কবির প্রেম

কবির প্রেম

আমি নাকি কিছুটা অদ্ভুত কিছুটা খেপাটে পাগল টাইপের মানুষ। সুযোগ পেলেই মিথিলা আমাকে এমন সব কথা শোনায়। আমি অবশ্য ওর কথা নিয়ে তেমন ভাবিনা। আমি ভাল করেই জানি মেয়েদের সব কথায় কান দিতে নাই।
ওর সাথে আজ দেখা হল র্ভাসিটির চত্বরে। ও আমার দিক এক নজর তাকিয়েই যেন আমার এক্সরে করে ফেললো। বললো, কি ব্যাপার সেভ করনি কেন? শার্টের নিচে স্যান্ডু গেঞ্জি কৈ? জুতো পড়েছো মুজো পড়নি কেন?

আমি বরাবরের মত তাৎচ্ছিল্য দেখিয়ে মুখ ভেংচি দিয়ে বললাম, ধ্যাত বাদ দেতো এসব! তার চেয়ে চল ফুচকা খাই।
আমার কথায় কর্নপাত না করে ও উপদেশের স্বরে বললো

–সকালে ঘন্টা খানেক দৌড়াতে পারিস না ? পেটটা কেমন প্রেগনেট মহিলাদের মত ঝুলে পড়ছে, খেয়াল আছে?
আমি ওর দিকে তাকিয়ে ধমকের স্বরে বললাম- তোরা পারিস ও বাবা, এবার বাদ দে না!
মিথিলার চোখ ছলছল করে উঠে। ও অভিমান জড়ানো কন্ঠে বলে

–ঠিক আছে আর কোন দিন তোমারে কিছু বলবো না। আমিতো তোমার কেউ না!
ও অভিমান করে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। দাত দিয়ে নখ কাটতে থাকে। ক্যাম্পাসের আম গাছে ছোট ছোট আম হয়েছে। ও মুখ ঘুরিয়ে আনমনে প্রকৃতি দেখছে। আমি জানি দু মিনিট পর ও আবার নতুন করে শুরু করবে।

গরম লাগছে খুব। আশে-পাশের গাছ গুলোর পাতা নড়ছে না। ভ্যাপসা গরমে খুব খারাপ লাগছে। ফুল হাতার শার্ট টা যে কোন বুদ্ধিতে গায়ে দিয়েছিলাম ! ইচ্ছে করছে খালি গায়ে ঘুরতে। অবশ্য আমার যে ফিগার এই ফিগার নিয়ে খালি গায় ঘুরলে পাখিরাও ফাজলামো করে ইয়ে করে দিতে পারে। আর ঢাকা শহরে যা দু’একটা পাখি বেচে আছে সে গুলোতো আরো বেশি ইচড়ে পাকা।
সিরিয়াস ভংগিতে মিথিলা হটাৎ করেই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়

–আকাশ ভবিষ্যতে তুমি কি করবে ভাবছো কিছু?
ওর এই ধরনের ফালতু কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে তাই চরম বিরক্তি চেপে হেসে বলি

— দিদি তুই না হয়ে ভেবে দিস!
আমার মুখে দিদি ডাক ও শুনতে পারে না, খেপে যায়। এবার ও তাই হলো। ওর চোখ হতে স্বচ্ছ অশ্রুকণা ঝরে পড়ল।

মেয়েদের এই অশ্রু(নাকি অস্ত্র!) দেখে আমি বেশ বিচলিত হই। আমার মাকে দেখি বাবার সাথে যখন সে কোন কিছুতে পেরে না উঠে তখন কেদে ফেলেন। আর সেই অশ্রু দেখে বাবা বিগলিত হন।
নারী অশ্রু যে খুব দামী তা স্বিকার না করে উপায় নাই।

মিথিলা আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু কিন্তু ও আমাকে এতো বেশি খবরদারি করে যে জীবনটাই কখনো কখনো অতিষ্ট হয়ে যায়।

অথচ আমার বন্ধুরা বলে দোস্ত তোমার কপালটা খুবেই উন্নত মানের, নাহলে কলেজের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা কেন তোমার জন্য পাগল? এমন সুন্দরীদের মন পাওয়াতো ঋশি-মনীষীদের কাজ!

অথচ কি বিচিত্র এতো ভাল কপাল থাকা স্বতেও কয়েকবার ১০ টাকার টিকিট কিনেও কপাল ঘুরলোনা!
সন্দেহ করছি ও হয়ত আমার মত ছন্নছাড়া টাকে ভালোবেসে ফেলেছে। সুন্দরী মেয়েরা কখনোই ভাল প্রেমিক পায়না সেটা মিথিলাকে দেখে আবার মনে পড়ল। অবশ্য মিথিলা নাটক সিনেমার মত করে কখনো বলেনি যে “এই শোনো আমি তোমাকে ভালবাসি!”
এজন্য কিছুটা নির্ভার ছিলাম।

সেদিন ফাষ্ট ইয়ারের একমেয়ে আমার প্রকাশিত একটা কবিতার খুব প্রশংসা করছিল আমি বেশ মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনতে ছিলাম। আমার লেখার প্রশংসা শুনতে বরাবরি আমার খুব ভাল লাগে। এমন সময়ে মিথিলা সেখানে এল। আমার দিক তাকিয়ে চোখ দিয়ে ও যেন বর্শা নিক্ষেপ করলো। মেয়েটা চলে যেতেই ও আমাকে জেরা করতে শুরু করলো। বললো

–বুড়ো বয়েসে তোমার দেখি ভিমরতী!
আমি যে বুড়ো হয়ে যাচ্ছি ওর কাছে আজ তা প্রথম শুনতে পেলাম। খুশকির জন্য মাথায় অলক্লিয়ার টাইপের স্যাম্পু দিয়ে যাচ্ছিলাম । সেই শ্যাম্পু খুশকি ক্লিয়ার করতে না পারলেও আমার মাথা থেকে বেশ কিছু চুল ক্লিয়ার করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। যার জন্য ও আমাকে বুড়ো বলতে পারলো। আমি অবশ্য এসব নিয়ে মোটেও বিচলিত না। চুল পড়লে টেনশন করতে নেই, এতে আরো পড়বে। তারচেয়ে টেকো মাথার কি কি উপকারিতা আছে এসব নিয়ে পজেটিভ চিন্তা করছি।

মিথিলা আমাকে একটা কাচের ঘেরা ফাষ্টফুডের দোকানে নিয়ে এল। বার্গার খেতে খেতে ও বললো শোন তোকে যে আমি অনেক বেশি ভালবাসি তুই কি তা বুঝিস?

আচমকা ওর একথায় আমার হঠাৎ করে বার্গার গলায় আটকে গেল। কাশিঁ দিয়ে গলা পরিস্কার করার পর পানি খেয়ে চোখ মুখ লাল করে ফেললাম। স্বাভাবিক হতে সময় লাগলো। ও ভেনেটি ব্যাগ হতে কম দামী একটা মোবাইল সেট দিয়ে বললো রাতে কথা বলবো। রাতে অবশ্য মিথিলার কল আসলো না। ঘুমটা তাই ভাল হল।
সাত সকালে মিথিলা মেসে এসে হাজির।
–কি ব্যাপার ফাজিল তোমার মোবাইল বন্ধ কেন?

আমি ওর দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বললাম তারমানে তুমি মোবাইল অন করে দাওনি! তাইতো বলি কল আসলো না কেন? বিছানা থেকে মোবাইল এনে পরীক্ষা করি।

ও চোখ গরম করে কটমট করে আমার দিকে তাকালো।
দ্রুত ওরে নিয়ে মেস থেকে বের হলাম। নাহলে মেসের মালিক বজলু মিয়ার চোখে পড়লে খবর আছে। এমনিতে ভাড়াখেলাপী বলে ওনি আমার উপর খেপে আছে। তাই গৃহহীন হবার ভয়ে প্রায় দৌড়ে বাসা থেকে বের হলাম।
ঢাকার বাড়ি ওয়ালাদের মতন এমন স্বৈরাচারী মানুষ এই ধরনীর অন্য কোথাও আছে বলে আমার জানা নাই। এদের আচরন দেখে মনে হয় হিটলারের বাংলা সংস্করন! ব্যাচেলর হলেতো কথাই নেই প্রথমেই বলবে ব্যাচেলরদের ঘর ভাড়া দিবনা। অথচ আমরা সব ব্যাচেলররা যদি বিয়ে করি পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতি পূর্ন এই দেশের তখন কি হাল হবে? আমিতো মনে করি ব্যাচেলররাই বরং দেশের জন্য কিছু করছে। সত্যিকারের দেশ প্রেমিক আমরা যারা বিয়ে না করে আদম উৎপাদন বন্ধ রাখছি।
মিথিলা হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে বললো কি হলো কোথায় যাচ্ছো?
-কেন ক্যাম্পাসে?

ও আমার দিকে তাকিয়ে ভুরুকুচকিয়ে বলে আরে গাথা এত সকালে ওখানে কেউ আসছে?
মিথিলা আমাকে কাসেম বিরিয়ানী হাউজে নিয়ে এল। খাওয়া শেষে রিক্সায় জিয়া উদ্যানে এলাম।
মিথিলা আমার পাশে বসে আমার দিকে তাকালো । আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম। ও বললো

– আকাশ জানিনা তুমি কতটুকু বুঝবে, তারপরও বলি মেয়েরা খুব সহজে কারো প্রেমে পড়েনা। অনেক হিসেব-নিকেষ করে তারা প্রেমে পড়ে। তবে আমি কোন কিছু না ভেবেই তোমার প্রেমে পড়েছি।

আমি ওর মায়া ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে অন্য এক মিথিলাকে আবিস্কার করি। ওর চোখে পানি। ও আমার হাত ধরে থাকে। আমার বুকের ভেতর ওর জন্য কেমন যেন করে। এর নাম কি ভালবাসা? এনে হয় মহাকাশের সূর্য আমার কাছে আজ পরাজিত। সূর্যর উত্তাপও আজ ম্লান আমার ভালবাসার উত্তাপের কাছে। ইচ্ছে হয় জীবনের সকল দুঃখ আর যন্তনাকে পরাস্ত করে পাঠিয়ে দেই ভিন দেশে। স্বপ্ন দেখি আগামী জীবনের প্রতিটি মুর্হূত পরিবেশের প্রতিটি কনা কানায় কানায় ভরে তুলবো ভালবাসা দিয়ে। গড়বো ভালবাসার নীড়। ছন্দ্য ছাড়া এই আমি ওর কাধে হাত রাখি।
এরপর আমার কিযে হয় আমার ! আগের মত আর একদল বন্ধুদের সাথে ঘুরা হয়না। ভালবাসাহীন যারা আছে সত্যি তাদের জন্য আফসোস হয়!

মিথিলার জন্মদিন হল ৭ই জানুয়ারী। প্রেমিকার জন্মদিনে দামী গিফট দেওয়ার প্রচলীত নিয়ম থেকে আমাকে বের হতে হয়েছে। কেননা আমার ম্যানিব্যাগের অবস্থা সোমালিয়ার সাধারন নাগরিকদের মত।

ভোর ৬টায় ৭ টি তাজা গোলাপ নিয়ে তাই দাড়িয়ে আছি মিথিলাদের বাসার সামনের ফুটপাতে। সাধারনত এত সকালে আমি ঘুম থেকে উঠিনা। তাই ভেবে ছিলাম সকালটা খুব নির্জণ হবে। কিন্তু এখন দেখছি রাস্তায় ডায়বেটিকস রোগীদের মিছিল! দলে দলে নারী-পুরুষ দৌড়াচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম কম আয়ের এই দেশে দ্রব্য-মূল্যর অসহনীয় বাড়াবাড়ি স্বতেও মানুষ গুলো কি করে এত স্থুল হলো তাই ভাবছি! এটা নিয়ে সময় পেলে থিসিস করে একখান ডক্টরেট নেয়ার ইচ্ছেও জাগলো মনে।
ভাবলাম খাওয়ার সময় একটু কম খেলে এই সকালে এত কষ্ট করে লম্ফ-ঝম্ফ দিতে হতনা। মজার ব্যাপার ধনীদের কেই বেশি দেখছি।

ওর মোবাইলে কল দেয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যো ওরে দেখলাম গেট ঠেলে বেড় হতে।
ও কাছে আসতেই ওরে জন্মদিনের বিখ্যাত গান হ্যাপি বার্থডে টু ইউ শুনিয়ে ফেললাম। যদিও রাস্তায় দাড়িয়ে হেড়ে গলায় এমন গান গাওটা বেশ বিব্রতকর হবার কথা ছিল কিন্তু মিথিলা বেশ মজা পেল। গোলাপ আর আমার প্রিয় কবি মহাদেব সাহার কবিতার বই দিলাম।

ও হেসে বললো যদিও কবিতা আমি পড়িনা তবু তুমি দিয়েছো বলে পড়বো। এখন বাসায় চল।
আমি বললাম না আজ না।

ও চলে গেল।
কিছু দুর গিয়ে আবার ফিরে এল। আমার হাত ধরে ও হঠাৎ করেই একটা কিস করলো। বুকের ভেতর কেমন কেপে উঠলো যেন।

ও বললো সাত সকালে তুমি ঘুম থেকে উঠেছো এজন্য এটা তোমার গিফট।
আমি বেকুপের মত বললাম তুই কিসটা হাতে না দিয়ে অন্য কোথাও দিতে পারতিস!
ও বাকা চোখে তাকিয়ে বললো আগে আমাকে বিয়ে কর তারপর!

ও চলে যাবার পর আমি একদল ডায়বেটিকস রোগীদের সাথে জগিং করতে করতে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। পাশ থেকে খালাম্মা টাইপের এক মহিলা বললো আহা বাবা তুমি এই বয়েসেই ডায়বেটিকস বাধিয়ে ফেলছো? বিয়ে করেছো?

-না।
তাহলেতো বাবা তোমার ভব্যিষৎ অন্ধকার! তোমারতো বাচ্চা নিতে সমস্যা হবে!
আমি দৌড়ে পালালাম।

সন্ধ্যায় ফোন এল মিথিলার। ঘুমিয়ে ছিলাম তাই বিকেল পেড়িয়ে সন্ধ্যার আগমনটা টের পাইনি।
হ্যালো বলতেই মিথিলার ধমক, এই তুমি ফোন ধরতে ছিলে না কেন? সঁতেরো বার কল দিয়েছি!
বিরক্তি আর অভিমান দুটোই ঝরে পরে ওর কন্ঠে।
ঘুমিয়ে ছিলাম বলে টের পাইনি। কি হয়েছে? জরুরী কিছু?

– তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে খুব।
– ও আচ্ছা।

– কি ! তুমি হাই তুলছো কেন? আমার কথা তোমার কাছে এখন আর ভাল লাগছে না, তাইনা? শয়তান ..হারামী…….। লাইন কেটে দিল মিথিলা। ব্যাক কল দিতে গিয়ে দেখি ব্যালেন্স নেই। ২০ টাকা রির্চাজ করে ছিলাম সপ্তাহ খানেক আগে।

কিছুই ভাল লাগছে না। মুখ ধুতে বেসিনে গিয়ে দেখি বাথরুমে পানি নেই এক ফোটাও। নদীমাতৃক বাংলার এই পরিনতি হবে কে জানতো? পানির জন্য আমাদের দেশে যতটা হাহাকার মরুভুমির দেশ বলে পরিচিত সৌদি আরবেও বোধকরি এতটা সংকট নেই। প্রায়ই বদনা, জগ আর পানির কলস নিয়ে রাজপথে মিছিল দেখি। কেউ কেউ আবার ঝাড়– হাতেও সেই মিছিলে যোগ দেয়। বিরক্তির চরম বহি:প্রকাশ! বোতলের পানি দিয়ে কুলি করলাম। চোখে মুখেও পানি ছিটালাম।

বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে মিথিলাকে অনুরোধের কল দিলাম। কিন্তু ও ফোন ধরলো না। মেয়েদের অভিমান আর অকারনে চোখের জ্বল ফেলা ছাড়া আর যেন কিছুই করার নেই।

বিদুৎ চলে গেল। ঘর অন্ধকার। সুযোগ পেয়ে মশারা ঢাল-সরকি নিয়ে নেমে পড়ল। ঘরে একমাত্র রক্তবাহী প্রানী আমি। তাই ওদের নিরাশ করে ঘরে তালা ঝুলিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলাম। মশাদের জন্য কিঞ্চিত মন খারাপও হল। ওদের সকাল বেলার নাস্তা খাওয়া আর হলনা।

গলির মাথায় চলে এলাম। গফুর মিয়ার চায়ের দোকানের সরু বেঞ্চে বসে চায়ের অর্ডার দিলাম। গফুর মিয়ার চায়ে কেবল প্রথম চুমুক দিব ঠিক তখনি তিনি বললেন, ভাইজান খবর হুনছেন নী ? বিরোধীদল নাকি আবার হরতাল দিব, টানা তিন দিন!

– তাই নাকি?
– গরিবের কথা কেউ ভাবেনা। তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার ভঙ্গি করেন। আমি জানি গফুর মিয়া এখন হরতাল নিয়ে তার অভিজ্ঞতা সহ বিরাট বক্তব্য দিবে। কিছু মানুষ দিনভর কথা বলতে ভালবাসে। বকবক করতে পারলেই ওনাদের যত সুখ। গফুর মিয়াকে থামিয়ে দেই এক ধমকে।

– এই মিয়া এইটা কি চা বানাইছো? চা নাকি সরবত! চিনির এমন অপচয়ের জন্যই এখন ৬০ টাকা কেজি হইছে।
জন্ম সূত্রেই বাঙ্গালীরা নিজের সমালোচনা সইতে পারেনা। গফুর মিয়া তাই ব্যাপক হতাস। সে চুপ করে বসে থাকে। এবার আমি নিরবে চা শেষ করি। বিল দেবার সময় গফুর মিয়া মিনমিনে কন্ঠে বলে, ভাই একটা জিনিষ আমি খেয়াল করছি, আপনি প্রায়ই আমারে চা খারাপ বলে ধমক দেন। কিন্তু চা ফেরত দেন না। আপনার ধারনা সামান্য চায়ের দোকানদার কেন দেশ নিয়ে কথা কইবো? কথা কইবেন আপনারা, শিক্ষিত মানুষরা। গরিবের মত প্রকাশ করারও আপনাগোর পছন্দ না। গরিবের কথার আসলে কোন দাম নাইকা।
এবার আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়।

সত্যিতো গরিবের কথার কোন দাম এই দেশে নেই। রাজা আসে রাজা যায়। কেউ গরিবের জন্য ভাবেনা। তারপরও গরিব মানুষরা লাইন বেধে ভোট দেয়। যাতে করে উচুতলার মানুষরা তাদের হক লুটেপুটে খেতে পারে! গফুর মিয়াকে ধমক দেবার জন্য মনে মনে আহত হই। সিদ্ধান্ত নেই একদিন সারাটা বিকেল আমি গফুর মিয়ার বক্তব্য শুনবো।
আকাশে আজ জোসনার বন্যা হচ্ছে। ছাদে উঠার ব্যাপারে বাড়িওয়ালার কারফিউ জারী করা আছে, তারপরও ছাদে উঠলাম। ইচ্ছে করছে আরো উপরে উঠে আকাশের কাছে চলে যেতে। আমার নাম আকাশ । কিন্তু নামটা ফলস। আমার ধারনা মানুষের নাম আকাশ রেখে বাবা-মা আকাশের সাথে ফাজলামো করেছেন। মানুষের দোষ হল ভাল কিছু পেলেই তাকে দখল করতে চায়।

আমি পানির ট্যাংঙ্কির উপরে উঠে শুয়ে আছি। আমার চোখের উপর আকাশ ভাসছে। আকাশে লক্ষকোটি তারার সাথে রুপালি চাদটাকে দেখে খুব ভাল লাগছে। মিথিলাকে মনে পড়ছে। কি করছে ও?
ফোন দিলাম। একটা মাত্র রিং বাজতেই ও ফোন ধরল। কি করছো? প্রশ্ন করি।

বই পড়ছি। তোমার দেওয়া কবিতার বই। কবিতা পড়তে গিয়ে মন ভাল হয়ে গেল। বিশ্বাস কর আমি ক্লাসের কবিতা পড়েছি পরিক্ষার জন্য। কিন্তু মহাদেব সাহার প্রেমের কবিতা গুলো পড়ে মনে হচ্ছে এ যেন আমার হৃদয়ের কথা।

–প্রেমে পড়লে ভালবাসার মানুষের সব কিছু ভাললাগে, দোষ গুলিকেও গুন বলে মনে হয়। তুমি এখন আমার মত ছন্নছাড়া উজবুকের প্রেমে পড়ে দিওয়ানা হয়েছো। আমার ধারনা তুমি একটা ঘোরের মধ্যে আছো। স্বপ্নের মধ্যে আছো। ভয় পাচ্ছি এই স্বপ্ন যখন ভেঙ্গে যাবে বাস্তবতার নির্মম ছোবলে। তখন তোমার আবেগের করুন মৃত্যু হবে। এ পৃথিবীতে আবেগের কোন মূল্য নেই। সবাই চায় বেগ মানে গতি। জীবন অনেক জটিল। জীবন অনেক জর্ঘন্য রকমের রহস্যময়।

— তোমার কি খুব মন খারাপ?
— হুম । আমার খুব মন খারাপ। গফুর ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে। ভদ্রলোক ফুটপাতে চা বিক্রি করে বলে আজ ওনার কথা আমার শুনতে ইচ্ছে করলো না। অথচ আমাদের ক্লাসের অনেক শিক্ষক ওনার’চেয়ে বোরিং লেকচার দেয়। আমি তা গিলে যাই। আমার মনেহয় আমরা সবাই টাকা আর পোশাকের কদর করছি। তুমি বলতো তোমার বাবা কি আমাকে মেনে নিবে? তোমাদের ইট-কাঠের এই শহরে আমার কি আছে? আমিতো অজঁপাড়া গায়ের এক কৃষকের ছেলে। আমার কোন বড় আত্মিয়-স্বজন নেই যে আমাকে একটা ভাল চাকুরি দিবে। ভাসমান কুচুরীপানার মত এই শহরে আমি ভেসে চলছি।

–আকাশ তোমার কথাগুলো শুনে খুব খারাপ লাগলো। বুঝতে পারছি তুমি খুব হতাস। তাই দার্শনীকের মত কথা বলছো। তবে আমার বিশ্বাস তুমি নিজের প্রচেষ্টায় একদিন বড় কেউ হবে। আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। আমার ভালবাসা আর প্রেরণা সব সময় তোমাকে আগলে রাখবে। এ শহরে পরিশ্রমিরা কখনো বার্থ্য হয়নি। তুমি ও হবেনা। আমার মাকে তোমার কথা বলেছি। মা কি বলেছে জান? মা বলেছে তোমার মত ছেলেই তার পছন্দ। মা আরো বলেছে রেডিমেট কাপড় দেখতে সুন্দর হলেও তা টেকশই নয়।

মিথিলার কথা শুনে খুব ভাললাগে আমার। মনে হয় আমি একটা মুক্ত পাখি হয়ে নীল আকাশে উড়ছি। আমার সেই আকাশে কোন মেঘ নেই। মিথিলাকে বলি, তুমি কি তোমাদের ছাদে যাবে একটু? মিথিলা হেসে বলে, কবির বউর মনেও কবিত্ব বাস করে। তোমার সাথে কথা বলতে বলতে আমিও ছাদে চলে এসেছি। তারা দেখছি। জ্যোছানা সাথে সমুদ্র দেখছি। তোমাকে কাছে পাবার আকুলতা অনুভব করছি। স্বপ্ন দেখছি একদিন সারাটা রাত আমি তোমার হাত ধরে জ্যোছানা দেখবো।

সময়টা ২০১৪ জুন। মিথিলার এর বাসা থেকে তারে বিয়ে দেবার পরিকল্পনা করছে। আর এই দিক দিয়ে আকাশও বেকার। কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না।
হঠাৎ আকাশ এর কল আসল
–হ্যালো

–মিথিলা তুমি কাদছ কেন?
–না এমনিতেই
–খুশির খবর আছে একটা
–কি
–না দেখা কর আগে তারপর বলছি
–ওকে আসছি

মিথিলা আগেই এসে বসে আছে আকাশ আসতেছে। মিথিলা ভাবছে তাকে কি করে বলি যে কিছু একটা কর যাতে তোমাকে হাড়াতে না হয়। মিথিলা জানে আকাশের ফ্যামিলী ভাল কিন্তু তার বাবা মা তো দেখবে আকাশ কি করে। মিথিলা এই বার বল তুমি কাদছিলে কেন…? আগে তুমি বল..? কি খুশির খবর..? ওকে বলছি, আমার একটা ইয়ে হয়ে গেছে, মানে তুমি আমাকে রেখে বিয়ে করে ফেরছ..? তা হলে তো আমি কেন তোমার জন্য বাসায় না করছি বিয়ে এখন করব না। অহ, এখন বুঝিছি কেন তুমি কাদঁছিলে কেন,, কি.!! তার মানে তুমি আমার কাছ থেকে কথা বেড় করার জন্য গেম খেলছ.? হুম খেলছি। তুমি কাদঁলে আমার পৃথিবীটা কেন জানি অন্ধ

গল্পের বিষয়:
রোমান্টিক

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত