হাড্ডির সারপ্রাইজ

হাড্ডির সারপ্রাইজ

আজ আমাকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে। আর এই বিয়েটাও আমি করছি না। কারণ আমার পছন্দের একজন মানুষ আছে। তবুই সেজে গুঁজে যেতে হয় তাদের সামনে। এর একটা কারণ হলো আমি যাকে পছন্দ করি সে। আমি জীবনে এমন একটা মানুষকে পছন্দ করেছি যার সাথে চলতে গিয়ে প্রতিনিয়তই উদ্ভট সব কাণ্ডকারখানা আমাকে দেখতে হয়।

যাকে পছন্দ করি তার নাম ‘হাড্ডি।’ এটা আমার দুই দুষ্টু ভাইবোনের দেওয়া নাম। আমিও এখন এই নামেই ডাকি। ওর সাথে সম্পর্ক হওয়ার পরে আমার ভাইবোনের সাথে ওকে পরিচয় করিয়ে দেই। সেই সাথে আমার ভাইবোন আমার পর হয়ে গেলো। প্রায়ই শুনতে হয় ওরা তিন জন মিলে এখানে ওখানে খেতে যায়। আমাকে এসে ছবি দেখায়। আমার প্রচণ্ড রাগ হয় প্রথমে। এরপরে আমার এতো ভালো লাগে যে আমার কলিজা পুরো ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ওদের এই সম্পর্কটা আমার খুব ভালো লাগে।

ভালবাসার মানুষকে যখন পরিবারের সবাই ভালবাসে সেটার চেয়ে বড় কিছু আর কিসে আছে। যদিও বাবা মা এখনো জানেন না। আমি পারতপক্ষে ওদের সাথে বের হই না। এতো ফাজলামো করে ওরা তিনটা মিলে আমি ঠিক মানিয়ে নিতে পারি না। তাই হাড্ডির সাথে দেখা করতে গেলে আলাদা হয়েই দেখা করি। ওহ যা বলতে গিয়েছিলাম সেটাই ভুলে গেছি। আমার এক কথা থেকে আরেক কথায় চলে যাওয়ার বাজে অভ্যাস আছে।

আজ আমাকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসবে। আমি সাজগোছ করছি। আর বোনটা এসে সেই তখন থেকে ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে, ‘আপু এবারের ভাগটা পুরো আমি চাই। হাড্ডি ভাইয়া আর ছোটুকে এবার দিবা না। প্লিজ আপু!’ আমি চুপচাপ চোখে কাজল আঁকতে থাকি। এই বাঁদরের দল নিয়ে আমি কোথায় যাবো। এসব হাড্ডির বুদ্ধি। আমাকে দেখতে এলে পাত্র পক্ষ আমার হাতে সব সময় টাকা গুঁজে দেয়। কেন দেয় আমি জানি না। হাড্ডি বলে, ‘তুমি হলে টাকার রাশি।’ সেই টাকা এখন হাড্ডি আর ভাইবোন ভাগ করে নেয়।

আমাকে ছেলে পক্ষ দেখতে এলেই আমার সবকিছু এলোমেলো লাগতো। হাড্ডির মাত্র পড়ালেখা শেষ হয়েছে। চাকরি পায়নি। বিয়ে করাও সম্ভব না। তাই এই ফন্দি এটেছে যেন কোন রকমে আরো এক বছর পার করি। আমার ভাইবোনকে দিয়েও আমাকে ম্যানেজ করে ফেলেছে। যেন বাবা মা যেই ছেলেকেই দেখাতে আনুক আমি যেন রাজি হই। আর আমার হাতে যে টাকা গুঁজে দেয় এসব ওরা মিলে উড়াবে। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা আমার কাছে খুব বাজে লাগতো। কেমন যেন লোভী লোভী মনে হতো। ভাবতাম এমন করাটা ঠিক হচ্ছে না। পরে ভাবলাম আমার কি। বাসায় পছন্দের কথা বললে ধরে বেঁধে বিয়ে দিয়ে দিবে যেখানে পারে। তবে এখন মজা লাগে।

আমিও সেজে সুন্দর করে ওদের সামনে যাই। আমি দেখতে ভালোই। অন্তত অপছন্দ করার মতো না। গত মাসে এক ছেলে আমাকে দেখতে এলো। ছেলে না বলে লোক বলা যায়। বাবা মা কি দেখে এমন লোক পছন্দ করলো আমি জানি না। শুধু ক্যারিয়ার ভালো হলেই কি হয়। হাড্ডি বলল, ‘তুমি টাকার রাশি। তাই টাকশাল গুলো তোমার কাছে আসে। কয়দিন হেবি লাঞ্চ করা যাবে।’ আমি বললাম, ‘মানে? কি বলতে চাও?’ হাড্ডি বলল, ‘এই লোকের সাথে দেখা করতে রেস্টুরেন্ট এ যাবে। তোমাকে তো পছন্দ করেছে। সাথে তোমার বিচ্ছু ভাইবোন দুইটা যাবে। আমি যাবো কাজিন হয়ে। আর কিছুদিন আগের মতো কোন এক ছুতো ধরে বিয়ে ভেঙ্গে দিবে।’

আমাকে আর কিছুই বলার সুযোগ দিলো না। তিন জন মিলে সব কিছু ঠিক করলো। ওরা রেস্টুরেন্টে গিয়ে যা যা পারলো অর্ডার দিলো। লোকটা শুধু বলছিলো, ‘চলুন না একটু ঐদিকের টেবিলে গিয়ে আলাদা হয়ে কিছুক্ষণ কথা বলি।’ এটা শুনে ছোটু বলল, ‘দুলাভাই বিয়ের পরে অনেক কথা বলতে পারবেন। তখন তো আর আমরা সময় পাবো না। এখন আমাদের সাথেই কথা বলেন না!’ লোকটা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘নিশ্চয় নিশ্চয়!’ আমি ছোটুর দিকে কটমট করে তাকাতে ও হাড্ডির দিকে তাকিয়ে চোখ নাচালো। এমন ভাই বোন যার আছে তার আসলে শত্রু না থাকলেও চলে।

যাই হোক। এবার যেই ছেলে দেখতে আসছে তার ছবি দেখেই আমার কেমন যেন সামনে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই। বোনটা ঘ্যানঘ্যান করে যাওয়ার পরে রুমে এলো ছোটু, ‘আপু প্লিজ এবার সব ভাগ আমাকে দিও।’ আমি বললাম, ‘এবার সব ভাগ আমার। নতুন একটা ড্রেস কিনবো। এই পর্যন্ত কত টাকা ভাগ পেয়েছিস খেয়াল আছে। এক টাকার ভাগ দিয়েছিস।’ ছোটু আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আপু তুমি হলে আমাদের টাকার কুমির। কামড় দিয়ে টাকা নিয়ে আসবে শুধু…’ বলেই ফাজিলটা আমার গাল টেনে দিলো। বললাম, ‘দূর হ ফাজিল!’ হাসতে হাসতে চলে গেলো। এই তিনটার কারণে আমার প্রতিদিনই একেকটা নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সাথে পরিচিত হতে হয়।

কলিংবেল বাজলো। ছেলে পক্ষ এসে গেছে মনে হয়। কিন্তু আজ আমার একেবারেই যেতে ইচ্ছে করছে না। মাথায় টাক পরা ছেলে আমার পছন্দ না। চুপ করে বসে আছি রুমে। কিছুক্ষণ পরে বোনটা রুমে এলো, ‘আপু বাবা মা এটা কি ছেলে এনেছে। জানি বিয়ে হবে না। তাই বলে এমন ছেলে?’ আমি জিজ্ঞাস করলাম, ‘কেন? দেখতে কি ছবির চেয়েও খারাপ?’ ও বলল, ‘নিজের চোখেই দেখো গিয়ে। আসো তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি।’

বুকটা কেন যেন আজ ধড়ফড় করে কাঁপছে। মাথা নিচু করে বোনের হাত ধরে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলাম। সবাই চুপচাপ। ছেলে আমার সামনের সোফায়। তাকাবো কিনা বুঝতে পারছি না। বুকটা কাঁপছে। ছেলের মা পাশে এসে বসলো। আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘আমার ছেলের পছন্দ আছে! এতদিনের সম্পর্ক তোমাদের আর আমি কিনা আজ দেখলাম তোমাকে। আমাকে ছবি পর্যন্ত দেখায়নি।’

কথাটা শুনে আমার সারা শরীরে একটা ঝাঁকি দিলো। মাথা উঁচু করে তাকালাম ছেলের দিকে। সারা শরীরে কাটা দিয়ে উঠলো আমার। ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রায় চিৎকার করেই বলল, ‘হাড্ডি তুমি…’ আমার পাশ থেকে ছোটু কানে ফিসফিস করে বলল, ‘আপু সারপ্রাইজ!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত