সুপ্ত প্রেম

সুপ্ত প্রেম

-তোমার হাতটা একটু ধরি ? (নিধি) কাউকে চরমভাবে অবহেলা করার পরো যদি বারবার কেউ কাছে ঘেসতে থাকে তখন বিরক্তির অন্ত থাকে না।নিধি মেয়েটাকে সেই কলেজ লাইফ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তিব্র ভাবে এড়িয়ে চলছি।তবুও আমার পিছু ছারছে না। অপমানও করেছি অনেকবার তবু কোনকিছুতেই কোন লাভ হয় নি। বিকাল পাঁচটার দিকে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলাম ঠিক সেই সময় লক্ষ করলামনিধি কোথা থেকে যেন আমার পাশাপাশি হাটতে শুরু করেছে।শুধু হাটছেই না আবার হাত ধরে হাটতে চাইছে।স্বভাবতই একটু বিরক্তির রেখা ফূটে উঠলো মুখে।  কিছু না বলেই সোজা হাটা দিলাম।তবুও পিছু ছারবে না জানি।ঠিকি কিছুক্ষন পর আবার পাশাপাশি হাটা শুরু করে দিল।

আমার বাসার গলিটার আরেকটু এগিয়েই নিধির বাসা।তাই বাড়ি পর্যন্ত একসাথে যেতে হবে। নিধি দেখতে অসম্ভব সুন্দরি আর কিছুটা চঞ্চল প্রকৃতির।ঝটপট করে একটা কাজ করে বসবে কেও সেটা আগে থেকে বুঝতেও পারবে না।এইসব স্বভাবের জন্যই হয়তো ওকে দেখতে পারি না।অবশ্য আরেকটা কারনও হতে পারে। নিধি ছোট থেকেই লেখা পড়ায় ভাল।শুধু ভাল না এককথায় প্রচন্ড মেধাবি।ছোট থেকেই স্কুল এমনকি কলেজেও ফাস্ট হয়ে বসে থাকতো।যদিও আমার সন্দেহ হত ও পড়ে কখন সারাক্ষন তো আমার পিছনেই লেগে থাকে।তবুও প্রতি পরীক্ষায় ও প্রথম হবেই।মা ছোট থেকেই ওকে দেখিয়ে বলতো”দেখ নিধি কত মেধাবি প্রতি ক্লাসে প্রথম হয় আর তুইতো খাওয়া আর ঘুম ছারা কিছুই পারিস না।” হয়তো একটু হিংসে করতাম ওকে যদিও হিংসেটা মেয়েদের গুন। বাড়ির গেটের কাছাকাছি আসতেই নিধি বলে উঠলো

-বিকালে কি তোমার একটু সময় হবে?? আমি বেশ বিরক্তির সাথেই উত্তরদিলাম
-না বিকালে কাজ আছে।
মেয়েটাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলাম। ওর সঙ্গ কেন যেন আমার ভালোলাগে না।আবশ্য ওর সাথে বের হইনি কখনো।তবু বুঝতে পারি ওর সঙ্গ আমার কাছে বিরক্তির কারন। বিকালে তেমন কোন কাজ নেই।কিছু টানা পুরোটা মিত্য বলেছি নিধিকে।বরংবিকালের সময়টা বেশ অসহ্য লাগেকাটতে চায় না সহজে।তার উপর যদিঘুমটা ধরতো তাহলেও সময়টা কেটে যেত কিন্তু এই সময়টায় কেন যেন ঘুমটাও আসতে চায় না।ঘুম রাজ্যের রাজার হয়তো নির্দ্দেশ এটাই যে বিকাল বেলানিরব আহসানের ঘুম রাজ্যে প্রবেশাধিকার নেই।যদিও প্রতি বিকালে চোরাই রাস্তা খুজি এই রাজ্যে প্রবেশ করার জন্য।কিন্তু বেশির ভাগ সময় ঘুম রাজ্যের অতন্দ্র প্রহরিরা আমাকে ধরে ফেলে।

-এই যে মিস্টার নিরব।(রাত্রি)
-জ্বী হ্যা বলুন??(আমি)
-সন্ধ্যা হয়ে গেছে আমাকে একটু বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসেন।
-আচ্ছা চলুন।

রাত্রি মেয়েটা অসম্ভব রাগি আর বদমেজাজি।অফিসের বসও ওকে দেখে ভয়ে থাকে।যদিও আমি আর রাত্রি একি পোস্টে কাজ করি।তবুও ওর সাথে কথা বলতাম না।কারন একটাই এই মেয়ে সব করতে পারে।একটু আবলতাবল হলে মাইর খাওয়ারও সম্ভাবনা আছে।তাই কিছু না বলেই রাজি হয়ে গেলাম।ওদের বাসাটাও আমাদের বাসা থেকে বেশি দুরে না। এই রকম মেয়েও যে ভয় পেতে পারে জানা ছিল না।আমারতো মনে হয় উচ্চমানের কোন ডাকাতও ওকে দেখে বলবে এর থেকে দুরে থাকাই ভাল। রাত্রি মেয়েটাকে যে একেবারে ভয় পাই না তা না।মোটামোটি ভয় লাগে কিসের জন্য তা জানিনা যদিও আমার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি।করবেই বা কিভাবে আমিতো কথা বলা দুরের কথা ওর সামনেই তো যাই খুব কম। এতক্ষন চুপ করে আছি দেখে রাত্রিই নিরবতা ভেঙ্গে জিঙ্গেস করলো

–আপনি এত গম্ভির কেন?? নামের সাথে আপনার চালচলনের মিল আছে।
–হয়তো কিছুটা।
–সত্যি কথা বলতে আপনাকে দেখে আমি একটু ভয়ই পাই।শুনেছি গম্ভির লোকরা খুব বদ মেজাজি হয়। মেয়েটার কথা শুনে আর চুপ থাকতে পারলাম না।হো হো করে হেসে ফেললাম। যে মেয়েকে দেখে অফিসের সবাই ভয়ে থাকে সেই মেয়ে আবার আমার মত নিরিহ কাউকে ভয় পেতে পারে।এতো হাসি যে কতোদিন পর হাসলাম ঠিক মনে করতে পারছিলাম না।

–বাহ আপনি আবার হাসতেও জানেন। জানতাম না তো? উত্তর দেওয়ার সময় পেলাম না কারন ইতোমধ্যেই রাত্রির বাসা এসে গেছে।

এরকম হাসি দেখে রেগেই গেল নাকি বুঝতে পারলাম না ঠিক।মেয়েরা এতবেশি জটিল যে বড় বড় দার্শনিকরাও ওদের মন বুঝার অনেক চেষ্টা করেও পারেনি। আর আমার মত অধম তো দুর।তাই আর চেষ্টা করলাম না ওর মন বোঝার। ইতোমধ্যেই হঠাৎ করেই প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।একেই বোধহয় বলে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।খুব চিন্তায় পরে গেলাম। এমনিতেই বৃষ্টিতে আমার এলার্জি। একটু ভিজলেই জ্বর মামা চেপে বসে। ছাতাও নিয়ে আসিনি কি করবো কি না করবো ভাবতে না ভাবতেই পুরোপুরি ভিজে গেলাম।বাসায় আসতে আসতে ভিজে একদম কাঁদা হয়ে গেলাম।সেই রকম হাচিঁ শুরু হয়ে গেল।জানি না কপালে কি আছে। রাত হতে না হতেই গা পুরিয়ে বেদামজ্বর চলে আসল।আমি মোটামুটি নিশ্চিত একটানা সাতটাদিন বিছানার কোলে মাথা রেখে কাটাতে হবে।আবশ্য খুব একটা মন্দ হবে না অফিস নামক প্যারা থেকে কিছু দিন বিরত থাকতে পারবো।আমি ছুটি কাটাই খুব কম তাই বস নির্ধিদায় ছুটি দিয়ে দিবে।

–কলিগ গার্লফ্রেন্ডের সাথে বৃষ্টিতে ভিজে এই অবস্থা হয়েছে তাই না?? সকাল থেকে জ্বরটা একটু কম কম লাগছিল।ছুটি আরো একদিন আছে তাই অফিস না যেয়ে ছাদে উঠেছিলাম।এমন সময় নিধি এই মেজাজ খারাপ করা কথাটা বলে উঠলো।কিন্তু অবাক করা বিষয় এখন বিষয়টা এখন লক্ষ করলাম সেটা হলো আমার কেন যেন মেজাজটা গরম হচ্ছে না।বরং মনের মাঝে একটা প্রশান্তির ছায়া দেখতে পেলাম।

বৃষ্টিতে ভেজার পর থেকে এই সাতটাদিন নিধির ছায়া পর্যন্ত আমি দেখতে পাইনি।যাকে সারাজিবন এরিয়ে এরিয়ে চলে এসেছি।অবাক করা বিষয় সেই মানুষটার শুধু সাতদিন এরিয়ে চলা আমি সহ্য করতে পারছি না। কেন এমনটা হচ্ছিল আমি বুঝতে পারছিলাম না।তার মানে আমি নিধির প্রতি দূর্বল হয়ে পরছি??।আমিতো এরকম ছিলাম না??।কেন এরকম এলোমেলো লাগয??।অন্যের মন বোঝাতো দূরের কথা নিজেকেই ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।কেন আমার এই পরিবর্তন। আমি এতক্ষন চুপচাপ নিধির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম।আজ নিধিকে সামনে পেয়ে নিজেকে কেমন যেন পরিপুর্ন লাগছে।ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় মনে হলো আমি ঠিক নিধিকে ভালোবেসে ফেলেছি। এতক্ষন ছাদে সুনসান নিরবতা বিরাজ করছিল।এই নিরবতা ভেঙ্গে নিধি বলে উঠলো

–জানো আমার লন্ডনের স্কলার্শীপটা হয়ে গেছে।এই মাসের শেষেই ফ্লাইট। বুকের ভেতরটা ধুক করে উঠলো।আমি জানি আমার সাথে জেদ করেই নিধি আমার থেকে দূরে যেতে চাইছে। কিন্তু আমিতো এই কয়দিনে বুঝতে পেরেছি আমার জীবনে নিধির প্রয়োজনিয়তাটা।আমিকি হারিয়ে ফেলবো আমার সুপ্ত ভালোবাসাকে।যেই হাত সবসময় আমার হাতটা ছুঁতে চাইতো সেই হাতটা অনেক দুরে হারিয়ে যাবে?। চোখদিয়ে অজান্তেই অঝর ধারায় পানি গড়িয়ে পরছে।নিধি এককোনায় দারিয়ে তিনতালার নিচের দিকে তাকিয়ে কথা গুলো বলছে তাই আমার চোখের পানি এখনো দেখতে পায়নি।

–রাত্রির সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই বিশ্যাস করো।সেদিন সন্ধ্যা হয়ে গেছিল তাই ও একটু হেল্প চাচ্ছিল। কথাগুলো একনিঃশ্বাসে বলে ফেললাম। কথা গুলো শুনে নিধি হয়তো বুঝতে পারলো আমি কেদে দিয়েছি।সাথে সাথেই আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালো। যার সাথে সবসময় ধমকের সাথে কথা বলেছি তার কাছেই আবার কান্না কন্ঠে অনুনয় করছি!!এই বিষয়টাই হয়তো নিধিকে অবাক করেছে।

–তো আমি কি করবো।আমার গোছগাছ করতে হবে আমি আসছি আমি কাউকে জোর করি না।তবে আজ আমি যেনো আমি নেই।বরই বেপরোয়া হয়ে গেছি।কারন নিধিকে আমি চাই।ওকে যেতে দেওয়া যাবে না কোন ভাবেই না। নিধি আমার সমনদিয়ে দুই একপা করে চলে যাচ্ছে আর আমার মনে হচ্ছে ও আমার জিবন থেকেই হারিয়ে যাচ্ছে।

এক হ্যাচকা টানে নিধিকে পাগলের মত জাপ্টে ধরলাম।দেহে হঠাৎ করেই এত শক্তি যে কোথা থেকে আসলো বুঝতে পারলাম না।এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছি যে নিধি নরতেও পারছে না।নিধি যে নড়ার চেষ্টাও করছে না তাও বুঝতে পারলাম।তবে হ্যা নিধি কাঁদছে। শব্দকরেই কাদঁছে।আমার বুক থেকেমাথা তুলে আমার চোখথেকে বেয়ে পড়া পানি গুলো যত্ন সহকারে মুছে দিয়ে নিধিই জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।সেই সাথে আমার মুখে ফুটে উঠলো এক প্রশান্তির হাসি।আমি জানি এটা ফিরে পাওয়ার এক অমূল্য অনুভূতি।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত