এক্স প্রেমিক

এক্স প্রেমিক

-ছেলে কি করে মা?
-ছেলে বিসিএস ক্যাডার।কাস্টমস এ জব করে
-ওহ আচ্ছা

নিতুকে আজ পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে।ছেলে বিসিএস ক্যাডার শোনার পরেই নিতু চুপ হয়ে গেল।পাত্র হিসেবে তার বাবা মার প্রথম পছন্দ বিসিএস ক্যাডার।আর কেনোই বা হবে না? নিতু দেখতে সুন্দরী।ভালো একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী।

বাবা সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব। গাড়ি বাড়ি সবই আছে ওদের।সুতরাং নিতুর স্ট্যাটাসের সাথে বিসিএস ক্যাডারই যায়। কিন্তু তবুও তার দুই বছরের প্রেমিক রেজুয়ানের জন্য মন খারাপ হচ্ছে।বেচারা নিতুকে অনেক ভালোবাসে।কিন্তু কি আর করার রেজুয়ান পাশ করে বের হওয়ার এক দেড় বছর হয়ে গেলেও এখনও কোনো চাকুরি হয়নি।আর নিতুর বাবার একটাই কথা নিতুর জন্য নুন্যতম হলেও ছেলেকে ২য় স্কেলে জব করতে হবে।সেখানে রেজুয়ান বেকার।তাই বেকার রেজুর কথা শুধুশুধু বাবাকে বলাই হতো।এতে কোন লাভই হোত না।এজন্য রেজুয়ানের ব্যাপারটা নিতু পরিবারের সবার কাছ থেকেই গোপন রাখে।আর যেহেতু বিসিএস ক্যাডার পাত্র পাওয়া গেল সেহেতু আর কোন কিছু না ভাবাই বেটার।কপাল গুনে এমন পাত্র পাওয়া যায়।তাছাড়া নিতুর বয়সও তো আর কমহোল না।

রেজুয়ানের চাকুরির জন্য আর কয়দিনই বা অপেক্ষা করা যায়।যদিও রেজুয়ান যথেষ্ট ভালো স্টুডেন্ট ছিল কিন্তু ও নিজের লাইফ নিয়ে কেয়ারলেস।যার জন্য পড়াশোনা শেষ করার দেড় বছর পরেও এখনও কোন চাকুরি জোগাড় করতে পারে নি।যাইহোক পাত্রপক্ষ নিতুকে দেখেই পছন্দ করে ফেলল।পাত্রের সবই ঠিক আছে শুধু মাথায় চুল একটু কম।”তাতে কি? বিসিএস ক্যাডারের মাথায় একটু কম চুল থাকা দোষের কিছু না” নিতু মনে মনে ভাবল।সেদিনই নিতুর সাথে বিয়ের দিনতারিখ সবকিছু একদম ঠিকঠাক হয়ে গেল।নিতু ওই রাতেই রেজুর ফোনে মেসেজ দিল,”আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।আমার সাথে আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করো না।যদি ভাগ্যে থাকে তবে পরের জন্মে আবার দেখা হবে।আমার কিছু করার ছিল না।আই এম সরি। ভালো থেকো বাই” নিতুর বিয়ের দুইবছর পরের কথা।প্রতিদিনের মত আজ রাতেও নিতু তার মায়ের সাথে ফোনে কথা বলছে..

-জানিস নিতু আজ তোর জন্য একটা বিরাট খুশির সংবাদ আছে।
-কি সংবাদ মা?
-আরে ওইযে বলেছিলাম না? আজিজ নামের একটা ছেলের কথা? তোর মিন্টু আংকেল এই ছেলের সন্ধান দিয়েছিলেন।বিসিএস ক্যাডার প্রশাসনে জব করে আজিজ।ও আর ওর বাবা আজকে আমাদের বাসায় এসেছিল রিমিকে দেখতে।রিমিকে ওদের খুব পছন্দ হয়েছে।ওরা রিমিকে ডায়মন্ডের একটা রিং পরিয়ে গেছে।সেই সাথে আগামী মাসের দুই তারিখ বিয়ের ডেট ফিক্সড হইছে।তুই কিন্তু চারদিন আগেই চলে আসবি।

-বল কি মা।এতকিছু হয়ে গেল আমি জানতেই পারলাম না।তোমার তো ভাগ্য খুবই ভালো দুইটা জামাই পেলা দুটোই বিসিএস ক্যাডার। কিন্তু মা তোমার বড় জামাইয়ের অফিসের ব্যস্ততার কথা তো তুমি জানোই।চারদিন আগে আসতে পারব না হয়ত।দুইদিন আগে আসব।

-হুমম ঠিকই বলেছিস।আমার তো রাজকপাল।আমার দুই মেয়েজামাই বিসিএস ক্যাডার ভাবতেই ভালো লাগছে।আল্লাহ যে আমার কপালে এত সুখ রেখেছে সেটা আমি বিশ্বাস করতেইপারছি না।

-‘যাই বলিস না কেন আপু আমার জামাই কিন্তু দুলাভাইয়ের চেয়েও বেশি হ্যান্ডসাম।আর অনেক রোমান্টিক।আমরা একসাথে ঘুরে বেড়িয়েছি,মুভি দেখেছি,লং ড্রাইভেও গেছি। দুলাভাইয়ের মাথায় তো চুল নাই।কিন্তু আমার জামাই একদম ফিট।হি হি হি।এইযে দেখ আমাদের কাপল ছবি।’রিমি নিতুকে বলল।

-রাখ তোর ছবি।এখন সিরিয়ালের খুব এক্সাইটিং জায়গায় আছি।ডিস্টার্ব করিস না সর।পরে ছবি দেখবো নি।নিতু সিরিয়ালদেখতে দেখতেই রিমিকে বলল।

-তোকে আর দেখাবোই না।এইযে আমার  বিয়ের কার্ড।দুইদিন পর যখন চলে যাব তখন বুঝবি। দেখ আপু সুন্দর হয়নি কার্ডটা?? নিতু এবারও টিভির স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই বললো “হুম”
-ধুর থাক তুই তোর সিরিয়াল নিয়েই। রিমি প্রচন্ড রাগে কার্ডটা নিতুর সামনে ফেলে গাল ফুলিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল।

সিরিয়াল শেষ হবার পর নিতু ছোটবোনের বিয়ের কার্ডটা নেড়েচেড়ে দেখছিল। আসলেও অনেক সুন্দর হয়েছে কার্ডটা।আর কেনোই বা হবে না।বাড়ির ছোট মেয়েরবিয়ে বলে কথা।নিতুর বাবা বিয়েতে কোন কিছুরই কমতি রাখেননি।প্রায় পাঁচশ লোকেরকাছে কার্ড দেওয়া হয়ে গেছে।কাল বাদেপরশু রিমির গায়ে হলুদ।অতিথিরা অনেকেই আসতে শুরু করেছে।বাড়িটাও আস্তে আস্তে প্রানবন্ত হয়ে উঠছে।নিতু এগুলো ভাবছিল আর রিমির বিয়ের কার্ডটা নেড়েচেড়ে দেখছিল।হঠাত একটা জায়গায় তার চোখ আটকে গেল।পাত্রের নামের জায়গায় লেখা “মোঃ মামুনুল আজিজ রেজুয়ান” নিতু চমকে উঠল।আচ্ছা রেজুয়ান মানে কি সেই রেজুয়ান?..না না তা হবে কেন।রেজুয়ান বিসিএস ক্যাডার কিভাবে হবে।দুইটা মানুষের নাম তো একরকম হতেই পারে।আর রিমির কাছে ছবি আছে।ছবি দেখে এখনই শিওর হওয়া দরকার। তারপর নিতু রিমির কাছে আজিজের ছবি চাইল।রিমি বলল,

-জানিস আপু ওর এই নামটা আমার একদম পছন্দ না। আমি ওকে বিয়ের পর রেজু বলে ডাকব।
-হুমম ডাকিস।তুই আগে ছবি দেখা।

নিতু ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।সবগুলোই কাপল পিক।রেজুয়ান ওরফে আজিজ আর তার বোন হাসিমুখে ছবিগুলা তুলেছে।কি সুন্দর দেখাচ্ছে দুইজনকে।কিন্তু এই সুন্দর ছবিগুলা নিতুর কাছে বিষের মত মনে হচ্ছে।তার হাতগুলা কাপছে।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।সে দ্রুত তার পুরাতন বন্ধ করে রাখা সিমটা থেকে রেজুয়ানকে ফোন দিল।দুইবার রিং বাজার পর ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হলো..

-হ্যালো..রেজুয়ান বলছি।কে বলছেন?
-আমি নিতু।দেখো তুমি যেই কাজটা করছ এটা ঠিক করছো না।ও আমার ছোট বোন।ওকে তুমি ধোকা দিতে পার না।

-হাহাহা।সবাইকে নিজের মত ভাবতে হয়না মিস নিতু।আমি ওকে মোটেও ধোকা দিচ্ছি না।আর ও যে আপনার বোন এটা আমি জানতাম না।বিয়ের সবকিছু ঠিকঠাক হবার পরে জেনেছি।তখন আর আমার কিছুই করার ছিল না। আমার বাবাই আংটি পরিয়ে এসেছিলেন।

-আচ্ছা যা করার তাহলে আমিই করি? আমি ওকে সবকিছু খুলে বলছি..এ বিয়ে হতে পারে না।

-ভুলেও এটা করবেন না মিস নিতু।আপনার ছোটবোন এই অল্পকিছুদিনেই আমাকে অনেক ভালোবেসে ফেলেছে।তাই দয়া করে ওর মনটা এভাবে ভাঙবেন না দুই বছর আগে আমার মন ভেঙেছিলেন তখন আমার কাছে কিছুই ছিল না সেজন্য আমি কিছু বলতেও পারিনি।কিন্তু এখন আমার কাছে সব আছে।তাই দয়া করে এই ভুলটা দ্বিতীয় বার করবেন না।এবার আমি চুপ করে থাকব না।আর তাছাড়া আমি রিমিকে আমার এক্সের বোন হিসেবে বিয়ে করছি না।আমি ওকে বিয়ে করছি একজন সচিবের মেয়ে হিসেবে।আর আমাকে আপনার ফ্যামিলি থেকেই প্রথমে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।আই থিংক একজন বিসিএস ক্যাডারের সাথে একটা সচিবের মেয়ের বিয়ে হতেই পারে।এটা আমার স্ট্যাটাসের সাথে যায়।কি বলেন?? এতে অন্য কোন বিসিএস ক্যাডারের বউ কি ভাবল না ভাবল সেটা আমার দেখার বিষয় না।আশা করি ব্যাপারটা বুঝাতে পেরেছি আপামনি।

এখন রাখি বিয়ের দিন দেখা হবে..বাই নিতু চুপচাপ ফোন হাতে নিতে দাড়িয়ে আছে। সে কি করবে বুঝতে পারছিল না।দুর থেকে পটকার আওয়াজ আসছে।পুরো বাড়িটা লাইটিং এর আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।নিতু চেয়েছিল রেজুয়ানের সাথে তার পরের জন্মে দেখা হবে।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এজন্মেই রেজুয়ানের সাথে তার দেখা হয়ে গেল।আর সেটা তার এক্স প্রেমিক হিসেবে নয়,ছোটবোনের জামাই হিসেবে!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত