রোদেলা আকাশ

রোদেলা আকাশ

“হ্যালো মিস্টার সকালের কথা ভুলে গেছেন”রোদেলার কথা শুনে একলাফে বিছানা থেকে উঠে গেলো আকাশ।চশমাটা চোখে দিতে দিতে বলতে লাগল,”সকাল!কোন সকাল!কি হয়েছে?”আকাশের কথাটা শুনে হাসতে হাসতে বিছানার উপর গড়াগড়ি খেতে লাগল রোদেলা।আকাশের এই একটা রোগ,সব কিছুকেই সিরিয়াসলি নিবে,একটা কথা বললেই সেটার অর্থ খোজার চেষ্টা করবে,কেউ কথাটা কেনো বলল…হোক সেটা মজা,আকাশ যেন সেটা বুঝতেই পারেনা।তার কথা হচ্ছে যে ,”প্রতিটি কথারই একটা অর্থ থাকা উচিৎ। যে কথার কোনো মানে নেই,সে কথা কেউ বলবে কেনো!মানুষের কথা খুব মুল্যবান একটা জিনিস।

যখনতখন যাকে তাকে যা খুশি বলা উচিৎ নয়। হতে পারে মানুষটা তখন সেই ধরনের কথা শোনার জন্য প্রস্তুত নয়,হতে পারে কথাটা তার ভালো নাও লাগতে পারে,সে কস্টও পেতে পারে।”তাই কাউকে হুটহাট কষ্ট দেওয়াটা আকাশের একদম পছন্দ নয়। কিন্তু রোদেলা ঠিক তার উল্টো স্বভাবের একটা মেয়ে,বিয়ের এক বছরের মতো হয়ে গেলো ,অথচ আকাশ রোদেলার এই স্বভাবের সাথে যেন পরিচিতই হতে পারেনি। রোদেলার মজা করতে ভালো লাগে,আর আকাশ সেটা সিরিয়াসলি নিয়ে নেয়। যদিও আকাশ মাঝে মাঝে এতোটা সিরিয়াস হয়ে যায় , রেগেও যায় খুব রোদেলার উপর। অবশ্য রোদেলার ভালই লাগে আকাশকে রাগাতে। কিন্তু আকাশ রেগে গেলেই রোদেলার মুখটা ভয়ে একদম চুপসে যায়। একটা কথাও বলেনা তখন ,চুপচাপ আকাশ যা বলে তাই শোনে।

বিয়ের সময়তো আকাশ রোদেলার সাথে একা কথা বলতে চেয়েছিল,কিন্তু রোদেলা ওর ছোট ভাইকে পাশে রেখেছিল। আকাশ রোদেলাকে বলেই নিয়েছিল যে তার সাথে কোনো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে মজা করা যাবেনা। কথাটা শুনে রোদেলাতো তখন হেসেই যাচ্ছিল ।আকাশ যেন সেদিন সেই হাসিটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল,তাই অপলক তাকিয়ে ছিলো আর আনমনে রোদেলার হাসি দেখছিলো। হঠাত রোদেলার চোখ পরে আকাশের দিকে ওর ও হাসিটা থামিয়ে নিচের দিকে তাকায়, লজ্জা পেয়ে যায় মেয়েটা। সেদিন যদিও আকাশের সামনে বেশি কথা বলতে পারেনি,তবে তার এই আবদারটা শুনে রোদেলা বলেই দিয়েছিল যে ,”শোনেন,আমাকে যদি বলেন যে দিনে একবার খেতে দিবেন না,মেনে নিলেও চুপ করে থাকাটা মেনে নিতে পারব না।

কথা আমার প্রাণ, কথার মাঝেই যেন আমি আমাকে খুজে পাই, কথা না বলে আমি থাকতেই পারব না। “ও আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ও দেখতে পায় যে আকাশ ওর দিকে তাকিয়েই আছে। আকাশ রোদেলার সব কথা শুনছিলো আর যেন বলতে চাচ্ছিল, “তুমি বলে যাও ,আমি যে তোমার সব কথা শোনার জন্য প্রস্তুত” কিন্তু বলতে পারেনি। রোদেলাও কেমন লজ্জা পেয়ে গেছিলো সেদিন। কিন্তু পরে রোদেলা ঠিকই বলে দিয়েছিল যে এই গোমড়া মুখো ছেলেটাকে ও বিয়ে করতে পারবে না। কিন্তু আকাশের রোদেলাকে একটু বেশিই পছন্দ হয়ে গেছিল কিনা,রোদেলাকে দেখার পরেও ওর পরিবার থেকে অনেক মেয়ে দেখায়। যদিও আকাশের রোদেলাই চাই, কিন্তু ওর পরিবারের সবাই বলেছিলো যে ,”রোদেলা মেয়েটার ভাব বেশি ,এতো ভালো একটা ছেলেকে সাধারণ একটা বিষয়ের জন্য না করে দিলো! কেমন মেয়েরে বাবা।”

কিন্তু আকাশ ব্যাপারটাকে খুব সহজভাবেই নিয়েছিলো। কারণ রোদেলা ঠিকই বলেছে, একটা মেয়ে যেমন পরিবারেই জন্ম নিক,স্বাধীনভাবেই বেড়ে ওঠে,আর বিয়ের পর তার নতুন জীবন শুরু হয়, সেখানে যদি নিজের সব ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে গলা টিপে হত্যাই করে দিবে তাহলে সে কি নিয়ে বাচবে!! সারাটা জীবন কি অন্যের পছন্দতেই চলবে !!হ্যা বিয়ের পর একটু কম্প্রোমাইজ করতে হবে,কিন্তু তাই বলে কি পুরোটাই মেয়েটাকেই করতে হবে নাকি!! ছেলেটাওতো বিয়ে করে,তাহলে তাকেওতো কিছুটা কম্প্রোমাইজ করতেই হবে। রোদেলা যদি আকাশের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যেত যে ,ও বেশি কথা বলবে না তাহলে হয়ত সারাজীবন নিজের কাছে অপরাধী হয়েই থাকতে হতো, আকাশ হয়ত অতোটাও কঠোর নয় তবুও মেয়েটা ওকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে। আর এটাই ওর পরিবার মেনে নিতে পারছে না যে, বিয়ের আগে একটা ছেলে যে কথাটা বলেছে ,মেয়েটা ঐ কথাটা মানতে পারবে না জেনেও তাকে কেনো বউ করে আনবে!

কিন্তু শেষ অব্দি যখন আকাশের আর কোনো মেয়েই পছন্দ হচ্ছিল না, তখন সবাই আকাশের মনের অবস্থাটা বুঝতে পারল। আর আবার রোদেলাদের বাসায় বলল যে, রোদেলা তার ইচ্ছেমতই কথা বলতে পারবে। রোদেলা অবশ্য বেশি অবাক হয়নি সেদিন, আর না ও করেনি, হয়ত রোদেলাও আকাশকে পছন্দ করে ফেলেছে।

বিয়ের রাতে অবশ্য রোদেলা চুপ করে ছিলো, নতুন বাসা বলে কথা। কিন্তু পরের দিন রোদেলাদের বাসায় গিয়ে আকাশ আর রোদেলাকে খুজেই পাচ্ছিলো না, কাউকে জিজ্ঞেস করবে তারও সাহস পাচ্ছিলো না। পরে জানতে পারে যে রোদেলা বাসায় নেই, কোনো এক মহিলার সাথে দেখা করতে গেছে। আকাশ সেদিন খুব রেগে গেছিলো, ওদের বাসা থেকে কয়েকজন এসেছিলো, তারাতো নানা কথা বলতে লাগল, নতুন বউ এখন থেকেই নিজের স্বাধীন মতো চলছে। পরে কি হবে কথাগুলো শুনে আকাশের মেজাজটা প্রচুর খারাপ হয়ে যায়, ও রোদেলার ছোট ভাইয়ের সাথে সেই বাসায় যায়। গিয়ে দেখে অনেক পুরাতন একটা বাসা, তেমন একটা পরিষ্কার নয়, কেমন জঙ্গল টাইপের হয়ে আছে, আসলে ওটা ছিল রোদেলার নানির বাসা। উনি খুব অসুস্থ, আর একাই থাকেন ঐ বাসায়, একটা কাজের মেয়ে থাকে যে ওর নানিকে দেখাশুনা করে। রোদেলা ওর নানিকে খুব ভালবাসে ,ওর নানি অসুস্থ থাকায় ওর বিয়েতে যেতে পারেনি, তাই রোদেলাই ওর নানিকে দেখতে গেছিল, যদিও আকাশকে নিয়ে যাওয়া উচিৎ ছিলো, কিন্তু রোদেলা ভয়ে আকাশকে কিছু বলেনি। সেদিন হঠাত করে আকাশকে দেখে রোদেলা ভয় পেয়ে গেছিলো…

_আসলে আমি আপনাকে বলতে…
_থাক,আর কিছু বলতে হবেনা,তোমার ভাইয়ের থেকে সব শুনেছি।আমাকে নিয়ে আসতে পারলে না, আমি কি তোমার কেউ নই?

_না আসলে আমি ভেবেছিলাম যে… আপনি হয়ত আসবেন না। তাই
_আসলামতো। নেক্সট একা একা কোথাও যাবেনা। এখন আর আমি বা তুমি বলে কিছু নেই, এখন থেকে আমরা।
_হুম।

সেদিন আকাশ ভেবেছিল যে মেয়েটা হয়ত তাকে ভয় পেয়ে কম কথা বলে। কিন্তু এখন হাড়েহাড়ে বুঝতে পারে যে, রোদেলা কেমন চুপচাপ।

ভাবনার জগত থেকে ফিরে এলো আকাশ রোদেলার হাসির শব্দে…

_এই এতো হাসছো কেনো? সকাল কে?
_আপনার বউ…

_ওহ আচ্ছা, আজকেই সকাল নামের একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে আসব।তুমি বাপের বাড়ি চলে যাও।
রোদেলা জানে আকাশ কখনো মজা করেনা,সব সময় সিরিয়াস কথা বলে, তাই ও খুব রাগ করে।

_কিহ! আপনি আবার বিয়ে করবেন। আমি এক্ষুণি চলে যাচ্ছি। থাকেন আপনি আপনার বউ নিয়ে
বলেই রাগ করে রোদেলা রুম থেকে বের হয়ে গেলো।

আকাশ রোদেলাকে ঝুজতে খুজতে দেখে ও ছাদে গিয়ে কান্না করছে।আকাশ পাশে গিয়ে বসে চোখের পানিগুলো মুছে দিতে লাগল। রোদেলা সরে বসল।

_আপনি এখানে এসেছেন কেনো আমি এক্ষুণি চলে যাচ্ছি।
_আমাকেওতো নিয়ে যেতে বলেছেন আমার শশুরমশাই, ভুলে গেলে সকাল সকাল
এইবার রোদেলা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলতে লাগল…

_আপনি আমার সাথে মজা করছেন কেনো!
_বাহ! তুমি যে সব সময় আমার সাথে মজা করো,সেটার শোধ নেওয়া শুরু করে দিয়েছি। সাবধান।
বলেই দুইজন হাসতে লাগল।হয়ত এই হাসির শেষ হবেনা বা হবে জীবনের কোনো এক মুহুর্তে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত