একটি মৃত ভালোবাসা ফিরে পাওয়া

একটি মৃত ভালোবাসা ফিরে পাওয়া

তাকিয়ে আছি মেয়েটার দিকে,বোরকা পরা,মুখটাও ঢাকা..শুধু চোখ দুটো খুব চেনা চেনা লাগছে। এই মেয়েটাই কি সেই নিলা! নাহ,কি ভাবছি এসব? নিলা এখানে আসবে কেমন করে! আর আসলে তো একা আসবেই না..সাথে তার হাজব্যান্ড তো আসবে। মেয়েটা একটা পাথরে উপর বসে আছে,আর উদাস মনে নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে আমি এর থেকে বেশ খানিকটা দুরে বসে আছি। এই মেয়েটাই নিলা,যখন এইদিকে তাকালো তখন ওর চোখ দেখে একদম শিওর হলাম। মেয়েটা আমাকে দেখে ফেলেছে! চিনতে পেরেছে মনে হয়। বসা অবস্থা থেকে উঠে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। আমি উঠে যথাসম্ভব দ্রুত চলে আসার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু না। মেয়েটা আরো দ্রুতো হেঁটে আমার সামনে চলে আসলো।

-কেমন আছো ইমন? হাঁফিয়ে হাঁফিয়ে জিগ্গেস করলো।
-তাকিয়ে আছি। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা। বেশ কিছুক্ষন নিরবতা।
-হুম,ভালো আছি,আর ভালো না থাকলেও ভালো থাকার চেস্টা করি।
-সেটাই ভালো
-হুম
-তোমার খোজে এখানে সপ্তাহে প্রায় তিনদিন ই আসি।
-কেনো?
-[_ _ _ _ _] কোনো উত্তর নেই।
-কিছু বলছোনা কেনো? আর তোমার হাজব্যান্ড কোথায়?
-সে নেই।
-নেই মানে নেই।
-কেনো?
-সে অনেক কথা।
-শুনি কি কথা?
-বিয়ের ১৫ দিনের মাথায় তার সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে,তার অনেক বাজে অভ্যাস ছিলো তো।
-কি রকম?
-রাতে মাতাল হয়ে এসে আমাকে মারধর করতো|
-ওহ।
-তুমি কোথায় থাকো? তোমার তো এটা প্রিয় জায়গা,তোমাকে খুজতে প্রায়ই এখানে আসি..কিন্তু তোমাকে পাইনা।
-এখানে আর তেমন আসিনা। তাছাড়া এতোদিন এই জেলাতেই ছিলামনা।
-কেনো? এখানে আসোনা কেনো?
-আগে কোনো একজনের সাথে আসতাম…এখন তো আর তেমন নেই।
-আগে যেমন কবির মতো কথা বলতে,এখন তেমনই বলো দেখছি।
-হুম।

বিশ টাকা দিনতো,আমার টাকা ভুলে বাড়িতে রেখে আসছি। এখন রিকশা ভাড়া দিতে হবে। আপনাকে আমি বাসায় গিয়ে দিয়ে দেবো।

-চুপচাপ ২০ টাকা বের করে মেয়েটাকে দিয়ে দিলাম।
-ধন্যবাদ। আর শুনুন,যাবার সময় আমাকে সাথে নিয়ে যাবেন প্লীজ,আমার কাছে তো কোনো টাকা নেই।
-হুম

ক্লাস শেষে রিক্সায় দুজন বাড়ি ফিরছি। পাশাপাশি বসেছি দুজন। কেমন যেনো অসস্তি লাগছে। তাই চুপচাপ বসে আছি।

-আচ্ছা আপনি এমন গোমড়া মুখো কেনো?
-মানে? (আমি)
-চুপচাপ বসে আছেন। পাশে একটা সুন্দরি মেয়ে বসে আছে,অথচ কোনো কথাই বলছেন না!
-নিজেই নিজেকে সুন্দরি ভাবেন দেখছি!
-কেনো আমি সুন্দরী না?
-হুম
-আচ্ছা আমরা তো একই ক্লাসে পড়ি তাহলে আপনি করি বলছি কেনো! তুমি করেই বলি?
-হুম,আচ্ছা আপনার নাম কি যেনো?
-আপনি করে বলো কেনো?
-ওহ,স্যরি। তোমার নাম কি যেন?
-নিলা,আর তুমি ইমন তাইনা?
-কথা বলতে বলতে বাসার সামনে চলে আসলাম আমি রিক্সা ভাড়াটা দিয়েই সোজা আমাদের বাসায় চলে আসলাম।
-মেয়েটা আমাদের পাশের বাসাতেই থাকে,মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় আসে,কিন্তু কখনও কথা বলা হয়ে ওঠেনা।

আসলে মেয়েটাকে দেখলেই কেমন যেনো লজ্জা লাগে। আজই প্রথম কথা হলো। আমরা একই ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। একই ক্লাসে। বিকেল বেলা রুমে বসে বসে ফেসবুকিং করছিলাম। পাশের রুমে কেউ একজন আম্মার সাথে কথা বলছে শুনতে পেলাম..মানে নিলার কথা শোনা যাচ্ছে। সে আম্মুকে জিগ্গেস করছে ইমন কোথায়। একটুপরেই আমার রুমে নিলার আগমন ঘটলো। সে আমার দিকে কিছু টাকা সহ হাত বাড়ালো।

-তোমার টাকা..
-আরেহ লাগবেনা,আজ আমি ভাড়া দিয়েছি,অন্যদিন তুমি দিও। এতেই শোধ হয়ে যাবে।
-হা হা হা,ঠিক আছে। তাই হবে।
-হুম।

নিলার প্রতি আমার দুর্বলতাটা অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিনিন একসাথে ভার্সিটিতে যাওয়া আসা করি। ভার্সিটিতে বন্ধ থাকলে একসাথে ঘুরতে যাই। নদীর পারেই বেশী ঘুরতে ঘুরতে যাই। ওটাই আমার পছন্দের যায়গা। এখন রিক্সাতে একসাথে বসলে আর অসস্তি লাগেনা। বরং বেশ আনন্দ লাগে। ক্যাম্পাসে প্রতিটা মূহুর্ত নিলার সাথেই কাটাই। নিলাকে ছাড়া ভালই লাগেনা। নিলাকে যে আমি খুব পছন্দ করি তা ওকে বুঝাতেই পারিনা। ভাবছি যেভাবেই হোক নিলাকে সব বলতে হবে। ক্লাস শেষে দুজন রিক্সায় বাড়ি ফিরছিলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে নিলার হাত ধরলাম,আর হাত ধরে বললাম এই হাত ধরে কি সারাজীবন হাঁটতে দিবা? নিলা কিছু বললোনা,শুধু একটা হাসি দিলো।

-কি হলো কিছু বলছোনা কেনো? (আমি)
-হাঁটতে পারি,একটা শর্তে। (নিলা)
-কি শর্ত?
-হাত কক্ষনও ছাড়তে পারবানা।
-ছাড়ার জন্য কি আমি হাত ধরবো নাকি!
-তাহলে চলো এখন রিক্সা থেকে নেমে হাত ধরে হাঁটি?
-এখন! এই রোদের মধ্যে হাঁটবা? মাথা ঠিক আছে তো?
-রোদের মধ্যে হাত ধরে হাটতেই ভয় পেয়ে গেলা? তাতেই সারাজীবন হাত ধরে হাটতে চাও!
-এ কি মেয়েরে বাবা! রিক্সাওয়ালা মামাকে থামতে বললাম। ভাড়াটা দিয়ে রিক্সাটা ছেড়ে দিলাম। কয়েক সেকন্ডের মধ্যে নিলাই এসে আমার হাত ধরে টান দিলো। দুজন হাটতে হাটতে বাসায় চলে আসলাম। বাসায় এসে বেশ হালকা হালকা লাগলো। তাই একটা ঘুম দিলাম।

আমাদের একসাথে পথচলা দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিলো। কিন্তু বিপত্তি ঘটে গেলো। নিলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো,ছেলে ব্যবসায়ী,খুব টাকাপয়সা ওয়ালা। পাত্রটা নিলার বাবার পছন্দ। নিলাদের পরিবারে ওর বাবার কথার বাইরে কেউ কথা বলতে সাহস পায়না। তেমনি নিলাও ওর বাবার কাছে আমার কথা বলতে সাহস পেলোনা। নিলার সাথে আর তেমন কথা হয়না। একসাথে ভার্সিটিতেও যাওয়া হয়না। কেমন যেনো হাহাকার লাগে। নিলার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অথচ আমার কিছুই করার থাকছেনা! নিলার সাথে কথা হলো__

-জিগ্গেস করলাম বিয়েটা কি তোমার সম্মতিতেই হচ্ছে? নিলা কিছু বলতে পারলোনা,শুধু হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো। নিলার বিয়ে হবে ওদের গ্রামের বাড়িতে। তাই ওদের পরিবারের সবাই চলে গেলো। এর মাঝে আমরাও বাসা পাল্টিয়ে ফেললাম। আমার ইচ্ছাতেই বাসা পাল্টানো হলো। তিন মাসের মধ্যে আমার ভার্সিটিতে পড়া শেষ হলো,রেজাল্ট বের হবার পর আমরা এই জেলা থেকেই চলে গেলাম। তারপর একটা জবের ভিতর ঢুকে গেছিলাম। বিয়ে সাদি করার দিকে আর মাথা ঘামাইনি। বাসা থেকে অবশ্য বিয়ের জন্য বলতো দিতো। কিন্তু আমিই না করে দিতাম।

-সেদিন আমার অনেক কিছুই করার ছিলো,কিন্তু আমি কিছুই করতে পারিনি। (নিলা)
-হুম..এখন কোথায় থাকো তোমরা?
-ঐ বাসাতেই থাকি। তোমাকে খুব খুজতাম। কিন্তু কোথাও পেতাম না।
-ওহ। খুজতে কেনো বললা না তো?
-কেনো খুজতাম তুমি বোঝোনা?
-না তো বুঝিনা?
-নিলার চোখে অশ্রুকণা জমতে শুরু করেছে।
-আচ্ছা ভালো থাকো,আমাকে যেতে হবে..সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। (নিলা)
-কোথায় যাবে?
-কেনো বাসায় যাবো।
-ওহ,ঠিক আছে যাও।
-শোনো ইমন,পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। নিলা আর কিছু বললো সোজা চলে যেতে লাগলো।
-হ্যা তুমিও শোনো,ক্ষমা করতে পারি এক শর্তে।
-কি শর্ত?
-আমি নিলার হাতটা ধরলাম,
-তোমার সঙ্গে এখন আমাকে নিয়ে যেতে হবে।
-কোথায়?
-হাত ধরে যেখানে নিয়ে যাবে,সেখানেই।
নিলার হাতে হাত রেখে হাঁটতে লাগলাম দুজনে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত