বিয়ে বাড়ি

বিয়ে বাড়ি

রাতে ঘুমটা একদম ভালো হয়নি। বৌ কি যেন নতুন রেসিপি রান্না করেছিলো রাতে। খেতে ভালো হলেও পেটে গন্ডগোল পাকিয়ে দিয়েছে। রাতে বারবার উঠে বাথরুমে যেতে হয়েছে। রাতে ঘুম হয়নি বললেই চলে। ভোর রাতে ঘুমিয়েছি, ঘুম ভাঙ্গলো মেয়ের অত্যচারে। বিছানায় উঠে লাফালাফি শুরু করছে। কচ্ছপ যেভাবে খোলস থেকে মাথা বের করে ঠিক সেভাবে লেপের ভেতর থেকে মাথা বের করে বললামঃ

-আম্মু বিছানায় উঠে নাচানাচি করছো কেন। তোমার আব্বুর বিয়ে নাকি তোমার আম্মুর বিয়ে?
–নানু বাসায় যাবো তাই নাচছি।
-কেন তোমার নানুর বিয়ে?
–নানুর বিয়ে না তো খালামনির বিয়ে।

আব্বে সালা ভুলেই তো গেছি। বৌয়ের কাজিনের বিয়ে। কোন জ্বালা। ছুটির দিনে কিসের জম্পেশ ঘুম দিবো তা আর হলোনা। মেয়েকে অন্যঘরে পাঠিয়ে দিয়ে লেপের তলে মাথা ঢুকিয়েছি মাত্র এক হ্যাঁচকা টানে লেপ সরিয়ে ফেললো বৌ। রেগে দিলাম ধমকঃ

-এটা কেমন ভদ্রতা।
–অমন ভদ্রতা। উঠো নটা বাজে।
-তো আমি কি করবো। ঘড়ির কাটা আটকে রাখবো?
–না জাহাপানা। নাস্তা করে উপকার করেন।
-নাস্তা খাবোনা।
–কেন?
-এমনি (বৌ কে তো বলা যাবেনা তার স্পেশাল রেসিপি খেয়ে পেট আপসেট হয়েছে, বেচারি মনে কষ্ট পাবে।)
–৫ মিনিটের মধ্যে যদি নাস্তার টেবিলে না পাই তাহলে বিছানায় পানি ঢেলে দিবো।

হুমকি দিয়ে বৌ হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। ভাবছি ঘুমাবো নাকি উঠবো। বৌয়ের কোন ভরসা নেই সত্যি সত্যি বিছানায় পানি ঢেলে দিবে। এ কাজটা সে আগেও করেছে। বাধ্য হয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। আয়নার দিকে তাকিয়ে “ও মাগো” বলে চিৎকার দিলাম। আমার চিৎকার শুনে রাত্রী দৌঁড়ে এলো।

–কি ব্যাপার চিল্লাচ্ছো কেন?
-আমার গোঁফ কই?
–ওহ্ এই ব্যাপার, সকালে যখন মুখ হা করে ঘুমাচ্ছিলা তখন ক্যাঁচি দিয়ে ছেঁটে ফেলেছি।
-বদ মহিলা, নাপিতের ঘরের মহিলা নাপিত। কাঁচি দেখলে হাত নিসপিস করে। নিজের চুল কেটে ফেল, আমার সাধের গোঁফ কাটলি কেন?
–নিজেকে কি সউথ ফিল্মের হিরো মনে করো যে গোঁফ রাখছো। কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি খেতে আসো।
-বদ মহিলা।
–খাটাস বুড়া। আয়নার দিকে তাকিয়ে কান্না পাচ্ছে। আমার সাধের গোঁফ। ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে বসলাম, বৌ বললোঃ
–ব্রাশ করেছো?
-অতবড় একটা হাতি, কতো বড় দাঁত তাকে কখনো দেখেছো ব্রাশ করতে?
–অতবড় হাতিটা উলঙ্গ থাকে, তুমি কাপড় পরো কেন? হাতি সবার সামনে পটি করে তুমি বাথরুম যাও কেন? কথা না বাড়িয়ে চুপ করে থাকলাম। এমনিতেই গোঁফ হারানোর শোকে আমি কাতর। বৌ বললোঃ

–কেউ মারা গেছে?
-না…
–তাহলে মুখটা পেঁচার মতো করে রাখছো কেন। নাস্তা করো। নাস্তায় দেখি পাউরুটি, জেলি আর কলা। বৌকে বললামঃ
-এসব কি? রুটি ডিম কোথায়?
–যা দিয়েছি সেটাই খাও। খেতে ইচ্ছা না করলে নিজে নাস্তা বানিয়ে খাও।

মা মেয়ে দুজনে সুন্দর আনন্দের সাথে জেলি মাখানো পাউরুটি খাচ্ছে। আমার রুটি ডিম ছাড়া তো পেট ভরবেনা। রেগে গিয়ে পিরিচের জেলিটুকু ছুঁড়ে দিলাম, হিতে বিপরীত জেলিটুকু গিয়ে পড়লো বৌয়ের চেহারায়। এটা দেখে মুহির কি হাততালি। সে চিল্লাচ্ছে আর হাত তালি দিচ্ছেঃ

–কি মজা আব্বু, তোমার নিশানা কতো ভালো আম্মুর মুখে গিয়ে লাগছে জেলি। মিনমিন করে বড়লামঃ
-আম্মু মুহি চুপ করো।

মেয়েকে কে বুঝায় এক্সিডেন্টলি ঘটনাটা ঘটছে। ইচ্ছা করে রাত্রির মুখে ছুঁড়ে মারিনি। রাত্রি রাগে কটমট করছে। ভয়ে ভয়ে বললামঃ

-সরি, আমি ইচ্ছা করে…

কথাটা শেষ করার আগেই রাত্রি আমার মাথায় এক জগ পানি ঢেলে দিলো। বুঝছিনা ঘটনা কি। রাত্রির রাগের উত্তাপ এতো বেশি কেন? কাল রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত তো সব ঠিক ছিলো। এক রাতের ব্যবধানে এমন কি হলো যে বৌ এটম বোমের মতো ভয়ংকর হয়ে গেলো? মুহিকে কাছে ডাকলামঃ

-আম্মু এদিকে শোন।
–কি আব্বু?
-আম্মু তুমি কি সকালে দুষ্টামি করছো। আম্মুকে রাগিয়েছো?
–না আব্বু আমি তো গুড গার্ল দুষ্টামি করিনা। আম্মুর মেকআপ বক্স ভাঙ্গছি কিন্তু আম্মু তো জানেনা। থু থু দিয়ে আবার জোড়া লাগিয়ে দিয়েছি।
-সাব্বাস, বুদ্ধির দিক থেকে একদম তোর মায়ের মতো হয়েছিস। ভেরি গুড। যাও কার্টুন দেখ।
–আব্বু তোমাকে সাবান এনে দেই গোসল করো।
-আম্মাজান আপনি টিভি দেখেন যান। গোসল সেরে রুমে ঢুকে দেখি বৌ আমার ফোন গুতাচ্ছে।
-কি করো?
–তোমার প্রেমিকার মেসেজের রিপ্লাই করি।
-মানে?
–নিজেই দেখো।

ফোনটা হাতে নিয়ে ইনবক্স চেক করে দেখি অপরিচিত নাম্বার থেকে মেসেজ আসছেঃ“আলিফ জানু তোমার গোঁফটা না আমার অনেক পছন্দ। আজ বিয়েতে নীল পাঞ্জাবী পড়ে এসো কেমন।” গোঁফ ছেঁটে ফেলার রহস্য এখন বুঝলাম। বৌকে বললামঃ

-জান বিশ্বাস করো এটা কে আমি চিনিনা। তোমার কসম একে চিনিনা।

–খবরদার আমার কসম কাটবেনা। নাহলে কাঁচি দিয়ে পেট ফুটা করে দিবো। নুডুলসের মতো নাড়িভুড়ি বেড়িয়ে আসবে। তুমি চাও মিথ্যা কসম কাটতে যাতে তাড়াতাড়ি মরে যাই আর তুমি ওই মেসেজওয়ালিকে বিয়ে করো। বুঝিনা আমি।

-তুমি ভুল বুঝছো।
–সেটা পরে দেখা যাবে এখন চলো বিয়ে বাড়িতে যাই। বৌ দেখি আসমানি কালারের শাড়ি পড়ছে আর আমার জন্য সাদা পাঞ্জাবী-পায়জামা বের করছে।
-আমি এগুলো পড়ে যাবো বিয়ে বাড়ি?
–হুম…
-কেন?
–সেজে কাকে ইম্প্রেস করবা, মেসেজওয়ালিকে?

কথা না বাড়িয়ে রেডি হলাম। নিজেকে দেখে মনে হচ্ছে বিয়ে বাড়ি যাচ্ছিনা, যেন কারো কুলখানির মিলাদে যাচ্ছি। রাত্রি মুহি মা মেয়ে ঠিকই বিয়ের সাজ সেজেছে। বহুত না ইনসাফি। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় দেখি বৌ লাগেজ নিয়ে বের হচ্ছে।

-কি ব্যাপার লাগেজ নিচ্ছো কেন?
–বিয়ে বাড়ি থেকে সোজা বাপের বাড়ি যাবো। তুমি থাকো তোমার মেসেজওয়ালির সাথে।
-বৌ বিশ্বাস করো আমি তাকে চিনিনা। রং নাম্বার ওটা।
–তোমার নাম লিখে পাঠিয়েছে। আর বলছো রং নাম্বার যাই হোক। এ নিয়ে কথা পরে বলা হবে। এখন চলো দেরি হচ্ছে। রিক্সায় রাত্রি আমি পাশাপাশি। মুহি আমার কোলে। রাত্রি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে আছে।

-রাত্রি… জানু… বাবু…
–ন্যাকামি করবানা, কি হইছে?
-তুমি সত্যি বাবার বাসা যাবা?
–হুম…
-আমার জন্য কাপড় নিয়েছো তো?
–তোমার জন্য নিবো কেন?
-কেন আমি যাবোনা?
–না… বিয়ের দাওয়াত শেষে তুমি নিজের বাড়ি আমি বাপের বাড়ি।
-মুহি?
–আমার সাথে।

কিছু বলতে যাবো এমন সময় ফোনটা বাঁজছে। ফোনটা রাত্রির কাছেই। স্ক্রিনের দিকেই তাকিয়ে দেখি সেই নাম্বারটা। রাত্রি ফোনটা আমার হাতে দিয়ে বললোঃ

–রিসিভ করো, লাউড স্পিকারে দিবা। ফোনটা রিসিভ করে লাউড স্পিকারে দিলাম।
-হ্যালো…
–দুলাভাই আমি সুমাইয়া। কোথায় আপনারা। আসতে এতো দেরি করছেন কেন?
-আপু সকালে তুমি মেসেজ করছিলা?
–সরি দুলাভাই একটু ফান করেছিলাম। ফোনটা কেটে দিয়ে রাত্রির হাতে দিলাম। রিক্সাওয়ালাকে বললামঃ
-মামা রিক্সা থামাও। রিক্সা থেকে নেমে বললামঃ
-যাও…

রাত্রি বললোঃ

–সরি আলিফ, ভুল হইছে। প্লিজ চলো।
-আরে আমি যাবো তো। সকালে নাস্তা করিনি ক্ষুধা লাগছে। তোমরা যাও আমি আসছি।
-আসবা তো?
–তোমার কছম।

বৌকে পাঠিয়ে দিয়ে ভ্রাম্যমান সেলুনে বসলাম। ভ্রাম্যমান সেলুনের নাপিত ব্যাগে তার সরঞ্জাম আর ছোট টুল নিয়ে ঘুড়ে। স্বল্পমূল্যে চুল কাটা, শেভ করা সব করে। নাপিত বললোঃ

–স্যার কোন কাট দিমু?
-ন্যাড়া করে দিবি। আমার কথা শুনে নাপিক মুখের দিকে তাকিয়ে বললোঃ
–স্যার সত্য ন্যাড়া করবেন?
-হুম… কথা না বলে কাজ শুরু কর। নাপিত আনন্দের সাথে মাথা ন্যাড়া করলো।
-তোর কাছে সরিষার তেল আছে?
–আছে স্যার।
-ন্যাড়া মাথায় চপচপ করে সরিষার তেল দিবি, যাতে চেল চুয়ে চুয়ে পড়ে।

ন্যাড়া মাথায় সরিষার তেল মেখে বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হলাম। রৌদের কারনে ন্যাড়া মাথা চকচক করছিলো। প্রথম দেখায় কেউ চিনতে পারছিলোনা। রাত্রি দেখে রেগে গেছে। ওকে রাগানোর জন্যই এমনটা করেছি। আমার সাধের গোঁফ ছেটে ফেলেছো, মাথায় ঠান্ডা পানি ঢেলেছো তোমাকে তো এমনি এমনি ছাড়ছিনা। রাত্রির অনেক আত্মীয়ের মুখে শুনলামঃ রাত্রির বরটার মাথাটা বুঝি সত্যিই গেছে। আহারে রাত্রির জন্য কষ্ট হচ্ছে। ফুটফুটে পুতুলের মতো মেয়েটা বিয়ে করলো পাগল-ছাগলকে কপালের দোষ। আমার মেয়ে মুহি আবার আমার ন্যাড়া মাথা বেশ পছন্দ করেছে। কোল থেকে নামতেই চাইছেনা। একটু পরপর ন্যাড়া মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর বলছেঃ

–আব্বু তোমার মতো আমিও চুল কাটবো।

বিয়ে শেষ হতে হতে রাত হয়ে গেলো। বাসা ফিরছি দেখি পিছে পিছে রাত্রি আসছে। ইয়া বড় ব্যাগ টানতে তার কষ্ট হচ্ছে। মুহি রাত্রির আঙুল ধরে হাঁটছে।
দাঁড়িয়ে পড়লামঃ

-কি ব্যাপার এদিকে কেন? তোমার বাবার বাসা তো এদিকে না।
–সরি…
-সরি কেন। বাবার বাসা যেতেই পারো। আমার তো মেসেজওয়ালি আসবে বাসায়।
–আরেহ্ সরি বলছি তো। আর এমন হবেনা।
-প্রত্যেক বারই এই কথা বলো।
–তোমাকে দেখে হাসি পাচ্ছে। এলিয়েনের মতো লাগছে। চুল আর গোঁফটাই ভালো মানাচ্ছিলো।
-হু…
–ঠান্ডা লাগছে তোমার?
-হুম…
–ব্যাগে চাদর আছে দাঁড়াও বের করছি। তুমি মুহিকে কোলে নাও।

এক চাদরের ভেতরে আমি, রাত্রি আর মুহি। কুয়াশা কেটে ধীরে ধীরে রিক্সা চলছে। একটা গান বারবার মনে পড়ছে, এই পথ যদি না শেষ হয়…

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত