শুকনো পাতা

শুকনো পাতা

আমি রিফাত আর বিরিয়ানিফুল্লাহ সরি সাইফুল্লাহ মিলে রেস্টুরেন্টে এসেছি। উদ্দেশ্য একটাই! বিরিয়ানি খাওয়া। তাও আবার প্রতিযোগিতা করে। যে বিরিয়ানি বেশি খেতে পারবে তার টাকা মাফ। আর যে কম খাবে তার সব টাকা দিতে হবে। এক্ষেত্রে আমার পুরোপুরি বিশ্বাস সাইফুল্লার চেয়ে কেউ বিরিয়ানি বেশি খেতে পারবে না। কারণ ওর নামটাই বিরিয়ানিফুল্লা। আর বিরিয়ানি খাওয়ার সিস্টেম তো পুরাই পিনিক।

রেস্টুরেন্টের ঠিক মাঝখানের চেয়ারে আমরা বসেছি। সাইফুল্লা শুধু এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। তারমানে ওর বিরিয়ানিরর নেশা ভালো করেই পেয়েছে। রিফাত আর আমি সাধারণ ভঙ্গিতেই বসে আছি। সাইফ ওয়েটার কে ডাক দিলো….

–আহো ভাতিজা আহো….তাত্তারি বিরিয়ানি আনো।

-জি স্যার কিছু বলবেন?

–বিরিয়ানি নিয়া আহোনা ক্যারে?

-সরি স্যার আনতেছি, ওয়েট।

বলেই ওয়েটার চলে গেলো। সাইফুল্লার মুখে নোবেলজয়ী হাসি। ওয়েটার বিরিয়ানি আনলে সাইফ বলল….

–হুরররর মিয়া আমার এক প্লেটে হইতোনা, গামলা নিয়া আসেন।

-সরি স্যার আমরা সেটা পারবনা। আপনার লাগলে বলবেন আমরা এনে দিব।

–ভাই আমার গামলা লাগবো….(আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল)

কি আর করার? শত হলেও ছোট ভাই বলে কথা। ওয়েটারকে বললাম…..

–আচ্ছা ছোট গামলার এক গামলা নিয়ে আসুন।

-আচ্ছা।

–সাথে পঞ্চাশটা ডিম। (সাইফ)

সাইফের মুখে পঞ্চাশটা ডিমের কথা শুনে আহাম্মক হয়ে গেলাম। আমি জানতাম ও শুধু বিরিয়ানি খোর, এখন দেখছি ডিম খোর। লে হালুয়া টুটটুট…. সাইফ আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তারমানে ও বলছে….”ভাই প্লিজ ডিম আনিয়ে মুই খাইয়িঙ্গি।” আমি ওয়েটারকে বললাম….

–আচ্ছা তুম ডিম আনুঙ্গি সাইফ খায়ুঙ্গি…

-জি স্যার কি বললেন?

–ডিম আনো যাও

-ওকে স্যার….

ওয়েটার এসে আমাকে আর রিফাতকে এক প্লেট করে বিরিয়ানি দিলো। আর সাইফকে দিলো একটা গামলায় সাথে পঞ্চাশটা ডিম। মনে মনে বললাম…”সাইফরে জীবনে ফকির হতে হলে তোর মতন ভাই একটাই যথেষ্ট।” সাইফ গপাগপ বিরিয়ানি খাচ্ছে আর ডিম মুখে পুরছে। আমার মাথায় আসেনা ওর পিচ্ছি পেটের মধ্যে কেমনে এত বিরিয়ানি হজম হয়। অদ্ভুত, ভাভাগো….

এদিকে আমরা যে রেস্টুরেন্টে খেতে এসেছি কারো পকেটে কোন টাকা নাই। সাইফের খাওয়া যখন মাঝপথে ঠিক তখনি আমাদেরর পাশের টেবিলে মারিয়া এসে বসলো। মারিয়া আমার প্রাক্তন জিএফ। মারিয়ার সাথে ওর ছোট বোন সাদিয়া। সাদিয়া আবার সাইফের প্রাক্তন জিএফ। সাদিয়ার সাথে একটা ছেলে এসেছে। মেবি ওর বিএফ। কিন্তু মারিয়ার সাথে কোন ছেলে নাই। তারমানে ও এখন সিঙ্গেল আছে। দিলমে ডেরাম বাঁজেগা। আমি চেয়ার থেকে উঠে মারিয়ার পাশে গিয়ে বসলাম। আমাকে দেখে মারিয়া অবাক হয়ে গেলো। আমতা আমতা করে বলল….

–তুমি এখানে কেনো?

-বিরিয়ানি খেতে আসছি। সাথে সাইফ আর রিফাত।

–আপনার ভাইতো আস্তো একটা হাতি…?(সাদিয়া)

-মানে?

–পচ্চুর বিরিয়ানি খোর…..

হঠাৎ সাইফ ওর চেয়ার থেকে উঠলো। তারমানে একটা গ্যাঞ্জাম শুরু হতে চলছে। নিজেকে প্রস্তুত করলাম। সমস্যা হলে ঘুরান্টি দিয়ে দৌড়। সাইফ হাতে করে গামলা নিয়েই উঠেছে। গামলায় ডিম। আমাদের কাছে এসে সাদিয়ার বিএফের উদ্দেশ্যে বলল….

–এই হনুমানটা কে?

-মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ। (সাদিয়া)

–চুপ কর চামচিকা।

-সাইফ এটা কেমন কথা? (মারিয়ায়া)

–আপনে চুপ করেন ইঁন্দুর জানি কোথাকার।

-সাইফ মুখ সামলে কথা বলো।

–ভাইরে অফ যা….(আমি)

সাইফ বাংলা ছবির মতন করে বলল….

-না ভাইয়া না, আমি থামবনা। এরা হলো প্রতারক বাজ। চামচিকা, টিকটিকি। এদের কারণে আমাদের হতে হয় দেবদাস। শালা চিটিংবাজ।

–সাইফ বেশি বেশি হচ্ছে কিন্তু? (সাদিয়া)

-চুপ কর আন্ডা। (রিফাত)

হুট করে রিফাতের রেগে যাওয়া দেখে হতভম্ব হয়ে গেলাম। ওতো বেশ শান্তশিষ্ট ছেলে। রেগে গেলে খবর আছে। সাদিয়ার জিএফ বলল….

–ভাইয়া আপনারা কারা ?

-আমরা তোমার দুলাভাই চান্দু…(সাইফ)

–সাইফ ভালো হবেনা বলে দিচ্ছি। ও আমার বিএফ, ওর সাথে কোন খারাপ বিহেব করবানা বলে দিলাম।

-তাই আমার কিরে…

–মাইন্ড ইট…

-বিরিয়ানির পুত বলে। পিউর বিদেশী আন্ডা….

সাদিয়া আবার একটু জেদি টাইপ। হুট করে রেগে যায়। সাদিয়া রেগে গিয়ে সাইফকে ধাক্কা দিলো। সাইফকের হাতে বিরিয়ানির গামলা ছিলো। একটুর জন্য পরে গেলোনা। সাইফ রেগে আগুন হয়ে গেলো। নিজের রাগলে কন্ট্রোল করতে পারলনা। গামলায় থাকা ডিম দিয়ে দিলো ঢিল। ঢিল গিয়ে লাগলো সরাসরি সাদিয়ার মুখে। ডিমটা সাদিয়ার মুখে থাকা অবস্থায় সাইফ ডিম দিয়ে আবার ঢিল। এবার ঢিল গিয়ে লাগলো সাদিয়ার বিএফের মাথায়। ভয়ে সাদিয়ার বিএফ মাগোওও বলে চিৎকার দিলো। সাদিয়া উচ্চস্বরে বলল….

–সাইফ স্টপ ইট, বারাবারি হচ্ছে….

এবার রিফাত আচমকা সাইফের গামলা থেকে ডিম নিয়ে বলল…

–আন্ডা বলে কিরে…

-রিফাত, সাইফ ভাই তোরা থাম। (আমি)

রিফাত সাইফকে বলল….

–সাইফ মার ডিম…

বলেই ডিম ছুরে মারলো। ডিম সাদিয়ার কপালে লেগে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো। সাদিয়া ওদের টেবিলে থাকা গ্লাস ছুরে মারলো। গ্লাস সাইফের কানের কাছ দিয়ে চলে গেলো। পুরো রেস্টুরেন্টে চলছে তুল কালাম। ডিম দিয়ে ছুরাছুরি। রেস্টুরেন্টে সমস্ত লোক দাঁড়িয়ে পরেছে। কেউ কেউ ভিডিও করছে। একজন দেখি ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করছে। রিফাত বলল….

–হালা ভিডিও মারাস।

বলেই ডিম দিয়ে ঢিল। ডিম গিঁয়ে লাগলো ক্যামেরা ম্যানের নাকের ডগায়। ক্যামেরা ম্যান ভয়ে নাক চেপে ধরে দৌঁড়। আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে ভিডিও করা শুরু করলাম। সাথে বক্তৃতা….

“সুপ্রিয় দর্শক মন্ডলী আপনার দেখছেন ডিম লাইভ টেলিকাস্ট। এই মুহূর্তে আমি আছি রেস্টুরেন্টে। আমার সাথে এসেছিলো বিরিয়ানিফুল্লাহ আর রিফাত। দুঃখের বিষয় ওরা এখন ডিম খেলছে। ইটস ডিম ঢেলাঢেলি। দ্যা গেম স্টার্ট কিছুক্ষণ আগে হইইছে…এখনো শেষ হয়নি। সাদিয়াও ওদের বিপক্ষে খেলছে। উরাধুড়া ঢিল দিচ্ছে সাইফ…আমরা সবাই সেটা উপভোগ করছি..আপনারা আমাদের সাথেই থাকুন আর উপভোগ করুন ঐতিহাসিক ডিম খেলাআআআচ….”

আমার বক্তৃতা দেওয়া শেষ হলে মারিয়া দিকে তাকিয়ে দেখি ও রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম….

–কিচ্চে মারিয়া, রাগছো কিউ?

-তুমি ওদের ঝগড়া না থামিয়ে উপভোগ করছো?

আমি মারিয়ার প্রশ্নেরর উত্তর দিতে যাব তখনি পুউউ পুউউ করে পুলিশের গাড়ীর শব্দ হলো। মনে হয় রেস্টুরেন্ট মালিক এমন অবস্থা দেখে পুলিশ খবর দিয়েছে। কিসের ঝগড়া, কিসের ডিম, কিসের উপভোগ। নিজের জান বাঁচানোর জন্য রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আসলাম। অনেক্ষণ পর মোবাইল ফোন বেঁজে উঠলো। সাইফ ফোন করছে….

–কিরে?
–ভাই আমাদের বাঁচান, পুলিশে ধরছে।

অপরপাশে রিফাতের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ও বলছে ওরে আন্ডা, আহারে আন্ডা। আমি বললাম….

–রিফাত চিল্লাচ্ছে কেনো?
–ওকে আন্ডা থেরাপি দেওয়া হচ্ছে।
–আচ্ছা ভালো থাক ভাই।

বলেই ফোনটা কেঁটে দিলাম। অবস্থা ভালো না। দুরে কোথাও যেতে হবে। কয়েকদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে। সাইফ আর রিফাতের জন্য আফসোস হচ্ছে, আহারে বেচারারা এবার ডিম থেরাপি খাবে। খেলে খাক তাতে আমার কি? আমি ভদ্র, ইনোসেন্ট।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত