এমনি

এমনি

বিয়েটা করেছি বাবার ইচ্ছাতেই। নিজের কোন পছন্দের মেয়েও ছিল না,তাই আপত্তি করার কোন কারণ খুঁজে পাইনি।

পরিবারের মেঝো ছেলে হওয়াতে অনেক মজার মধ্যেই বিয়েটা হয়েছে। পাত্রীকে প্রথম দেখি বাসর রাতে। এর আগে শুধু ছবিতে দেখেছিলাম,সরাসরি না। গায়ের রঙ একটু কালো। শ্যাম বর্ণের বলা চলে। গায়ের রঙ যেমনই হোক দেখতে খুবই সুন্দর। হয়তো এখন থেকে ওর সাথেই জীবনের বাকি সময়টুকু কাটাতে হবে তাই সুন্দর লাগছে।
বাসর ঘরে ঢোকার পর এখন পর্যন্ত একটা কথাও বলিনি। অনেক ভেবে চিনতে বোকার মত একটা কথা বললাম,”আপনি এতো সুন্দর কেন?”
অবন্তী একটু লজ্জা পেয়ে বলল,এমনি

এর পর নিজের বোকামিতে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। আমি এতোটা বোকা? হঠাৎ করে এ ধরণের প্রশ্ন করে নাকি কেউ!

তারপর অনেক কথা হলো। ওর জীবনের কিছু কথা,কিছু চাওয়া সবই বলল আমাকে। আমি যে চুপ ছিলাম তা না। আমিও ওর প্রত্যেকটা কথার জবাব দিয়ে গেছি। নিজেও অনেক কথা বলেছি।

বিয়ের কয়েকদিন পার হবার পর বুঝতে পারলাম অবন্তীর মাঝে কিছু একটা ঝামেলা ধরণের আছে। ওর সাথে এখনো এতোটুকু কথা হয়নি যে আপনি থেকে তুমি তে চলে যাব। অপরিচিতদের মত আপনি বলেই দিন চলে আমাদের। আজ সকালে সকালে ওকে বলেছিলাম,আপনি চা খান না?
অবন্তী মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল,না।
কেন?
এমনি।
এমনি?
হু
আচ্ছা চলুন আজ বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
না। যাবোনা
কেন? চলুন,ভালো লাগবে।
উঁহু
কিন্তু কেন?
এমনি।

অবন্তীকে কোন প্রশ্ন করলে তার প্রত্যেকটার উত্তর আসে “এমনি”,এমনি বলার কি দরকার। কারণ টা বললেই তো হয়!

একদিন পরিবারের প্রায় সবাই মিলে বাইরে ঘুরতে গেলাম চার দিনের জন্য। পাহাড়ি এলাকায়।
বাসায় বাবা আর আমার বড় ভাই আছে। ব্যবসার দিকে তারা কঠিন ভাবে নজর রাখে। বাসায় কেউ খেয়েছে কি না তার খবর না রাখলেও দোকানের কর্মচারী খেয়েছে কি না তার খবর ঠিকই রাখেন বাবা।
বাবা আর ভাই না থাকাতে তেমন খালি খালি লাগছেনা। বরং ভালোই লাগছে,তাদের কড়া কড়া কথা শুনতে হচ্ছেনা। ছোট বোন নীলা আর মা বাগানের দিকে গেছে। ছোট ভাই ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত। আমি অবন্তীর সাথে পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত। এতোদিনে আমাদের সম্পর্কটা তুমিতে এসেছে।

অবন্তী।
হু?
চলো পাহাড়ের দিকে যাই। ওইখানে নাকি একটা বড় ঝর্না আছে। ঝর্নার পানির সাথে ছোট ছোট মাছ লাফিয়ে লাফিয়ে নিচে পরে,দেখার মত দৃশ্য। চলো যাই।
না
কেন?
এমনি
এমনি কি আবার? ভয় পাও?
অবন্তী একটু লজ্জা পেয়েই বলল,হুম
চলো কিছু হবেনা। ভয় পাবার কি আছে!

হেঁটে হেঁটে পাহাড়ের অন্যদিকে গেলাম। বেশি সময় লাগেনি,সুরঙ্গ দিয়ে এসেছি। বিশ টাকা করে টিকিট। পাহাড়ের অন্য দিকে গিয়ে বাম দিকে একটু এগুলো ঝর্না দেখা যায়।

ঝর্নার কাছে গিয়ে অবন্তী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলো। এর আগে বোধহয় ঝর্না দেখেনি। আমি নিজেও দেখিনি। ছোট ছোট মাছ লাফিয়ে পড়ছে নিচে। রুপোলী রঙের মাছ গুলো কিছুক্ষণের জন্য মুক্তোদানা মনে হচ্ছিল। হঠাৎ কি হলো বুঝতে পারলাম না। অবন্তী যেখানে পা রেখেছিল সেখানটা তেমন ভালো ছিল না। একটা পাথর একটু সরে যাওয়াতে অবন্তী পরে যায়। যদিও খাদ থেকে অনেকটা দূরেই ছিলাম আমরা,তবুও অবন্তী ভয় পেয়ে বাচ্চাদের মত কেঁদে দিল। আমি জড়িয়ে ধরে বললাম,আরে কান্না করার কি আছে। কিছু হয়নি তো! কান্না করছো কেন?
এমনি।

ঘুরাঘুরির পর বাসায় ফিরে আসি। বাকি দিন গুলোর মতই চলতে থাকে আমার সময়। ঘুম,খাওয়াদাওয়া,অফিস,আর পরিবার এগুলোই চলছে শুধু। কিন্তু পরিবার একটু পাল্টেছে। আগে অবন্তী ছিল না,এখন অবন্তী নামের নতুন কেউ এসেছে। আমি ভেবেছিলাম একটু কালো দেখে সবার সাথে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে ওর। কালো মেয়েদের সবাই একটু হলেও অবহেলা করে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। বিয়ের কয়েকদিন পর থেকেই ও সবার সাথে মানিয়ে নিয়েছে। আমার মা কে এমন ভাবে “মা” ডাকে যে মাঝে মাঝে হিংসে হয়।
একদিন অফিসে থাকতে বাসা থেকে ফোন এলো। অবন্তী নাকি মাথা ঘুরে পরে গিয়েছে। কিছুদিন ধরে বমিও করছে। আমি তাড়াহুড়া করে বাসায় চলে গেলাম। বাসায় শুধু ছোট বোন ছিল,বাবা-মা বাইরে গেছে ডাক্তার দেখাতে। ছোট ভাই আর বড় ভাই দোকানে।

অবন্তীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার পর চিন্তা উড়ে গেল। আমি বাবা হচ্ছি,এ কথা শোনার পরও কোন চিন্তা থাকে নাকি। আমি অবন্তীকে বললাম,তুমি তো বোধহয় আগে থেকেই টের পেয়েছিলে। তাই না?
হু
তো বলোনি কেন?
এমনি।

এই মূহুর্তে কি বলা উচিৎ আমি জানিনা। খুশির মাঝেও কেমন যেন অবাক লাগছে। এই মেয়ে এমন কেন?
আমি অসহায় দৃষ্টিতে অবন্তীর দিকে তাকিয়ে আছি। আর অবন্তী চোরা হাসি হাসছে। হাসছে,কিন্তু বোঝাতে চাচ্ছেনা।

শুক্রবারের সময়টা ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেই। দুপুরের দিকে একটু ঘুমিয়েছিলাম অবন্তীর চিৎকারে উঠে পরলাম। বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে কেন যেন চিৎকার করছে। আমি সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,কি হয়েছে?
ও এক হাত দিয়ে মুখের কাছে ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,তেলাপোকা!

আমি ভেতরে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম,কোথায় কি! হঠাৎ করে অবন্তী আরেকটা চিৎকার দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল।
আমি দরজায় ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছি,কিন্তু খোলার নাম নেই।

অবন্তী। দরজা খোল।
না
কেন?
এমনি।
অবন্তী আমি বাইরে যাবো। দরজা খোল!
উঁহু
আরে আমার ঘুম পাইতেছে। দরজা না খুললে বালিশ দিয়ে যাও কোনভাবে।
না
কেন?
এমনি!
অবন্তী!
কি?
দরজা খোল। আমার ইয়ে ধরেছে।
ইয়ে তুমি ভেতরে করো। বাইরে কি?
অবন্তী এগুলো কেমন কথা। আমাকে তেলাপোকা খেয়ে ফেলবে।
আমি খুলবোনা।
কেন?
এমনি।
আমার কি দোষ! আমি তো তেলাপোকা না। আমাকে কেন আটকে রেখেছ?
এমনি।

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত