ঝলসানো চাঁদ

ঝলসানো চাঁদ

বিকাল পাচটা। মিতু ছাদের রেলিং ধরে রাস্তার দিকে চেয়ে আছে। মিতুর পড়নে আসমানি রংয়ের শাড়ি সাথে ম্যাচিং করা ব্লাউজ। আসমানি শাড়িতে মিতুকে খারাপ লাগছে না, বরং ভালোই লাগছে। অন্যদিনের তুলনায় মিতুকে আজ বেশ মায়াবী মায়াবী লাগছে।
ফর্সা মেয়েদের যেকোনো ড্রেসেই মানায়। কিন্তু কালো কিংবা শ্যামলা মেয়েদের সব ড্রেসে মানায় না, অনেক সময় বিদঘুটে টাইপের লাগে। কালো মেয়েদেরকে অনেকেই আবার পেত্নী বলে উপহাস করে। মিতুর ধারনা, এই সমাজ শুধু ফর্সা মেয়েদের জন্য, কালো মেয়েদের জন্য না। আর না হওয়াটাই স্বাভাবিক, মানুষ এমনকি এই সমাজও সুন্দরের পূজারী, অসুন্দরের না।
.
মিতুর ফোনে ফুল ভল্যুমে গান বাজছে। আধুনিক মিউজিকে পুরাতন গান। “হৃদয় মাঝারে রাখবো, ছেড়ে দেব না।”
মিতু রাস্তার দিকে তাকিয়ে, একমনে গান শুনছে। দুফোটা জল চোখ থেকে নেমে, গালে এসে চিকচিক করছে, সেদিকে মিতুর কোনো ভূক্ষেপ নেই। মিতু শব্দহীন ভাবে একনাগাড়ে কেদে যাচ্ছে।
.
মুহুর্তেই মিতুর চোখজোড়া আনন্দে চকচক করতে লাগলো। শিহাব আসছে। শিহাব মিতুর এক দূরসম্পর্কের মামাতো ভাই। আপাতত বেকার, তবে খুব তাড়াতাড়িই চাকরি বাকরি কিছু একটা হবে। কিছু ছেলে আছে যারা ফার্স্ট ছাড়া, কখনো সেকেন্ড হয়না। শিহাব সে দলের।
মিতু কলিংবেল বেজে ওঠার আগেই দৌড়ে নিচে নেমে গেলো। আয়নার সামনে দাড়িয়ে চোখের লেপ্টে যাওয়া কাজল খুব যত্ন করে মুছে, মাথার চুলগুলো খুলে ফেললো। তারপর কপালে একটা টিপ দিয়ে শাড়ির আচলটা ঠিক করার সাথেসাথেই মিতুদের কলিংবেল বেজে উঠলো। মিতু দরজার সামনে দৌড়ে গিয়ে কিছুক্ষন চুপচাপ দাড়িয়ে থেকে, খুব ধীরেসুস্থে দরজাটা খুললো।
— কীরে মিতু! দরজা খুলতে এতো দেরী হলো ক্যান?
— ছাদে গেছিলাম, তাই নামতে একটু দেরী হলো।
— তোদের বাড়িতে তো দোতালা থেকেই কলিংবেলের আওয়াজ শোনা যায়না। তুই ছাদ থেকে শুনলি ক্যামনে? থাক মন খারাপ করিস না, এই বিয়ে ভেঙেছে তো কী হয়েছে? সামনের বার ঠিকই তোর বিয়ে হবে। হা হা হা…..
মিতুর চোখে প্রায় সাথেসাথেই জল চলে এলো। বিয়ে নিয়েও কেউ ঠাট্টা মস্করা করে? মিতু অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিলো, পাত্রপক্ষের আমাকে পছন্দ হয়েছে। সামনের শুক্রবার আমার বিয়ে।
— ওহ! কনগ্রাচুলেশন মিতু! তোর বিয়েতে আমায় দাওয়াত দিস। কোনো গিফট টিফট দিতে পারবো না, এমনি এসে খেয়ে যাবো। আর খাসীর রেজালায় ঝাল একটু কম দিতে বলিস।
— ভাইয়া আমার এখন ভালো লাগছে না, আপনি পরে আসুন।
— তুই তোর ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর, কাউকে বল খাবার দিয়ে যেতে। আমি খেয়েই মেসে চলে যাবো। আসলে আজ বুয়া আসেনি, পকেটেও টাকা নেই যে বাইরে খাব। তাই তোদের বাড়িতে নির্লজ্জের মতো চলে আসলাম। যা আছে দিতে বল। খেয়েই বিদায় হবো তার আগে না।
.
মিতু ফারুকের মাকে ডাকতেই, মিস্টি আর পরোটা নিয়ে ফারুকের মা হাজির হলো। খুব সাবধানে প্লেট রেখে শুকনো মুখে বললো, গোস্ত শেষ হইয়া গেছে। আপনি কষ্ট কইরা মিষ্টি দিয়া খান।
.
মিতু জানে গোস্ত শেষ হয়নি। খাবার বাচানোর জন্য ফারুকের মা মিথ্যা বলছে। এইমুহূর্তে মিতুর ইচ্ছা করছে, ফারুকের মায়ের মুখের উপর মাংসের বাটি চেপে ধরতে।মিতু রাগ সামলিয়ে শান্ত গলায় বললো, মাংসের সাথেসাথে কী পরোটাও শেষ, নাকি আছে? থাকলে আরো দুটো এনে দেও
.
শিহাব বললো, আমার আর পরোটা লাগবে না। ফারুকের মা আপনি দয়া করে আমায় এককাপ চা বানিয়ে খাওয়ান। কড়া লিকারের রং চা, ফ্রেশ পাত্তি।
ফারুকের মা শিহাবের প্লেটগুলো তুলে চা বানানোর জন্য রান্নাঘরে ঢুকলো। শিহাবের যে পেট ভরেনি, মিতু শিহাবের চোখমুখ দেখেই বুঝতে পারছে। কাগজের মতো পাতলা দুটো পরোটা আর দুটো মিষ্টি খেয়ে একটা বাচ্চা ছেলেরও পেট ভরে কিনা সন্দেহ, আর সেখানে কিনা….
.
শিহাব পাঞ্জাবিতে হাত মুছে, বামপকেট থেকে আধখাওয়া সিগারেটটা খুব যত্ন করে বের করলো। সিগারেটটা টেবিলে রাখতেই, মিতু ঝাঝালো কন্ঠে বলে উঠলো, ছিঃ শিহাব ভাইয়া! আপনি অর্ধেক খাওয়া সিগারেট পকেটে নিয়ে ঘোরেন? আপনি যে এতটা নোংরা আগে জানতাম না। দয়া করে সিগারেটের ছাই ফেলে, মেঝে ময়লা করবেন না। আপনার অনেক অত্যাচার সহ্য করছি, আর না। পকেটের সিগারেট পকেটে ঢোকান। নাহলে চা খেতে দেব না।
.
সিগারেট ছাড়া চায়ের মজা পাওয়া যায়না রে পাগলি। আর কী বললি নোংরা! বাবার টাকায় বড় হচ্ছিস তো তাই মা-বাপ মরা ব্যাচেলর ছেলের তিনটাকার একটা সিগারেটের মূল্য তুই বুঝবি না। থাক চা আর খেয়ে আর কাজ নেই। আজ উঠিরে মিতু, তোর বিয়েতে খেতে আসবো। আর সারাদিন মুখগোমড়া করে থাকিস না, পেত্নী পেত্নী লাগে।
.
শিহাব উঠে দাড়ালো। মিতুর ইচ্ছে করছে চেচিয়ে বলে, শিহাব ভাইয়া আপনি যাইয়েন না, সোফায় বসে যত ইচ্ছা সিগারেট খান। আমি নিজের হাতে চা বানিয়ে আনছি। কথাটা বলতে গিয়েও মিতু বলতে পারলো না, গলার কাছেই আটকে রইলো।
মিতু ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। আয়নার সামনে দাড়িয়ে দেখে, সত্যিই তাকে পেত্নীর মতো লাগছে। মিতু যেকারো মুখে পেত্নী ডাক সহ্য করতে পারে, কিন্তু শিহাবের মুখে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। মিতু ঠোট কামরিয়ে কান্না সামনোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। চোখের জল দুঃখের বাধ ভেঙে, চোখ থেকে গড়িয়ে চিবুকে এসে পড়ছে।
.
আজ শুক্রবার। মিতুর আজ বিয়ে হচ্ছে। মিতুর বাবা নগদ অর্থ, গাড়ি, একগাদা ফার্নিচার যৌতুক দিয়ে মিতুর বিয়েটা ঠিক করেছেন। মিতু লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি আর গা ভর্তি গয়না পড়ে বরের পাশে বসে আছে। বিয়েতে ছোটবড় সবাই যে যার মতো হাসিঠাট্টা হইহুল্লোড় করছে। অথচ মিতু আজ কাদছে। কেউ কেউ আবার শ্বশুরবাড়ির প্রশংসা করে মিতুকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
শ্বশুরবাড়ি কিংবা এইবাড়ির কারো জন্যই মিতু কাদছে না। মিতু কাদছে শিহাবকে না পাওয়ার জন্য। মিতু যে মনের অজান্তেই, শিহাবকে এতটা ভালোবেসে ফেলেছে, এটা মিতু ছাড়া কেউ জানেনা। এমনকি শিহাবও না।
.
সত্যি সত্যিই শিহাব আজ খেতে এসেছে। রংচটা জিন্সের প্যান্ট আর কালো টিশার্টে শিহাবকে আজ বেশ মানিয়েছে। শিহাব মাথা নিচু করে খাসীর রেজালা খাচ্ছে। মিতুর বিয়ের দিকে শিহাবের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। শিহাব খেতে ব্যস্ত।
.
আকাশে চাদঁ উঠেছে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ঝলসানো রুটির মতো চাদঁ। চাদঁ আলো দিয়ে সর্বত্র আলোকিত করে রেখেছে। মিতুদের জানালা ভেদ করে সেই আলো এসে শিহাবের মুখে পড়ছে। শিহাবকে আজ আরো সুন্দর লাগছে। মিতু পলকহীন চোখে সেই মুখের দিকে চেয়ে আছে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত