ব্যাচেলর প্রেম

ব্যাচেলর প্রেম

প্রচন্ড কুয়াশা পড়েছে আজ।আজকাল শহরে এমন কুয়াশা প্রতিদিন দেখা যায়না।তবে জানুয়ারি মাসে দেশের সব জায়গাতেই ঠান্ডার তীব্রতা বেড়ে যায়।আর আমিও লেগে পড়ি কুয়াশা উপভোগে। অবশ্য অন্যান্য দিনগুলোতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সকালকে দুপুর বানিয়ে দিলেও আজ একটু খুব সকালেই ঘুম থেকে উঠেছি। কলেজও যেতে
হবেনা আজ। তাই ঘুম থেকে উঠেই চলে এসেছি বাসা থেকে একটু দূরে মোরের পাশের চায়ের দোকানে।গরম গরম চায়ের কাপটা হাতে নিতেই মনটা ফুরফুরে হয়ে গেছে।চুমুক দিতে যাবো এমন সময় মিলন মামা প্রশ্ন করে উঠলো ..
–মামা, আইজ এত্ত সকাল সকাল উঠিছো যে? ঘটনা কি?

চায়ে একটা চুমুক দিয়ে মিলন মামার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলাম।মিলন মামা হলো চায়ের দোকানদার। এক বছর ধরে তার সাথে আমার পরিচয়।সে চায়ের দোকানদার হলেও চা খাওয়ার জন্য তার সাথে পরিচয় হয়নি।।এই শহরে আমি যখন নতুন এসেছিলাম তখন আমি একটা বাসা ভাড়া খুজছিলাম।আর একবছর আগে এই মিলন মামার দোকানে এসে জিজ্ঞেস করেছিলাম বাসা ভাড়া পাওয়া যাবে কিনা। পরে উনিই একটা বাসায় ভাড়ায় থাকার ব্যবস্থা করেছিলো।সেই সুবাদেই পরিচয়।
–কেনো মামা? সকাল সকাল কি শুধু তুমি একাই উঠতে পারো? আর কেউ পারেনা বুঝি? মিলন মামাও একটা হাসি দিয়ে বললো..
–এর আগে তুমারে কোনোদিন সকালে এই দোকানে দেখি নাইতো তাই কইলাম।মনেহয় আইজ খুব খুশিতেই আছো।
–আমি তো সবসময় খুশিই থাকি মামা। আর তুমার হাতের চা খেয়ে এখন আরো খুশি হয়ে গেছি। ভাবছি প্রতিদিন সকালে উঠে তুমার এখানে এসে চা খাবো।
–হ ভালা চিন্তা। সকালে ঘুম থেইকা উঠাও অনেক ভালো।

হঠাৎ কেউ একজন বলে উঠলো ..
–কি বাবা খালিদ, দিনকাল কেমন যাচ্ছে? আজ এত সকালে ঘুম থেকে উঠেছো যে ঘটনা কি? মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলাম আমি যেই বাসায় ভাড়ায় থাকি সেই বাসার মালিক।আমার বাবার বয়সী লোকহলেও উনার ভুড়িটা অনেক বড়।শাড়ি কাপড় পড়ালে নিশ্চয়ই গর্ভবতী মহিলাই মনে হবে।তবে উনি এখন নিয়মিত জগিং করে। ভুড়ি কমানোর অদম্য চেষ্টা করে চলেছেন। আমার ভাইয়ের বয়সী হলে এখনই উনার পিঠে চাপড় মেরে বলতাম,লেগে থাকো বৎস ..তুমি পারবেই। কিন্তু বাপের বয়সী বলে কিছু বললাম না।চায়ে চুমুক না দিয়ে উনার কথার জবাব দিলাম ..
–এইতো আঙ্কেল ভালোই যাচ্ছে দিনকাল। আপনার জগিং কেমন চলছে? উনি নিজের ভুড়ির দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললো..
–দেখছোনা কতখানি কমিয়ে ফেলেছি। ইনশাআল্লাহ আর কিছুদিনের মধ্যেই ফিট হয়ে যাবো। একদম তোমার মতো।
–হুম তাই তো। তো লেগে থাকুন থেমে গেলেন কেনো?
–আরে এখন একটু বিরতি। মিলনের দোকানে একটু চিনি ছাড়া চা খেতে আসলাম।
–ওহ তো বসে পড়ুন।
মিলন মামা চা বানাতে ব্যস্ত।আমি দোকান থেকে চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাড়ালাম। কেননা এই ভদ্রলোক যখন তখন বাসা ভাড়া চায়। পথে ঘাটে যেখানে দেখে সেখানেই জিজ্ঞেস করে
,বাসা ভাড়াটা কবে দিবা? অবশ্য এর পেছনে দোষটা আমারই। পারিবারিক অনেক ঝামেলার কারণে এখনো টাকা পাঠায়নি বাসা থেকে। তাই আমিও বাসা ভাড়া দিতে পারছি না।যে দুইটা টিউশনি করাই তারাও এখনো টাকা হাতে দেয়নি।পুরোটা বেহাল অবস্থা। তরিঘরি করে চায়ের কাপটা রাখতে যাবো তখনই মিলন মামা বলে উঠলো ..
–মামা, তুমার বাকি টাকাটা যদি দিয়া দিতা অনেক উপকার হইতো। আমি কিছু বলার ভাষা খুজে পেলাম না। মিলন মামার কাছেও অনেক টাকা বাকি পড়ে আছে। পুরো দুই মাসের বাকি।অনেক কষ্টে মিলন মামাকে আশ্বস্ত করলাম ..
–এই সপ্তাহেই বাকি পরিশোধ করে দিবো মামা। আসলে টিউশনির টাকাটা এখনো হাতে পাইনি। দোকান থেকে বেরুবো এমন সময় আঙ্কেল ডেকে উঠলেন ..
–কি খালিদ, চলে যাচ্ছ কেনো? তুমার সাথে কথা আছে। বসে পড়ো। আমি বাধ্য ছেলের মতো বসে পড়লাম আবার।
–তা বাবা তুমার ভাড়া তো এখনো দিলে না। কবে দিবা?

এইরে ..যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়।একজন ব্যাচেলরের সুন্দর সকালটা নষ্ট করার জন্য তো এই একটা প্রশ্নই যথেষ্ট।
–এইতো আঙ্কেল বাসা থেকে টাকা পাঠালেই দিয়ে দিবো।
–তা কবে পাঠাবে?
–এইতো দুই একদিনের মধ্যেই আঙ্কেল।
–ওহ.. বিদ্যুৎ বিলও তো বাকি আছে। তাড়াতাড়ি দিয়ে দিও। প্রতিদিন টাকা চাইতে ভালো লাগেনা। চাওয়ার আগেই দিতে পারোনা? মামার বাড়ির আবদার। টাকাতো  গাছে ধরে। চাইলেই পাওয়া যায়।
–কিছু বললে নাকি?
–নাহ আঙ্কেল কিছুনা। আসলে বলছিলাম যে আপনাকে আজ একটু বেশি হ্যান্ডসাম লাগছে। আসলে ভুড়িটা কমে যাওয়ার এখন তিরিশ বছরের যুবক লাগছে। কথাটা শুনে ভদ্রলোকের মুখে খুশির আভা দেখা গেলো।যাক বাবা অন্তত কটাদিন এভাবেই পার করে দিতে পারলেই বাচি।
–তা যা বলেছো বাবা। আর আমার বয়স ও তো খুব বেশি না। ভুড়িটার জন্য একটু বেশি লাগে।
–হ্যাঁ ঠিক তাই।আঙ্কেল এখন আমি আসি তাহলে?
–আরে কই যাও? বসো তো। তুমার সাথে গল্প করতে ভালোই লাগে।ছেলেটা তুমি ছ্যাছরা হলেও কথা খুব ভালো বলো।
.
এত বড় অপমান। ওইদিকে মিলন মামা মুচকি মুচকি হাসছে। আমিও এর শোধ নিবো। ভাবতে ভাবতে একটা উপায় পেয়ে গেলাম।
–ইয়ে,আঙ্কেল তাহলে আপনাকে সেদিন রাতের কথাটা বলি অনেক ভালো লাগবে।
–কোন রাতের কথা?
–আরে আমি যেদিন রাতে সপ্নটা দেখলাম।
–কোন সপ্ন! বলোনি তো।
–তাহলে শুনুন সেদিন রাতে একটা ভয়াবহ সপ্ন দেখলাম। পুরাই থ্রিলিঙ মুভি বলা যায়।
–তাই নাকি!!!! তো কি দেখলে?
–দেখলাম,আপনি আমার কাছে প্রতিদিনের মতো বাসা ভাড়ার টাকা চাইতে এসেছেন।
–তারপর?
–আমিতো সেই বিরক্ত হয়ে গেলাম। আপনিই বলেন, প্রতিদিন কারো কাছে এতবার টাকা চাইলে তার কি মেজাজ ঠিক থাকে? তারউপর ঘুমের মধ্যে এসে ভাড়া চাওয়ায় আমার মেজাজ গেছিলো খারাপ হয়ে। …
আঙ্কেল করুন দৃষ্টি তে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কথা চালিয়ে যেতে লাগলাম
–তারপর ঠাস ঠাস করে কয়েকটা বসায়া দিলাম।
–কি বসায়া দিলে বাবা?
–ঠাস ঠাস করে কি বসায় জানেননা? চড় বসায় দিলাম।
–তুমি এত্ত বাজে ছেলে!!!
–আরে আরে আঙ্কেল ভুল বুঝতেছেন কেনো? আসলে আমি তো ইচ্ছে করে মারিনি। সপ্নে যে কেনো এমন ভুলভাল হয়ে যায় বুঝতেই পারিনা। আমি কি কখনো ইচ্ছে করে এমন কাজ করতে পারি বলেন?
–তা অবশ্য ঠিকই বলেছো।
–হুম,তারপরের কাহিনী আরো ভয়াবহ। আমিতো আমার পেয়াজ কাটা ছুড়িটা আপনার পেটে ঢুকিয়ে দিলাম। যাতে আপনি আর ভাড়া চাইতে না পারেন।
–কিহ!!! ভাড়া চাই জন্যে একেবারে খুন করে দিলে!!!
–হ আঙ্কেল, আপনিই বলেন কোন ব্যাচেলর এত অত্যাচার সহ্য করতে পারে?
–আমি কি আসলেই খুব অত্যাচার করি বাবা?
–আরে না ..কি যে বলেন। তবে সপ্নে তো সেটাই মনে হয়েছিলো। তাই খুন করে ফেলেছিলাম। আঙ্কেল করুন দৃষ্টি দিয়ে তাকাচ্ছে। আমি বললাম …
–একি আঙ্কেল আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? কিন্তু ভয়তো পাওয়া উচিৎ আমার।
–খুন করবে তুমি আবার ভয়ও পাবে তুমি!
–হুম। কারণ আমি শুনেছি সপ্নে যা দেখা যায় বাস্তবে নাকি তার বিপরীতটাই ঘটে।
–তারমানে তুমি বলতে চাইছো ভাড়া না দেয়ায় অতিষ্ট হয়ে আমি তোমাকে খুন করে দিবো?
–হতেও তো পারে আঙ্কেল, দিন দিন আপনার মেজাজের যে অবস্থা হচ্ছে।
–বাবা,আমি কি লোকটা এতটাই খারাপ?
–আঙ্কেল আপনি মন খারাপ করছেন কেনো? সপ্ন কখনো সত্যিই নাও হতে পারে।
–সত্যি যেনো না হয়? আমি কখনোই এমন কাজ করতে পারিনা। এই বলে আঙ্কেল চায়ের কাপ রেখে বাড়ির পথে হাটতে লাগলেন। এদিকে মিলন মামার হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরেছে।আমিও হাসি থামাতে পারছি না।বাড়িওয়ালা বেচারার এমন হাল হয়েছে যেনো এখনই মার্ডার করে আসলো। ফাসির আসামী সে। হাহাহাহাহা।আমিও আর দোকানে না থেকে বাসার দিকে হাটতে লাগলাম।যাক,শীতের সকালটা যেভাবেই কাটুক অনেক উপভোগ করেছি।
.
রুমে একা একা রান্নার কাজ করছিলাম।ব্যাচেলর মানুষের আবার কাজের কোনো শেষ নেই। জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সব জানে ব্যাচেলর প্রাণীরা।হঠাৎ দরজায় কড়া নড়ার শব্দ পেলাম।রান্না ছেড়ে উঠে গেলাম দরজা খুলার জন্য। দরজা খুলতেই দেখলাম বাড়িওয়ালা আঙ্কেল। এই লোকের বুঝি আক্কেল জ্ঞান কম। আবার বেহায়ার মতো ভাড়া চাইতে এসেছে।অবশ্য আমিও বেহায়ার একধাপ উপরে।আঙ্কেল কে বললাম ..
–আঙ্কেল, কালকের মধ্যেই ভাড়া মিটিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবো।
–আরে না, আমি ভাড়া চাওয়ার জন্য আসিনি তো। একটু অবাক হলাম।লোক টা গত একবছরে আমার কাছে এসেছে শুধুমাত্র ভাড়ার জন্যই।আজ আবার কি হলো? নাকি সকালের ফরমুলা কাজে লেগেছে। জিজ্ঞেস করলাম …
–তো বলুন, এই অধম আপনার কি সহযোগিতায় আসতে পারে?
–আসলে আমি বিকেলের দিকে বাসায় থাকবোনা। তো তোমাকে রেলস্টেশনে যেতে হবে।
–আপনি বাসায় না থাকলে আমাকে স্টেশনে যেতে হবে কেনো?
–আরে পুরোটা তো আগে শুনো। চিটাগাং থেকে আমার মেয়ে আসবে আজ।তাই তুমি ওকে স্টেশন থেকে নিয়ে আসলে ভালো হয়।আমি তো ওইসময় বাসায় থাকিনা।
–ওহ, এটাতো খুবই সহজ কাজ। তা আপনার মেয়ের নাম্বার টা কি পেতে পারি? আঙ্কেল চোখ বড় বড় করে তাকালেন। বাপের কাছে মেয়ের নাম্বার চাওয়াটা বুঝি মস্ত বড় অপরাধ হয়ে গেছে।পরিস্থিতি সামাল দিতে দিতে বললাম ..
–না মানে নাম্বার থাকলে স্টেশনে খুজে পেতে সুবিধা হতো আরকি।
–ওহ আচ্ছা, বিকেলে বেরুবার আগে তোমার আন্টির কাছে নিও।আচ্ছা তুমি কি কিছু পুড়াতে দিছো? নাকে কেমন পুড়া পুড়া গন্ধ আসছে।
–হ্যাঁ, ওইটা ভাতের গন্ধ।
–তুমি কি ভাত পুড়িয়ে খাও?
–না। তবে আপনি রান্নার টাইমে এলেন তাই আজ পুড়ে যাওয়া ভাতই কপালে জুটলো।
–আহারে, ওকে আজ রাতে আমাদের ওখানে তোমার দাওয়াত রইলো।
–যাক কষ্টটা তাহলে বুঝেছেন।
.
আঙ্কেল চলে গেলেন। আমিও রান্নার কাজে লেগে পড়লাম। তলের ভাত পুড়ে লাল হয়ে গেছে।দেখেই চোখে পানি এসে গেছে আমার।
.
বিকেলে বেরুলাম।উদ্দেশ্য স্টেশনের দিকে। হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমি একটু দেড়ি করে ফেলেছি।মেয়েটার ফোন নাম্বার নিয়েছি। কিন্তু ফোন দিতে পারছি না ব্যালেন্স এর অভাবে। স্টেশনের কাছাকাছি গিয়ে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গেছি। চারিদিকে শুনশান।তার মানে ট্রেন অনেক আগেই এসেছিলো।বাড়িওয়ালার মেয়েটা যদি বদরাগী হয় তাহলে তো মসিবতে পড়তে হবে। আমার দারায় আসলে একটা কাজও ঠিকমতো হয়না। স্টেশনের দিকে একটা ছুট দিতে যাবো এমন সময় কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলাম। আমি ততক্ষনে উঠে দাড়িয়েছি। দাড়িয়ে দেখলাম আমার থেকে কিছুটা দূরে একটা সুন্দরী মেয়ে পড়ে আছে।ছাড় তোর বাড়িওয়ালার মেয়ে।এই সুন্দরিকেই সামলানো এখন আমার দায় পড়েছে। মেয়েটাকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বললাম ..
–স্যরি, উঠে আসুন।
এটা সিনেমা হলে এতক্ষণে ব্যকগ্রাউন্ড এ মিউজিক বাজতো।আহ কি রোম্যান্টিক সিন। নিজেকে শাহরুখ খান মনে হচ্ছিলো।
.
হঠাৎ কাউয়ার কা কা শব্দে বাস্তবে ফিরে এলাম। না এটা কাউয়ার ডাক ছিলোনা। মেয়েটা রেগে গেছে। মেয়েটা নিজের জামার ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে আমাকেও ঝাড়তে লাগলো। ইতর বদমাইশ বলে গালি দিচ্ছে। সুন্দরী মেয়ে বলেকি পার পেয়ে যাবে। আমিও কম নই। আমিও ঝাড়তে লাগলাম …
–ওই মেয়ে স্যরি বলছি না!
–স্যরি বললেই সব শেষ হয় নাকি? আপনাদের মতো ছেলেকে ভালো করেই চেনা আছে। মেয়ে দেখলেই ধাক্কা খেতে ইচ্ছা করে।
.
অবশ্য কথা মিথ্যা না। ধাক্কা খেতে যে এত মজা আগে জানলে প্রতিদিন ভাতের বদলে ধাক্কাই খেতাম।
–ওই ছেলে কথা বলেন না কেনো? ভাবখানা এমন যেনো শাহরুখ খান। আসলে আপনি একটা জোকার।
–কিহ! আমি জোকার। আপনি নিজে কি? আর এভাবে চিল্লাচ্ছেন কেনো? শহরের কাউয়া গুলাও আপনার গলার সাথে পারবে না।একদম কাউয়া লাগে আপনার কন্ঠটা।কাউয়া একটা। মেয়ে এবার তেলে বেগুনে জলছে। যাক আমার উদ্দেশ্য সফল। সে এখন নিজের চুল ছিড়ুক আর যাই করুক আমার দেখে কাজ নেই।
.
হঠাৎ আমার ফোন বাজতে লাগলো। বাড়িওয়ালা আঙ্কেল ফোন দিয়েছে।
–হ্যালো আঙ্কেল বলুন ..
–তুমার ফোনে ফ্লাক্সিলোড দিয়েছি। ফোনে তো তোমার টাকা থাকেনা। এখন আমার মেয়েটাকে ফোন দাও। আমি মনে মনে বললাম …ইশ, যদি কোনো মেয়ের বাপ তার মেয়ের সাথে কথা বলার জন্য ফ্লাক্সিলোড করে দিতো তাহলে আজ কোনো ব্যাচেলরের কষ্ট থাকতো না। ভাবতেই কেমন চোখে কান্না চলে আসে। সুখের কান্না।
.
মেয়েটাকে ফোন দিলাম। এতক্ষণ যার সাথে ঝগড়া হয়েছে তাকে আশেপাশে কোথাও দেখলাম না। সুন্দরী মেয়েগুলো এত ঝগড়ি কেনো হয়
আল্লাহ মালুম।সে যাক। এদিকে এই মেয়ে ফোন রিসিভ করতেই উল্টো ঝাড়ি…
–এই ছেলে আপনি কোথায়? আব্বু আপনাকে কখন আসতে বলেছে? সময়জ্ঞান নেই নাকি?
..এমনিতেও নেই। তবে ঝাড়ি খেয়ে মনে হচ্ছে সময় জ্ঞান থাকাটা আসলেই জরুরি। বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের মেয়েকে আমি দেখিনি কখনো। তবে যখন এত ঝাড়ি মারা স্বভাব তাহলে তো সুন্দরীই হবে।জিজ্ঞেস করলাম ..
–আপনি কোথায় আছেন এখন?
–নিউ মার্কেটের সামনে দাড়িয়ে আছি। আমার এখানে একা দাড়িয়ে থাকতে অসস্তি লাগছে। আপনি তাড়াতাড়ি আসুন।
–ওকে, আপনি ফোনটা কাটুন আমি চট করে হাজির হচ্ছি।
.
নিউ মার্কেটের সামনে গিয়ে দাড়াতেই দেখলাম তখনকার ধাক্কা লাগা সেই কাউয়া মানবী ওখানে দাড়িয়ে আছে।হাতে লাগেজ ব্যাগ বোঝাই। আমাকে এখনো দেখতে পায়নি। আমি বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের মেয়েকে ফোন দিলাম ..
–হ্যালো আপনি কই?
–বললাম না নিউমার্কেট এর সামনে।
–আপনি নিউমার্কেট এর সামনে থেকে সরে যান আমি ওখানে আসতে পারছি না।
–এখানেই আসতে হবে। আমি এত জিনিসপত্র নিয়ে আর হাটাহাটি করতে পারবো না। ঝাড়ি মেরে ফোন কেটে দিলো মেয়েটা।
.
আমি ভয়ে ভয়ে তখনকার ধাক্কা লাগা মেয়েটার পাশে গিয়ে ভাব নিয়ে দাড়ালাম। বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের মেয়েকে ফোন দিলাম।এদিকে তখনকার মেয়েটা আমাকে ভূত দেখার মতো দেখে যাচ্ছে। আমিও তাকাচ্ছি আবার চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছি।মেয়েটা মনেহয় এখনো রেগে আছে। ইশ, সুন্দরী মেয়েরা রাগলে আরো অনেক সুন্দরী হয়ে যায়।বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের মেয়ে ফোন রিসিভ করতেই বললাম ..
–আর লুকোচুরি না খেলে এবার তো দেখা দিন। হঠাৎ কেউ বলে উঠলো
–এইতো আমি আপনার সামনেই দাড়িয়ে। কথাটা ফোনের ভেতর থেকে এলো কিন্তু সামনে তাকিয়ে দেখলাম তখনকার ধাক্কা লাগা কাউয়া মানবী আমার সামনে দাড়িয়ে।যা বুঝার বুঝে গেলাম আমি। এইটাই বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের মেয়ে। শরীর বেয়ে একটা 440 ভোল্টের শক লাগলো। কপালে আজ শনি আছে। সকালে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলাম সেটাই মনে করার চেষ্টা করছিলাম। মনে পড়ে গেলো.. দাঁত ব্রাশ করার সময় নিজের মুখটাই আয়নায় দেখেছিলাম। আমি যে কেনো এত অপয়া। আমার চোখের সামনে কেউ তুরি বাজাতেই বাস্তবে ফিরলাম ..
–এইযে মিস্টার শাহরুখ খান,এটা স্বপ্ন দেখার সময় নয়, এতগুলো জিনিস কি আমি একা বয়ে নিয়ে যাবো? আমি আর একটা কথাও বললাম না, আসলে বলার ভাষা নেই। চুপচাপ লাগেজপত্র নিয়ে সিএনজি ঠিক করতে লাগলাম। সারা রাস্তায় আর কারো সাথে কেউ কথা বলিনি।
.
সেদিন রুমে ঢুকার পর আর বেরোইনি। ভয় লাগছিলো, যদি আবার কাউয়া মানবীর সাথে দেখা হয়ে যায়।এমনিতেই যতকিছু করে ফেলেছি।আর যাইহোক বাড়িওয়ালার সুন্দরী মেয়েকে কাউয়া বলাটা উচিৎ হয়নি।
.
রাতে গিটার নিয়ে ছাদে গেলাম।এই বাসার ছাদটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে।ইচ্ছেমতো গিটারে টুংটাং করা যায়।আমি গিটার ভালো বাজাতে পারিনা। তবুও গিটারে টুংটাং করে সময় কাটাতে ভালো লাগে।
.
ঠান্ডায় হাত কাপছে আর কাপছে আমার গিটারের তার। হেলান দিয়ে ছিলাম।আমার পাশে কারো উপস্থিতি টের পেলাম একটু পরেই।একি! আমার পাশে যে কাউয়া মানবী দাড়িয়ে আছে।শরীর আমার কাপতে লাগলো। সেটা ঠান্ডায় নাকি বিকালের সেই ঘটনার অনুশোচনায় সেটাই মিলাতে পারছি না।কাউয়া মানবী নিজেই কথা বলতে লাগলো …
–কি মিস্টার শাহরুখ খান … কাপা উচিৎ গিটারের তার কিন্তু কাপছেন আপনি নিজেই। ঠান্ডা কি সহ্য হচ্ছে না এত মোটা জ্যাকেট পড়ার পরও?
–ইয়ে মানে না।আসলে আজ একটু বেশিই ঠান্ডা লাগছে। আমি আর কি বলবো কিছুই মাথায় আসছে না।সুন্দরী মেয়েদের সামনে এমনিতেই অসস্তিতে পড়তে
হয়।এদের ঝাড়ি কোনটা আর মিস্টি বুলি কোনটা সেটা আমি বুঝিনা।তারপরও বিকালের ঘটনার জন্যও স্যরি বলা উচিৎ।দোষটা তো আমিই প্রথমে করেছিলাম।
–হুম, ঠান্ডার চেয়েও আপনার কাপাকাপিটা বেশি মনে হচ্ছে। তা গিটার বাজাতে পারেন?
–না, খুব ভালো পারিনা।
–খুব ভালো না পারলেও চলবে। যেভাবে পারেন সেভাবেই বাজান। আমার গিটার শুনতে ভালোই লাগে। আমি টুংটাং আওয়াজ তুলতে লাগলাম।কাউয়া মানবী
মনযোগ দিয়ে শুনছে।গিটারের সুরটা যেনো কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে।বাজানো শেষে কাউয়া মানবী বললো..

–অনেক ভালো হয়েছে।
–আর লজ্জা দিয়েন না। কতটা বাজে হইছে আমি ভালো করেই জানি। আর একটা কথা বলার ছিলো ..
–কি কথা?
–বিকেলের ঘটনার জন্য দুঃখিত। আসলে আপনার কন্ঠ মোটেও কাউয়ার মতো না .. কোকিল ও হয়তো আপনার কন্ঠের কাছে হার মানবে।
–বাব্বাহ! এইবার শাহরুখ খানের মতো ডায়লগ দিতে পেরেছেন।হাহাহা.. ইট্স ওকে। আমি কিছু মনে করিনি।আমার তো তখনকার কথা ভেবে হাসি পাচ্ছে খুব।
–আমারও। তো আপনার নামটা তো এখনো জানা হলোনা?
–হাসি।
–আমি আপনার ফিলিংস জানতে চাইনি নাম জানতে চাইছি।
–আজ্ঞে হাসিই আমার নাম।
–হাসি, অনেক সুন্দর নাম।নামের সাথে চেহারার মিল আছে। হাসলে আপনাকে অনেক সুন্দর লাগে।
–পাম দিচ্ছেন তাইনা?
–ছি ছি! পাম দেই আর যাই করি মিথ্যে তো বলছিনা।
–আচ্ছা বাদ দিন।আপনার নাম নিশ্চয়ই খালিদ ..
–হ্যাঁ। আপনি কিভাবে জানলেন?
–আব্বু বলেছিলো।কিসে পড়েন?
–অনার্স সেকেন্ড ইয়ার। আপনি?
–এইতো এসএসসি পাশ করে আসলাম চিটাগাং থেকে।
–ওইদিকে কেনো?
–আসলে নানুরবাড়ি থেকে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তবে এখন এই শহরেরই কলেজে ভর্তি হবো।আপনার এখনো অনেক কাজ বাকি।
–আমার কাজ বাকি মানে?
–মানে আপনাকে খাটিয়ে মারবো। মনে মনে বললাম ..মারই না যতো খুশি।এমন রূপবতীর হাতে মরতেও ভালো লাগবে।
–কিছু ভাবছেন? বাস্তবে ফিরলাম।
–ইয়ে না মানে।সমস্যা নেই।
–আচ্ছা আপনি প্রেম করেননা?
–প্রেম!!!! সে কি জিনিস? খায় না মাথায় দেয়?
–ন্যাকামো করবেন না বলে দিলাম।
–আচ্ছা আচ্ছা … তবে প্রেম কখনো করা হয়নি। আপনি করেছেন?
–না .. তবে করবো।ছেলেও পেয়ে গেছি। আমার হৃদয়ের বাম পাশে চিনচিন ব্যথা হচ্ছে।এইসব সুন্দরী মেয়ে আমার কপালে জুটবে না সেটা জানি। কিন্তু সামনে থেকে কেউ কেড়ে নিয়ে গেলে সেটা সহ্যসীমার বাইরে চলে যায়। তারপরও আগ্রহ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম …
–কে সেই ভাগ্যবান ছেলে? হাসি একগাল হাসলো … হাসিতে লজ্জার মাখামাখি ছিলো। আমি বুঝলাম না সেই হাসির রহস্য।হাসি হেসে হেসেই কথা ঘুড়িয়ে নিলো।
–শুনলাম আপনার ভাত পুড়ে গেছে।আমাদের ওখানে তো আপনার দাওয়াত।ডিনারে মুরগির মাংস থাকলে কি আপনার ভালো লাগবে? আমিও একগাল হাসলাম।দাওয়াতের কথা শুনলে যেকোন ব্যাচেলরের মুখে হাসি ফুটবেই।বললাম

–ডিনার একটু পরে করি। চলুন তার আগে আপনাকে একটা গান শুনাই। এরপর বেসুরো গলায় আমি গান ধরলাম ..
“ব্যাচেলর আমি ব্যাচেলর, বিন্দাস লাইফে কোনো পেইন নেই আমার।” হাসি শুধু মুচকি মুচকি হাসছিলো।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত