ভালবাসা

ভালবাসা

বাবা যখন কালো বেঁটে মহিলাকে বিয়ে করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন তখন আমার মায়ের মিষ্টি হাসিমাখা মুখটা বড্ড বেশি মনে পড়ছিল। আমার মায়ের চিকন নাক, মায়াবী চোখ আর মিষ্টি হাসি আমি কখনো ভুলতে পারিনা। মায়ের মৃতদেহটা যখন নিথর হয়ে পড়েছিল তখনো আমার মনে হচ্ছিল মা মিটি মিটি হাসছে। মায়ের মুখটা যে মমতার আঁধার,সেখানে অন্য কারোর মুখ মায়ের মত কখনো হতেই পারেনা

বাবা আবার বিয়ে করবেন শুনে আমি রেগে যাই,বড্ড বেশি রেগে যাই। আমার মনে হতে থাকে বাবা আমার মাকে ভালবাসতো না, আমাকেও ভালবাসেনা তাই অতি সহজে মাকে ভুলে গিয়ে আবার বিয়ে করে নিচ্ছে। মনে হতে লাগলো এ দুনিয়াতে কেউ কারোর জন্য নয়,সবাই স্বার্থপর।

মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী গেল গতকাল আর আজই মাথায় পাগড়ী পড়ে বাবা বিয়ে করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন!

কি করে এত স্বার্থপর হয় সবাই? বাবার প্রতি একটা ঘৃণা তৈরি হয় আমার। একটা বিতৃষ্ণা তৈরি হতে থাকে।

মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দুপুরবেলা বেশ কজন এতিম খাওয়ানো হল বাসায়। হুজুরদের দিয়ে মিলাদ মাহফিল করে মায়ের আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করানো হয়। দাদী ফুফুদের পাশাপাশি আমার নানা নানুও এসেছেন আজ এ বাসায়। মনটা বিষন্ন আমার, বারবার মায়ের কথা মনে পড়ছে। সারা বাসায় মায়ের কোন ছবি নেই। শুধু আমার রুমেই মায়ের একটা ছবি বড় ফ্রেমে বাঁধাই করা আছে।

মা ছবির জন্য বেশ শৌখিন ছিলেন।সুন্দর সুন্দর ফ্রেমে আমরা তিনজনের ছবি বাঁধাই করে বিভিন্ন দেয়ালে লাগিয়ে ঘর সাজাতেন। মা পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পরে বাবা এক এক করে সব ছবি দেয়াল থেকে নামিয়ে ফেলেছেন,শুধু আমার রুমেরটাই রয়ে গেছে। এ ঘরে বাবার পদচারণা খুব কম বলেই ছবিটা বাবার চোখে পড়েনি। নয়ত এটাকেও দেয়াল থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতেন।

ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে বিষণ্ন মনে মায়ের মুখটা দেখতে দেখতে চোখ থেকে টপাটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছিল।নিচে কোন একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে আর সে সোরগোল আমার কানে এসে বাজলো। একটু এগিয়ে সিঁড়ির রেলিং পর্যন্ত গিয়েই বুঝলাম বাবা আবার বিয়ে করছেন। হুম আমি ভুল শুনিনি বাবার বিয়ে এবং সেটা আগামীকালই।

গতকাল বাবা আমাকে একটা কফিশপে নিয়ে গিয়েছিল, আর সেখানে কালো বেঁটে এক মহিলার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তাহলে বাবা ঐ মহিলাকেই বিয়ে করছেন! বাবা কিভাবে মাকে ভুলে যেতে পারলো? রাগে দুঃখে চোখের জলে রুমের দরজা আটকে শুয়ে থাকলাম। মা কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল? আল্লাহকে দোষ দিতে লাগলাম আমার জীবনের সব সুখ কেড়ে নেয়ার জন্য। অবশেষে কিনা আমার একজন সৎমা হবে! সৎমা যে ভাল হয় না তা আমার ক্লাসমেট টগরের মুখে শুনেছিলাম। টগরের সৎমা ওকে মারধর করে, খেতে দেয়না, কাজ করায়। আমার জীবনে তাহলে আরেক কালো অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। মা মরে গেছে সেটা ছিল আমার জীবনের এক অন্যতম বড় দুঃখ, তারপর শুরু হল বাবার আর আমার এক বিশৃঙ্খল ও ছন্নছাড়া জীবন আর এখন আসছে সৎমার মত মানসিক যন্ত্রণা। সবচেয়ে খারাপ লাগছে বাবার মাকে ভুলে যাওয়াটা।

হঠাৎ ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে মায়ের। ডাক্তার বলেছিল ক্রিটিক্যাল কন্ডিশন এবং লাস্ট স্টেজে এসে অসুখটা ধরা পড়েছে। টিউমারটা গলতে শুরু করেছে,চিকিৎসা করেও কোন বিশেষ লাভ হবেনা। উনি আর একুশ/বাইশ দিন বাঁচবেন। সত্যিই মাত্র ২১দিন বেঁচেছিলেন মা। ২১তম রাত ১:৩০ এ মায়ের আত্মাটা দেহ ছেড়ে উড়ে যায়।আমার চেয়েও বেশি কেঁদেছিলেন বাবা, কান্না দেখে যেন পাষাণ গলে যায়। অসুখটা ধরা পড়ার পর থেকে বাবা প্রতিটা রাত মায়ের পাশে বসে থেকে চোখের জল ফেলত। একরাতে আমি ঘুমিয়ে গেছি,বাবার আহাজারিতে সজাগ হই,ভয়ে বুক কেঁপে উঠে আমার। বাবা মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর বলছে,” জেনি আমাকে ছেড়ে যেও না।হে আল্লাহ্ আমার জেনিকে তুমি কেড়ে নিওনা।” সেই বাবাই আজ নতুন করে বিয়ে করে বউ নিয়ে আসবে? আমি মানতে পারছি না, কিছুতেই পারছি না।

সাত সকালে বাবা আমার রুমের দরজায় কড়া নাড়ে। নানা নানু রাতেই বাসায় চলে গেছেন। দাদী আমাকে অনেকবার ডাকেন আমি সাড়া দেইনি,ঘুমিয়ে গেছি ভেবে আমাকে আর কেউ ডাকেনি।

সকালবেলা বাবার ডাকে রুমের দরজা খুলে দরজায় দাঁড়িয়ে দেখি নিচে রহিমা খালা আর চাচী রান্না নিয়ে তোড়জোর করছেন। বাবা কিছু বলবে সেটা নিশ্চিত। আমার হাত ধরে ছাদে নিয়ে যায় আমায়। ছাদে মায়ের পছন্দে একটা বেঞ্চ বানানো হয়েছিল।বাবা আমাকে সেই বেঞ্চে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,” জাহিন, তুমি শুনেছো আমি তোমার জন্য নতুন মা আনতেছি?” আমি চুপ রইলাম। বাবা আমাকে বুকের কাছে টেনে শুধু বললেন, “আমাকে ভুল বুঝ না, তোমার নতুন মাকে মেনে নিতে চেষ্টা করো।” বাবার কথাতে আমি কাঁদতে শুরু করলাম। বাবা আমাকে ছাদে রেখেই নিচে চলে গেলেন।

সন্ধ্যায় একদল মুরুব্বী আর সাথে সেই মহিলা এসে হাজির হল আমাদের বাসায়। কাজী সাহেবও ছিলেন, বিয়ে পড়ানো হল। আমি ঘরের দরজা আটকে মাথার উপর বালিশ চাপা দিয়ে কাঁদছি। কখন ঘুমিয়ে গেছি তা জানিনা।

মাঝরাতে মাথায় একটা হাতের স্পর্শ পেলাম, একটা কোমল হাত। অনেকদিন এমন হাতের স্পর্শ পাইনা, তবে কি মা এসেছে আমার কাছে? মমতার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছেন আমার মাথায়। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখি সেই মহিলা, পরম মমতায় ডাকছে,”জাহিন বাবা,জাহিন বাবা।”

উনার মমতার বুলি এক সেকেন্ডেই আমার কাছে বিষ মনে হতে লাগলো। বিরক্তি লাগতে লাগলো। চোখ খুলে দেখি আমার অগোছালো রুমটা সুন্দর করে গোছগাছ করা। রাগ হচ্ছে এ মহিলার উপর,কেন উনি আমার মায়ের স্থানটা নিতে এসেছেন, কেন?

রাগ,ঘৃণা আর বিতৃষ্ণায় আমার পড়াশোনা বড্ড বেশি খারাপের দিকে চলে যাচ্ছে।আমার সপ্তম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা সামনে, স্কুল থেকে গার্ডিয়ান ডাকা হয়েছে। বাবার সময় নেই বলে ওই মহিলা আসলেন আমার স্কুলে, হেডটিচারের সাথে কথা বলে উনি বাসায় ফিরে গেলেন। রাতে বাবা উনাকে স্কুলে গার্ডিয়ান ডাকার কারন জানতে চাইলে, বাবাকে বললেন আমার পড়াশোনার খারাপ অবস্থার কথা। আমার জন্য উনি দেখে খোঁজ করে হোম টিউটর রাখলেন, হোমটিউটরদের যত্ন করতেন নিজের হাতে, রাতে আমার পাশে এসে বসে পড়ার খোঁজ নিতেন। মাঝে মাঝে পড়া ধরেন,না পারলে বুঝিয়ে দেন। বাজারে গেলে আমার জন্য পছন্দসই পোশাক কিনে আনতেন ,আমার পছন্দ হলেও ওই মহিলাকে পছন্দ করতাম না বলে পোশাকগুলো পড়তাম না।

এতকিছুর মাঝে আমি আমার মাকে এক মুহুর্তের জন্যও ভুলে যাইনি সবসময় মা আমার হৃদয়ে থাকতেন। বাসার সব দেয়ালে আবার আমার মায়ের ছবি ঝুলছে। আমি অবাক হই!

এসএসসি তে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে পাশ করলাম, আনন্দে চোখে জল চলে আসলো। আজ যদি আমার মা থাকতেন তাহলে কত খুশি হতেন! আনন্দের জোয়ারে সৎমা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমার অস্বস্তি হয়,নিজেকে ছাড়িয়ে নিই উনার থেকে। মনে কষ্ট পান উনি, আমার রুম থেকে বেরিয়ে যান দ্রুত পায়ে।

ইন্টারমেডিয়েটের ক্লাস শুরু কাল থেকে। ঢাকা কলেজে চান্স পেয়েছি, বাসা ছেড়ে চলে যেতে হবে এবার। ওই মহিলার আপত্তিতে মেসে উঠা হয়নি আমার। আমরা দুই বন্ধু এক রুমের ফ্ল্যাটে থাকবো, রান্না বান্না করে দিবে কাজের মহিলা। সব ব্যবস্থা ওই মহিলাই করেছেন। এতকিছুর মাঝে আজও আমি উনাকে মা বলে মেনে নিতে পারিনি। একদিনও মা বলে ডাকিনি, ভালওবাসতে পারিনি উনাকে।

বাসা ছেড়ে আজ প্রথমবারের মত বাহিরে থাকছি। বাবাই নিয়ে এসেছিলেন, বিকালে ফিরে গেছেন।
রাতে খেয়ে শুয়ে আছি,মায়ের মুখটা মনে পড়ছে,মায়ের মুখের পাশাপাশি আজ আরও একটা মুখ চোখে ভেসে উঠছে, কালো একটা মুখ। ফোনটা বেজে উঠেছে,এ ফোনটাও ওই মহিলাই কিনে দিয়েছিলেন, এতদিন প্রয়োজন হয়নি তাই হাতেও নিইনি। ড্রয়ারেই পড়েছিল। কল বাজছে, রিসিভ করতেই একটা মহিলা কন্ঠস্বর আমার কর্ণকুহরে পৌঁছালো, এক মায়া মাখা স্বর সেটা।

— বাবা কি করো?
—শুয়ে আছি,আপনি?
— শুয়ে আছি। খেয়েছো বাবা?
— হুম খাইছি,আপনি খাইছেন? (এ প্রথম আমি উনাকে খাবারের কথা জানতে চাইলাম)
— বাবা, তোমাকে ছাড়া ঘরটা শূন্য লাগছে, গলা দিয়ে খাবার নামছে না। তোমাকে রেখে কি করে খাই?

ঢুকরে কেঁদে উঠেন উনি ফোনের ওপাশ থেকে, উচ্চস্বরে কেঁদে চলেছেন উনি,অস্ফুট আর্তনাদ উঠে আমার বুকেও, কি বলে শান্তনা দিব উনাকে? শুধু একটা শব্দই মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “মা” আবারও বললাম মা তুমি খেয়ে নাও।

সাতসকালে ঘুম ভেঙে দেখি উনি ব্যাগপত্র গুছিয়ে চলে এসেছেন এখানে। রুমমেট আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে, তাকিয়ে দেখি আমার মা। পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরেন আমাকে। “কোনদিন মা হতে পারবো না জেনেই তোমার বাবা আমাকে তোমার মা হতে আমাকে বিয়ে করেন, আমিও মা হবার লোভে জীবনের প্রথম বিয়ের সিদ্ধান্ত নেই। সেই আমার সন্তানকে রেখে আমি একা বাসাতে থাকতে পারবো না, আমি তোমার কাছেই থাকবো আজ থেকে, বাবা। আমার সোনামানিককে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না। মমতামাখা মাতৃস্নেহে আমি সিক্ত হয়ে গেলাম, জড়িয়ে ধরলাম আমার মাকে,ভুলে গেলাম উনি যে আমার সৎমা।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত