ফাঁদ

ফাঁদ

অনুভূতি হাজার অনুভবের মাঝে উত্তপ্ত রোদে ঝিরঝির বাতাসে ধান ক্ষেতের পাশে বসে গল্প লেখার মজা অন্য।
নিজেকে অদ্ভুত ভাবে প্রকাশ করা যায়।লেখা যায় মন-প্রাণ উজাড় করে। প্রকৃতির বর্ণনা হয় অতুলনীয়।এবং পকেটে এক প্যাকেট সিগারেট হলে তো কথাই নেই। যদিও এটা নিধানের নিত্যদিনের কাজ। সে সিগারেট টানছে আর লিখছে। “দুটি পাখি দূর গাছে বসে।ক্লান্তি বিরাজমান উভয়ের মাঝে।তবু একটি পাখির চনচল্যতা প্রকাশ ঘটাচ্ছে উভয়ের মাঝে ভালবাসার কথা।নিশ্চুপ অপর পাখি মাথা নিচু করে আছে।মনে মনে হয়তো সেও ভালবাসা পেতে প্রস্তুত।” ঠিক তখন কোথা থেকে স্নিগ্ধা হাজির।পেছন থেকে এক টানে নিধানের হাত থেকে খাতা নিয়ে গেলো। নিধান হতভম্ব।লেখার ধাচটা নষ্ট হয়ে গেছে। এদিকে স্নিগ্ধা খাতা হাতে নিয়ে লেখা গুলো বিরবির করে পড়ছে।পড়া শেষে চুপচাপ নিধানের হাতে খাতা ফেরত দিয়ে বললো,’বাহ্!দারুণ হয়েছে তো।’ নিধান সিগারেটে টান দিয়ে জবাব দিলো,’এসব ফাজলামোর মানে কি?এখানে পার্সোনাল লেখাও থাকতে পারতো।’

– তুই সিগারেট খাচ্ছিস?
– তোকে যা বলেছি তার উত্তর দে।
– তুই সিগারেট খাস?
– দেখতে তো পাচ্ছিস।
– আন্টি জানে?
– না।
– ওহ্,ভালো।
– হুম,এখন যা।
– যা মানে?তোর সাথে কথা বলতে এত খুঁজে এখানে এসেছি।আর তুই চলে যেতে বলছিস!
– হুম।

– জানিস,আমি প্রতিদিন ফেসবুকে তোর গল্প পড়ি।সবগুলো গল্প আমার মুখস্থ।আহা!এত রোমান্টিক কেন তুই?
– জানিনা।
– ইগনোর করছিস?
– না।তুই যা প্লিজ।এখন কথা বলার মুড নেই।
– মুড না থাকলেও বলতে হবে।
– না বললে?
– না বললে নাই।আজ বাদে কাল চলে যাবো।মেহমানের সাথে এমন ব্যবহার করা ঠিক?
– আমার ইচ্ছা না করলে আমি কি করতে পারি?
– বসে বসে যা বলি শুনতে পারিস।
– তোর বকবক শুনতে ভাললাগে না।
– দেখ,কাজিন বলে কিছু বলছি না।তাছাড়া….!!
– তাছাড়া?
– আমি তোকে ভালবাসি।

এবার নিধান নিশ্চুপ।জবাব খুঁজে পাচ্ছে না। স্নিগ্ধা উত্তর না পেয়ে নিধানের হাত ধরে বললো,’আমি সত্যি তোকে ভালবাসি।শুধুমাত্র তোর জন্য গ্রামে আসা।’ বাক্যটা সবাই সাধারণভাবে নিতে পারে না।নিধানের বেলাতেও তাই ঘটেছে। নিধান রেগে হাত ছাড়িয়ে সচরে স্নিগ্ধার গালে চড় মেরে বসলো।

স্নিগ্ধা গালে হাত দিয়ে তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে। অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিধানের দিকে।চোখে স্পষ্ট ভেসে উঠছে মনে জমে থাকা ক্ষোভের ভাষা। স্নিগ্ধা দাতে দাত চেপে বললো,’এ পর্যন্ত যা দেখেছিস তা ছিলো আমার ভালো রূপ।খারাপ রূপ আস্তে আস্তে টের পাবি।বিয়ে আমি তোকেই করবো।মা হলে তোর বাচ্চারই হবো।দেখি তোর বাপের সাধ্য কত!পারলে আটকা।’ ডুবন্ত সন্ধ্যা। ধীরেধীরে অন্ধকার ছেয়ে আসছে।পাখিরা নিজ বাসায় ফিরে যেতে ব্যস্ত। চাপা ফুল ঘ্রাণ ছড়াতে শুরু করে দিয়েছে। ঠিক তখন নিধান উঠানে দাঁড়িয়ে জোড় গলায় বললো,’মা!’ বাক্যটা একজনের উদ্দেশ্য করে ছোড়া হলেও বাড়ির সবাই বেড়িয়ে এসেছে। এভাবে সবার উপস্থিত দেখে নিধান আতংকিত।মনে একটাই সংশয় “স্নিগ্ধা কিছু বলে দেয়নি তো?” ব্যাপারটা পরিস্কার করে দিয়ে নিধানের বাবা সিয়াম সাহেব বললেন,’সারাদিনে সময় হলো বাসায় আসার।তা স্নিগ্ধার সাথে কি করছিস তুই?’ নিধান থতমত খেয়ে জবাব দিলো,’ওর সাথে আবার কি করবো!’

– ছিঃ ছিঃ লজ্জা লাগছে না তোর?
– লজ্জা লাগবে কেন?
– হতচ্ছাড়া,বেয়াদব।সমাজে মানসম্মান ডুবিয়ে বলছিস লজ্জা লাগবে কেন।সব তোর মায়ের দোষ।তোকে শাসন করলে আজ এই দিন দেখতে হতো না।
– নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছিলাম না।তাই ভুল হয়ে গেছে,সরি।
– ওই হাদারাম,এসব কোন ধরণের কথা হ্যা?
– তোমার থেকে শিখেছি।ভুল করে তুমিও তো আম্মুকে একই কথা বলো।
– আমার ভুল আর তোর ভুল এক?তোর আম্মু তো আমার বিয়ে করা বউ।স্নিগ্ধা কি তোর তাই হয়?
– এখন কি পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে হবে?
– না।এর একটাই উপায়।
– কি?
– বিয়ে।
– হোয়াট!!!
– ইয়েস।না হয় এই মুহূর্তে আমার বাড়ি থেকে বেড় হয়ে যা।
– বেড় হয়ে কোথায় যাবো?
– জানিনা।কিন্তু বাড়ির তীর সীমানায় তোকে দেখলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।
– তো…বিয়ের ডেট ফেলবা কবে?আমি কিন্তু আগে বলে দিচ্ছি,আমার এক মাস সময় লাগবে।
– সামনে শুক্রবার তোদের বিয়ে।

নিধান কোনো জবাব দিলো না।সিয়াম সাহেব চোখ গরম করে রুমে চলে গেলেন। এরপর একে একে সবাই চলে গেলো। একপর্যায়ে ওঠানের মাঝে নিধান একলা দাঁড়িয়ে। চারিপাশ ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেছে। দূর মাইকে চিরচেনা সে গান বাজছে “কি হবার ছিলো,কি হয়ে গেলো।ভালবেসে মন সব হারালো।” ফুলে ফুলে সাজানো ঘর, নব বধূর মুখে লজ্জা। মধুময় এই রাতের নাম, “ফুলসজ্জা।”

অনেক ঝামেলা অতিক্রম করে নিধান রুমে প্রবেশ করলো। মনে বড্ড ভয়।বন্ধুরা বলেছে,এই রাতে বউ জাত করতে না পারলে সারাজীবন বউয়ের গোলাম হয়ে থাকতে হয়। ব্যাপারটা মাথায় রেখে দরজার আটকে নিধান খাটে গিয়ে বসলো। এক সেকেন্ড যায়,দুই সেকেন্ড যায়,তিন সেকেন্ড যায় কিন্তু ভয়ের মাত্রা বেড়ে চলেছে। এরপর স্নিগ্ধা আচমকা নিধানের কলার ধরে বললো,’কেমন দিলাম লেখক সাহেব।কথা রাখতে পেরেছি তো?’ চমকে উঠে কলার থেকে স্নিগ্ধার হাত ছাড়িয়ে নিধান জবাব দিলো,’একটা চড় এভাবে ফাঁসিয়ে দিবে ভাবিনি।’

– হাহাহা,আমার প্লান এভাবে কাজ করে যাবে আমিও ভাবিনি।
– তুই আবার কি প্লান করলি?
– এইযে!
– কি?
– হিহিহি,শুনলে আকাশ থেকে পড়বা।
– বল।
– সবাইকে বলছি তুমি আমাকে কিস করছো।
– হোয়াট?[চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে]
– রাগ করেনা সোনা।তুমি তো অন্যকিছু ভেবে তোমার আব্বুর সাথে বুক উঁচু করে কথা বললা,হিহিহি।
– ফাজিল ম্যাইয়া।তোর জন্য আমি আব্বুর কথায় কি না কি উত্তর দিলাম।ওহ্ গড।এখন ওনাদের সামনে যাবো কিভাবে?সব..সব তোর দোষ।ইডিয়েট,ননসেন্স,শয়তান,আজাইরা মেয়ে।

– ওই মুখ সামলে।কিছু বলছি না বলে এই না যে,যা ইচ্ছা বলবা।এখন চুপচাপ আদর করো। নিধান ভয় পেয়ে বললো,’ও..হুম।কোথায় আদর করতে হবে যেন?’ স্নিগ্ধা লজ্জায় মাথা নিচু করে বললো,’ধ্যাত!!!’ ছেলেরা ভালবাসতে জানে। এবংমেয়েরা ভালবাসা আদায় করে নিতে জানে। সুতরাং, উভয় একে অপরের পরিপূরক।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত