বোবা বউ

বোবা বউ

আমার মা একটু ধার্মিক লোক।মহিলা তাবলিক দলের নেত্রী। নিজের এলাকায় বয়স্ক মহিলাদের সঠিকভাবে নামাজ রোজা পড়া,দোয়া কালাম শিখানো, আবার হাদিস, কোর আন শিক্ষা দেন। তবে দূরে কোথায় ও যান না। কেউ যদি খুব অনুরোধ করেন তবেই যান অন্যথায় নয়। এ রকম কয়েক জায়গায় গিয়ে মহিলাদের মধ্যে নামাজ কালাম, দোয়া, দুরুদ,কোরআন শিক্ষার যথেষ্ট আগ্রহ দেখেছেন। এমনই এক জায়গায় তালিমে গিয়ে একটামেয়ে দেখে মায়ের খুব পছন্দ হয়েছে। মা মনে মনে সিদ্বান্ত নিয়েছেন বড় দুই ছেলে নিজেরপছন্দের মেয়েকে বউ করে ঘরে আনতে হয়েছে। কিন্তু ছোট ছেলেকে তিনি নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করাবেন। মা এই এলাকায় আরো দু,একবার তালিম করাতে এসেছিলেন। আজ তালিমের মসলিসে একটা নতুন মেয়েকে দেখতে পেলেন।বার বার মেয়েটার দিকে চোঁখ আটকে যায়। তালিম শেষে মেয়েটা দ্রুত মজলিস ছেড়ে চলে যায়।

মা মেয়েটার সাথে একটু কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েটা মাকে সে সুযোগ দিলেন না। একজনের কাছে জিজ্ঞেসকরে জানতে পারলেন, মেয়েটির নাম মমতা।মা সিদ্বান্ত নিলেন,এই মেয়েকেই আমার জন্য বউ করে ঘরে আনবেন। তালিম শেষে মেয়ের গার্ডিয়ানের সাথে কথা বললেন।গার্ডিয়ান বলতে একমাত্র বাবা।মাকে একটা দূর্ঘটনায় হারিয়েছে। সে সময় মমতা ও গাড়িতে ছিল। তবে সে প্রানে বেঁচে গেছে। সেই থেকে তার জীবনটা পুরোপুরি বদলে গেছে। মমতার বাবা আমার মাকে মমতা সম্পর্কে বিস্তারিত সব জানালেন।সবকিছু শুনে মা রাজি হয়ে গেলেন। আমাকে একবার জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করলেন না।এর অবশ্য কারন আছে।মা জানে আজ পর্যন্ত কোন কিছুতে মায়ের অবাধ্য হইনি। মায়ের সবচেয়ে বিশ্বাসের জায়গা হচ্ছে, মা অপমানিত হবে এমন কোন কাজ আমি করব না। বাড়ীতে এসে মা ভাই,ভাবী সবায়কে জানালেন নিরবের জন্য পাত্র দেখে এসেছেন। আমি পাক্কা কথা দিয়ে এসেছি এ মেয়েকেই নিরবের জন্য বউ করে আনবো। তোমরা কবে আসতে পারবা আমাকে জানালে সে অনুযায়ী বিয়ের তারিখ নির্ধারন করব।

আমি অফিস থেকে ফিরে বাসায় ঢুকবো এমন সময় মায়ের ফোন। কোন মতে দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকে জানতে চাইলাম,মা এই সময় তো সাধারণত তুমি ফোন করোনা। তোমার শরীর ভাল তো। মা বললেন, হ্যাঁ বাবা আমি ভাল আছি। তোর শরীরটা কেমন? জী আম্মা আমি ভাল আছি। শোন আগামী মাসের প্রথম শুক্রবার তোর বিয়ে। আমি পাত্রী পছন্দ করে রেখেছি।আমি কিছু বলতে যাবো, অমনি মা লাইনটা কেটে দিলেন। যা শালা! মেজাজটা গেলো বিগড়ে। মনে মনে নায়লাকে একটু পছন্দ করতে শুরু করলাম। মেয়েটা ও আমাকে পছন্দ করতে শুরু করছে।আর মা এদিকে পাত্রী দেখে বিয়ের দিনক্ষন পর্যন্ত ঠিক করে ফেলেছেন। শালা! কুরবানীর খাসী হয়ে গেলাম। তারচেয়ে বর্তমানে আমার অবস্থা আরো খারাপ।কুরবানীর খাসী ও তো দেখেশুনে পছন্দ করে কিনে আনে।আমাকে সে সুযোগ ও দিলেন না।

তবে বিশ্বাস এতোটুকু মা আমার জন্য সবচেয়ে ভালোটাই করবেন। এ জন্য টেনশন হচ্ছে না।তবে দু: খ হচ্ছে নায়লার জন্য।প্রেমটা সবে মাত্র পাতা গজাতে শুরু করলো। কিন্তু মা ভালবাসারসেই চারাগাছটা শিখর সহ উপড়ে ফেললেন। অগত্যা বাধ্য হয়ে অনুগত ছেলের মতো বাড়ীতে চলে এলাম। এসেই যা শুনলাম তাতে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। মেয়ে বোবা কথা বলতে পারে না। মা বুঝে ফেলছেন,ভাবীরা আমার কান ভারী করতেছেন। বড় ভাবীর একটা কাজিন আছে। ভাবী মনে মনে আমার জন্য তার কাজিনকে ঠিক করে রেখেছিলেন।আজ ভাবী তার মনের কথা বললেন।আমি ভাবীকে বললাম,আগে বলোনি কেন? আগে বললে, নূন্যতম প্রেমটা হয়ে গেলে আমাকে আজ বোবা মেয়েকে বিয়ে করতে হতো না। এখন তো না করার ও উপায় ও নেই। নিজের মাথার চুল একটা একটা করে ছিড়তে ইচ্ছেকরছে।

আমার মনের বেগতিক অবস্থা বুঝতে পেরে মা আমাকে নিজের রুমে ডাকলেন। বস, মা আমাকে বললেন। তারপর আমার হাতে একটা মেয়ের ফটো দিলেন। আমি নিজের অনিচ্ছা স্বত্বে ও ফটোটা হাতে নিলাম।আড়চোঁখে ফটোটার দিকে তাকালাম। একটা মেয়ে এতো সুন্দর হতে পারে।বোবা বলে হয়তো আল্লাহ এতো সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। দূর, হোক সুন্দরী।বন্ধু মহলে আমার তো প্রেসজিট থাকবে না। আমি সবার সাথে কি বলে পরিচয় করে দিব। যা হোক বন্ধু -বান্ধব,আত্মীয়স্বজনকে তেমন একটা দাওয়াত দেওয়া হয়নাই। নির্ধারিত তারিখে বিয়েটা হয়ে গেলো। আমি মন খারাপ করে বসে আছি। বউ আমার বাসর ঘরে একা একা বসে আছে।ইচ্ছা করছে বাসর ঘরে ঢুকতে।নায়লার কথা খুব মনে পড়তেছে। আমি কোন দিন সিগারেট খাইনাই।কিন্তু রাগে গোস্বায় আজ গাঁজা খাইতে ইচ্ছে করতেছে।

এদিকে মা ভাবীদের দ্বারা আমাকে রুমে ঢুকার জন্য পিড়াপীড়ি করতেছেন। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বাসর ঘরে ঢুকলাম। আমি ঘরে ঢুকার পরে মেয়েটা খাঁট থেকে নেমে আমাকে সালাম করল। আমার মধ্যে বিরক্তি ভাব চলে এলে। আমি চাইনি মেয়েটা আমাকে স্পর্শ করুক। আমি মমতাকে কিছু না বলে তোয়ালেটা হাতে নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম ফ্রেশ হওয়ার জন্য। আমি ফ্রেশ হয়ে নিচে একটা কম্বল পেতে শুয়ে পরলাম।আমার বোবা বউ খাটের উপর এতোক্ষন চুপচাপ বসে ছিল। এখন সে কাকুতি মিনতি শুরু করে দিল আমি যেন খাটে শুই। তার সাথে আমার যদি ঘুমাতে ভাল না লাগে সে নিজে নিচে ঘুমোবে।তবু ও আমি যেন খাটে ঘুমাই। মমতা অঝোরে কাঁন্না জুড়ে দিল। আমি তড়িগড়ি উঠে খাটে শুয়ে পরলাম যাতে মা বুঝতে না পারেন যে মমতা কাঁন্না করছে।

মমতা খাট থেকে নেমে জামাকাপড় চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে এসে আমার পাতা কম্বলের উপর শুয়ে পড়ল। হঠাৎ রাত চারটার দিকে গুনগুন শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো।ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি,মমতা মোবাইলের আলোতে কোরআন তেলাওয়াত করতেছে। অথচ রুমের লাইট জ্বালায়নি পাছে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি এখন না ঘুমিয়ে ঘুমের ভান ধরে রইলাম। কিছুক্ষন পর দেখি সে নামাজ পড়তেছে।বুঝলাম তাহাজ্জুূদ নামাজ।তারপর সেফ্লোরে বসে আমার পায়ের কাছে মাথা রেখে নি:শব্দে কাঁদছে। তার কয়েক ফোটা অশ্রু গাল বেয়ে আমার পায়ের উপর পড়তেই আমি টের পেলাম। আমি চুপচাপ। ফজরের আযান হচ্ছে। সে উঠে গিয়ে ওজু করে ফজর নামাজ পড়তে দাড়াল। নামাজ শেষে হাত তুলে অঝোরে চোঁখের জল ফেলছে।

আমি কখন যে আবার ঘুমিয়ে পড়েছি বলতে পারবো না। সকাল আটটায় নাস্তা করার জন্য তার ধাক্কায় আমার ঘুম ভাঙ্গলো। আমি ফ্রেশ হয়ে কিচেন ঘুরে টেবিলে বসে বুঝতে পারলাম সে আর ঘুমায়নি। সবার জন্য নাস্তা তৈরী করে আমাকে সহ বাসার সবাইকে ডেকে তুলেছে।এখন পর্যন্ত তার দিকে আমি একটু তাকাইনি। আমরা সবায় নাস্তার টেবিলে সে দাড়িয়ে সবাইকে প্লেটে নাস্তা দিচ্ছে।কাজের মেয়েটা তাকে সাহায্য করছে। আমি আড়চোখে তারদিকে তাকালাম। মমতারচোখে মুখে বিন্দুমাত্র ক্লান্তির ছাপ নেই। বেশ হাসিখুশি। প্রথমদিনের নিয়মে বেশ কয়েকদিন কেটে গেলো। আমি একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম রাত চারটার পর সে আর ঘুমায় না।কোরআন তেলাওয়াত,তাহাজ্জুূদ নামাজ, ফজর নামাজ শেষে কিচেনে ঢুকে পড়ে। দুপুরের খাবারের পর একটু ঘুমায়। আমার অফিসের ছুটি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। মা বললেন, তোমাদের সাথে আমি ঢাকায় যাবো।

বউকে নিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। বউ আর মা মিলে বাসাটাকে অন্যরকম করে সাজালেন। আমাকে বিন্দু পরিমান সাহায্য করতে হয়নি। আমার কখন কি প্রয়োজন সম্ভবত মা সব বুঝিয়ে বলে দিয়েছেন।তাই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেখানে যেটা দরকার তা পেয়ে যাচ্ছি। নিজ থেকে কিছু চাইতে হয়না। তারপরে শুধু বোবা হওয়ার জন্য তার প্রতি আমার কোন ফিলিংস কাজ করে না। একটু মায়া ও জন্মায়নি। প্রতি দিনের মতো আজকে অফিসে রওয়ানা হলাম। অফিসের কাছে রাস্তা পারাপারের সময় হঠাৎ একটা গাড়ী আমাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে চলে গেলো।আমার কাছে আমার অফিসের আইডি কার্ড দেখে লোকজন অফিসে ফোন করল। অফিসের লোকজন এসে আমাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গেলো। আমার বাসায় মাকে ফোন করে জানিয়ে দিল,আমি এক্সসিডেন্ট করে হাসপাতালে আছি। মা আর বউ হাসপাতালে চলে এলো। মাথায় মারাত্বক জখম হয়েছে।

বাঁচা মারার মাঝামাঝি অবস্থায় আমি। আমাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হলো। বউ নাকি মাকে বলে বাসায় চলে আসলো। তার এ বাসায় চলে আসাটা কেউ ভালভাবে নেয়নি। অপারেশন সফল হওয়ার পর মা বাসায় এসে দেখলো মমতা নামাজের সেজদায় পড়ে অঝোরে কাঁন্না করতেছে। মা বুঝতে পারলেন কেন মমতা হাসপাতাল থেকে বাসায় চলে এসেছে। মা মমতাকে ডাক দিলেন। মায়ের কন্ঠ শুনে সে মাকে ঝড়িয়ে ধরে কাঁদলে লাগলেন। মা বলল, ওরে পাগলি,যে মেয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে,কোনদিন তাহাজ্জুদ নামাজ বাদ যায় না তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে না। তারপর মায়ের সাথে মমতা হাসপাতালে চলে এলো। যতদিন হাসপাতালে ছিলাম একদিনের জন্য বাসায় যায়নি। আমি হলফ করে বলতে পারি, যতটা না ডাক্তারী চিকিৎসায় সুস্থ্য হয়েছি তার চেয়ে বেশী সুস্থ্যতা লাভ করেছি আল্লাহ’র কাছে তার দোয়া চাওয়াতে।

সে প্রতিদিন আমাকে শিশু বাচ্চার মতো খাইয়ে দিতো।অর্থাৎ নার্স এসে একদিন বলেই ফেলল, আমার তো আর দরকার নেই।আপনার ওয়াইফ এই পনের দিনে যে সেবাযত্ম করছে আর আল্লাহ’র কাছে আপনার সুস্থ্যতা কামনা করে কাঁন্না কাটি করছে, আপনি এমনি ভাল হয়ে যেতেন। আমি এই প্রথম ওর মুখের দিকে ভাল করে তাকালাম। মমতার কাজল কালো আঁখি দু’টি প্রথম পলকেই যে কারো দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম। হরিনীর মতো চঞ্চল। চেহারাটা একহারা গড়ন।বেশ মায়বী।যে কেউ প্রেমে পড়তে সক্ষম। অনেকে হয়তো নিজের অজান্তে তাকে ভালবেসে কল্পনার জগতে হারিয়ে যায়।কিন্তু ঐ বললাম, হরিনীর মতো চঞ্চল।কেউ তার নাগাল পায় না। অথচ সবার সঙ্গে নিত্য বসবাস।

এমন সুরভিত মায়বী মুখখানী তাকে দিয়েছে সবার চাইতে ভিন্নতা।দেখলে মনে হবে বড্ড বেশী ভালবাসা বুকের গহীনে জমিয়ে রেখেছে ভালবাসার মানুষটির জন্য। বুকের যে পাশটা খালী সেখানে তার ভালবাসার চারাগাছটা বড় যত্নে বেড়ে উঠছে। চঞ্চল,চপল, কোমলমতি একটা মেয়ে। এমন মেয়েকে ভাল না বেসে পারা যায় না। এই প্রথম আমি তাকে ভালবেসে ফেলেছি। হাতের ইশারায় তাকে আমার পাশে বসার জন্য ইঙ্গিত করলাম। সে লাজুক ভঙ্গিতে আমার পাশে বসল। আমি আলতো করে তার কপোলে একটা চুমু দিলাম। সে চোখের পানি ছেড়ে দিলো। আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। কাঁন্না তার বাঁধ ভেঙ্গে গেলো। একদিন পর হাসপাতাল থেকে বাসায় চলে এলাম। রাতে সে আগের নিয়মে নিচে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতেছে। আমি বললাম, বউ তুমি বোবা হও আর কালা হও তাতে আমার কিছু আসে যায় না।

আমি ক্যাটরিনা কাইফ, ঐশরিয়া রাই কিংবা কোন মডেল মার্কা স্ত্রী চাইনা। আমি এ জীবনে ও তোমাকে চাই,পর জনমে ও তোমাকেই চাই। তুমি বোবা বলে আমি তোমার প্রতি এতোদিন যে অন্যায় করেছি, তারর জন্য আমি লজ্জিত এবং অনুতপ্ত। মমতা তুমি আমাকে ক্ষমা করো। মমতা হঠাৎ বলে উঠল,আমি বোবা তোমাকে কে বলল।কথা না বললেই মানুষ বোবা হয়ে যায়।আমি বোবার অভিনয় করেছি।আমি চেয়েছিলাম,আমার স্বামী আমাকে আমার রূপে নয় গুনে ভালবাসুক।আমি আজ স্বার্থক।তুমি আমাকে আমার রূপে নয় গুনে ভালবেসেছো। আল্লাহ’র কাছে শুকরিয়া। আলহামদুলিল্লাহ।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত