ভালোবাসাটা হারিয়ে যায় ঘন কুয়াশার মাঝে

ভালোবাসাটা হারিয়ে যায় ঘন কুয়াশার মাঝে

ইশরা দেখলো প্রতিদিনের মতো আজও ছেলেটি সেই গাছটার পেছন থেকে অপলক ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটাকে দেখেই মেজাজ টা চরম খারাপ হয়ে যায় ইশরার। রাগে গজগজ করতে করতে ছেলেটির কাছে গিয়ে বলে,

–আপনি আজও এখানে দাঁড়িয়ে আছেন?

ছোলেটি মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।

–কি হলো কথা বলেন না কেন?আমাকে ফলো কেন করেন? প্রতিদিন দেখি এখানে দাঁড়িয়ে ভ্যাবলার মতো আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন, কেন?

ছেলেটা তবুও কিছু বলে না।

— কি হলো বোবা নাকি কথা বলতে পারেন না? ইশরা রেগেই কথাটি বললো।
— আমি আপনাকে ভালোবাসি ।

অভ্র মাথাটা নিচু করে এক দমে বলে দিলো।

— হাহাহা ভালোবাসেন! তা কতটা ভালোবাসেন জানতে পারি কি?
— অতটা ভালোবাসি, যতটা বাসলে কখনোই আপনি কষ্ট পাবেন না।
— আমার জন্য কি করতে পারবেন?
— জীবনটা মা আর বাবার দেয়া; তাই জীবনটা দেয়া ছাড়া সব করতে পারব।
— সত্যি তো?
— হ্যাঁ।

–আচ্ছা। আপনি যদি সত্যি সত্যি আমাকে ভালোবেসে থাকেন তো আল্লাহর দোহাই লাগি আর কোনদিন আমার পিছু নিয়েন না। আর কোন দিন যেন আপনাকে আমার দেখতে না হয়।

কথাটা শুনে কষ্ট পেল অভ্র। তারপর কিছু সময় চুপ থেকে বললো,

–এই ডায়রি টা রাখুন।
আর ভালো থাকবেন। নিজের খেয়াল রাখবেন কেমন? আর কাজল দিলে আপনাকে খুব সুন্দর লাগে। পারলে চোখে কাজল দিয়েন। আর এই কয়টা দিন আপনাকে খুব বিরক্ত করেছি যদি পারেন তো মাফ করে দিয়েন। শেষ বারের মতো একটা কথা বলবো রাগ করবেন না তো?

— যদি শেষ বারের মতো হয় তো রাগ করবো না।
— বড্ড ভালোবাসি আপনাকে। ভালো থাকবেন
আল্লাহ হাফেজ।
বলেই অভ্র পিছু ফিরে চলে যায়।
আর ইশরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে ভাবে,
–যাক আজ ছেলেটাকে কিছু বলতে পেরেছি।

সেই কবে থেকে শুধু ভ্যাবলার মত চেয়েই থাকতো আর মেজাজ টা জ্বলে যেত। এসব ভাবতে ভাবতেই বাসায় চলে আসে ইশরা। তারপর অভ্রর দেয়া ডায়রিটা ছুঁড়ে স্টোর রুমে ফেলে দেয়। দেবে না কেন?

অভ্রর জন্য ইশরার মনে তো করুণাও জন্ম নেয়নি। পরেরদিন ভার্সিটি থেকে আসার পথে সেই গাছটার নিচে তাকায় ইশরা। নাহ্ ছেলেটা আজ আর আসেনি। ছেলেটা আসেনি দেখে ইশরার খুব ভালো লাগে আর মনে মনে ভাবে,

যাক্ গে আপদটা আজ আর আসেনি।

তারপর খুশি মনে বাসায় চলে আসে ইশরা।

এরপর কয়েকটা দিন আর আস্তে আস্তে কয়েকটা মাস চলে যায়। ইশরা আর কখনোই সেই ছেলেটিকে ঐ গাছটার নিচে দেখেনি।

সময়ের সাথে সাথে ইশরা ছেলেটার কথা ভুলে যায়।
ভার্সিটির স্মার্ট ছেলে রাজের সাথে রিলেশনে জড়ায় ইশরা। এরপর থেকে ইশরার ভুল করেও মনে পড়ে না কেউ একজন ওকে ভালোবাসতো।

একটা একটা করে দিন চলে যায়।

ইশরার সাথে রাজের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। সাথে বাড়তে থাকে চাহিদাও। একটু ভালোবাসো কথাটি দিয়ে রিলেশন শুরু হলেও এখন আর এ’কথা খাটে না।

ঠোটের স্পর্শ, শরীরের বিভিন্ন ভাঁজে নিজেকে হারিয়ে দেয়া তখন ভালোবাসার অংশ হয়ে যায়। সব শেষে ভালোবাসার টানে ইশরা নিজের শ্রেষ্ঠ সম্পদ স্বতিত্বটাও উপহার দেয়। এরপর সম্পর্ক আগের থেকে আরও গভীর হয়। দু’জনের চাওয়া পাওয়াটা সমানুপাতিক হারে বাড়তেই থাকে। ইশরা এখন রাজকে ছাড়া কিছুই বুঝেনা। দিন যায়, একটু একটু করে এত মধুর ভালোবাসা পানসে হতে থাকে!

একটু একটু করে ইগনোর করতে করতে এক সময় ইশরার সাথে ব্রেকআপটা করেই ফেলে রাজ। কয়েকটা দিন খুব কান্না করে ইশরা। নিজেকে চার দেয়ালের মাঝে আটকে ফেলে।

হঠাৎ করেই মনের কোণে উঁকি দেয় কোন একদিন একটা ছেলে ইশরাকে দূর থেকে ভ্যাবলার মত করে দেখতো। খুব বিরক্ত লাগতো । ন্যাকামো ভেবেই হয়তো।

ও মনে মনে ভাবে,

সেদিন ছেলেটাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম। ছেলেটা যাওয়ার আগে একটা ডায়েরি দিয়েছিল। ডায়েরিটার কথা মনে পড়তেই ইশরা স্টোর রুমে চলে যায়। গিয়ে দেখে সেদিন যেভাবে ছুঁড়ে ফেলেছিল ঠিক তেমনই আছে শুধু ধুলো জমে গেছে মলাটে।

অতি যত্নে ধুলো পরিষ্কার করে ডায়েরিটা ঘরে নিয়ে আসে ইশরা। ডায়েরিটা খুলতেই ইশরার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। কেন এমন হলো তা জানেনা ইশরা।

প্রথম পাতায় একটা কাজল কালো চোখের ছবি। আর

সেখানে খুব সুন্দর করে লেখা,

জানিনা ভালোবাসা কি। জানিনা কি ভাবে ভালোবাসে। শুধু জানি আপনাকে দেখার পর থেকে আমার আপনাকে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে। আপনাকে দেখতে ভালো লাগে। তাইতো প্রতিদিন লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি। আপনাকে কাজল কালো চোখ আর খোলা চুলে ভিষণ মানায়! আপনার মুখ দেখেই বুঝি আমার তাকিয়ে থাকাতে আপনি বিরক্ত হন তবুও আমি বেহায়ার মতো এক পলক দেখতে আসি।কি করবো বলেন?

না দেখলে বড্ড খারাপ লাগে যে!

আমি সত্যি জানিনা কেমন করে ভালোবাসে।

তবে এতটুকু বলতে পারি যাকে কখনো কষ্ট দেয়া যায়না, যাকে ছাড়া ভালো থাকা যায় না তার জন্য মনের অনুভূতিটাই হয়তো ভালোবাসা।

আমার না খুব ইচ্ছা আপনাকে আপন করে নেয়ার। কথা দিচ্ছি যদি কোনদিন আপনাকে আপন করে পাই তো কখনোই কষ্ট দেবো না। খুব ভালোবাসবো খুব, খুব!

ডায়েরিতে আর কিছুই লেখা নেই। চোখ দিয়ে কেন জানি জল গড়িয়ে পড়ছে ইশরার। ইশরা ভাবে, সেদিন ছেলেটাকে না বুঝেই কত কিছু বলে দিয়েছিলাম। আমাকে ছেলেটা কত ভালোবাসতো! তাইতো শুধু আমার সুখের জন্য আর আসে নি সামনে। আমি যে মানা করেছিলাম! ইশরা বাসা থেকে বেড়িয়ে সেই গাছটার কাছে আসলো। নাহ্, ছেলেটা আজও আসেনি। ছেলেটা হয়তো আসতো। কিন্তু সে যে ভালোবাসার পরীক্ষা দিচ্ছে। তাইতো আর আসে নি।

৪ বছর পার হয়ে গেছে। ইশরা আজও সেই গাছটার কাছে আসে আর ভাবে,এই বুঝি ছেলেটা তাকিয়ে আছে! হয়তো লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছে। ইশরাও তাকায়। নাহ্, ছেলেটা আর আসে না। আর আসবেও না। সে যে পরীক্ষা দিচ্ছে। ভালোবাসার পরীক্ষা। এক বুক হতাশা নিয়ে বাড়ি ফেরে ইশরা।

এখন ইশরা উপলব্ধি করতে পারছে ছেলেটা তাকে কতটা ভালোবাসতো। যে কারণে হাসি মুখে নিজের ভালোবাসার প্রমাণ দিতে দূরে চলে গেছে।

অভ্রর মত এমন অনেক অনেক ছেলে আছে যারা শুধু একটু ভালোবাসা চায়। প্রিয় মানুষটাকে পাশে চায়, তার সুখে দুঃখে পাশে থাকতে চায়।

তবে ইশরার মত মেয়েরা এমন অভ্রকে ভ্যাবলা ভাবে, ভাবে ন্যাকামো।
মোহে পড়ে ভদ্র আর স্টাইলিশ বাজে ছেলের সাথে নিজেকে জড়ায় আর যার শেষ পরিণতি হয় নিজের জীবনটা নষ্ট করা।

যখন বুঝতে পারে পবিত্র ভালোবাসাটা হারিয়ে ফেলেছি তখন আফসোস করে। কিন্তু হায়, তখন অনেক অনেক দেরি হয়ে যায়।

ভালোবাসাটা তখন একটু একটু করে হারিয়ে যায় ঘন কুয়াশা মাঝে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত