পরিচয়

পরিচয়

জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছি। এই পৃথিবীতে আর নেই কোন বাকী। পৃথিবীর সাথে নেই কোন আড়ি। পৃথিবীর মাঝে নেই কোন পিছুটান। শুধু আছে একটাই আরজি; ঐ আকাশে ছোট্ট একটা বাড়ি। কিন্তু ভয় হয় খুব ভয়। যদি বাড়িটা সুখের না হয়ে দুঃখের হয়? তাহলে কিভাবে কাটবে আমার পরকাল? কিভাবে যাবে আমার অসীম কাল?

বুকের ভিতর আগুন জ্বলে, চোখের কোণে জল। বাকীটা পথ কিভাবে শেষ হবে? জানে না আমার মন। রাতের আঁধারে একা হাঁটি, একা চলি, থাকে সাথে চাঁদ তাঁরা জোনাকি। আমাকে দেখে কেউ হাসে, কেউ পাগল বলে, কেউ গালি দিয়ে যায় চলে। আমি অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকি আর মুচকি মুচকি হাসি। কেউ হাসতে পারে না এই হাসি।

রাতটাকে আমার খুব ভালো লাগে। কেন লাগে জানেন? বাসায় কাঁদতে পারি না, যদি বাবা-মা দেখে ফেলে? কোন প্রশ্ন করে বসে? তাই এই নির্জনতায় আমি আমার মত করে কাঁদি। কেউ দেখতে আসে না, কেউ বুঝতেও পারে না।

আমি আগে কাঁদতাম না। জানেন কখন থেকে এই কান্না শুরু হয়েছে? আমার এই কান্না এক বছর পূর্ব থেকে শুরু হয়েছে। একদিন বাবা মার কিছু কথা কানে আসছিল। আমাকে নিয়ে তারা কথা বলছিল। আমি কান দিয়েও কান দেইনি; আমাকে নিয়ে তারা কত কথাই তো বলতে পারে! হঠাৎ একটা কথা শুনে আমি কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলি। আমি বোবা হয়ে যায়। বাবা মা এসব কি বলছেন? মা বলছিলেন, ‘আসতে কথা বলেন। দেয়ালেরো কান আছে।’ বাবা বলছিলেন, ‘কে শোনবে শুনি? তাওহীদ তো বাহিরে, সেতো এখন বাসায় নেই। সে যে আমাদের সন্তান না। এই কথা তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ জানে না, এবং জানবেও না। এটা আস্তে বলার কি আছে?’

কিন্তু যে শুনবে যা শুনবে সব তো শুনেই ফেলেছে। আমি যে এসেছি তাঁরা লক্ষ্য করেনি। আমি কি করব কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। আমি তাদের সন্তান নই? এই সত্যটা এতোদিন গোপন করেছিল? আমার মনে হচ্ছে আমি কষ্ট পাচ্ছি খুব কষ্ট। চিৎকার করে কাঁদতে চাচ্ছিলাম কিন্তু পারছিলাম না। মনে মনে বার বার বলছিলাম, ‘বলো আমি তোমাদের সন্তান।’ কিন্তু আমার মস্তিষ্ক বার বার বলছিল, তুই তাদের সন্তান না? তুই তাদের সন্তান না? তুই তাদের সন্তান না?

মা বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। ‘তাওহীদ আমাদের সন্তান না, এই কথা মুখেও নিবেন না। জন্ম দিলেই শুধু মা হওয়া যায়? জন্ম না দিলে মা হওয়া যায় না? বাবা কিছু বলতে পারছিলেন না। মাকে থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছিলেন। ছেলের সাথে রক্তের সম্পর্ক নেই। অথচ ছেলে কষ্ট পাবে বলে নিজে কষ্ট পাচ্ছেন এবং কেঁদে চলেছেন। মনে মনে বলি এটাই মা? এটাই মায়ের ভালোবাসা?

এদিন এরপর থেকে আড়ালে কাঁদি নীরবে চোখের জল ফেলি। তাদের সামনে হাসার অভিনয় করি। এখনও তারা জানে না, আমি যে জেনে ফেলেছি। এবং কোনদিন জানতেও দিবো না। আমি চাই না আর তারা আমার জন্য কষ্ট পাক।

খোকা, খোকা, এই খোকা, কান্না করিস না বাবা আমার। তুই কোন রাস্তার ছেলে না। তুই কোন অপবিত্র ভালোবাসার ফসলও না। তোর পরিচয় আছে। তুই আমাদের সন্তান। আমাদের খোকা। আমি আর তোর একদিন ঘুরতে বের হয়েছিলাম। এক্সিডেন্টে আমি আর তোর বাবা না ফেরার দেশে পাড়ি জমাই। তোর বংশের নাম তোর বাবার নাম  তোর মায়ের নাম। একটা নামও আমি ঠিকমত শুনতে পাইনি। ঘুম থেকে জেগে উঠে মা মা বলে চিৎকার করতে থাকি। রুমটা থাকে নীরব নিঃস্তব্ধ অন্ধকারে ঢাকা। কোথাও কেউ নেই। আমি শুধু তাকিয়ে থাকি। অবচেতন মনে প্রশ্ন জাগে, আমার কি পরিচয় আছে? নাকি নেই? কে আমি? উত্তর জানা নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে।

আমি না ছিলাম হাতির বাচ্চা, না ছিলাম হরিণের বাচ্চা। আমি ছিলাম চিকনা। আমি না ছিলাম নৌকার আলকাতরা, না ছিলাম ধব ধবে সাদা। আবার না স্যামলা। তাহলে আমি কেমন ছিলাম থাকুক না অজানা।আমার মানুষকে আকৃষ্ট করার একটা ক্ষমতা ছিল। আমার চোখ দুটি নীল ছিল। যে আমার দিকে একবার তাকাতো, দ্বিতীয় বার আবার তাকালো। ছোট বড় সকলে চোখের প্রেমে পড়তো।

একটা মেয়ে আমার চোখের প্রেমে পড়ে। এবং সেই মেয়ে আমার জীবনে প্রথম প্রেম হয়ে আসে। আমার মতই চিকন ছিল। তার দীঘল কালো চুল ছিল। কাজল কালো চোখ ছিল। মুক্ত মাখা হাসি। এসবের মায়ায় আমিও ফেঁসে যাই। ভালো বাসায় ভালোবেসে দিনগুলি ভালো যাচ্ছিল।

একদিন মজা করে বাবা মার কথাটা তাকে বলি, ‘ যদি শোন আমি পালক ছেলে তখনও কি আমায় ভালোবাসবে? নাকি দূরে ঠেলে দিবে? তার তাকানোটা কেমন যেন ছিল। আমার ভিতরটা হাহাকার করে ওঠে। কেন আমার এমন হলো বুঝতে পারিনি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি এটাই শেষ কথা। এরপর আর কিছু শোনতে চাইনা আমি।’ আমি শুধু তাকে নয়ন ভরে দেখছিলাম।মনে মনে বলি আমি তো জানি কে আমি? হঠাৎ গায়ে কাঁটা দেয়।

তারপর সেদিনটা আসে। যেদিন টায় তার আমার ছাড়াছাড়ি হয়। আমি তাকে বলি, ‘আজ তোমাকে একটা সত্য কথা বলব। আমার কোন পরিচয় নেই। তারা আমাকে রাস্তায় পেয়েছিল।’ আমার প্রিয়তমা বলে, ‘মজা করো না।’ আমি বলেছিলাম, ‘সত্যি বলছি।’ প্রিয়তমার মুখটা কেমন শুকনো হয়ে যায়। শুধু আমাকে কেমন করে দেখছিল। আমি মনে মনে বলি, ‘কি আমাকে আবেগে ভালোবেসে ছিলে বিবেকে না? নীল নয়নের প্রেমে পড়ে কি হবে? যদি পরিচয় না মিলে? তাই না প্রিয়তমা?’ আমি মুচকি মুচকি হাসি। পৃথিবীটায় এমন। ভালোবাসা চাইলে ভালোবাসা পাওয়া যায় না। ভালোবাসা না চাইলে ভালোবাসা ফুরাবে না।

ডাইরির পৃষ্ঠায় আর কোন লেখা নেই। শুধু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শূন্য পাতা। মেয়েটা অবাক চোখে ডাইরির পাতায় তাকিয়ে আছে। মনে শুধু একটায় প্রশ্ন শেষ পরিণতি কী হয়েছে? ডাইরির একটা পৃষ্ঠায় লেখা ছিল, “ভালো বেসেছি ভালো বেসে যাব মৃত্যু পর্যন্ত ভালোয় বাসবো।” এই কথাটা কে বলেছিল? বার বার তাকে মনটা প্রশ্ন করে যায়। কিন্তু উত্তর পায় না। বিষন্ন মনে মেয়েটা শূন্য ডাইরির পাতায় তাকিয়েই থাকে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত