পরম্পরা

পরম্পরা

আমার প্রেমিকা জুমু আমার হাত তার ছোটবোন জিতু এর হাতের সাথে মিলিয়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘শুনে রাখ জিতু, আমার ভালোবাসা আমি তোর হাতে তুলে দিলাম। তুই কখনোই হিমুকে এক তিল পরিমাণ কষ্ট পেতে দিবিনা। তোর সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে ওকে আগলে রাখবি। আমি চাই তোরা দুজনে খুব সুখে থাক’ জুমু চোখের জল মুছতে মুছতে আরো বলতে লাগলো, ‘হিমুরে, আমি তোকে খুব ভালোবাসতাম, কিন্তু তোকে পাওয়াতো আমার ভাগ্যে নেই। আমি জানি তুই খুব কষ্ট পাবি, প্লিজ নিজেকে কন্ট্রোল করে জেএসসি পরীক্ষা টা ভালোমতো দিস। আর জিতুকে দেখেশুনে রাখিস। জিতু খুব লক্ষী একটা মেয়ে। আমার অভাব জিতু তোকে টেরই পেতে দিবেনা’ কথাটা বলেই জুমু দৌড়ে চলে গেল। আমার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগলো, জিতু আমার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো, ‘আমি আছিতো হিমু, প্লিজ তুমি কেঁদোনা’

জুমু আমার ক্লাসমেট, আর একমাস পরই আমাদের জেএসসি পরীক্ষা। প্রাইমারী স্কুল থেকেই আমরা দুজনে বেস্টফ্রেন্ড। এই বছরের ভালোবাসা দিবসের দিন জুমু আমাকে একটা কিটকাট চকোলেট দিয়ে প্রপোজ করে এইভাবে, ‘হিমু তোকে এখন একটা কথা বলবো, তুই রাজি না হলে কিন্তু তোর মাথা ফাটিয়ে দিবো। এই যে চকোলেট দেখছিস? এটা তোর জন্য, তুইতো জানিস এই চকোলেট আমার কতো প্রিয়? কিন্তু তুই এটা জানিসনা, এই চকোলেট এর চাইতে তুই আমার কাছে আরও বেশী প্রিয়। আমি তোকে খুব ভালোবাসি হিমু। আমি চাই তুইও আমাকে ভালোবাসবি’ জুমু এর কথায় আমি সেদিন না করতে পারিনি। জুমুরা হচ্ছে চারবোন, ‘জুমু, জিতু, জুহি, জুসি’ আর জুমু’র বাবা এলাকার চেয়ারম্যান। হঠাৎ করেই উনি জুমুর বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। জুমু ওর বাবাকে এতোটাই ভয় পায় যে সাহস করে বাবাকে কিছু বলতে পারেনি। আর আমাকেও বলতে দেইনি।

দুইবছর পর আজ আমাকে ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছে হিমু। আংটি ও পরিয়ে দিয়ে গেছে। তুমিতো জানোই আমার বাবা কেমন? আমি কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিনা। আমি চাইনা তুমি কষ্টে  থাকো জিতু অনর্গল কথা বলেই যাচ্ছে, তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘চলোনা আমরা পালিয়ে যাই?’ জিতু চোখ বড় করে বললো, ‘তুমি কি আমার বাবাকে চেনোনা? পালিয়ে বাঁচতে পারবে?

আর এখন তোমার এসএসসি পরীক্ষা চলছে, আমি চাইনা তোমার এতো বড় একটা ক্ষতি হোক’ একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জিতুর ছোটবোন জুহিকে জিতু ডাক দিয়ে বললো, ‘এই জুহি এইদিকে আয়’ জুহি কাছে আসার পর, জিতু আমার হাতে জুহির হাত মিলিয়ে বললো, ‘আমার ভালোবাসাকে আমি তোর হাতে রেখে গেলাম জুহি। তুই ওর খেয়াল রাখিস, ওকে কখনো কষ্ট পেতে দিসনা। ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখিস’ জিতু চোখের জল, নাকের জল এক করে আরও বললো, ‘আর হিমু তুমিও শুনে রাখো, জুহি আমার খুব আদরের ছোটবোন। ওকে ছেড়ে যেওনা কখনো’ কথাটা বলেই জিতু দৌড়াতে লাগলো। আর জুহি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘আমি তোমাকে জিতু আপুর চাইতেও বেশী ভালোবাসবো, তুমি একটুও কষ্ট পেওনা। আরও দুইবছর পর ‘আব্বু আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে হিমু, আর পাঁচদিন পরই তোমার এইচএসসি পরীক্ষা। জানি, এই সময়ে এমন একটা সংবাদ তোমার জন্য কতোটা কষ্টদায়ক হবে। কিন্তু কি করার বলো? বাস্তবতা আমাদের মেনে নিতেই হবে।’ কথাটা বলেই জুহি কাঁদতে লাগলো।

কাঁদতে কাঁদতে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার ছোটবোন জুসিকে বললো, ‘আমার হিমুকে আমি তোর কাছে রেখে গেলাম জুসি। হিমু আমার হয়নিতো কি হয়েছে? আমি চাই হিমু তোর হোক’ কথাটা বলেই জুহি দৌড়ে চলে গেল। আর জুসি আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘মন খারাপ করোনা হিমু আমিতো আছি’ আরও সাতবছর পর তিন মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার পর আমার প্রেমিকাদের বাবা চেয়ারম্যান সাহেবের মাথা সুবুদ্ধির উদয় হইছে। জুসি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। তবুও এখনো বিয়ের নাম মুখে আনছেনা। আমিও গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে অতিকষ্টে একটা জব পেয়েছি। আজ দুইমাস হলো জব করছি। ভাবছি কিছুদিন পরই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবো জুসি’র বাবার কাছে।

হঠাৎই সেদিন জুসি আমাকে কল দিয়ে বললো,’তোমার সাথে জরুরী কথা আছে, আমাদের বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আসো’ আমার বুকে ধুকপুকানি শুরু হলো। ওই পুকুর পাড়েই আমার তিন সম্পর্কের শেষ এবং শুরু হয়েছিল। ‘আমার আব্বু এর বন্ধুর ছেলে বিদেশে থাকতো, আর এই কারনেই এতোদিন আমার বিয়ে দেইনি। আমিতো সেটা জানতামনা। গতকাল ওই ছেলে দেশে আসার পরই আব্বু বলছে। আমি আব্বুকে সরাসরি বলে দিয়েছি আমি ওই ছেলেকে বিয়ে করতে পারবোনা। কিন্তু আব্বু বলছে, আমি যদি ওই ছেলেকে বিয়ে না করি? তাহলে আমাকে ত্যাজ্য করে দিবে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আব্বুর কথার বিরুদ্ধে আমি যেতে পারবোনা। আমি ওই ছেলেকেই বিয়ে করবো।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে একটু থেমে জুসি আবার বললো, ‘তোমাকে একটা কথা বলবো, রাখবেতো হিমু? প্লিজ হিমু কথাটা রেখো।

তুমি আরেকটা প্রেম করো হিমু। দেখবে আমাকে খুব সহজে ভুলতে পারবে।’ আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, ‘আমি পারবোনা আর প্রেম করতে। তোমাকে আমি কোনোভাবেই ভুলতে পারবোনা। আমি আজই আত্মহত্যা করবো’ জুসি আমার চোখের জল মুছে দিতে দিতে বললো, ‘তুমি এমন কথা বলোনা হিমু। কয়েকটা মিনিট তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি এক্ষুনি বাড়ি থেকে আসছি’ আমি ভাবছি জুসি হয়তো পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু তা না, জুসি তার সাথে করে একটা দশ-এগারো বছর বয়সের মেয়েকে নিয়ে এসে বললো, ‘এ হচ্ছে জোনাকি, জুমু আপুর মেয়ে। দেখছো? কত্তো কিউট না ও? তোমার সাথে ওকে খুব মানাবে। প্লিজ হিমু, তুমি ওকে মেনে নাও। দেখবে ও তোমাকে খুব হ্যাপি রাখবে’ জুসি কথাটা বলেই দৌড়ে চলে গেল। আর জোনাকি চুপ করে লজ্জা মুখ করে রইলো। এই প্রথম আমি কারো চোখে মুখে লজ্জা টের পেলাম। আমার খুব মায়া জন্মে গেল জোনাকির প্রতি।

আরও চারবছর পর আমি আর জোনাকির আজ বিয়ে আমার শাশুড়ি আর তিন খালা শাশুড়ি আমাকে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বললো, ‘আমাদের মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। তুমি ওকে তোমার ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখো। কখনও ওকে কষ্ট পেতে দিওনা’ আমি বুঝতেই পারিনি এই চোখের জল কি আমার জন্য? নাকি জোনাকির জন্য?

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত