেষ্টা করে। অভ্র এখন একটু একটু বুঝতে পারে যে সে অনুর উপর অনেকটা দূর্বল হয়ে পড়েছে। কয়েকটা মাস চলে যায় এর মাঝে অভ্র অনুকে অনেক বেশিই ভালোবেসে ফেলে। তবে মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারে না।

আয়ান, রাজু আর অভ্র বসে আছে মাঠে। ভাই যদি কিছু না মনে করেন তো একটা কথা বলি? বলে আয়ান। বল কি কথা। অনু, মানে ঐ মেয়েটা আসার পর থেকে আপনি খুব বদলে গেছেন। আপনি কি ওকে ভালোবাসেন? অভ্র বড় বড় চোখ করে আয়ানের দিকে তাকায় আর আয়ান ভয় পেয়ে যায়। না মানে ভাই আমার মনে হয় তাই বললাম আর কি। তুই ঠিক ই ধরেছিস রে। মানে! রাজু অবাক হয়ে বলে। ইয়ে মানে আমার না অনুকে খুব ভালোলাগে সেই প্রথম থেকেই। সত্যিইইই! দেখছিস রাজু আমি ঠিক ধরেছি। ভাইটা আমার এতোদিনে প্রেমে পড়ছে। আমরা একটা ভাবি পাইছি বলেই লাফিয়ে ওঠে আয়ান।  ঐ আয়াআআন!  স্যরি ভাই আর কমু না। উপরে রাগ দেখালেও ভিতরে ভিতরে খুব খুশি খুশি লাগে অভ্রর। আসলেই যে অভ্র অনুকে ভালোবাসে। একসাথে ক্লাস করা, মাঠে বসে আড্ডা দেয়া এভাবেই অভ্র আর অনুর দিনগুলো খুব ভালোই কাটতে থাকে। চলে যায় আরও একটা মাস। বিকেলে অনু ওর বড় ভাইয়ের সাথে ঘুড়তে বেড়িয়েছিল তখনই দেখলো অভ্র বসে আছে সবার সাথে। ভাইয়া তোকে না বলেছিলাম আমার একটা ফ্রেন্ড আছে ও খুব ভালো। চল তোকে পরিচয় করিয়ে দেই অনু ওর ভাইকে বলে।  আচ্ছা চল।

অভ্ররা সবাই মিলে খুব আড্ডা জমিয়েছে ঠিক তখনই  আরে অভ্র কেমন আছিস?ভালো আছি আর তুই?  এইতো ভালো।  তা এখানে এই সময় তুই?এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম তোকে দেখলাম তাই ভাবলাম যে একটু কথা বলে আসি। ওহহ্।  অভ্র তোকে বলেছিলাম না আমার একটা বড় ভাই আছে। এইযে আমার ভাই অয়ন। হাই ভাইয়া আমি অভ্র।  হ্যালো, আমি অয়ন। তো পরিচিত তো হইলি এবার তাহলে আমি যাই? আচ্ছা যা। অনু চলে গেল। অভ্রর শরীরটা রাগে প্রচন্ড রকমের কাঁপছে। ভাই এটা সেই ছেলেটা না? যে ঐ দিন চোরাকারবারের জন্য আপনার হাতে মার খেলো?হুমম। এটা যদি অনু ভাবির ভাই হয় তাহলে তো আপনার অনেক সমস্যা হবে ভাই। সেটাই তো ভাবছি। কিন্তু যেভাবেই হোক অনুকে আমার চাই চাই ই চাই। কিন্তু ভাই, অনুর ভাই তো আপনার বিপক্ষে ও তো এমনিতেই আপনার উপর রেগে আছে।  সেটা পরে দেখা যাবে। বলেই অভ্র সেখান থেকে চলে আসে।

রাত ১০টা। পরিবারের সবার সাথে খেতে বসেছে অনু ঠিক তখনই অয়ন বলে, বাবা তোমার সাথে কিছু কথা ছিল। বলো কি কথা? তোমার আদরের দুলালি মেয়ে কার সাথে বন্ধুত্ব করেছে জানো? চিৎকার করে অয়ন বলে। অয়নের চিৎকারে খুব ভয় পায় অনু। কার সাথে? এলাকার টপ বখাটে অভ্রর সাথে। কি বলিস এসব! হ্যা বাবা। আজ নিজেই গিয়ে আমার সাথে অভ্রর পরিচিয় করিয়ে দিছে। তোমার মেয়ে কি জানে ঐ ছেলেটা কেমন? এসব কি বলিস ভাইয়া! অভ্র তো খুব ভালো ছেলে। ভালো ছেলে! হ্যা ভালো! তুই আসার আগে ঐ বখাটে ওর লোকজন নিয়ে আমার উপর হামলা করেছিল জানিস কি তুই? তোর ভাইকে অনেক মেরেছিল ঐ বখাটে টা। আর যাকে ভালো ভাবছিস সে শুধু ভালোর মুখোশ পরে থাকে ও একটা গ্যাংয়ের লিডার এটাও কি জানিস? অয়নের কথাতে অনুর সব কেমন যেন এলোমেলো লাগে। অভ্রকে দেখে তো অনু এসব কিছু ভাবেই নি।

মা’রে ছেলেটা অনেক খারাপ। ভাগ্য ভালো এখনও তোর কিছু করে নি তুই একটু খোজ নিয়ে দেখিস ছেলেটা কেমন জানতে পারবি। অনুর মা বলে। খাবার টেবিল থেকে উঠে যায় অনু। আর কোন দিন যেন ঐ ছেলের সাথে তোকে মিশতে না দেখি বলে দিলাম চেঁচিয়ে বলে অয়ন। অনু ঘরে এসে ভাবতে থাকে অভ্র কি আসলেই এমন? আমার ভাইকে মেরেছে? যদি এটা সত্য হয় তো ওর সাথে কোন কথা বলবো না। পরদিন ভার্সিটিতে গিয়ে বসে আছে অনু। পাশে ওর বান্ধবিরা। অনু বললো, আচ্ছা আনিকা তুই তো এলাকার মেয়ে আমাকে একটা কথা বলতে পারবি কি?  কি কথা বল? অভ্র ছেলেটা কে? কেমন? এসব। আসলে অনু তোকে এ’কথা আগেই বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দেখলাম তুই অভ্রর সাথে অনেক ভালো ফ্রেন্ডশীপ করেছিস তাই আর কিছু বলিনি।  তবে এখন বল। অভ্রকে এই এলাকার বখাটেদের বাপ বলতে পারিস। ও একটা গ্যাং চালায়। আমি দেখিনি তবে সবাই বলে।

অভ্র এলাকায় মাস্তানি করে বেড়ায় আর এলাকার বড় ভাই বলে কেউ সামনে থেকে কিছু বলে না তবে প্রায়ই মারামারি হয় অভ্রর সাথে অন্যদের। আর অভ্র এলাকার মোড়ে সারাদিন বসে থাকে এটা তো ওর বখাটে গিরির বড় পরিচয়। আনিকার কথা শুনে অভ্রর উপর কেন যেন খুব রাগ লাগতে থাকে অনুর। অভ্র আমার ভাইকে মেরেছে আবার এলাকাতে মাস্তানি করে ভাবতেই অনুর রাগটা আরো বেড়ে যায়। অপরদিকে অভ্র খুব টেনশন নিয়ে ক্লাবে শুয়ে আছে আর ভাবছে,” অনু তো এখন জেনে যাবে যে আমি একটা বখাটে.। যা সবাই বলে। তবে আমি যে অনুকে ভালোবাসি। নাহ্ আর দেরি করা চলবে না। অনু আমার ব্যাপারে জানার আগেই ওকে আমার ভালোবাসার কথাটি বলে দিতে হবে। হ্যাঁ, আমি কালই অনুকে আমার মনের কথাটা বলে দেবো। পরদিন অভ্র খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। তারপর ফ্রেশ হয়ে ওর পছন্দের স্কাই ব্লু শার্ট টা পড়ে ক্লাব থেকে বের হয়। মনটা খুব ভালো আজ অভ্রর। খুশি মনে ক্লাব থেকে বের হতেই রাজু আর আয়ানের সাথে দেখা। রাজু আর আয়ান তো একদম হা করে তাকিয়ে আছে অভ্রর দিকে।

কিরে ছোট কি দেখিস এভাবে? অভ্র মুচকি হাসি দিয়ে বলে। ব্যাপার কি ভাই? হঠাৎ এত্ত সুন্দর পরিপাটি হয়ে কই ছুটলেন? বলে রাজু। আরে গাধা বুঝিস না, ভাই তো প্রেমে পড়সে। এখন না স্টাইল করলে করবে কখন বলে আয়ান।  ঐ চুপ থাক তোরা। আগে বল আমাকে কেমন লাগছে?  ভাই! কি কমু! আমি যদি মেয়ে হতাম না তো শিওর আপনারে প্রপোস করতাম মুচকি হেসে বলে আয়ান।  ঐ শালা চুপ থাক। তা ভাই কই যান এখন? রাজু বলে। কালকে অনেক ভেবে দেখছি রে ছোট, অনুকে ছাড়া আমার চলবে না। তাই আমার মনের কথাটা ওকে বলতে যাচ্ছি। ওয়াও! ভাই, ভাব্বি আজ আপনারে দেখে শিওর প্রেমে পড়ে যাবে।  ভাই এক কাজ করেন সামনের দোকান থেকে কিছু টাটকা গোলাপ নিয়ে যাইয়েন কেমন? আচ্ছা ঠিক আছে। ওকে ভাই দোয়া রইল। বিকেলে যেন খুশির খবরটা শুনি। ঠিক আছে। বলেই রওনা দেয় অভ্র। রিক্সা করে ভার্সিটির দিকে যাচ্ছে অভ্র আর নিজের অজান্তেই বারবার মুচকি মুচকি হাসছে। ফুলের দোকান থেকে একদম টকটকে দুটে গোলাপ কিনে নিলো অভ্র। কিছুক্ষণ পর ভার্সিটি পেয়ে গেলো। গেট দিয়ে ঢুকতেই বুকের ধক ধক আওয়াজটা কেন যেন বেরে গেল। বাড়ছেই বাড়ছেই। কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে অভ্রর। ভাবছে অনু কি আমাকে ভালোবাসবে? না কি ভুল বুঝবে?

একপা একপা করে ক্লাসের দিকে এগিয়ে যায় অভ্র। ক্লাসের সামনে এসেই দেখে অনু দাড়িয়ে আছে। গোলাপটা পিছনে লুকিয়ে অনুর সামনে যায় অভ্র। বুকের ধক ধক আওয়াজটা এবার খুব বেশি জোরে হচ্ছে। মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছেনা অভ্রর। তবুও অনেক কষ্টে বললো, কে মন আ আছিস অনু? হ্যা ভালো। অ অনু তোর সাথে আমার কিছু কথা ছিলো। আমারো তোর সাথে কিছু কথা ছিল। অনুর ও কথা আছে ভাবতেই অভ্রর বুকের ভিতর কেমন যেন করে ওঠে। কি কথা বল। না তুই বল। আ আসলে অনু আমি জানি না তুই কথাটা কিভাবে নিবি। কথাটা বলার পর আমাকে কি ভাববি তবে আমার কথাটা বলার খুব প্রয়োজন। অনু তুই যেদিন আমার কাছে রিক্সা ভাড়ার খুচরা টাকা চাইলি সেদিন থেকেই আমার তোকে ভালো লাগে। তোর কথা বলা, তোর মুচকি হাসি, খোলা চুল, পাগলামি সবই খুব ভালো লাগে। তবে এই ভালো লাগার কথাটা আর বলতে পারি নি রে। তবে আজ বলছি। আমি তোকে ভালোবাসি অনু। সারাজীবন তোর পাশে থাকতে চাই। দিবি কি একটা সুযোগ? বলেই অভ্র পিছন থেকে ফুল অনুর দিকে বাড়িয়ে দেয়। তোর বলা কি শেষ?  হ্যাঁ শেষ। অভ্র মুচকি হেসে বলে। এবার আমি কিছু বলি? হ্যাঁ বল। তোর পরিচয় কি? পরিচয় মানে! অভ্র অবাক হয়ে বলে অভ্র।

মানে এলাকায় সবাই তোকে কি বলে চেনে  গুন্ডা, বখাটে , বড় ভাই এটাই তো তাইনা? সারাদিন রাস্তার মোড়ে আড্ডা দেয়া, খারাপ কাজ করা মারামারি করাই তোর কাজ তাইনা? অনু চিৎকার করে বলে। অনু আগে আমার কথা শো চুপ কর তুই। আমাকে বলতে দে। তুই এতটা খারাপ ছিঁ। তোকে আমি খুব ভালো ভেবেছিলাম আর সেই তুই কি না আমার ভাইকে বিনা দোষে মেরেছিলি। অনু তোর ভা  চুপ কর আমাকে কথা শেষ করতে দে। তোর নামে থানায় ও অনেক রিপোর্ট আছে। শুনেছি এলাকার বেশিরভাগ মানুষই তোকে খারাপ বলে। অভ্র তুই আমার বন্ধু ভাবতেও ঘৃণা লাগে। আর আজ তুই আমাকে প্রপোস করলি! হাহাহা। তুই ভাবলি কি করে যে তোর মতো একটা বখাটে ছেলেকে আমি ভালোবাসবো! তুই আমার ভাইকে মেরেছিস এরপর আমি তোকে বন্ধুই তো ভাবতে পারছি না আবার ভালোবাসা! শোন অভ্র একটা কথা বলে রাখি তোকে আমি কোন দিনও ভালোবাসবো না। আর এর থেকে বড় কথা হলো আর কোন দিন আমার সাথে কথা বলবি না। আমি কোন বখাটে ছেলের সাথে কথা বলতে চাই না।

আমি সত্যি তোকে অনেক ভালোবাসি। তোকে ছাড়া আমি ভালো থাকতে পারবো না। প্লিইইজ অনু এমন করে বলিস না। আমাকে ভালোবাসিস? হ্যাঁ হ্যাঁ অনেক অনেক ভালোবাসি। কি করতে পারবি আমার জন্য ? আত্মহত্যা পাপ। এটা ছাড়া সব করতে পারবো।  তুই যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসিস তো প্লিইইইজ আর কোনদিন আমাকে ডিস্টার্ব করিস না। আমার আশে পাশেও যেন তোকে না দেখি। আর হ্যা ভালো থাকিস। বলেই চলে গেল অনু। আর অভ্র শুধু অবাক চোখে অনুর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। খুব কান্না পাচ্ছে অভ্রর। কিন্তু চোখ দিয়ে কোন জল বেরুচ্ছেই না। হাত থেকে ফুলটা পড়ে গেল। চিনচীনে ব্যাথা ভরা বুকটা নিয়ে একপা একপা করে হাটা শুরু করল অভ্র। ক্লাবে ঢুকে ধপাস করে খাটে শুয়ে পড়ল। থেমে থাকা সিলিং ফ্যানটার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে অভ্র আর ভাবছে, আচ্ছা আমি কি সত্যিই বখাটে? আমি তো কখনোই খারাপ কাজ করিনি। সমাজ আমাকে এই পথে চলতে বাধ্য করছে। আচ্ছা মানছি আমি বখাটে। তাই বলে কি ভালোবাসতে পারি না?না কি বখাটেদের ভালোবাসার অধিকারটা নেই।

অনু তো বলে গেল আর ওকে ডিস্টার্ব না করতে।  কিন্তু ওকে ছাড়াতো আমি ভালো থাকতে পারবো না।  আমি যে অনুকে সত্যিই খুব ভালোবাসি। আর এই ভালোবাসা তো মিথ্যা প্রমাণ করতে দেবো না। হ্যাঁ হ্যাঁ আমি আর যাবো না অনুর আশেপাশে। তবে সব সময় দূর থেকেই ওর খেয়াল রাখবো। ওকে দেখবো, ওকে ভালোবাসবো আমি আমার সবটুকু দিয়েই। দূর থেকে অনুকে আগলে রাখবো। আমি যে অনুকে খুব ভালোবাসি খুব খুব অনেক কষ্টে টুপ করে দুফোটা জল অভ্রর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। আজ অনেক বছর পর অভ্রর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ব্যাপারটা অনেক ভালো লাগছে অভ্রর। অভ্র ভাই. …অভ্র ভাই, আমাদের মিষ্টি কইইইই হু ? বলে আয়ান আর রাজু ক্লাবে ঢুকতেই থমকে যায়!

অভ্র তাড়াতাড়ি চোখটা মুছে মুচকি হেসে বলে চল তোদের আজ পেট পুরে মিষ্টি খাওয়াবো  কি হয়েছে ভাই! আয়ান অবাক হয়ে বলে। সত্যি করে বলেন ভাই কি হয়েছে? রাজুও বলে। হাহাহা কিছুনা চল যাই। ভাবি মানে অনু আপনার প্রপোজে রাজি হয় নি তাইনা? আরে ধ্যাত, তা না। আমি বুঝে গেছি। ঐ রাজু চল অনুকে তুলে নিয়ে আসবো। আমার ভাই প্রথম কাউকে এতটা ভালোবাসছে আর সে আমার ভাইটাকে কষ্ট দিবে! চল এখনই। ছোট, প্লিইইজ যাস না আগে আমার কথা শোন। না শুনবো না চল তো রাজু। আমার কসম যাস না। চারপাশ নিরব হয়ে যায়। কারণ অভ্রর একটা কথাও ফেলতে পারে না আয়ান আর রাজু। এরপর অভ্র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব খুলে বলে। বুঝলি তো এই হলো কথা হাহাহা। ভাই আপনি সত্যিই অন্যরকম। এত কষ্টেও মুখে হাসি ধরে রাখতে পারেন! বলেই অভ্রকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দেয় আয়ান। শোন ছোট, এখন থেকে তোদের কাজ হলো অনুকে দেখে রাখা বুঝলি তো? ওর যেন কিছু না হয়। তবে কখনো ওর কাছে যাবি না। যতটা পারিস দূর থেকে খেয়াল রাখবি কেমন?  ঠিক আছে ভাই। এরপর থেকে অভ্র আর অনুর কাছাকাছি যায় না। যতটা পারে দূর থেকেই দেখে। ভালোবাসে তো। অভ্র আর ক্লাসও করে না। বলা তো যায় না এতে যদি অনু ডিস্টার্বড হয়।  আর আয়ান, রাজু ওরা অনুর খেয়াল রাখে। এভাবেই চলে যায় দুটো মাস।

ক্লাবে বসে আছে অভ্র। যেই অভ্র সিগারেটের ধোঁয়া সহ্য করতে পারতো না আজ সেই অভ্র জীবনের ১ম হাতে সিগারেট তুলে নিয়েছে। কারণ অভ্র শুনলো আজ অনু ভার্সিটির টপ স্মার্ট প্লে বয় ইমনের সাথে রিলেশনে জড়িয়েছে। সিগারেটে এক টান দিতেই কাশতে কাশতে শুয়ে পড়ে অভ্র। নাহ ওর দ্বারা এটা হবে না। অনু কারো প্রেমে পড়ছে এজন্য যতটা না কষ্ট লাগছে তার চেয়ে অনেক বেশি কষ্ট লাগছে এই ভেবে যে ছেলেটা ইমন। যে কিনা প্রেম করে দেহ ভোগের জন্য। ইমনকে খুব ভালো করে চেনে অভ্র। আর অনু!  না না অনুর কিছু হলে এটা অভ্র সহ্য করতে পারবো না। মোটেই না। রাজু আর আয়ানের থেকে অভ্র জানতে পারে কিছুদিন ইমন অনুর সাথে একটু বেশিই এদিক সেদিক যাচ্ছে। কথাটা শুনে আর থাকতে পারে না অভ্র। অনুকে সাবধান করতে হবে না হলে খুব বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। কিন্তু অনুকে যে কিছু বলবে সে রাস্তা অভ্রর জানা নেই। তাই অনেক ভেবে দুজন লোক ভাড়া করে অনুকে কিডন্যাপ করায়।

এরপর অনুকে অনেক বুঝায় যে ইমন খুব খারাপ ছেলে একটু সাবধানে থেকো। তবে অনু শুনতে নারাজ। অনুকে বাসায় দিয়ে আসে অভ্র আর সাবধানে থাকতে বলে।  কি রে? এরপর আর আমার মেয়েকে ডিস্টার্ব করবি? আমিন সাহেব জেলে ঢুকে বলে। আর ভাবনার ভাবনার ছেদ পরে অভ্রর। চোখ মেলে দেখে সকাল হয়ে গেছে আর অনুর বাবা ওর সামনে দাড়িয়ে আছে। আমি কখনোই আপনার মেয়েকে ডিস্টার্ব করিনি। হয় ভালোবেসেছি না হয় খেয়াল রেখেছি। ঠাসসসস। কথাটা বলতে না বলতেই আমিন সাহেব অভ্রকে চড় বসিয়ে দেন। রফিক এই রফিক। জি স্যার। একে যেখান থেকে নিয়ে এসেছিস সেখানে রেখে আয়। জি স্যার। আর দেখো অভ্র, তোমাকে শেষ বারের মতো বলে দিচ্ছি আমার মেয়ের পিছু নেয়া ছেড়ে দাও। ও তো বলেই দিছে যে তোমাকে ভালোবাসে না তাই না? আশা করি তুমি চাওনা যে আমি ওকে অন্য কোথাও রেখে আসি সো ওর আশেপাশে আর এসো না কেমন। বলেই আমিন সাহেব চলে গেল।

আর রফিক সাহেব গাড়িতে করে অভ্রকে ক্লাবের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেল। চোখে কেমন যেন ঝাপসা দেখছে অভ্র।  দাড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও যেন নেই তবুও অভ্র রিক্সা করে ভার্সিটির গেটে এসে থামলো।  তারপর আস্তে আস্তে ভিতরে যেতে লাগলো। মাথাটা কেমন যেন ঘুড়ছে অভ্রর। তবুও চলছে শেষ শক্তিটুকু নিয়ে। ঐ তো ক্লাসের সামনের বারান্দায় দাড়িয়ে আছে অনু। কোন রকমে অভ্র অনুর কাছে গেল তারপর, কেমন আছো অনু? অভ্রকে দেখেই অবাক হয়ে যায় অনু। কি হলো তুই কেন আবার এসেছিস আমার কাছে তোকে না মানা করেছিলাম! অনু কিছু কথা ছিলো। কোন কথা নেই চলে যা বলছি। একটু শুনো। কথা দিচ্ছি এরপর চলে যাবো। ওকে বল । বিরক্তি নিয়ে অনু বলে। আমি না আসলেই খুব খারাপ জানো তো।

খুব একা একা থাকি তো ছোট থেকেই তাই সামাজিকতা কি সেভাবে বুঝিইনি। কখনো কারো আদর পাইনি তো।
জানো তো আমি সত্যিই একটা বখাটে তবে কখনোই অন্যায় করিনি। যারা আমাকে খারাপ বলে তারা এলাকার খারাপ দলের লোক। জানো তো আমি সত্যিই বখাটে, গুন্ডা তবে তোমার ভাইকে সেদিন ইচ্ছা করে মারিনি। কেন মেরেছিলাম জানো? তোমার ভাই একজন অসহায়ের গায়ে হাত তুলেছিলো সে তোমার ভাইয়ের চোরা কারবারির খবর জানতো বলে। আমি আসলেই খারাপ জানো তো? সবার কাছেই খারাপ শুধু দুজনের কাছে ছাড়া। এক আয়ান আর এক রাজু। আমি জানি এই পৃথিবীতে ওদের আমি আর আমার ওরা ছাড়া কেউ নেই। হাহাহা এতিমরা এর থেকে আর কতটা ভালো হবে বলো? জানো তো এসবের মাঝে একটা কথা সত্য।

আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসেছি। তবে এর মানে এই না যে আমার তোমাকেই জোড় করে হলেও চাই।  তুমি আমাকে নাই বা ভালোবাসলে আমি তো বাসি।  আমি শুধু চাই তুমি খুশি থাকো, ভালো থাকো। তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসলে আমি কিছুই বলতাম না। কিন্তু ইমনকে তুমি জানো না অনু। ও অনেক খারাপ। আমি চাই তুমি ভালো থাকো তাই সব সময় তোমাকে চোখে চোখে রাখতাম। তুমি বুঝলে না।  শুধু এতোটুকুই বলবো যে একটু নিজেকে সেভ রেখো কেমন?তোমার কিছু হলে আমি সহ্য করতে পারবো না। আর পারলে আমাকে মাফ করে দিও।  বখাটে হিসেবেই না হয় মাফ করো। তোমাকে যে অনেক বিরক্ত করছি আমি। যাই হোক, সাবধানে থেকো কেমন। আর শুনেছিলাম কেউ যদি মন থেকে কিছু চায় তাহলে সে তা পায়। আমি তোমাকে চাইলাম। যদি কোনদিন এই বখাটে টার কথা মনে পড়ে, যদি কোন দিন ভালোবাসার অভাব পড়ে তো এই বখাটে টার কাছে চলে এসো কেমন? সারাজীবন অপেক্ষা করবো। ভালো থেকো সাবধানে থেকো।

বলেই অভ্র চোখটা মুছে চলে গেলো। আর বিরক্তি নিয়ে ক্লাস না করেই বাসায় চলে গেল অনু। রাতে খেতে বসেছে সবাই ঠিক তখন,কি রে মা ঐ বখাটে টা কি আর তোকে ডিস্টার্ব করেছে আমিন সাহেব জানতে চান।  না তো বাবা কেন?  হাহাহা। জানি আর করবেও না। যে মার মেরেছি জীবনেও ভুলবে না।  কবে মেরেছো বাবা?  কেন পরশুদিন রাতেই তুলে নিয়ে গেছিলাম। জেলে পুরে একটু সাইজ করেছি আর যাবে না তোর আশেপাশে হাহাহা। খাওয়া শেষে নিজের রুমে চলে গেলো অনু। রাত ১১টা। অনু ইমনের সাথে ফোনে কথা বলছে। ইমন বললো, বাবুনি তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো? অনেক ভালোবাসি বাবু অনেক।  তাহলে আমি যা চাই তা দিচ্ছোনা কেন বাবুনি?  কি চাও বাবু বলো? তোমাকে আমার কাছে চাই খুব কাছে। আমি তো তোমার কাছেই থাকি। নাহ এভাবে না।

আমি তোমাকে অতটা কাছে যাই যতটা কাছে আসলে তোমার নিঃশ্বাস আমি শুনতে পারবো। কিন্তু এটা তো ঠিক না। কি ঠিক না হু! তুমি আমাকে ভালোই বাসোনা একটু আদরই তো চাইছি।  তাহলে বিয়ে করো আমাকে। তারপর সব পাবে। বিয়ে তো তোমাকেই করবো বাবুনি। প্লিইইইজ বাবুনি প্লিইইইইজ। প্রথমে রাজি না হলেও ভালোবাসার দাবি পুরণে রাজি হয়ে যায় অনু। এই বাবুনি তাহলে আমি তোমাকে কাল বিকেলে বাসায় নিয়ে যাবো কেমন তুমি রেডি থেকো। আচ্ছা ঠিক আছে। আমার লক্ষী বাবুনি love you. ummmmmaaahh। ফোন কেটে খুশিতে অট্টহাসি হাসে ইমন।  অবশেষে অনু ইমনের জালে ধরা দিলো। তবে অনেকদিন পর। কালকেই আবার নতুন একটা দেহের স্বাদ নিবে ভাবতেই চোখ দুটো চকচক করে ওঠে ইমনের। ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙে অনুর। ইমনের ফোন। হ্যা বলো।  বাবুনি আজ ভার্সিটি আসবা না?  না বাবু। বিকেলে তো তোমার কাছে যেতে হবে তাই যাবো না।  আচ্ছা ঠিক আছে বাবুনি বাই। ওকে বাই। ফোনটা রেখে আবার একটু ঘুমায় অনু। হঠাৎই ঘুমটা ভেঙে যায় অনুর। মনে পরে আজ না একটা ইমপরটেন্ট ক্লাস আছে।

তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করেই ভার্সিটিতে যায় অনু। গিয়ে ক্লাসটা করে তারপর ইমনের সাথে দেখা করার জন্য ওর ক্লাসের দিকে যায়। মামা অবশেষে তাইলে মালটা ভোগ করতেছো আজ তাইতো? ইমনের ক্লাসে ঢুকতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে এমন কথা শুনে ভকড়ে যায় অনু। দরজার কাছে দাড়িয়ে শোনার চেষ্টা করে কি কথা হয় ভেতরে। হ মামা মালটা আজ খাবো। জানিস তো এর আগের গুলা তাড়াতাড়ি পটাইছি বাট এটা কাছে ঘেষতেই চায়না। আজ বাগে পাইছি বলেই হাসে ইমন।  তবে যাই বলো মামা জিনিসটা কিন্তু জোশ। আগে টেস্ট করে দেখি কেমন। এত দেখে কি হবে ইউজ হলেই মাল বাতিল হাহাহা। এমন কথা শুনে রাগে কষ্টে চোখ ফেটে পানি চলে আসে অনুর। নিজেকে আর ঠিক রাখতেই পারে না। ক্লাসে ঢুকেই ইমনের গালে ঠাসসসসস করে কষে একটা চড় বসিয়ে দেয় অনু।

এই বাবুনি মারলে কেন? গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে ইমন বলে। ঠাসসসসস। কুত্তা কে তোর বাবুনি? তোর মুখে যেন জীবনে আর এ ডাক না শুনি। এসব কি বলো বাবুনি। ঠাসসসসস। তুই এতটা নিচু ছিঁ!  মেয়েদের সাথে নষ্টামি করে খুব মজা পাস না! কত মেয়ের সাথে এমন করেছিস বল? এসব কি বলো বাবুনি। ঠাসসসস। কুত্তা তোর মুখে বাবুনি ডাক মানায় না। তোকে বিশ্বাস করে ঠকেছি আমি।  তবে খুব বাঁচা বেঁচে গেছি এই যদি আজ ক্লাসে না আসতাম তবে আমি জানতেই পারতাম না তোর আসল কথাটা কি। আমি তোকে এতটা ভালোবাসি আর তুই শুধু ভোগ করতে চাস! টেস্ট করতে চাস! ঠাসসসস। তোকে ভালোবাসি ভাবতেই আমার ঘৃনা লাগছে ছিঁ। এই বাবুনি শোন আমার কথা।  আর একটাও কথা বলবি না। তোর ব্যবস্থা আজই করবো। বলেই রাগে হনহন করতে করতে বাসায় চলে আসে অনু। তারপর ওর বাবাকে ফোন দিয়ে সবটা খুলে বলে। অতঃপর ইমনকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। সারাটা রাত খুব কান্না করে অনু। ওর বিশ্বাসই হচ্ছেনা যে ইমন এতটা খারাপ! যাকে মনে প্রাণে ভালোবেসেছি সে কিন আমাকে ভোগ করতে ভালোবেসেছে ছিঁ! ভাবতেই খুব কষ্ট লাগছে অনুর।

সারাটা রাত আর ঘুমাতে পারে না অনু। কান্না করতে করতেই রাতটা পার হয়ে যায়।পরদিন থেকে অনু কেমন যেন হয়ে যায়। এত বড় ধাক্কা কাটাতে পারছেনা অনু।  কি করে কাটাবে? সে যে খুব ভালোবাসতো ইমনকে। এখন কেন যেন বারবার অভ্রর বলা কথা গুলো মনে পড়ছে অনুর। অভ্র বলেছিল ইমন ছেলেটা ভালো না সাবধানে থাকতে অনু শুনেনি অভ্রর কথা। তবে আজ বুঝতে পারছে অভ্র কেন বলেছিল। আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করেনা অনু। অনেকটা শুকিয়ে গেছে। এখন কেন জানি ইমনের কথা আর ভাবতে পারে না।  ভাবনাতে শুধু অভ্রর কথাগুলাই আসে। অভ্র বলেছিল আমার কাছে ভালোবাসা মানে চোখে চোখ রেখে কথা বলা, একে অপরকে বুঝতে পারা, খুব বেশি বিশ্বাস করা, তার খোলা চুলের খেলা দেখা আর হাসির মাঝে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। যেদিন অনুকে অভ্র ধরে নিয়ে গেছিলো সেদিন অনু বলেছিল আমাকে ভোগ করতে এনেছিস তা করতে পারবি বাট ভালোবাসা পাবি না।

সেদিন অভ্র মুচকি হেসে বলেছিল আমার কাছে ভালোবাসা খুব পবিত্র তোমাকে আমি টাচ ও করবোনা। যেদিন অভ্র প্রপোস করেছিল সেদিন বলেছিল, “দেবে কি তোমার পাশে থাকার সুযোগ? কথা দিচ্ছি কখনো ছেড়ে যাবো না। ” অভ্রর প্রতিটা কথা অনুকে খুব কষ্ট দিচ্ছে। অনু এখন খুব করে অনুভব করতে পারছে সত্যিকারের ভালোবাসা কি।  ভালোবাসা কতটা পবিত্র অনু এখন খুব করে বুঝছে। অনুর খুব আফসোস লাগছে অভ্রকে এতটা দিন ভুল বুঝার জন্য।নিজের কাছে বড্ড অপরাধি লাগছে অনুর। এ মুখ নিয়ে মাফ ও চাইতে পারবে না অনু। কিন্তু অভ্র!অভ্র কই!  অনু তাড়াতাড়ি ক্লাবের দিকে ছুটে চলে যায়। গিয়ে দেখে ক্লাবে তালা দেয়া। খুব কান্না পায় অনুর। অভ্রকে এখন কোথায় পাবে? অনু যে এখন খুব করে বুঝছে অভ্র কি ছিলো তার জন্য। চোখ দিয়ে অঝর ধারায় পানি পড়ছে অনুর হঠাৎই দেখলো আয়ান আর রাজু এদিকেই আসছে। অনু ছুটে যায় ওদের কাছে। আয়ান অ অভ্র কই? হাহাহা। কেন ঐ বখাটে, গুন্ডা টারে কি দরকার আপনার? আয়ান বলে।

 

এভাবে বলোনা প্লিইইইজ বলো অভ্র কই। হাহাহা। নিজে তাড়িয়ে দিয়ে আজ নিজেই করুণা দেখাতে এসেছেন হ্যাঁ ? কি দোষ করেছিলো আমার ভাই যার জন্য এতটা কষ্ট দিলেন? শুধু ভালোবেসেছে পাগলের মতো এটাই কি অপরাধ? নাকি সে একটা বখাটে হয়ে আপনাকে ভালোবেসেছে এটা তার অপরাধ? রাজু বললো।  আরে রাখ না এসব কথা। এরা আমাদের মতো এতিমদের কি করে বুঝবে। যার বাবা জেলে আটকে মারতে মারতে আধমরা করতে পারে তার আবার কিসের কথা।  আচ্ছা ভাই তো আপনার কোন ক্ষতি করেছিলো না তবুও এতোটা কষ্ট দিলেন কেন? যা খুশি বলো, যতো পারো আমাকে বলো তবুও বলো অভ্র কই প্লিইইজ বলো। আপনার বাবা ভাইকে বলেছিল যদি সে থাকে এখানে তো আপনাকে এখানে থাকতে দেবেনা। আর আপনিও তো এটাই চাইতেন তাইনা? তাইতো আমাদের ভাইটা আপনার খুশির জন্য চলে গেছে। এবার খুশি তো আপনি চলে যান এখন চলে যান। বলেই চোখ মুছে নেয় আয়ান। তোমাদের কাছে হাত জোড় করে বলছি যত খুশি বকা দাও তবুও আমাকে একটা বার অভ্রর কাছে নিয়ে যাও প্লিইইইজ। হাত জোর করা লাগবে না। চলেন আমাদের সাথে রাজু বলে। না যাবো না নিয়ে। আবার আমার ভাইকে কষ্ট দিবেন তা হতে দেবো না আমি। আমাকে ভুলটা শুধরে নেয়ার একটা সুযোগ দাও প্লিইইইজ। আচ্ছা চলেন।

হ্যা চলো। চোখটা মুছতে মুছতে অনু ওদের সাথে যায়। প্রায় দেড় ঘন্টা পর গ্রামের পরিবেশে চলে আসে ওরা। অভ্র কই?অনু বলে। কেউ কোন কথা বলে না। একটু একটু করে নদীর পাড়ে চলে আসে সবাই। ঐ যে নদীর পাড়ে বসে আছে ভাই রাজু হাতের ইশারায় বলে। তোমাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ। এতে হবে না। আমরা চাই আজকের ভিতর ভাইয়া আবার আগের মত হয়ে যাক। তাই হবে। তোমরা যাও আমরা আসছি। ঠিক আছে ভাবি,স্যরি হিহিহি । আয়ান আর রাজু চলে যায়। আর অনু একপা একপা করে অভ্রর দিকে এগুতে থাকে। যতই এগুচ্ছে বুকের ভেতর কেমন যেন লাগছে ওর। অনু অভ্রর কাছে গিয়ে দেখে অভ্র বসে অপলক ভাবে বহুদূর তাকিয়ে আছে। অভ্রোওওওও কান্না জড়িত কন্ঠে অনু বলে।

কারো কন্ঠ শুনেই তাড়াতাড়ি চোখটা মুছে পিছে তাকায় অভ্র। পিছে তাকাতেই অবাক হয়ে যায়। আরে অনু আপনি এখানে? কেন আমি কি আসতে পারি না?  না তা বলিনি। আপনি আসতেই পারেন তবে একটা বখাটের কাছে আসছেন এটা কেমন যেন হয়ে যায় না? অনু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।  দৌড়ে অভ্রর বুকে ঝাপিয়ে পড়ে তারপর খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করে দেয়। অনুর এমন কাজে বড্ড অবাক অভ্র তবুও নিজেকে সামলে নেয়। এটা ঠিক না। ছাড়ুন আমাকে। আমি অনেক খারাপ ছেলে ছেড়ে দিন।

চুপ থাক কুত্তা। বেশি কথা বলেছিস তো এখানেই মেরে ফেলবো। বলেই আরো বেশি শক্ত করে অনু অভ্রকে ধরে রাখে।  আমি না খুব বড় ভুল করেছি রে খুব বড়। প্লিইইইজ আমাকে ভুল টা শুধরানোর একটা সুযোগ দে কেঁদে কেঁদে বলে অনু। আরে এসব কি বলেন? আপনার কোন ভুল নেই ভুল তো আমার আমি একটা বখাটে।  চুপ থাক। তুই বখাটে হ আর গুন্ডা হ। তুই খারাপ হোস বা ভালো আমি এত কিছু জানি না শুধু এটুকু জানি আমার তোকে ছাড়া চলবে না, মোটেই না। আমাকে তোর বুকে রাখ না রে অনু কান্নার সূরে বলে। অভ্রর খুশিতে চোখ দিয়ে অশ্রু ঝড়ছে তবুও অভিমান করে বললো, না রাখবো না এতোদিন কষ্ট দিছেন আর একটা বখা আর কিছু বলতে পারে না অভ্র ঠোটে কিসের যেন স্পর্শে চোখটা বুজে যায়। কিছুক্ষণ পর অনু অভ্রর বুকে মাথা রেখে বলে, এতোদিন যে কষ্ট দিছি সব শোধ করে দেবো ভালোবাসা দিয়ে। তবুও এই বখাটে টাকেই আমার চাই।

অভ্র আর কিছুই বলতে পারে না। এই ভালোলাগার অনুভূতিটা বলার ভাষা অভ্রর জানা নেই। তবে চোখের জল বলে দিচ্ছে অভ্রর কতটা ভালো লাগছে। দুজনে একে অপরকে পরম ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরে রেখেছে। কষ্টের প্রাপ্তি সত্যিই অনেক মধুর হয় অনেক। হোক সে বখাটে। সত্যিকারের ভালোবাসা এভাবেই বেঁচে রয়।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত