উনার সাথে একদিন

উনার সাথে একদিন

স্টেশনে পৌঁছেই দেখি লোকে লোকারন্য। এতো লোকের ভিড়ে ট্রেনে উঠবো কিভাবে ভেবে পাচ্ছি না। এদিকে রাহাত এখনো আসলো না। কমলাপুর থেকে ট্রেন ছেড়েছে সেটা লিমন ফোন করে বলল। আমি শুধু অজানা এক দুশ্চিন্তায় ভুগছি যে ট্রেন উঠবো কিভাবে এতো ভিড়ের মাঝে। এর মাঝে রাহাত চলে এলো। আমাকে বলল, আজ কিন্তু সময় মত চলে এসেছি। মাথায় একটা চটকানা মেরে বললাম, স্টেশনে কত মানুষ দেখেছিস? ট্রেনে উঠবি কিভাবে? ও তখন হেসে বলল, লিমন বলল জানালা দিয়ে উঠতে হবে। গেট দিয়ে ঢোকার মত জায়গা নাই। আর তোকে এটা বোঝাতে বলল। এটা শুনে আমি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। না জানি আজ নিজের মানসম্মানটা কতভাবে হারাতে হবে? রাহাতকে উঠেই পেটাতে শুরু করলাম আর বললাম, কতবার বলেছিলাম বাসে চল বাসে চল, শুনেছিলি? এখন এইভাবে ট্যুরে যেতে হবে? তোদের আমি আজ শেষ করে ফেলবো। ও তখন নিজেকে বাঁচাতে বলল, আরে একটাবার ট্রেনে উঠে নেই তারপর মজা বুঝবি। আমি ছেড়ে দিতেই ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকলো। ট্রেনে এমনিতেই উপচে পড়া ভিড় তার ওপর আবার স্টেশনে এতো লোক।

ভাবতেই পারছিনা এই ট্রেনে উঠতে হবে। ট্রেন থামতেই জানালা দিয়ে লিমন ডাকছে। দুজনে জানালার দিকে এগিয়ে গেলাম ততোক্ষনে ট্রেনের গেটে বিশাল এক ভিড় জমে গেছে। হঠাৎ রাহাত পেছন থেকে কোমর ধরে উপরে উঠিয়ে ধরে জানালার কাছে নিয়ে গেল। আমি চেঁচাতে লাগলাম, ওই নামা আমায় নিচে নামা। কিন্তু ততোক্ষনে লিমন আমাকে ধরে কেমন করে জানি ট্রেনের ভেতরে নিয়ে নিল। ট্রেনের ভেতরে ঢুকে আমি অবাক। প্রচুর ভিড়ের মাঝে সবাই আমার দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে। একটু পরে জানালা দিয়ে রাহাতও ভেতরে আসলো। আমার রাগটা ততোক্ষনে দ্বিগুন হয়ে গেছে। এমন সময় লিমন বলল, একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। রাহাত ওর দিকে প্রশ্নসুচক দৃষ্টিতে তাকাতেই ও বলল, আমাদের দুটো সিট এখানে আর আরেকটা সিট পাশের বগিতে পরেছে। এটা শুনে রাগের মাথায় আমি আর কিছু বললাম না। রাহাত বলল, একটা কাজও ঠিকমত করিস না কেন? এখন কে যাবে ওই বগিতে? লিমন বলল, আরে চিন্তা করিস না, এখান থেকে কাউকে পাঠিয়ে দিয়ে সিট বদল করে নিব। আমি আর এর মাঝে কথা না বলে টিকিট নিয়ে অন্য বগিতে চলে গেলাম। ওরা হয়তো কিছু বলতো কিন্তু আমি চুপ থাকাতে আর কিছু বলল না।

সিটে এসে বসেছি অনেকক্ষন হলো। এর মাঝে ওরা এসে বলে গেছে কয়েকবার যে, চল ওখানে। আমরা সিট পেয়েছি একটা। কিন্তু আমি গেলাম না। মেজাজটাও কেমন যেন বিগড়ে আছে। জানালার দিকে তাকাতেই রাগটা কেমন করে যেন হারিয়ে গেল। সামনের সিটে বসে থাকা এক মোটামুটি বয়স্ক লোক আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ উনি বললেন, ঘুরতে যাওয়া হচ্ছে? আমি উনার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন দ্বিধায় পরে গেলাম। অচেনা এক লোককে কিছু বলা কি ঠিক হবে? উনি আবারও বললেন, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়ার আলাদাই একটা মজা আছে। যেখানেই যাই না কেন, তাদের সাথে ঘুরতে যাওয়াটা সবসময়ই নতুন কিছু। এবার আমি কিছুটা স্বাভাবিক হলাম। উনার কথা শুনে মুখ দিয়ে একচিলতে হাসি ফুটে উঠলো। ঠিকি বলেছেন উনি। যতই রাগ করিনা কেন, এদের নিয়ে কোথাও যাওয়াটা যেন জিবনকে নতুনভাবে উপভোগ করা। এরি মধ্যে সামনে বসা বয়স্ক সেই ভদ্রলোক হঠাৎ করেই একটা সিগারেট হাতে নিলেন। লাইটার দিয়ে ধরানোর আগে আমায় বললেন, তোমার চলে? আমি মৃদু হেসে বলি, না আমি খাই না, ধন্যবাদ। কিন্তু ট্রেনের ভেতরে সিগারেট খাওয়া এক ধরনের অপরাধ। এটা শুনে উনি একটু হাসলেন। বললেন, অনেক সময় কিছু আইন না মানাতেও এক আলাদা মজা আছে বুঝেছো। তবে যেহেতু তুমি নিষেধ করছো তাই খাচ্ছি না। আসলে সত্যি বলতে আমার স্ত্রীও এসব খাওয়া পছন্দ করে না। ওর সামনে আমি এসব কখনোই খাই না তাই ওর অনুপস্থিতিতে একটু আদটু হয়ে যায়।

আমি আবারও আগের ন্যায় হাসলাম। জিজ্ঞেস করলাম, আপনার স্ত্রী কোথায়? মানে বর্তমানে কোথায় থাকেন আরকি? উনি সিগারেটটা পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে বললেন, ও বাড়িতেই আছে। আমি ঢাকায় এসেছিলাম মুলত আমার পেনশনের টাকার জন্য দরখাস্ত দিতে। ও একটু অসুস্থ হয়েছিল কিছুদিন আগে। ওই বয়স হলে যা হয় আরকি। একটু সুস্থ হলে আমি ঢাকায় আসি। আর এর মাঝে আবার খবর পেলাম যে অসুস্থ হয়ে পরেছে। কতবছর একসাথে পার করলাম কিন্তু আমাকে ছাড়া ও কখনও থাকতেই পারেনা জানো। এই যে দেখছো অসুস্থ হয়েছে এটা কিন্তু আমাকে কাছে না পাবার কারনে। তুমি দেখো, আমি গেলেই ও ঠিক ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে। একটু কাছে এসে উনি বললেন, বয়স হয়ে গেলে কি হবে, আমার জন্য তার ভালবাসা আগের মতই আছে। এখনও আমি তার কাছে তার নিজের নায়ক। এসব বলে উনার মুখে তৃপ্তির এক হাসি দেখতে পাচ্ছি। আমি হেসে ফেলেছি এসব শুনে। উনার কথাগুলো বিরক্তিকর হলেও কেন যেন বিরক্ত লাগছে না। হঠাৎ উনি বললেন, তোমরা প্রেম করনা কেউ? এই বয়সটাতে তো প্রেম করার আলাদা এক মজা। এবার আমি বললাম, আসলে প্রেম এখনও আসেনি জিবনে তবে ভাবছি এবার একটা কিছু করতে হবে। তখনি উনি বলল, কিছুই হবে না। আসলে তোমরা যেটাকে প্রেম বল সেটা আসলে প্রেম না। প্রেম কখনও বলে কয়ে আসে না। হুট করে জিবনে জায়গা করে নেয়। আমার স্ত্রীর সাথে আমার প্রেম করে বিয়ে হয়েছিল জানো। বলেই হেসে ফেলে আবারও বলতে লাগলো, সে অনেক আগের কথা। আমি তখন প্রনিবিদ্যা নিয়ে তৃতীয় বর্ষে পড়ছিলাম। হুট করে সেদিন ক্লাস শেষে বৃষ্টি শুরু হল। সবাই ক্লাসরুমের ভেতরেই বসে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছে। আমার কেন যেন বৃষ্টিতে ভেজার খুব শখ হল। ব্যাগটা বন্ধুদের দিয়ে নেমে পড়লাম বৃষ্টিতে। সামনে ক্যাম্পাসের মাঠে এসে দেখলাম, এক মেয়ে মাঠের মাঝখানে দাড়িয়ে মাথা আকাশের দিকে উচিয়ে বৃষ্টিবিলাস করছে। তখনকার সময়ে এসব অনেক কমই দেখা যেতো। হয়তো বৃষ্টির মাঝে আশেপাশে কেউ ছিল না তাই সে নিজেকে একটু স্বাধীনচেতা হিসেবে দেখেছিল। মেয়েটুর একটু কাছে গিয়ে আমি বলি, বৃষ্টি কি খুবি প্রিয়? মেয়েটা ধীরে ধীরে মাথা নিচে করল। একটু পরে আমার দিকে তাকালো। আমরা দুজনেই তখন ভিজে গেছি। জামা কাপড় শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। সে কিছু বলছিল না তবে তার বড় কেশ দিয়ে যখন পানি গড়িয়ে পড়ছিল তখন অপলক দৃষ্টিতে আমি তাকিয়ে ছিলাম। বৃষ্টির প্রতিটা ফোটা মাথার চুল হয়ে কপাল দিয়ে গড়িয়ে নাক মুখ হয়ে নিচে আসছিল। জানিনা আমি ওই সময়টাকে কিভাবে ব্যক্ত করব তবে তখন আমরা দুজনেই থমকে দাড়িয়েছিলাম। ও যখন মাথা নিচু করে কানে চুল গুজে দিয়ে মুখমন্ডল থেকে চুয়ে পরা পানি মুছে নিচ্ছিল তখন আমি শুধু তাকিয়ে দেখেছি। প্রকৃতি হয়তো কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে ছিল। মেয়েটাকে দেখলাম মাথা নিচু করে ভেজা ওরনা ঠিক করতে। হয়তো ও আমাকে এভাবে আশা করেনি। কতক্ষন তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম জানিনা তবে হঠাৎ মেঘের গর্জনে আমার ঘোর কেটে যায় আর ওকে দেখি কেমন চমকে উঠেছে। লজ্জায় মেয়েটা কেমন যেন লাল হয়ে গিয়েছে আর সাথে এই বৃষ্টির মাঝে তার পুরে শরীর কাটা দিয়ে লোম দাড়িয়ে গেছে। খুব একটা সাহসের কাজ করে ফেলেছিলাম সেদিন। জানিনা কিভাবে হয়েছিল সব কিছু। তবে তার কাছে গিয়ে বৃষ্টিস্নাতো হাতটা ধরে বলেছিলাম, কে তুমি মেয়ে? তুমি কি এমন জাদু নিয়ে এসেছো যে আমি নিজেকে তোমার মাঝে হারিয়ে ফেলেছি? মেয়েটা আবারও মুখ নিচু করে নিলো? একটু পরে সে পেছন ফিরে চলে যেতে চাইলে আমি বললাম, তোমার নাম কি মেয়ে? সে থমকে দাড়ালো, একটু পরে মুখ ঘুরিয়ে বলল, আমি নিমিশা। এরপর কিছু না বলে সে চলে গেল। ও চলে যাওয়ার পর কতক্ষন সেখানে দাড়িয়েছিলাম জানি না। তবে বৃষ্টি শেষে যখন আমার এক বন্ধু আমার ব্যাগ দিয়ে বলল, কিরে এখনো দাড়িয়ে আছিস কেন? তখন আমি আবারও ঘোর কাটিয়ে বাস্তবে ফিরি।

এই তুমি আবার বিরক্ত হচ্ছো না তো? উনার কথা শুনতে শুনতে আমিও ভাবনায় চলে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম মানুষের জিবনে তো কতকিছুই হয় তাই না। উনার কথায় ভাবনা থেকে বের হয়ে আমি বললাম, না না, বিরক্ত হবো কেন? আপনি বলুন না এরপর কি হল? উনি আমার আগ্রহ দেখে একটু খুশিই হলেন। এরপর আবারও বললেন,
সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে তো জ্বর চলে এলো। তাই তিনদিন ভার্সিটি যেতে পারিনি। যেদিন ভার্সিটি যাই সেদিন গেট থেকে ঢুকার পর থেকেই নিমিশাকে খুজছি। কিন্তু পাচ্ছি না। ক্লাসরুমের পাশে একদল মেয়ে আড্ডা দিচ্ছিলো। পাশ দিয়ে যেতেই তারা সবাই কেমন যেন জরেই হেসে ফেলল। আমি অনেক দ্বিধায় পরে গেলাম। এরা কি কোন কারনে আমায় দেখে হাসছে? এসব কিছু ভেবেও আমি সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। ঠিক তখনি অনেকটা সুখের আভাসে নিমিশা আমার সামনে এসে দাড়ালো। সামনে এসে আমাকে অনেকটা জড়িয়ে ধরার মত করে হাত আমার পিঠে দিয়ে কি যেন খুলছিল। যখন সে সামনে আসলো তখন দেখলাম বড় এক কাগজে লিখা, পাত্রী চাই, পাত্র স্বয়ং আমি। আর এটা কে যেন লিখে পিঠে আটকিয়ে দিয়েছে। নিমিশা মিটিমিটি হাসতে হাসতে বলল, কি ব্যাপার জনাব, সেদিন আমার হাত ধরে এতোক্ষন তাকিয়ে থেকে আজ আবার পাত্রী খোজা হচ্ছে? এই যদি মতলব হয় তবে সেদিন ওভাবে তাকিয়ে দেখছিলেন কেন আমায়? আমার লজ্জা করছিলো না বুঝি? যান আপনার সাথে আর কথা নেই বলেই ও যখন চলে যাচ্ছিল তখন আমি আবারও তার হাত ধরে আটকালাম। বললাম, তোমাকে খুজতেই তো নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি মেয়ে। গেট দিয়ে ঢুকার পর রবীর সাথে কোলাকুলি হলে সেই মনে হয় এই কাজটা করেছে। চোখদুটো কাউকে খুজতে দিশেহারা হয়ে আছে আর তাইতো এমন লজ্জার স্বীকার আমি। তবে ভুল বুঝোনা আমায়। আমি সেদিন থেকেই যে তোমাতে আসক্ত।
এসব কথার মানে ও কি বুঝেছিল জানি না তবে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল সে। হাতটা ছাড়িয়ে আমার নাকটা টেনে বলেছিল, তবে জনাব আপনার মাঝেও কি কোন জাদু আছে? নাহলে আমি কেন আপনার প্রতি আসক্ত হয়ে যাচ্ছি? এতো মায়াভরা কথাগুলো কিভাবে বলেন আপনি? উত্তরে কি বলব আমি ভেবে পাই না। শুধু বলেছিলাম, টেনে টেনে কি তুমি আমার নাকটাই বোঁচা করে দেবে? আর বোঁচা হয়ে গেলে বলবে আমার নাক বোঁচা জামাই পছন্দ নয়। না, এমনটা কিন্তু হতে দেবো না। তখন এই নাক বোঁচা জামাইকেই নিয়ে সারাজিবন থাকতে হবে। এটা শুনে ও হেসে ফেলে বলল, আপনি অনেক রসিক মানুষ বুঝেছেন? তবে আপনি কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে আমি আপনার সাথে সারাজিবন কাটাবো? বলেই মিটিমিটি হাসছে মেয়েটা। আমি এবার একটু অভিমান নিয়ে বলি, তবে কি শুধু শুধুই আমার নাক চেপে ধরেছিলে? মেয়েটা এবার হেসেই চলেছে। ওর হাসিটা কেন যেন আবারও আমায় ঘোরের মধ্যে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলো তবে এই কনফিউশনের মধ্যে সেটাও হচ্ছে না। একটু পরে ও বলল, অভিমান নিয়ে কথা বললে আপনাকে আরও মায়াবী লাগে জানেন তো। তবে আর অভিমান করবেন না যেনো। কারন আমিও আপনার সাথেই সারাজিবন কাটাতে চাই। আর আরেকটা কথা, আমার জন্য অযথা আমার ডিপার্টমেন্টের সামনে অপেক্ষা করে সময় নষ্ট করবেন না। আমি তো আপনারই আছি এখন তাই না। বলেই ও আর দাড়ালো না। চলে যেতে লাগলো। আমি শুধু এটুকু বললাম তাকে, তুমি কি জানতে আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করতাম? হঠাৎ দাড়িয়ে পেছন ফিরে ও বলল, মেয়েরা বুঝতে পারে জনাব।

চা খাবে আমার সাথে? ট্রেনটি একটা স্টেশনে এসে দাড়িয়েছে। তখনি উনি বললেন, চা খাবো কি না। আমি উঠে দাড়িয়ে বললাম, আমি নিয়ে আসছি। লোকটি তখন বলল, তুমি বস, আমি নিয়ে আসছি। নাহলে সেভাবে বানিয়ে আনতে পারবে না আর তখন চা টা জমবে না তোমার সাথে। আমি তখন আবারও হেসে ফেললাম। উনি সিট থেকে উঠলে পান্জাবীর পকেট থেকে উনার মোবাইলটা সিটে পরে যায়। উনি বুঝতে পারেন না। উনি চা আনতে যেতেই উনার মোবাইলটা বেজে উঠলো। আমি হাতে নিয়ে দেখলাম অজানা এক নাম্বার। ধরবোনা ধরবোনা করেও কেন যেন ধরে ফেললাম। ওপাশ থেকে কেউ একজন বলল হ্যালো, আতিকুর চাচা বলছেন? আমি জি বললেই, ওপাশ থেকে আওয়াজ আসলো, চাচা আপনার স্ত্রী কিছুক্ষন আগেই মারা গেছেন। আমরা অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারলাম না। বাড়িতে কাউকেই সামলানো যাচ্ছে না। আপনি যত জলদী সম্ভব চলে আসুন। বলেই ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গেলো। আমি এবার আর দাড়িয়ে থাকতে পারছি না। যেই লোকটা তার স্ত্রীকে এতোটা ভালবাসে সে কিভাবে এটা মেনে নিবে? যদিও উনি সম্পর্কে আমার কেউ না তবুও খুবি খারাপ লাগছে কেন যেন আমার। কি করব এই মুহুর্তে আমি ভেবে পাচ্ছি না। উনার মোবাইলটা পকেটে রেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম যে উনার সাথে উনার বাড়িতে যাব। এই অবস্থায় লোকটিকে একা ছাড়া যাবে না।

কিছুক্ষন পর লোকটি দুকাপ চা নিয়ে ভেতরে ঢুকলো। আমাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে সে বলল, কি ব্যাপার দাড়িয়ে আছো কেন? বস। আমি ভদ্রতা দেখিয়ে বললাম, না মানে বসুন আপনি। উনি একটু হেসে বললেন, তোমরা আজকাল কার ছেলেরা দেখছি ফরমালিটি একটু বেশিই মেনে চলছো। ফরমালিটির এতো দরকার নেই বুঝছো। এটার কারনে আমরা কাছে আসতে পারি না। আর কাছে না আসলে খেলা জমে না, কি বল? আমি কষ্ট করে হলেও হাসলাম। এবার আমি উনাকে বললাম, আংকেল একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেলুন। একসাথে খেয়ে দেখি কেমন লাগে। উনি হেসে চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে একটা সিগারেট বের করে ধরিয়ে ফেললেন। বললেন, এখন যদি টিটি চলে আসে? আমি বললাম, মাঝে মাঝে পৈশাচিক কারনে হলেও কখনও নিয়ম ভাঙতে হয় আংকেল। এবার উনি হেসে ফেললেন। আমি বললাম, তো বললেন না এরপর কি হল? চায়ে একটা চুমুক দিয়ে উনি বলা শুরু করলেন।

সেদিন ওই বৃষ্টিতে ভেজার আগেও মেয়েটাকে আমি চিনতাম। তবে নাম জানতাম না। একবার হলেও দেখার জন্য তার ডিপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে থাকতাম। আমার কাছে এখনও সেই বৃষ্টিটা জিবনের উপর ধেয়ে আসা চরম এক ভাগ্য মনে হয়। সেদিনই আমি আমার নিমিশাকে পেয়ছিলাম নিজের করে। এরপর তো চিঠি আদান প্রদান শুরু হল। আমাদের মাঝেও ঝগড়া হত তবে নিমিশা আমাকে অনেক সম্মান আর বিশ্বাস করতো আর আমিও নিমিশাকে অনেক ভালবাসতাম তাই এসব ঠুংকো ঝগড়া আমাদের মাঝে কোন দুরত্ব তৈরী করতে পারিনি। তবে বিয়ের পর একবার একটা বড় ঝগড়া হয়েছিল বাচ্চা নিয়ে। নিমিশা তখন তিম মাসের প্রেগনেন্ট। আমি চাইতাম আমার একটা মেয়ে হবে আর ও চাইতো ছেলে। তারপর আবার বাচ্চার নাম নিয়েও। ও এটাও বলেছিল যে বাচ্চা হলে আমি নাকি ওর থেকে আমার বাচ্চাকে বেশি ভালবাসব। আরে একটা বাচ্চার সাথেও কি তার হিংসে করতে হয়? এসব বিষয় নিয়ে সেদিন একটু বেশি কথা কাটাকাটি হয়ে যায়। তাই রাগ করে সে বাপের বাড়ি চলে যায়। আমিও দুদিন জেদের বসে তার সাথে কোন প্রকার যোগাযোগ করিনি। কিন্তু তিনদিন যেতে না যেতেই আমি ওর বাবার বাসায় ওকে আনতে যাই। কিন্তু ওখানে গিয়ে শুনি ও নাকি আজকে সকালেই আমার বাসায় চলে গিয়েছে। আমি তখনি নিজের বাসায় আসি। এসে দেখি ও ডায়নিং এ বসে চাল বাচছে। ইচ্ছে তো করছিল দুটো চর মেরে বলি, আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল কেন? মেরে ফেলে রেখে যায়নি কেন? এতো কষ্ট দেওয়ার মানে কি? কিন্তু ওকে কিছুই বলাম না। উল্টো মাকে ডেকে বলেছিলাম আমি অফিসে যাচ্ছি। সেও কিছু বলে নি। রাতে বাসায় এসে না খেয়ে শুয়ে পরলাম। একটু পরে ও এসে আমাকে ডাকলো। আমি খাবনা বলেই আরও ভালভাবে ঘুমানোর ভান করছি। একটু পরে দেখি ও আমার সামনে বসে খাচ্ছে আর বলছে মাছটা কি স্বাদটাই না হয়েছে। আমি বললাম, ডায়নিং ছেড়ে এখানে খাচ্ছ কেন? ও বলেছিল, আমার ইচ্ছে তাই। তুমি খাবে? আমি এবার এসব না শুনে বললাম, চলে তো গিয়েছিলে তাহলে আবার আসলে কেন? ও বলল, তুমি আনতে যাবে কষ্ট করে এটা চিনতা করে নিজেই চলে এলাম। আর এসে শুনছি যে তুমিও আমায় আনতে গেছো। আমি বললাম, আমি কাউকে আনতে যাই নি। ও বলল, ওও, তাহলে মা আমাকে মিথ্যে বলেছে। বুঝেছি। বলেই ও হাসতে লাগলো। আমিও আর রাগ করে থাকতে পারলাম না। তবে আবারও অভিমান করে শুয়ে পড়লাম। একটু পরে ও আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে বলল, এই খাবে না? আমি কিছু বলছি না। তখন ও আমাকে ওর দিকে ঘুরিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে বলল, এই তুমি খাবে না? ওর চোখে কান্না দেখে আমি আর থাকতে পারলাম না। চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম, আমাকে রেখে চলে গিয়েছিলে কেন? কিভাবে থাকতে পারলে এই তিনদিন? ও বলল, তুমিও তো একটাবার খোঁজ নাও নি। আমার কি কষ্ট হয়নি তোমাকে ছাড়া থাকতে? তাইতো আজ সকালেই বাসায় চলে এসেছি। চলো খাবে এখন। আমি তখন বিছানা ছেড়ে উঠছি না দেখে কিছুক্ষন পর ও ভাত নিয়ে এসে বলল, এই উঠে বসো, হা করো। আমিও তার কথা মত সবি করলাম। শুধু বললাম, কখনও ছেড়ে যেও না আমায় মেয়ে। আর গেলেও মেরে ফেলে যেও। তা না হলে বিচ্ছেদের কষ্টটা কেন যেন সহ্য হয় না। ও আমাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে খাইয়ে দিল। এই হল আমাদের সংসার। জিবনের অনেক গুলো কঠিন সময়ে আমরা সবসময় একে অপরের পাশে ছিলাম। সামনেও তাই থাকবো এটা আমাদের বিশ্বাস।

উনার গল্প শুনে আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে সাথে মুখে হাসিও। কিভাবে পারবে এই লোকটা নিজেকে সামলাতে যখন জানবে যে তার ভালবাসার মানুষটা আর নেই। এখন এসব বলে সারাটা রাস্তা উনাকে কষ্ট বহন করতে দিতেও ইচ্ছে করছে না। ভাবলাম, যা হওয়ার উনার বাড়িতেই হবে। আমাকে এভাবে দেখে উনি বললেন, কি ব্যাপার তোমার চোখে পানি কেন? তুমি তো দেখছি অনেক আবেগী হয়ে গেলে। চা তো দেখেছি ঠান্ডা করে ফেলেছো। এটা শুনে আমি এক বারে চা টা শেষ করে বললাম, আংকেল সিগারেট টা নিভে গেছে আবার ধরাবেন কি? উনি হাতের সিগারেটটা আমার হাতে দিয়ে বললেন এবার তুমি ধরাও। আমি আসছি বলেই সিগারেট আর লাইটার টা হাতে নিয়ে পাশের বগিতে গেলাম।

সেখানে রাহাত আর লিমনকে সবটা জানালাম। ওরাও সব শুনে চুপ হয়ে গেল। তখন তাদের একটা প্লান বললাম। তিনজনে আংকেলের কাছে আসলাম। আমি বললাম, আংকেল আপনার সব কথা শুনে আমরা সবাই ঠিক করেছি যে আপনার স্ত্রীকে দেখতে যাব। যদি এতে আপনার কোন সমস্যা না হয় তাহলে? এটা শুনে লোকটা হেসে বললেন, তোমরা যাবা এতে সমস্যার কি আছে বোকা ছেলে। তোমরা আমার ছেলের মত। অবশ্যই যাবা। দারাও বাড়িতে একটা ফোন করে দেই তোমাদের একটু আপ্যায়নের আয়োজন তো করতেই হয়। বলেই উনি ফোন খুজতে যাচ্ছিলেন তখনি আমি বাধা দিয়ে বললাম, আংকেল এসবের কোন দরকার হবে না। আমরা আপনার সাথেই যাব। যা আপনার হবে তাই আমাদেরও হবে। তাই এসবের কিছু দরকার নেই। লোকটা এবার আমাদের সাথে আরও নানান বিষয়ে গল্প করলেন। আমাদের পরিবারে কে কে আছে। কে কিসে পরছি এসব। বিকেলের দিকে উনাকে একটু রেষ্ট নিতে বলে আমরা ট্রেনের দরজায় এসে সিগারেটটা ধরালাম। মুক্ত বাতাশে বিষাক্ত ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে ভাবছি, জিবনের এই অংশটা কেমন যেন। সবকিছু ঠিক থাকে তবে হঠাৎ আবারও অপুর্নতা গ্রাস করে ফেলে। রাহাত আর লিমনও ভাবছে কেন এমনটাই হতে হবে? অথচ ভেতরে ভেতরে সবাই জানি, এটাই হয়ে আসছে সবসময়। এটাই নিয়ম। কেউ সারাজিবন থাকেনা। আবার কেউ সারাজিবনেও পায় না। তবে থেকে যায় এই ভালবাসার গল্পগুলো। যেমনটা এই লোকের ভালবাসার গল্পটা আমাদের কাছে।

ট্রেন থেকে নেমেই উনার বাড়িতে আসার জন্য ভ্যান নিয়েছি। আকাবাকা পথ পেরিয়ে চলেছি। কিছুদুরে একটা জটলা দেখা যাচ্ছে। উনাকে ধীরে ধীরে বলতে শুনলাম, আমার বাড়ির ওখানে আবার জটলা কিসের? বুঝতে পারলাম ওটাই ওনার বাড়ি। বাড়ির সামনে যেতেই উনার ছেলেমেয়ে এসে উনাকে জড়িয়ে কাঁদছে। বলছে, বাবা, মা আমাদের একা করে চলে গেছে বাবা। আমরা তিনজন শুধু উনাকে দেখছি। উনি কি করবেন এখন? উনি কি এই ব্যাথাটা সহ্য করতে পারবেন? কিন্তু না পরোক্ষনে আমাদের ভুলটা ভেঙ্গে গেল। উনিও ছেলেমেয়েদের জড়িয়ে নিয়ে আছেন। তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আশ্চর্য উনার চোখে আমরা কোন পানি দেখি নি। পুরো এলাকাতেই একটা শোকের ছায়া। অথচ যেই মানুষটা তার স্ত্রীকে এতোটা ভালবাসে সেই মানুষটার চোখে কোন পানি নেই। কিছুটা অদ্ভুত তাই না। আবার এটাও মেনে নিতে হচ্ছে যে, কাঁদলে হয়তো মানুষ জনও বলবে যে এই বয়সে এসেও স্ত্রীর জন্য কান্না করা লাগে। অনেকটা তিরস্কার আরকি। সারাটাক্ষন আমি ওই লোকটির দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। জানাজা শেষ হল, মাটিও দেওয়া হল। রাত তখন দুটোর কাছাকাছি। সবাই চলে গেছে যে যার ঘরে। আংকেলও তার বাড়িতে আর আমরা এলাকারই এক পুলে বসে আছি। অথচ আমাদেরকে আজ তার আপ্যায়ন করানোর কথা ছিল। এটাই জিবন। তিনজনেই বসে ভাবছি কাল সকালে উনার সাথে একটু দেখা করে চলে যাব। কিন্তু না, একটু পরে দেখলাম পান্জাবী পরে সেই আংকেল গোরস্থানের দিকে যাচ্ছে। আমরাও তার পেছন পেছন গেলাম। হঠাৎ করেই বৃষ্টি শুরু হল। উনাকে দেখলাম, উনার স্ত্রীর কবরের ওখানে গিয়ে বসলেন। রাহাত আর লিমনকে আমার ব্যাগটা দিয়ে আমি উনার পাশে দাড়ালাম। উনি বলছেন, আজও বৃষ্টি হচ্ছে জানো। এরকমি এক বৃষ্টিস্নাতো দিনেই তোমায় পেয়েছিলাম আমি। আজও মনে আছে আমার। আবার এরকমি বৃষ্টিস্নাতো এক রাতে চলে গেলে তুমি। কেন একটাবার বলনি যে, যেতে হবে না তোমায়। তুমি আমার সাথে থাকো। একা করে রেখে যেতে পারলে কিভাবে তুমি? কেন তুমি সেদিন আমাদের সন্তানের দায়িত্ব আমার হাতে দিয়েছিলে? তা নাহলে তোমার সাথে আমিও চলে যেতাম। এসব বলেই উনিই অনেক জোরেই কাঁদতে লাগলেন। আমারও কি চোখ বেয়ে গরম পানি ঝরে পরলো। হয়তো। তবে আশ্চর্য এই কান্নাগুলো কেউ দেখতে পারে না। সব কিছুই বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে মিশে একাকার। আলাদা করার কি কোন উপায় আছে কোনটি বৃষ্টির পানি আর কোনটি চোখের? একটু পরে আবারও উনি বলল, বৃষ্টিতে আর তোমার সাথে ভেজা হবে না। একদম ভয় পাবে না ওখানে। আমি তোমার পাশেই আছি। আমি উনার কাধে আমার হাত রাখলাম। পেছনে ফিরে আমাকে জড়িয়ে নিয়ে আবারও কান্না করল আমার বাবার চেয়েও বয়সে বড় সেই লোকটি। আমি তাকে থামালাম না। কাঁদুক উনি। এসব জিনিসের কোন শান্তনা হয় না এটা আমি জানি। তার সাথে আমার সেরকম কোন পরিচয় নেই অথচ তিনি আমাকে জড়িয়ে কাঁদছেন। এটাও বাস্তবতা।

একটু পরে উনাকে নিয়ে বাড়িতে আসি। পরেরদিন সকালে উনাকে উনার মোবাইলটা দিয়ে বলি, আংকেল আমি জেনেছিলাম সবকিছু। কিন্তু আপনাকে জানাতে ইচ্ছে হয় নি। উনি বললেন, তোমাদের ট্যুরটা নষ্ট করে ফেললাম। আমি বললাম, কি বলছেন আংকেল। আমরা ঠিক আছি। এরকম আরও কিছু কথায় সেদিন আমরা বিদায় নিয়েছিলাম। আসার সময় বলেছিলাম, আপনার স্ত্রীর কথাগুলো রাখবেন। এসবের মাঝেই উনাকে খুঁজে পেতে পারেন। তবে আমি আপনাকে জিবনের সেরা একটা দিনের পথ চলার সঙ্গী হিসেবেই মনে রাখবো।

এই ঘটনার প্রায় দুবছর পেরিয়ে গেছে।আমরা তিনজনেই জানি আমাদের জিবনের শ্রেষ্ঠতম একটা ট্যুর ছিল সেই দিনটাতে। যেখানে আমরা স্বচক্ষে বুঝেছিলাম ভালবাসা কি? দেখেছিলাম ভালবাসাকে খুবি কাছে থেকে। কয়জনের ভাগ্যে জোটে এমন কিছু। ভার্সিটি থেকে বেরিয়ে এখন জব করছি। ভার্সিটিতে এক মেয়েকে খুবি ভাল লাগতো। অনেকদিন পর আজ ভার্সিটিতে আসলাম তিনজনেই। হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হল। ক্যাম্পাস থেকে তারাহুরো করে বের হচ্ছি এমন সময় দেখলাম কে যেন মাঝমাঠে দাড়িয়ে বৃষ্টিবিলাম করছে। কাছে যেতেই দেখি এটা আমার মনের ভেতরে পরিকল্পিতভাবে বাস করা সেই মৃন্ময়ী। দুজনি বৃষ্টিতে ভিজে গেছি। তার অপরুপ রুপের দিকে তাকিয়ে ভাবছি, তবে কি আমিও পেতে যাচ্ছি আমার ভালবাসাকে?

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত