একাকিত্ব

একাকিত্ব

যেদিন আমার বিয়ে হল, আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে আমার কপালে স্ত্রী সুখ নেই!
তবুও বাবা-মা’য়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়েতে সম্মতি দিলাম। তাদের কি দোষ, তাদের যথেষ্ট বয়স হয়েছে। আর এই বয়সে হইত সব বাবা-মা ই চাইবে তাদের ঘরের বিয়ের উপযুক্ত ছেলেটা বিয়ে করে সংসারী হোক। পরিবারের দায়-দায়িত্ব বুঝে নিক। তাদের জন্য নাতি-নাতনী উপহার দিক, যেন তারা তাদের শেষ বয়সটা একটু আনন্দে কাটাতে পারে… সুধু একটুখানি চিন্তিত হলাম এই ভেবে যে আমার বই পড়ায় আবার না কোন ব্যাঘাত ঘটে!

আমি আদি, অভ্রনীল আদি। অনার্স পাশ করার পরে ঘরে বসে দিন কাটাচ্ছি। আমার এত পড়াশোনারই বা দরকার কি? বাবা একা যা ইনকাম করেছে এবং এখনো যে ফ্যাক্টরিগুলো গুলো রয়েছে, ঠিকমত তা দেখেশুনে খেতে পারলে সেটা দিয়ে দিব্যি তার পরের দু-তিন পুরুষ বসে খেতে পারবে। তাই সারাদিনে আমার তেমন কোন কাজ নেই। সুধু গল্প উপন্যাসের বই পড়া, খাওদা-দাওয়া আর ঘুমানো। বলতে গেলে আমি নিজেই আমাকে গৃহবন্দি রেখেছি। কেন জানিনা বাইরের আলোকউজ্জল আবহাওয়া আর পরিবেশের থেকে আমার আবদ্ধ ঘরই ভালো লাগে। তাছাড়া আমি ব্যাক্তিগত ভাবে গল্প-উপন্যাস প্রেমি। আমার রুমের সাথে এটাস্ট করা আরেকটা রুম আছে, যেটার সম্পূর্ণই একটা বিশালাকার লাইব্রেরি! হরেক রকমের আর নানান লেখকের গল্প, উপন্যাসে ভর্তি! আমার জীবন বলতে আজ অবধি এতটুকুই ছিল…..

বিয়ে করার পরে আমার জীবন এভাবে পরিবর্তন হবে, সেটা ছিল অকল্পনীয় আর অভাবনীয়। সেই গল্পই আজ বলছি….

-আজকে আমার বাসররাত। সবমিলিয়ে প্রায় সবকিছুই নিয়মমাফিক ঠিকঠাক হবার পরেই আমি বাসর ঘরে ঢুকলাম। আমার সাথে আমার সদ্য বিয়ে করা বউয়ের প্রথম কথোপকথন। ঘরে ঢোকা মাত্রই সে বলে উঠল….
-দেখুন, আমার সাথে আপনার বিয়ে হয়েছে বলেই ভাববেন না আমি আপনাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিব! আমার উপরে স্বামীত্ব দেখাতে আসবেন না….

-……………

-নিজেকে আয়নায় দেখেছেন কখনো? একে তো মোটা! তারউপরে কেমন ভয়ংকর কালো চেহাড়া। আমার মনে হয়, যে কেউ স্বপ্নেও যদি আপনাকে দেখে তবে সে আতকে উঠবে।

সত্যিই তো! নিজেকে ঘরে আবদ্ধ রাখার অন্যতম কারণ হল এটা। আমি খুব বেশি পরিমাণেই কালো আর মোটা। চেহারার কালো ভাবটা যতটা না ঠিক আছে, বিভৎষ লাগে তো শরির অনুযায়ী নিজের অতিরিক্ত মোটা হবার কারণে। যার কারণে বাইরে আমার কোন বন্ধু-বান্ধব নেই। আমি কারো সাখে মিশতে পারি না বা কেউ আমার সাথে মিশে না!
কে জানে, মেয়েটা হয়ত আমাকে বিয়ে করতে চাইনি! তবে তার বাবা হয়ত আমাদের পারিবারিক স্বচ্ছলতার কথা ভেবেই না করতে পারে নি। আর এখনো এ দেশের কোন বিয়েতে মেয়ের মতামত তেমন প্রাধান্য পায় না।

প্রায় তিনমাস আমাদের সংসারটা ভালোই চলছিল। যে মেয়েটার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে ওর নাম আনিকা। দেখতে শুনতে সুন্দর, বুদ্ধিমতি মেয়ে। আমাদের ভিতরে যেটাই ঘটুক না কেন, সেটা সুধুই আমাদের ঘরের চার দেয়ালের ভিতরে ছিল। বাইরে আমরা ছিলাম সুখি দম্পতি। বাবা-মা তাই একটুও সন্দেহের অবকাশ পেল না। তারা এটা ভেবে খুশি হল যে, আমি বিয়ের পরে সুখে আছি! আমরাও খুব ভালোমত অভিনয় করে যাচ্ছিলাম। বাইরে সবার সামনে স্বামী-স্ত্রী আর ভিতরে আমি থাকি এবং ঘুমায় আমার লাইব্রেরিতে আর কে থাকে রুমে।

এ নিয়ে অবশ্য আমার তেমন কোন অভিযোগ ছিল না। বরংচ এটা ভেবে বেশ ভালো লেগেছিল যে আমার বই পড়ায় কোন ব্যাঘাত ঘটে নি। তখন আমি শরৎচন্দ্রের লেখা, ‘পথের দাবী’ উপন্যাসটা পড়ছিলাম।

এরই ভিতর হঠাৎ একদিন একটা অঘটন ঘটে গেল! আমার বউ অর্থাৎ আনিকা পালিয়েছে! কোথায় গেছে, কার কাছে বা কার সাথে গেছে কেউ জানে না। যাবার আগে আমাদের বাড়ি থেকে নগদ কিছু টাকা ও কিছু গহনা নিয়ে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি আর কানাকানির পরে জানা গেল যে, সে একটা ছেলের সাথে পালিয়েছে!

এরপরে প্রায় ৬ মাস পরের কথা। মা ভীষণ অসুস্থ। বাবা গত দু-মাস আগে মারা গেছেন। আনিকা চলে যাবার পরে বাবা ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছিলেন। কেননা আনিকা বাবার বিশ্বাষ অর্জন করেছিল। বাবাও তাকে খুব আপন করে ফেলেছিল। যার কারণে ওর হঠাৎ চলে যাওয়া বাবা মেনে নিতে পারেন নি। আনিকা যাবার পরে বাবা-মা আবারো আমাকে বিয়ে দেয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করে। কিন্তু এবারে আমি কিছুতেই বিয়েতে সম্মতি দেই নি। কেননা আমি জানতাম হয়ত আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। দরকার কি?

বাবা মারা গেলেন। না চাইতেও সংসার, অফিস আর মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব এসে ঘাড়ে পড়ল। আমি দিব্যি খেটে খাওয়া মানুষ হয়ে গেলাম। আমার ওজন অনেকটা কমে গেল। দৌড়াদৌড়ি, চিন্তা আর কম ঘুম হওয়াতে সম্ভবত অসম্ভব শুকিয়ে গেলাম। তবে গায়ের রঙটা আরও একটু কালোতে রূপান্তরিত হল!

ব্যাক্তিগত ভাবে আমার প্রিয় লেখক হলেন, শরৎচন্দ্র। আমি তখন তার লেখা উপন্যাস ‘দেনা-পাওনা’ পড়ছিলাম। যদিও ঠিকমত পড়া হয়ে উঠছিল না। ইদানিং মা অসুস্থ হওয়াতে সেটা প্রায় বাদই গেল……

ওদিকে শুনেছি আনিকা ফিরে এসেছে। সে বা তার পরিবারের কেউ অবশ্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। আমরাও করিনি। সে প্রায় ১৭ দিন পরে বাড়িতে ফিরে আসে। যে ছেলের সাথে সে গিয়েছিল, শুনেছি সেই ছেলেটা নাকি তার টাকা পয়সা, গহনা সব নিয়ে ভেগেছিল। সাথে তাকেও এক পতিতালয়ে বিক্রি করেছিল। অনেক কষ্টে সে সেখান থেকে বের হয়ে এসেছে। এর ভিতরে আমি অবশ্য তার সাথে দেখা করার ইচ্ছা পোষণ করলেও কেন জানিনা কিসের একটা বাধা পেতাম!

মায়ের অসুস্থতা সেই বাধা দূড় করে দিল। আমার মনে হল, মা’কে দেখার জন্য একটা মেয়ের দরকার! সে ঠিক কাজের মেয়ে হবে না। সে ঠিক আনিকার মত হলেও চলবে! যে কিনা আমার স্ত্রী হবার অভিনয় করবে। এবং বাইরে আমার মায়ের মেয়ের মত হয়ে থাকবে। ঠিক আগের মত, এতটুকু হলেই যথেষ্ট। অন্তত মা মূত্যুর আগে তার ছেলেকে সুখি দেখতে পারবে….

এরপরে আমি সত্যিই একদিন চলে গেলাম তাদের বাড়িতে। শুশুরআব্বা আমাকে দেখে চিনতে পারলেন না! শাশুড়িমা ভড়কে গেলেন। তাড়া সবথেকে অবাক হল, যখন জানতে পারল আমি আনিকা’কে নিতে এসেছি। জানিনা আনিকা রাজি হবে না কি। তবে আমার মনে হয়, সে রাজি না হলে আমি অনুরোধ করব! সে যেমন চাইবে তেমনই হবে! সুধু আমার স্ত্রী হয়ে থাকার অভিনয় করলেও চলবে। মায়ের সেবা না করলেও অন্তত মা’য়ের একাকিত্বটা কিছুটা ঘুচানোর জন্য তার সাথে গল্প-গুজব করলেও চলবে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত